আ’লীগের পরিণতির জন্য নেতারাই দায়ী


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৩৮

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
কথায় আছে বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়। আওয়ামী লীগের জন্ম রাজনৈতিক দল হিসেবে হলেও মৃত্যু হলো-ফ্যাসিস্ট-লুটেরা-মাফিয়া গোষ্ঠীর সংস্থা হিসেবে। ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হাসিনা ক্ষমতা দখল করেন। এ থেকে শুরু; এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গোটা সরকার নিয়ে তিনি পালিয়ে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত খুন, গুম, জুডিশিয়াল কিলিং, আয়নাঘরে নির্যাতন, মিছিল-মিটিংয়ে হামলাসহ হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে করেনি। আগস্ট বিপ্লবের পর ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে দলটি নিষিদ্ধের দাবি করা হয়। হাসিনার পতন এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুযোগে রাজনৈতিক কর্মসূচির ব্যানারে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা ও জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি জোরালো হয়। ২০২৫ সালের ১১ মে তারিখে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’ সংশোধন করে ওই অধ্যাদেশ জারি করে পরদিনই এর ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনগুলোর সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ‘কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ও তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের’ সুযোগ রেখে যে অধ্যাদেশ জারি হয়েছিল, সেটিকে বিএনপি সরকারের সময় ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা হয় গত ৮ এপ্রিল।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের প্রাণভোমরাখ্যাত শেখ মুজিবুর রহমান এরআগে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দেশের সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট রূপ চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি দলটির নাম দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। এ অপকর্ম বিনা বাধায় করার জন্য নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করে ঢাকায় এনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করেছিলেন। অর্থাৎ ক্ষমতা দখলের আগে রাজনীতির নামে আওয়ামী লীগে অস্ত্রের ব্যবহারের ইতিহাস কারো অজানা নয়।
সেই ইতিহাসের খণ্ডচিত্র
১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পল্টনে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের জনসভায় হামলা চালিয়েছিলো নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন আমীরে জামায়াত মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.)। কিন্তু সেদিন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ পল্টনে হামলা চালিয়ে জনসভা পণ্ড করে দেয়। প্রফেসর গোলাম আযম সাহেবসহ নেতারা মঞ্চে থাকা অবস্থায়ই তাজউদ্দীন আর সৈয়দ নজরুল ইসলামদের নেতৃত্বে মঞ্চ ভাঙচুর করা হয়।
এরপর ১৯৭০ সালের ১৮ জানুয়ারি পল্টনে জামায়াতের সমাবেশে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। তৎকালীন নিখিল পাকিস্তান আমীরে জামায়াত মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ.) পল্টনের সমাবেশে উপস্থিত হতেই পারেননি। প্রাদেশিক জামায়াতের আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবসহ নেতৃবৃন্দ মঞ্চ ছেড়ে পাশে মসজিদে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেদিন পল্টনে আবদুল মজিদ ও আবদুল আওয়াল নামে দুই জামায়াত কর্মী শহীদ হন; আহত হন শতাধিক।
১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে নিখিল পাকিস্তান (মাওলানা ভাসানীর) গণতান্ত্রিক সম্মেলনে পাকিস্তান আওয়ামী লীগের আরেক গ্রুপ শেখ মুজিবের নেতৃত্বে হামলা করে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে লাঞ্ছিত করে। এছাড়া ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে এদেশে আসা মুহাজির উর্দুভাষী মুসলমানদের আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা ব্যাপকভাবে নিধন করেছে- এর ঐতিহাসিক অনেক প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন গবেষকরা।
ফ্যাসিবাদী এ ধারা দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্ষমতায় গিয়ে এবং ক্ষমতার বাইরে সবসময়ই অব্যাহত রেখেছে। নিজের পাপ লুকাতে তারা কাজে লাগায় বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের। মিডিয়া সন্ত্রাসে তারা হিটলারের গোয়েবলসকেও হার মানিয়েছে। পতিত শেখ হাসিনা সরকারের সময় দেশের জনগণের টাকায় পরিচালিত বাংলা একাডেমির মতো সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানকে এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন- ২০১৮ সালের জুনে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্তের লেখা ‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ বইয়ের ৫২ পৃষ্ঠায় ১৯৭০ সালে জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় আওয়ামী লীগের হামলার ঘটনা বিকৃত করে বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে, ‘১৮ জানুয়ারি (রোববার) পল্টনের জনসভায় নিরীহ জনতার ওপর জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের হামলার প্রতিবাদে ১৯ জানুয়ারি ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ছাত্র-ধর্মঘট হয় এবং উক্ত ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে ঢাকায় হরতাল পালিত হয়। সকাল ৬টা থেকে ১২টা পর্যন্ত দোকানপাট, যান চলাচল বন্ধ থাকে।’ ইতিহাস না জানা যে কেউ বইটি পড়লে এত বছর পর কী মনে করবে? এতে কি বোঝা যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী আক্রান্ত হয়েছিল? আওয়ামী লীগ ফ্যাসিবাদী দর্শনের জাতীয়তাবাদী চেতনা ব্যবহার করে এভাবেই বারবার এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শের বিরুদ্ধে দলীয় নেতা-কর্মীদের দাঁড় করিয়েছে। তাদের হাতে তুলে দিয়েছে মারণাস্ত্র। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা বারবার ফ্যাসিবাদী একাডেমিক সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করে গণতন্ত্র ও চেতনার মোড়ক পরিয়ে দলটিকে দায়মুক্তি দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তারা হয়তো বুঝতে চান না একাডেমিক সংজ্ঞা নয়, চরিত্রের প্রকৃত চিত্র প্রকাশিত হয় কর্মে। অর্থাৎ ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।’ কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা এ সত্য মেনে না নিয়ে ফ্যাসিবাদের বিকাশে সহযোগিতা করেই যাচ্ছেন। তাই তো দেশবাসী রাজনৈতিক ঐক্য, জাতীয় সংহতি এবং সমৃদ্ধির পূর্বশর্ত স্থিতিশীলতার বঞ্চনামুক্ত হতে পারছে না।
অথচ নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে জন্ম নেওয়া এ দলটির প্রতিষ্ঠাতাদের জন্ম ছিলো ১৯৪৭ সালে নব্য স্বাধীন পাকিস্তানকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে মর্যাদার আসরে প্রতিষ্ঠিত করা। সেই সোনালি ইতিহাসের সাথে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আকাশ-পাতাল ফারাক।
কী সেই সোনালি ইতিহাস
আওয়ামী লীগের আদি ও আসল উৎস খুঁজতে গিয়ে যে সত্য বের হয়ে এলো, তা হলো সংগঠনটির সূচনা একজন পীরসাহেবের হাতে। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের (বর্তমান খাইবার পাখতুন প্রদেশ) মানকি পীরসাহেবের দরবার শরীফ থেকে। উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মানকি পীর সাহেবের ভূমিকা আজও ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তিনি দেশ বিভাগের আন্দোলনে (ভারত ভেঙে পাকিস্তান সৃষ্টি) অংশ নিয়েছিলেন খেলাফতের আদর্শে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই।
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন ছিল এই ভূখণ্ডে ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ ইসলামী আদর্শের আলোকে একটি কল্যাণরাষ্ট্র কায়েম করা। দলটির বর্তমান অবস্থা এবং বাঁকবদল দেখলে মনে হয়, অসীম আকাশে ছুটতে ছুটতে অনেক তারকা যেমন হঠাৎ জ্বলে উঠে হারিয়ে যায়। হারিয়ে যাওয়া ঐ তারকাগুলোর নামও বদলে যায়। তখন আর তাদের তারকা বলা হয় না, বলা হয় উল্কা। শুধু আকাশে নয়, এই মাঠির পৃথিবীতেও এমন ঘটনা ঘটে। যেমন দেশের বর্তমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ঘটেছে। এই দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। তিনি এবং তার সাথে যারা এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের স্বপ্ন ছিলো ইসলামের সুমহান রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে এই ভূখণ্ডে একটি কল্যাণরাষ্ট্র বা ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করা। তাদের সেই চিন্তার আলোকেই প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকালে ‘মূল দাবি’ নামে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সম্মেলনে একটি ম্যানিফেস্টো (ঘোষণাপত্র) উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি অখণ্ড পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ ও পাকিস্তান)-এর মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য যে কল্যাণরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই স্বপ্নে শরিক হয়েছিলেন অন্য নেতারাও। তাঁদের সেই স্বপ্নের রাষ্ট্রের যে বৈশিষ্ট্য দলটির প্রথম ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ করা হয়েছিল, তা হলো- ১. পাকিস্তান খেলাফত অথবা ইউনিয়ন অব পাকিস্তান রিপাবলিক ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বাইরে একটি সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্র হইবে। ২. পাকিস্তানের ইউনিটগুলোকে আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকার দিতে হইবে। ৩. রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব আল্লাহর প্রতিভূ হিসেবে জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকিবে। ৪. গঠনতন্ত্র হইবে নীতিতে ইসলামী গণতান্ত্রিক ও আকারে রিপাবলিকান। (সূত্র : স্বাধিকার আন্দোলন ও শামসুল হক, পৃষ্ঠা-৫৮, লেখক: মোহাম্মদ হুমায়ুন করীর)।
শামসুল হকদের গড়া সেই রাজনৈতিক দলের নাম বদলে হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন শামসুল হক। সে বছরই আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, দলের প্রথম ম্যানিফেস্টো তার হাতেই রচিত। ভাষা আন্দোলনের সব পর্বেই শামসুল হক ছিলেন প্রথম সারিতে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু আমতলায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিল। তখন শামসুল হক বললেন, ‘যেহেতু সর্বসম্মতিক্রমে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয়েছে, সুতরাং আমিও এর সঙ্গে একমত।’
জন্মলগ্নে ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনে গৃহীত খসড়া ঘোষণাপত্রে ‘মূল দাবি’তে বলা হয়েছিল, পাকিস্তানের দুই ইউনিটের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সাধারণ নির্বাচন, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেছিল। সম্মেলনে গৃহীত ১২ দফা- ‘১. পাকিস্তান একটি স্বাধীন-সার্বভৌম ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হবে। পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হবে জনসাধারণ। ২. রাষ্ট্রে দুটি আঞ্চলিক ইউনিট থাকবে পূর্ব ও পশ্চিম। ৩. অঞ্চলগুলো লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করবে। প্রতিরক্ষা-বৈদেশিক সম্পর্ক ও মুদ্রা ব্যবস্থা কেন্দ্রের হাতে থাকবে এবং অন্য সকল বিষয় ইউনিটগুলোর হাতে ন্যস্ত থাকবে। ৪. সরকারি পদাধিকারী ব্যক্তিরা কোনো বিশেষ সুবিধা বা অধিকারভোগী হবেন না কিংবা প্রয়োজনাতিরিক্ত বেতন বা ভাতার অধিকারী হবেন না। ৫. সরকারি কর্মচারীরা সমালোচনার অধীন হবেন, কর্তব্য সম্পাদনে ব্যর্থতার জন্য তাদের পদচ্যুত করা যাবে এবং অপরাধের গুরুত্বানুসারে তাদের ছোট-খাটো বা বড় রকমের সাজা দেয়া যাবে। আদালতে তারা কোনো বিশেষ সুবিধার অধিকারী হবেন না। কিংবা আইনের চোখে তাদের প্রতি কোনোরূপ পক্ষপাত প্রদর্শন করা হবে না। ৬. জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করবেন- যথা বাকস্বাধীনতা, দল গঠনের স্বাধীনতা, অবাধ গতিবিধি ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকার। ৭. সকল নাগরিকের যোগ্যতানুসারে বৃত্তি অবলম্বনের অধিকার থাকবে এবং তাদের যথাযোগ্য পারিশ্রমিক দেয়া হবে। ৮. সকল পুরুষ ও নারীর জন্য শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। ৯. পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোয় সকল নাগরিকের যোগদানের অধিকার থাকবে। একটি বিশেষ বয়সসীমা পর্যন্ত সকলের জন্য সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর ইউনিট গঠন করা হবে। ১০. মৌলিক মানবিক অধিকারসমূহ দেয়া হবে এবং কোনো অবস্থাতেই কাউকে বিনা বিচারে আটক রাখা হবে না। বিনা বিচারে কাউকে দণ্ডদান বা নিধন করা হবে না। ১১. বিনা খেসারতে জমিদারি ও অন্য সকল মধ্যস্বত্ব বিলোপ করা হবে। সকল আবাদযোগ্য জমি পুনর্বণ্টন করা হবে। ১২. সকল জমি জাতীয়করণ করা হবে।’
সামাজিক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে খসড়া ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, ভূমি সংস্কার বিনা খেসারতে জমিদারি উচ্ছেদ এবং প্রকৃত কৃষকদের মধ্যে জমি বণ্টন, যৌথ খামার ও সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সকল শিল্প-কারখানা জাতীয়করণ, শিল্প-কারখানা পরিচালনায় শ্রমিকদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, শ্রমিকদের সন্তানদের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং তাদের ধর্মঘটের অধিকার প্রভৃতি। এছাড়া দেশের শিল্পায়ন, শিক্ষার বিস্তার ও নারীর অধিকারের কথাও প্রথম ঘোষণাপত্রে লিপিবদ্ধ ছিল। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, প্রথম ঘোষণাপত্রের ২২ দফা আশু কর্মসূচির ১৮নং দফায় আওয়ামী লীগ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ এবং ১৯নং দফায় ‘আগামী তিন মাসের ভেতরে জাতিসংঘ গণভোট দ্বারা কাশ্মীর সমস্যার সমাধান না করলে পাকিস্তান কর্তৃক জাতিসংঘ ত্যাগ।’-এর ঘোষণা দিয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী আওয়ামী লীগের পরবর্তী নেতৃত্ব প্রতিবেশী দেশ ভারতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছিলো। তারা জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার বদলে বিচ্ছিন্নবাদ ও সন্ত্রাসকেই বারবার উসকে দিয়েছে। তাই পর্যবেক্ষকদের মনে একটাই প্রশ্ন- আওয়ামী লীগ কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের চরিত্র ধরে রাখতে পেরেছিলো, নাকি ফ্যাসিস্ট-লুটেরা-মাফিয়া গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার ক্লাবে পরিণত হয়েছিলো।
ফ্যাসিস্ট-লুটেরা-মাফিয়া গোষ্ঠীর ক্লাব
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। কিন্তু রাজনৈতিক দল করার সুযোগে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সংগঠন করার সুযোগ নেয়, পরে তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে স্বরূপে আভির্ভূত হয়। এমন উদাহরণ এ উপমহাদেশের ইতিহাসেও আছে, এমন ঘটনাও আছে একটি মহৎ উদ্দেশে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল চলে গেছে ফ্যাসিস্ট-লুটেরা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দখলে। পরে তা আর রাজনৈতিক দল থাকেনি। প্রথমটির অন্যতম উদাহরণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। দ্বিতীয়টি উদাহরণ জার্মানির নাৎসি পার্টি (Nationalsozialistische Deutsche Arbeiterpartei), ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি (Fasci di Combattimento)।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ছাত্র-জনতার গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনে গুম, খুন, মিছিল-মিটিং এ সশস্ত্র হামলার অভিযোগে নিষিদ্ধ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগও রাজনৈতিক দল হিসেবে শুরু করে শেষ পর্যন্ত চরিত্র ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দেশের প্রাচীন এবং অনেক ঐতিহাসিক ঘটনার ঘটক দলটির মৃত্যুর জন্য অন্য কেউ নয়, এর নেতৃত্ব দায়ী। অবশ্য আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের নিকট থেকে যারা দলটি ছিনতাই করেছিলেন, সেই স্বার্থান্বেষী ফ্যাসিস্ট নেতৃত্বের কারণেই আজ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ দল। আওয়ামী লীগের এ পরিণতির জন্য একটি বা দুটি ঘটনা নয়, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথমে প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হককে পাগল অপবাদ দিয়ে বের করে দেয়া এবং পরে সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী দলের নেতৃত্ব ছাড়ার পরই একটি প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্রে একটি মাফিয়া গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে তাদের দখলে নিয়ে নেয়। এরপরই আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলের চরিত্র হারিয়ে স্বার্থান্বেষী ফ্যাসিস্টদের দখলে চলে যায়। তখনই রাজনৈতিক দলের চরিত্র হারায়।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা বলতে বাংলাদেশে আর কিছু নেই।’
পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন, আওয়ামী লীগের ‘নেই’ এ পরিণত হওয়ার কারণ আওয়ামী লীগের নেতারাই। এ দায় কোনো রাজনৈতিক দল বা দেশের জনগণের ওপর চাপানোর কোনো সুযোগ নেই। তারা আস্তে আস্তে রাজনৈতিক দলের চরিত্র হারিয়ে ফেলে গণতন্ত্র ও জনগণের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে বারবার বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আজ সেই বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতি ভোগ করছে।