জামায়াতে ইসলামী অপেক্ষমাণ ক্ষমতাসীন দল
৭ মে ২০২৬ ০৯:২৭
জাতীয় সংসদের স্পিকারের পর্যবেক্ষণ
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বসার আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যে কথা দিয়েছিলেন, তিনি তা রেখেছেন। তিনি ১১ দলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশ ও জাতির স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে। ব্যক্তিগত রাগ-বিরাগ, ক্ষোভ, চাওয়া-পাওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে থেকে তিনি মহৎ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, সরকারি দলের অনেক সিনিয়র সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী ‘ধান ভানতে শিবের গীতে’র মতো অপ্রাসঙ্গিকভাবে ইতিহাসের পুরনো বিষয় টেনে এনেছেন, আওয়ামী বয়ান হাজির করেছেন। কিন্তু ডা. শফিকুর রহমান অল্প কথায় তাদের সেই নোংরা আক্রমণের জবাব দিয়েছেন, খুবই ভদ্র ও নরম ভাষায়। আধিপত্যবাদবিরোধী বাংলাদেশপন্থী নাগরিকরা তার এ ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ডা. শফিকুর রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রশংসা করেছেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর এ ভূমিকাকে অপেক্ষমাণ ক্ষমতাসীন দলের ভূমিকা বলে উল্লেখ করেছেন।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের সমসাময়িককালে অথবা অনেক পরে স্বাধীনতা লাভ করেছে এমন অনেক দেশ দ্রুত উন্নতি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ পারছে না। কিন্তু কেন পারছে না? বিশ্লেষকরা এর কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সবার আগে আঙুল তোলেন রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকে। কারণ অর্ধশতাব্দীতে তারা টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারি ও বিরোধীদলের মধ্যে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও সংহতির বদলে কাদা ছোড়াছুড়ি করে সঙ্কট আরো বাড়িয়েছে। দা-কুমড়ো সম্পর্ক বিরাজমান রেখে ‘তালগাছটা আমার চাই’ নীতিতে অটল থাকতো অতীতের বিরোধীদল। বিশেষ করে নিষিদ্ধঘোষিত দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় কিংবা বিরোধীদল উভয় অবস্থাতেই ফ্যাসিবাদী দর্শনের চর্চায় চ্যাম্পিয়ন ছিলো। তবে আশার কথা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি সরকারি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বিরোধীদলের আসনে বসেছে। দেশ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দায়িত্বশীল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করছে- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সদ্যসমাপ্ত প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পর পর্যবেক্ষকরা এমন মন্তব্য করেছেন। তারা মনে করেন, বিএনপি বা সরকারি দল ফ্যাসিস্ট হয়ে না উঠলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি কেউ থামাতে পারবে না।
বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির অন্যতম আরেকটি প্রধান বাধা প্রতিবেশী আধিপত্যবাদী দেশ ভারতের দাদাগিরি। দেশটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের সাথে সমমর্যাদার ভিত্তিতে নয়, করদরাজ্যের মতো সম্পর্ক চায়। তারা বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা সর্বত্র কর্তৃত্ব রজায় রাখতে গিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টিতে গোপনে এবং প্রকাশ্যে জাল বিস্তার করে। আন্তর্জাতিক সুপ্রতিবেশী সূচকে ভারতের অবস্থান খুবই খারাপ। মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, চীন, পাকিস্তান কারো সাথেই ভারতের সম্পর্ক মধুর নয়। বাংলাদেশে হাসিনার দুঃশাসনকালে নতজানু হয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করেছে। কিন্তু ভারতের অন্য প্রতিবেশীরা তাদের আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে। ছোট দ্বীপ দেশ মালদ্বীপ ভারতকে বাধ্য করেছে সেনা প্রত্যাহার করতে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সাহসী ভূমিকা নিয়ে ভারতের দাদাগিরি বৃত্তের বাইরে এসে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক অক্ষুণ্ন রাখতে পারলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরবে। কারণ কোনো দেশের দায়িত্বশীল সরকার ও বিরোধীদল অন্য কোনো শক্তির ব্যবস্থাপত্র না মেনে নিজেরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখালে তাদের কেউ দাবাইয়া রাখতে পারে না। বাংলাদেশ ইতোপূর্বে এমন দায়িত্বশীল ও শক্তিশালী বিরোধীদল পায়নি। এবারের এ সুযোগ তখনই কাজে আসবে, যখন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বিরোধীদলের দায়িত্বশীল ভূমিকার আলোকে নিজেরাও দায়িত্বশীল আচরণ করবে। কারণ বর্তমান সংসদে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। এমন নিরঙ্কুশ সংখ্যার কারণে তাদের মধ্যে অহংকারবোধ সৃষ্টি হলে সর্বনাশ অনিবার্য।
সদ্যসমাপ্ত প্রথম অধিবেশনে এমন সর্বনাশের অনেক লক্ষণ দেখা গেছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। তাহলে দেখা যাক কেমন ছিলো প্রথম অধিবেশন।
কেমন ছিল প্রথম অধিবেশন
গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার শেষ হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন। মোট ২৫ দিন অধিবেশন বসেছে। প্রথম অধিবেশ শুরু হয়েছিল গত ১২ মার্চ। গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম অধিবেশন শেষ হয়। সংসদে অধিবেশনে বিকালের অংশে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ও সকালে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সমাপনী ভাষণে জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয় ১২ মার্চ থেকে। এবারের অধিবেশনে মোট বৈঠক দিবস ছিল ২৫টি। অধ্যাদেশ ছিল ১৩৩ টি, অধ্যাদেশগুলোর বিপরীতে বিল পাস হয়েছে ৯১টি। অদ্যকার ২টি বিলসহ মোট ৯৪টি বিল পাস হয়েছে। আইন প্রণয়ন কার্যাবলী ছাড়াও এ অধিবেশনে ৫টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং ২টি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে।
‘কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধিতে ১৬টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২টির উপর আলোচনা হয়েছে। ৬৮ বিধিতে ৯টি নোটিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১টি নোটিশের ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়েছে। ৭১ বিধিতে গৃহীত ৩৮টি নোটিশের ওপর আলোচনা হয়েছে এবং ৭১ ক বিধিতে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে ২০৭ বার।’
তিনি বলেন, ১৬৪ বিধিতে ১৪টি নোটিশের মধ্যে ১টি গৃহীত হয়েছে এবং উহা বিশেষ অধিকার সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে প্রেরিত হয়েছে। ২৬৬ বিধিতে ৩টি নোটিশ পাওয়া যায় উহার পরিপ্রেক্ষিতে ২টি বিশেষ কমিটি গঠিত হয়েছে। এ অধিবেশনে সদস্যগণ প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরদানের জন্য সর্বমোট ৯৩টি প্রশ্নের নোটিশ প্রদান করেছেন। তন্মধ্যে তিনি ৩৫টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য মোট ২৫০৯টি প্রশ্নের নোটিশ পাওয়া যায়। এই নোটিশগুলোর মধ্যে মন্ত্রীগণ মোট ১৭৭৮টি প্রশ্নের উত্তর এ সংসদে প্রদান করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথমবার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, সংসদ পরিচালনায় সরকার ও বিরোধীদলের সকল সদস্যের সহযোগিতার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। এ সংসদে মোট ২২০ জন সদস্য প্রথমবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। এরপরও আপনাদের গঠনমূলক আলোচনা ও সহনশীল আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা এ মহান সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। তাই এই অধিবেশন ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করা, দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আসুন, আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করি। মতের ভিন্নতা থাকলেও দেশের স্বার্থকে সবার আগে রাখি। আমাদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করি। আমরা সংসদে একটি আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ প্রত্যক্ষ করেছি, যেখানে অংশগ্রহণকারী সকল মাননীয় সংসদ সদস্য সক্রিয়ভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। স্পিকার আরো বলেন, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনাদের প্রাঞ্জল আলোচনা সংসদীয় কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ করেছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার মাধ্যমে দেশের আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের চিত্র জনগণের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আপনারা মূল্যবান মতামত দিয়েছেন, যা সংসদের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করেছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ প্রথম অধিবেশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা তুলে ধরেছেন তার নিজ এলাকার একটি অনুষ্ঠানে।
স্পিকারের জামায়াত ইসলামী সম্পর্কে বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর প্রশংসা করে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম বলেছেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ভদ্র দল, সংসদে তারা খুবই ডিসিপ্লিন্ড, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। গত ১৭ এপ্রিল বিকালে ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত এক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন। তিনি জামায়াতে ইসলামীর প্রশংসা করে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ভদ্র দল, সংসদে তারা খুবই ডিসিপ্লিন্ড, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে। তারা পাশের লোকের সঙ্গেও কথা বলেন না। নিয়মকানুন মেনে চলেন। একসময় তারা আমাদেরই মিত্র দল ছিল। তাদের অনুরোধ করব, আপনারা ও বিএনপি মিলেমিশে চলবেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম জামায়াতে ইসলামীর ইতিবাচক ভূমিকা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার পরও একটি গোষ্ঠী সরকার ও বিরোধীদলের গঠনমূলক ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক সহনশীল আচরণকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে দেশে অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তারা জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের নবীন নেতাদের বিভিন্ন ছোট-খাটো নেতিবাচক বিষয়কে বড় করে দেখাচ্ছে। তাদের মনোবল ভেঙে দিতে, ‘প্রথম’ ‘নতুন’ ‘সংসদীয় আচরণ’ এবং কে কার চেয়ারে কেন বসলো ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয় প্রচার করতে ব্যস্ত। অথচ এমন ঘটনা বাংলদেশে নতুন নয়। এ সংসদের জন্যও নতুন নয়। প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিরোধীদলীয় নেতাসহ অনেকেই আসেন, যারা নতুন। ইতোপূর্বে বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিব থেকে নিয়ে জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, শেখ হাসিনা সবাই প্রথমবার সংসদ নির্বাচিত হয়েই এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। জাতীয় সংসদে তর্ক-বিতর্ক করেছেন। ভুল হয়েছে, স্পিকারের পক্ষ থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ ও সংশোধন কিংবা এক্সপাঞ্জ (Expunge) বা ‘কার্যধারা থেকে বাদ দেওয়া’ হয়েছে। কিন্তু কোন মিডিয়ায় অপপ্রচার করেনি অমুক নতুন এমপি সংসদীয় ভাষায় অজ্ঞ। কিন্তু সরকারি দল জুলাই সনদের আলোক সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ওয়াদা পূরণ না করে জাতির সাথে প্রতারণা করেছে, সে সম্পর্কে তেমন উচ্চবাচ্য নেই। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ব্যর্থতার তালিকা করলে সবার ওপরে স্থান পাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করা। আর এজন্য দায়ী সরকারি দল।
সরকারি দলের দায়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নয়, জুলাই বিপ্লবোত্তর সরকার শপথ গ্রহণের দিনই জাতিকে হতাশ করেছে। সংবিধানের দোহাই দিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেনি সরকার গঠনকারী দল বিএনপির নির্বাচিত এমপিরা। বিপ্লবের আগে জুলাইয়ের উত্তাল সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এ আন্দোলনের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’ বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতিতেও তারা বার বার এ প্রমাণ দিয়েছেন। সদ্যসমাপ্ত প্রথম অধিবেশনেও বিএনপি প্রমাণ করলো তারা জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নের কথা মুখে বললেও অন্তরে বিশ্বাস করে না।
জুলাই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়া এবং শহীদ ও আহত পরিবারের দাবিতে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিলো অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বিএনপিসহ সব দল স্বাক্ষর করেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই তারা তার আলোকে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেবে। যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি, তা গণভোটে পাস হলে তাতে কারো আপত্তি থাকবে না। কিন্তু বিএনপি প্রায় শতকরা ৭০ জন নাগরিকের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে। তারা গণভোটের রায় উপেক্ষা করে নিজেরা একাই কমিটি করে স্বৈরাচারী কায়দায় তাদের সিদ্ধান্ত জাতির ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার নীলনকশা ধরে এগোচ্ছে।
এ নীলনকশার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৩টি নির্ধারিত সময়ে সংসদে পাস না হওয়ায় বাতিল (ল্যাপস) হয়ে গেছে। যার মধ্যে গণভোট, পুলিশ কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ উল্লেখযোগ্য। অথচ এ সংসদে যারা আছেন, তারা সবাই ফ্যাসিস্ট হাসিনার দুঃশাসনে নির্যাতিত। ফাঁসির মঞ্চ, আয়নাঘর ও জেলখানা থেকে অনেকে ৫ আগস্ট ২০২৪ এরপর মুক্তি পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। রাজনীতি বিশ্লেষকরা তাই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপির এমন ভূমিকাকে নব্য ফ্যাসিস্ট বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘পুরনো পদ্ধতিতে হাঁটলে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে না, এটা সুস্পষ্ট মনে হচ্ছে, যেন বিএনপি পুরনো পথেই হাঁটছে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তাদের (বিএনপি) মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। অতীতের ইতিহাস বলে, টু-থার্ড মেজরিটি নিয়ে কিংবা তার বেশি নিয়ে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারা নিজেদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে নাই। জনগণের জন্যও কল্যাণ বয়ে আনে নাই। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। কারণ এটি জনগণের রায়ের পক্ষে এবং এটাই শেষ কথা। এতে কোনো যদি বা কিন্তুর সুযোগ নাই।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুত হয়ে কেউ যদি জনগণের রায়কে উপেক্ষা করে, তবে তা গণতন্ত্রকে দুর্বল করবে। গণতন্ত্র সুসংহত করতে হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। জুলাই সনদ বাদ দিয়ে যারা গণতন্ত্রের কথা বলে, তারা মূলত স্বৈরতন্ত্র কায়েমের পথে হাঁটছে।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, জুলাই সনদ এবং বিএনপির স্বৈরাচারী আচরণের বিপরীতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, বিরোধীদলের চিফ হুইপ এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম ও হুইপ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানসহ ১১ দলের সংসদ সদস্যরা বলিষ্ঠ ও যৌক্তিক বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তারা জনগণরে দাবি আদায়ে সংসদের ভেতরে ও রাজপথে গণতান্ত্রিক আন্দোলন অব্যাহত রাখার বার্তা দিয়েছেন।
বিরোধীদলের নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার
গণতন্ত্রে বিশ্বাসী একটি বিরোধীদলের ধৈর্যশীল ও বলিষ্ঠ অবস্থানের বিকল্প নেই। তবেই তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাড়া দিয়ে জনগণ আরেকটি জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায় করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ১১ দলীয় জোটের শীর্ষনেতা ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদে বলিষ্ঠ বক্তব্য দিয়েছেন। এছাড়া জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য নিয়ে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনের জাতীয় মহাসমাবেশে বিএনপি সরকারের উদ্দেশে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, জুলাই প্রতি বছরের ক্যালেন্ডারেই আছে। সরকার জনগণের দাবি মেনে না দিলে আবারও ৩৬ জুলাই আসবে।’
এনসিপি নেতা, ১১ দলের অন্যতম শীর্ষনেতা বিরোধীদলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামও হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ‘সংসদে সরকারি দলের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদকে বাতিল-গণভোটকে অস্বীকার করেছে তাতে আমি অনেক হতাশ হয়েছি। আশা করি, আমাদের এই হতাশা অতি দ্রুতই শেষ হবে এবং আমরা যেই কমিটমেন্ট জনগণের কাছে করেছি সেই সকল প্রতিশ্রুতি আমরা রক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব।’
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায় ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ এবং সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থান একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এই ইতিহাসের কোনো অংশ অস্বীকার করা যাবে না; বরং সেগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই নতুন বাংলাদেশ গড়তে হবে।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মন্তব্য এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনগণ বিরোধীদের সাহসী ভূমিকাকে স্বাগত জানিয়েছে, তারা তাদের দাবি আদায়ে প্রয়োজনে আবারও রাজপথে নামতে প্রস্তুত। তারা মনে করেন, দেশের শান্তি স্থিতিশীলতা ও সরকারের মেয়াদ পূরণের সাথে জড়িয়ে আছে গণভোটের রায়ের বাস্তবায়ন। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বিএনপি চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতীয় সংসদের সমাপনী ভাষণ ও সিলেটের নতুন কুঁড়ি স্পোটর্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে তার মনোভাবও ইতিবাচক বলে মনে করেন। এখন সময়ই বলে দেবে তিনি সরকারের মধ্যে গুপ্ত থাকা আধিপত্যবাদী শক্তির মোকাবিলায় কতটা সফল হবেন।