ঢাকাইয়া গল্প

এখন আর সেই ডাক শুনি না


১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:১৪

॥ হাসান আখতার ॥
আমরা তখন পুরান ঢাকার জিন্দাবাহার। ফাস্ট লেনের পাশা চৌধুরীর বাড়িতে থাকি। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৬৫ কিংবা ১৯৬৬ সাল। আমি তখন টু কি ক্লাস থ্রিতে পড়ি, তাঁতিবাজার প্রসন্ন পোদ্দার লেন সরকারি প্রাইমারি স্কুলে। আমার সাথে পড়তো তাঁতিবাজার প্রসন্ন পোদ্দার লেনের আবুল কাশেম, ওহিউদ্দীন, আরজু, আবুল হাসেম, রাজু, নয়াবাজার নবাব সিরাজদৌল্লা পার্কের পূব প্রান্তের সুইপার কলোণি সংলগ্ন বাসাবাড়ি লেনের গোলাম রসূলসহ আরো অনেকে। আজ আর সবার নাম স্মরণে নেই, স্মতির অতলে হরিয়ে গেছে। আবুুল কাশেম ও ওহিউদ্দীন কাগজ ব্যসায়ী, হাসেম স্বর্ণ ব্যবসায়ী, রাজু মর্টর পাটস ব্যবসায়ী, আরজু বেঁচে নেই, গোলাম রসূল শুনেছি পশ্চিম পাকিস্তান চলে গেছে পরিবারের সাথে। তবে সবার সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল একটু অন্যরকম এজন্য হয়তো নাম কয়টি আজও মনে আছে।
তবে শিক্ষকদের মধ্যে সিদ্দীক স্যারের নামটি মনে পড়ে। পড়া ভুল করলে বা না পারলে বেতের বাড়ির কথা আজও মনে আছে। হেড স্যারের নামটি সম্ভবত ছিল আমীর আলী কিংবা আমীর হোসেন স্যার। থাকতেন সৈয়দ হাসান আলী লেনে। জিন্দাবাহার ফাস্ট লেনের পাশের মহল্লায়। যাই হোক স্মৃতি তো স্মৃতিই।
এ সময়টায় সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান ছিল আমাদের দেশের (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) প্রেসিডেন্ট। পূব পাকিস্তানের রাজনীতি সচেতন মানুষদের কাছে সে ছিল অত্যন্ত অপ্রিয় একজন মানুষ। এই দেশের তথা বাংলাদেশের জনগণকে খুশি রাখার জন্য সে চেষ্টা করে যাচ্ছিল দিনান্তর। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিদ্যুৎ সাপ্লাই, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানি ও জলের সরবরাহ ব্যবস্থাসহ নানা উন্নয়নমূলক কাজ করে যাচ্ছিল। রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, স্টেডিয়াম, কুমিটেলা এয়ারপোর্ট, শেরেবাংলা নগরসহ বহু স্থাপনা। তার পরও সে পূর্ব পাকিস্তানর আ’লীগসহ বাম ঘরানার রাশিয়াপন্থী দলগুলোর কাছে ছিল অপ্রিয় একজন শামরিক শাসক। দোষ-গুণে মানুষ। তার দোষ হয়তো ছিল। কিন্তু ঐ সময় এদেশের সাধারণ মানুষ জন সুখী ছিল। যাদের বয়স এখন সত্তরের কোটায়, তারা বুকে হাত দিয়ে বলুক যে আমরা ঐ সময় সুখী ছিলাম না? এই সত্যটা তারা বলবে না। কারণ সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলার মানসিকতা আমাদের অধিকাংশ মানুষের নেই। বিশেষ করে আমরা যারা দলকানা। এককথায় বললে আমরা সত্য বলতে ও অভ্যস্ত নই। এটাই আমাদের দেশের মানুষদের চরিত্র।
সে যাই হোক পুরান ঢাকায় তখনো প্রায় মহল্লায় ইলেকট্রিসিটি ছিল না। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও ছিল নিম্নমানের। সামান্য বৃষ্টি হলেই পাড়া-মহল্লা পানিতে তলিয়ে যেত জলবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। আমরা স্কুলে যাওয়া ছেড়ে দিতাম অবস্থার উন্নতি না হওয়া অবধি। এভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। জিনিসপত্রের দাম তুলনামূলকভাবে সস্তা ছিল বহু দেশের তুলনায়; বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশীদের তুলনায়। তখন ছিল সালে সাত কোটি মানুষ আর এখন ১৮ কোটি। আমরা জনগণরা অসুখী ছিলামনা। একথা সব সময় বলবো।
প্রতি বছর রোজা আসে, রোজা যায়। ঈদ আসে, ঈদ যায়। আমরা কী যে আনন্দ করতাম, ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সেবার আমার ঢাকাইয়া বন্ধুরা বললো
দোস্ত শুভ রাতমে কিয়া কারেগা?
আমি ঠিক বুঝে উঠে পারছিলাম না শুভ রাত বলতে ওরা কী বোঝাচ্ছে। আমি বললাম, শুভ রাত মানে?
আমার প্রশ্ন শুনে এক বন্ধু বললো, ছালা বাঙাল শুভ রাইত বুঝস না। শুভ রাইত অইলো গিয়া শবেবরাত এর রাইত। আলা বুঝছস আমি হো হো শব্দ করে মাথা দুলিয়ে বললাম, তাই বল শবেবরাত এর রাত।
আরেকজন বন্ধু বলল, প্রতি বছরের ন্যায় আমরা সবাই শুভ রাইত অনেক মজা করি আমগো ছপতের বাড়িতে তিন-চাইর কিছিমের হালুয়া পাক হয় শুকা রুটি (বাকেরখনি) তার বাদে বন রুটি, বড় বড় রুটি বেকারি থেইক্যা কিনা রিস্তাদারগো বাড়ি বাড়ি দিয়া আহি তারাভি আমগো বাড়িতে হালুয়া রুটি পাঠায়। মাগরিবের নামাজের বাদে দুধের ডিব্বা ছেদ কইর্যা তার মধ্যে মোমবাতি জ¦ালাইয়া লাইটের মতন হাতে লইয়া এই মহল্লা ঐ মহল্লা দল বাইন্দা ঘুরি বহুত মজা অহে তুই আইলে আমগো মহল্লায় আহিস।
বুদ্ধি পেয়ে গেলাম আমিও ঐ ভাবে লাইট বানিয়ে হাতে নিয়ে আরমানিটোলা মাঠে গেলাম। মাঠে গিয়ে দেখি পরিচিত-অপরিচিত বহুজনের হাতে সেই লাইট। সারা রাত ঐভাবে কাটিয়ে ফজরের আজানের সময় গিয়ে মসজিদে ঢুকতাম। ফজর নামাজ শেষে মোনাজাতের পর দাওনা (বিরআনি) দিতো তা নিয়ে বাসায় ফিরতাম। এই ছিল আমাদের শবেবরাত। শবেবরাতের পনের দিন পর রোজা শুরু হতো চাঁদ দেখার জন্য আমরা আরমানিটোলা মাঠে যেতাম। চাঁদ দেখে এসে মাকে বলতাম, মা চাঁদ দেখে এসেছি কাল থেকে রোজা শুরু। বাড়ি বাড়ি রোজার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেতো। আমরা বাজার থেকে তৈরি ইফতার কিনে এনে ইফতার করতাম। পুরান ঢাকায় ইফতারের বাজার বসতো জিন্দাবাহার সিরাজদৌল্লাহ পার্কের সামনে। ইসলামপুর পটুয়াটলি সংলগ্ন গলি, বাবুবাজার, আর চকবাজার, আমরা এই সব ভাসমান দোকান থেকে তেলের ভাজা পিয়াজু, আলু আপ, বেগুনি, ফুল্লরি সহ নানা আইটেম কিনতাম। এক পিস বেগুনি এক পিস পিঁয়াজু, এক পিচ আলুচপ এক পিস ফুল্লরি। প্রতি পিস ছিল পাঁচ পয়সা করে। এখন যা প্রতি পিস বিক্রি হয় দশ টাকা।
প্রথম রোজার সাহরির সময় মা আমাকে ঢেকে দেন। এখন মা আর আমায় ঢেকে দেন না । মা চলে গেছেন বহু বহু দূরে, যেখানে আমাকেও একদিন যেতে হবে। সবাইকে যেতে হবে।
প্রথম রোজার সাহরির সময় একটি চমতকার কণ্ঠে কানে ভেসে এলো
ইয়ে মাহে রমজান
ইস মাহেনেমে কুরআন নাজিল হুয়া
উঠো রোজদারো আল্লাহকা পিয়ারো
রেজা কারো নামাজ পাড়ো কাম আয়েগ্যা
চান্দিকা পায়সা জরিকা রুমাল
নূর ইসলাম মিয়াকা ইয়ে শাওয়াল।
এখন আর ঐ ডাক শুনি না, ছোট বেলায় যে ডাক শুনে প্রথম সাহরি খেতে উঠে ছিলাম।