ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য
১৭ মার্চ ২০২৬ ১১:১৩
॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥
‘ঈদুল ফিতর’ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় দুটি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে একটি। অন্যটি হলো ঈদুল আজহা। ধর্মীয় পরিভাষায় একে পুরস্কারের দিবস হিসেবেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম-সাধনা ও সামর্থ্যবানদের ফিতরা ও যাকাত আদায়ের পর মুসলমানরা এ দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও কর্তব্য পালনসহ খুব আনন্দের সাথে পালন করেন। এ দিনে তারা একে অপরকে ‘ঈদ মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা জানায়, যা মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছেদ্য ঐতিহ্য হয়ে গেছে।
বস্তুত ‘ঈদ’ অর্থ ‘আনন্দ, খুশি বা উৎসব’ একথায় বহুল প্রচলিত। ‘ঈদ’ শব্দটি আরবি ‘আওদ’ থেকে এসেছে। অর্থ ঘুরে আসা, প্রত্যাবর্তন করা। ঈদ মানে প্রতি বছর ঘুরে-ফিরে আসে এ রকম একটি দিন। আরবিতে বিশেষ দিবস বা উৎসবের দিনকে ঈদ বলে। ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা বা ইফতার করা। আমাদের কাছে পরিচিত ‘রোজার ঈদ’কে ইসলামী পরিভাষায় বলা হয় ঈদুল ফিতর বা রোজা ভাঙার উৎসব। পুরো রমজানে প্রতিদিন সূর্যাস্তের পর মুসলমানরা পানাহার শুরু করে। এটা শুধু সেদিনের রোজার ইফতার। ঈদের দিন এক মাসের নিয়মিত রোজা ভাঙা হয়। সেটাও একরকম ইফতার। রোজাদারের জন্য প্রত্যেক দিনের ইফতারের মুহূর্তই আনন্দের, ঈদুল ফিতরের দিন বিশেষভাবে আনন্দের ও উৎসবের। রাসূল (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দক্ষণ রয়েছে, ইফতারের সময় সে আনন্দিত হয়, রবের সঙ্গে দেখা করার সময় আবার সে আনন্দিত হবে। (বুখারি)। বস্তুত ঈদ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর বার্ষিক সম্মেলন; যা মুসলিম ভ্রাতৃত্বকে দৃঢ় ও মজবুত করে।
বস্তুত ঈদ একটি ইসলামী পরিভাষা। এটি মুসলিম উম্মাহর বিশেষ ধর্মীয় উৎসব। ঈদ মুসলমানদের সংস্কৃতি-এ কথার আগে যুক্ত করে নিতে হবে। অতএব ইসলামী মূল্যবোধের আলোকেই একে বুঝতে হবে এবং দীন ও শরীয়তের শেখানো পদ্ধতিতেই তা উদযাপন করতে হবে; নিজেদের মনগড়া ধ্যান-ধারণার আলোকে নয় কিংবা শরীয়তের বিধিনিষেধ বিবর্জিত বস্তুবাদী ও ভোগবাদী মানসিকতা নিয়ে নয়।
মূলত মানুষের বৈচিত্রহীন কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে মাঝে মাঝে উৎসবের প্রয়োজন হয়। সামাজিক ও আত্মীয়তার শীতল হয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলো সজীব ও প্রাণবন্ত করতে প্রয়োজন হয় কোনো সম্মিলন বা মিলন মেলার। যেন মানুষ তার প্রতিদিনের একঘেঁয়ে জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে বের এসে আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারেন। নিরুদ্যম প্রাণে শক্তি ও কর্মপ্রেরণা জোগাতে পারে। সব আসমানি ধর্মসহ পৃথিবীজুড়ে সব জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই বিভিন্ন উৎসব আছে। উৎসব জাতিগত ঐক্যের চেতনাও সৃষ্টি করে। উৎসবের দিনগুলোও যেকোনো জাতির স্বাতন্ত্র্য ও পৃথক পরিচয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ও প্রতীক। একটি জাতির স্বতন্ত্র পরিচয়-সত্তা নির্মাণ করতে, তাদের মধ্যে ঐক্যের চেতনা ও ভ্রাতৃত্বের মৈত্রী জাগ্রত করতে সম্মিলিত আনন্দ ও উদযাপন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাসূল (সা.) যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় গেলেন, তখন সেখানে জাহেলি যুগ থেকে প্রচলিত দু’টি উৎসবের দিন ছিল; শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোজ’ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় ‘ মেহেরজান’।
রাসূল (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এ দুদিন কীসের? মদিনাবাসী সাহাবীরা বললেন, জাহেলি যুগ থেকে আমরা এ দুদিন খেলাধুলা ও আনন্দ করি। রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ এ দুদিনের বদলে তোমাদের নতুন দুটি উৎসবের দিন দিয়েছেন: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। (মুসনাদে আহমদ)।
এভাবে মুসলমানদের পৃথক উৎসবের সূচনা হলো। এটা দ্বিতীয় হিজরি অর্থাৎ ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা। রাসূল (সা.) ঘোষণা করলেন, ‘সব জাতিরই ঈদ বা উৎসবের দিন থাকে, এটা আমাদের ঈদ।’ (বুখারি, মুসলিম)।
ঈদুল ফিতরের দিন মুসলমানরা আনন্দিত হয় রমজানের রোজা সফলভাবে রাখতে পারা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রাপ্তির কারণেও। এটা রোজাদার মুসলমানদের জন্য পুরস্কারের দিন। হজরত আউস আল আনসারী (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ফেরেশতারা রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান এবং মুসলমানদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা দয়ালু প্রতিপালকের দিকে এগিয়ে এসো। উত্তম প্রতিদান ও বিশাল সাওয়াব-প্রাপ্তির জন্য এগিয়ে এসো। তোমাদের রাত্রিবেলার নামাজের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তোমরা সে নির্দেশ মেনে নামাজ পড়েছো। তোমাদের দিনে রোজা রাখতে বলা হয়েছিল, তোমরা সে নির্দেশও পালন করেছো, এক মাস রোজা রেখেছো। গরিব দুঃখীদের আহার করানোর মাধ্যমে নিজের প্রতিপালককে তোমরা আহার করিয়েছো। এখন নামাজ পড়ে এসব পুণ্যকর্মের প্রতিদান ও পুরস্কার গ্রহণ করো’। ঈদের নামাজ পড়ার পর একজন ফেরেশতা ঘোষণা দেন, ‘শোন নামাজ আদায়কারীরা! তোমাদের মহান রাব্বুল আলামীন মাফ করে দিয়েছেন, সকল গুনাহ থেকে মুক্ত অবস্থায় নিজ নিজ আবাসে ফিরে যাও। আজ পুরস্কার প্রদানের দিন। আকাশে এ দিনের নামকরণ করা হয়েছে ‘পুরস্কারের দিন’ (আল মুজামুল কাবির লিত তাবারানি ৬১৭, ৬১৮)।
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ঈদের দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, ‘তারা আমার ফরজ আদায় করে প্রার্থনার জন্য বের হয়েছে। আমার মর্যাদা বড়ত্ব ও সম্মানের কসম! আমি অবশ্যই তাদের প্রার্থনা কবুল করবো। তারপর আল্লাহ বান্দাদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ফিরে যাও, আমি তোমাদের ক্ষমা করে দিয়েছি। তোমাদের পাপগুলোকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছি। এরপর সবাই ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। (বায়হাকির সূত্রে মেশকাত, অধ্যায়: হায়াতুল মুসলিমিন, পৃ: ২৪৯)।
মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার পর ঈদুল ফিতরের এ দিনটি মূলত আল্লাহ দিয়েছেন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। তিনি যে রমজানের সবক’টি রোজা রাখার এবং তাঁর ইবাদতে পুরো একটি মাস কাটানোর তাওফিক দিয়েছেন সেজন্য শোকর আদায়-এটাই ঈদের তাৎপর্য। এ মাসে রোজা রাখতে পারা এবং আল্লাহর ইবাদতের অসীম-অবারিত সুযোগ পাওয়ার যে আনন্দ মুমিন-হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়-ঈদুল ফিতর হল সে আনন্দ প্রকাশ করার উৎসব। সে আনন্দের প্রকাশ ঘটে দলে দলে ঈদগাহে হাজির হয়ে মহান রবের কৃতজ্ঞতায় সালাত আদায়ের মধ্য দিয়ে। তাঁর মহিমা ও বড়ত্বের ঘোষণা দিয়ে তাকবীর পাঠের মাধ্যমে এবং এ সিয়াম সাধনা যেন কবুল হয়, সেজন্য একে অপরের কাছে দোয়া চাওয়ার মাধ্যমে। মূলত মুসলমানের ঈদ আশা ও শঙ্কায় মিশ্রিত এক সতর্ক ও সংযত আনন্দ উদযাপন। একদিকে খুশি- আলহামদুলিল্লাহ, রোজাগুলো রাখতে পেরেছি। অন্যদিকে শঙ্কা- কবুল হয়েছে তো? রমজান পেয়েও যদি মাগফিরাত, তাকওয়া অর্জন ও জাহান্নাহের আগুন থেকে মুক্তি না মেলে, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্য তো কিছু নেই…। রাসূল (সা.) এমন সতর্কবাণীই উচ্চারণ করেছেন আমাদের উদ্দেশ্যে।
মাসব্যাপী ইবাদতের তাওফিক পেয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং সে খুশিতে তাঁর বড়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা করে তাকবীর পাঠ, এটাই যে ঈদের মর্মকথা-নিম্নোক্ত আয়াতই তার প্রমাণ। পবিত্র কালামে হাকীমে বলা হয়েছে, ‘…এবং যাতে তোমরা রোজার সংখ্যা পূরণ করে নাও আর আল্লাহ যে তোমাদের পথ দেখিয়েছেন, সেজন্য আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ কর ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর’। -সূরা বাকারা : ১৮৫।
আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অংশ হিসেবেই এদিন বৈধ সব উপায়ে আনন্দ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একজন মুমিন শরীয়তের সীমার ভেতরে থেকে যেভাবে আনন্দ করতে পারে। ভালো খাওয়া, ভালো পরা, আপনজন ও প্রিয়জনদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও খোশগল্প, একে অপরকে হাদিয়া দেওয়া, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ইত্যাদি। এ আনন্দে যেন সমাজের সব শ্রেণির মানুষ শরিক হতে পারে, সেজন্যই সদাকাতুল ফিতরের বিধান। শুধু নিজে ভালো খাওয়া ও ভালো থাকার যে আনন্দ-অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর আনন্দ তার চেয়ে বহুগুণে বেশি। এ কারণেই দান-সাদকা ও জাকাত-ফিতরার প্রতি এত উৎসাহিত করেছে শরীয়ত।
ইসলাম যে তার অনুসারীদের ধর্ম-কর্ম পালনের পাশাপাশি আনন্দ উদযাপনেরও সুযোগ দিয়েছে, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনদুটি তারই এক বড় নিদর্শন। ঈদের দিন বৈধ পন্থায় আনন্দ উদযাপনের এ অবকাশ প্রসঙ্গেই আম্মাজান আয়েশা (রা.) বিশ্বনবী (স.)-এর বর্ণনা করেছেন-‘ইহুদিরা জানবে, আমাদের ধর্মেও অবকাশ আছে। নিশ্চয়ই আমি প্রেরিত হয়েছি এমন এক শরীয়ত নিয়ে, যা সহজতা ও উদারতার গুণে গুণান্বিত’। (মুসনাদে আহমাদ)।
শরীয়তের শিক্ষা ও শরয়ী জ্ঞানের চর্চার অভাবে এবং শরীয়া প্রতিপালনে মুসলমানদের ক্রমবর্ধমান উদাসীনতার কারণে ঈদের এ যে তাৎপর্য-সেটা দিন দিন দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যাচ্ছে। তার স্থানে জায়গা করে নিচ্ছে ঈদের এমন এক সংজ্ঞা এবং চিত্র ও চরিত্র, শরীয়তের মেযাজ ও রুচির সাথে যার কোনো মিল নেই। বরং বলা যায়, যে উদ্দেশ্যে রোজা ও ঈদ, তার সম্পূর্ণ বিপরীত এক স্রোত গ্রাস করে নিচ্ছে মুসলমানদের ঈদভাবনা ও ঈদ-উদযাপন কর্মকাণ্ডকে। ঈদের স্বরূপ ও শিক্ষা থেকে আমরা কত দূরে, সেটা বুঝতে পারব আমাদের পূর্বসূরিদের সঙ্গে নিজেদের একবার মিলিয়ে নিলে। সালফে সালেহীন ঈদকে বাধ্যবাধকতার বন্ধন থেকে মুক্তি হিসেবে দেখেননি; বরং ইসলামের অন্যতম সম্মানিত দিন হিসেবে দেখেছেন। বিভিন্ন হারামে জড়িয়ে এ দিনের পবিত্রতা লঙ্ঘন করেননি, কোনো কর্তব্য কাজে শিথিলতা করেননি। বরং এ দিনটিতে তারা নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন জায়েজ খাবার ও পানীয় এবং পরিমিত ও পরিমার্জিত সাজসজ্জার মধ্যে এবং সেইসব কাজের মধ্যে, যা মুমিন-হৃদয়ে প্রফুল্লতা আনে, যেমন আল্লাহর জিকির ও তাসবীহ-তাকবীর, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং নির্দোষ হাসি-আনন্দ ও বৈধ বিনোদন। নিজের ও পরিবারের জন্য ভালোমানের খাবার ও পোশাকের ব্যবস্থা ইত্যাদি।
ওয়াকী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমরা ঈদের দিন সুফিয়ান সাওরীর সাথে বের হয়েছিলাম; তখন তিনি বললেন, এ দিনটি আমরা প্রথম যে কাজ দিয়ে শুরু করি, তা হলো দৃষ্টি অবনত করা। (আলওয়ারা, ইবনু আবিদ দুনইয়া, পৃ. ৯৬৩)।
তাঁদের কাছে প্রকৃত ঈদ ছিল আল্লাহর কাছে কবুলিয়ত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ। আলী (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তিনি রমজানের শেষ রাত্রিতে বলতে থাকতেন-‘হায়, জানা নেই, কে আমাদের মাঝে মাকবুল, যাকে স্বাগত জানাব! আর কে আমাদের মাঝে মাহরূম, যাকে সমবেদনা জানাব! (লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনে রজব হাম্বলী, পৃ. ৩৬৯)।
সালাফ সালেহীন ঈদের দিন এ চিন্তাতেই বিভোর থাকতেন। তার ভেতর দিয়েই হতো তাদের ঈদ উদযাপন। আনন্দ-বিনোদনের নামে হারাম ও গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়ার তো প্রশ্নই নেই। কারণ বিবেকবান পরহেজগার মানুষের কাছে পাপাচারের পঙ্কিলতায় ডুবে যাওয়া কোনোভাবেই আনন্দের বিষয় হতে পারে না, আনন্দ উদযাপনের তরিকা হতে পারে না। হাসান বসরী (রাহ.) তাই বলেছেন-‘প্রতিটি দিন, যেদিন তুমি আল্লাহর নাফরমানি কর না, সেটা তোমার জন্য ঈদ’। লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনে রজব হাম্বলী, পৃ. ৫১২)। কথাটিকে আরেকভাবে পড়ুন, যেদিন আল্লাহর নাফরমানি করা হয়, সেটা ঈদের দিন হলেও ঐ নাফরমান ব্যক্তির জন্য তা ঈদ বা খুশির দিন নয়, বরং ওয়াঈদ ও অভিশাপ!
আজ আমাদের অনেকেরই অবস্থা এমন, ঈদ তাদের ইবাদতকে প্রতিফলিত করে না। রমজানজুড়ে সিয়াম-সাধনার কোনো ফলাফল তাদের এ দিনটির কথা ও কাজে প্রকাশ পায় না। ঈদের জন্য তারা এমনভাবে প্রস্তুতি নেয়, ঈদের আয়োজন ও ঈদ-উপভোগে তারা এমনই আত্মহারা ও লাগামহীন হয়ে পড়ে। তাই এমন বাঁধভাঙা উল্লাস ও দিশেহারা অবস্থা। অপচয় ও ঔদ্ধত্য প্রকাশে কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, সে প্রতিযোগিতা। চোখের লালসা এবং মনের বাসনা পূরণের যত রকম উপায় ও উপকরণ হতে পারে-তার চর্চা ও প্রসারের এক মহা ধুম! পোশাক-আশাক ও পানাহার থেকে শুরু করে চলাফেরা ও কথাবার্তা, দেখা-সাক্ষাৎ ও মেলামেশা এবং বিনোদনমূলক প্রোগ্রাম ও আয়োজন, কোনো কিছুতেই হালাল-হারামের তোয়াক্কা নেই…।
ঈদ মুসলিম উম্মাহর একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ উৎসব ও বার্ষিক মহাসম্মেলন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে, ঈদুল ফিতর উদযাপন বাংলাদেশের সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য এটি বছরের সবচেয়ে আনন্দের সময়। প্রধান শহরগুলো থেকে সমস্ত বহির্গামী পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অত্যন্ত ভিড় হয়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারি বিধিনিষেধ সত্ত্বেও ভাড়া বেড়ে যায়। ঈদের দিন, ঈদের নামাজ সারা দেশে, মাঠ, ঈদগাহ বা মসজিদের ভিতরের মতো খোলা জায়গায় অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের নামাজের পর, লোকেরা বাড়ি ফিরে, একে অপরের বাড়িতে যায় এবং পরস্পর ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
দিনভর লোকেরা একে অপরকে আলিঙ্গন করে এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করে। গ্রামাঞ্চলে ধুমধাম করে ঈদ উৎসব পালন করা হয়। নিরিবিলি প্রত্যন্ত গ্রামগুলো জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে। নৌকা প্রতিযোগিতা, কাবাডিসহ বিভিন্ন ধরনের খেলা এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশি খেলার পাশাপাশি ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো আধুনিক খেলাও এই উপলক্ষে খেলা হয়। শহরাঞ্চলে, লোকেরা গান বাজায়, একে অপরের বাড়িতে যায়, পিকনিকের আয়োজন করে এবং বিশেষ খাবার খায়। সন্ধ্যায় আলোকসজ্জায় আলোকিত হয় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, বাজার, পার্ক। সিনেমা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখা শহরাঞ্চলে ঈদ উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় সব টিভি চ্যানেল এ উপলক্ষে বেশ কিছুদিন বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। কিন্তু আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত ঈদের আনন্দ প্রকাশে আমরা যাতে অতিমাত্রায় বেপরোয়া হয়ে না পড়ি। এক্ষেত্রে আমাদেরকে সালফে সালেহীনের মডেল অনুসরণ করতে হবে। এমন কিছু করা উচিত নয়, যা ঈদের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব এবং আধ্যাত্মিক চেতনাকে ব্যাহত করে।
ঈদুল ফিতরের একটি ওয়াজিব বা আবশ্যিক আমল হলো সালাতুল ঈদ বা ঈদের নামাজ। ঈদের আনন্দের সূচনা হয় এ সালাতের মাধ্যমে। ঈদের দিন প্রথম প্রহরে ধনী-দরিদ্র আমির-ফকির নির্বিশেষে সব মুসলমান এক কাতারে দাঁড়ায়। একসঙ্গে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহত্ত ঘোষণা করে। পরস্পরের খোঁজখবর নেয় ও কুশল বিনিময় করে। ইসলামে মুসলমানদের এ সম্মিলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদের আরেকটি আবশ্যিক আমল হলো সাদকাতুল ফিতর। ক্ষমাপ্রাপ্তির খুশিতে এবং রমজানে কৃত আমলের ত্রুটি দূর করতে মুসলমানরা সাদকাতুল ফিতর আদায় করে। সামর্থ্যবান ও সচ্ছল মুসলমানদের ওপর সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। ঈদ উদযাপন সর্বজনীন করে তুলতে, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই সাদকাতুল ফিতরের বিধান এসেছে। পাশাপাশি এ সাদকার মাধ্যমে রোজায় হয়ে যাওয়া ভুল-ত্রুটি মাফ হয়। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) রোজাকে বেহুদা ও অশ্লীল কথা-আচরণ থেকে পবিত্র করার উদ্দেশ্যে এবং দরিদ্রদের খাদ্যের ব্যবস্থা করার জন্য সাদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ)।
আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ ও তাদের খোঁজখবর নেওয়ার সুযোগও হয় ঈদের সম্মিলন ও দাওয়াতে। ইসলামে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা ফরজ। সারা বছর কর্মব্যস্ততার কারণে আমরা অনেক আপনজনকেই ভুলে থাকি। সবার খোঁজখবর সঠিকভাবে নেওয়া হয়ে ওঠে না। ঈদের উৎসবে সবাই একত্রিত হওয়ার সুযোগ পায়। আমাদের দেশে অনেক কর্মজীবী মানুষ বাবা মায়ের সঙ্গেও সাক্ষাৎ ও সময় কাটানোর সুযোগ পায় ঈদের ছুটিতে।
ঈদের উৎসবে একটু আনন্দের মধ্যে থাকা, খেলাধুলা করা বা উপভোগ করার শিক্ষা আমরা নবীজির জীবন থেকে পাই। আয়েশা (রা.) বলেন, এক ঈদের দিন হজরত আবু বকর (রা.) আমার ঘরে এলেন। সেখানে তখন দুজন মেয়ে বুয়াস যুদ্ধের গান গাইছিল। তারা গায়িকা ছিল না। হজরত আবু বকর (রা.) ওই মেয়ে দুটিকে শক্ত ধমক দিয়ে বললেন, শয়তানি বাদ্য! তাও রাসূলের ঘরে! রাসূল (সা.) বললেন, আবু বকর! ওদের ছেড়ে দাও। প্রতিটি জাতিরই ঈদ ও খুশির দিন থাকে। আজ আমাদের ঈদের দিন। (সহিহ বুখারি)।
আরেকটি রেওয়ায়াতে আয়েশা (রা.) বলেন, এক ঈদের দিন দুজন কৃষ্ণাঙ্গ ঢাল ও বর্শা দিয়ে খেলছিল। আমি রাসূলকে বললাম অথবা রাসূল (সা.) নিজেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, বর্শার খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম হ্যাঁ। রাসূল (সা.) আমাকে তার পেছনে দাঁড় করালেন। আমি রাসূল (সা.)-এর কাঁধে চেহারা রেখে খেলা দেখতে লাগলাম। রাসূল (সা.) বললেন, হুঁশিয়ার! হে বনি আরফাদা! (কোনো পক্ষকে উৎসাহ দিলেন বা সাবধান করলেন) (সহিহ বুখারি)।
দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম ও কিয়াম সাধনার পর এ অবসরযাপন ও বিনোদন এক অনাবিল প্রশান্তি ও আনন্দ বয়ে আনে আমাদের জীবনে। আত্মীয়তা, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যে উজ্জ¦ল হয়ে ওঠে কয়েকটি দিন। মূলত ঈদুল ফিতর হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বার্ষিক সম্মেলন। আর সম্মেলন আমাদের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় করে। মানুষের প্রতি সহমর্মী হতে শেখায়। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম ও কিয়াম সাধনার পর প্রতি বছরই আমাদের মাঝে ফিরে আসে এই মহিমান্বিত দিন।
তাই আমাদের প্রত্যেকেই উচিত এ দিনে ঈদের আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনা করা। আমরা সিয়াম ও কিয়াম পালনের মাধ্যমে কতখানি আত্মশুদ্ধি ও আত্মগঠন করতে পেরেছি সে বিষয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। আর ঈদ উদযাপন যাতে শরয়ী সীমার মধ্যে সর্বজনীন হয়ে ওঠে, সেদিকে সবিশেষ দৃষ্টি রাখা দরকার। ঈদের ফিতর আমাদের মাঝে বারবার ফিরে আসুক মহাখুশি, আত্মসংযম ও ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বারতা নিয়ে- এ প্রত্যাশা হোক আমাদের সকলের!