আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত : বিজ্ঞান কী বলে?
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৭
॥ মুহাম্মদ নূরে আলম ॥
প্রকৃতিতে যত আশ্চর্যজনক ঘটনা ঘটে, তার মধ্যে অন্যতম আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত। কখন ঘটবে, কেউ অনুমান করতে পারে না। অনুমান না করতে পারার কারণ, আগে থেকে তেমন কোনো লক্ষণ টের পাওয়া যায় না। ভূপৃষ্ঠের নিচে মূল ঘটনা ঘটে বলে সবই থাকে মানুষের চোখের আড়ালে। বাইরে শুধু ফলাফলটুকু দেখা যায়। পৃথিবী আমাদের দৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও এর ভূ-অভ্যন্তরে বিশাল শক্তি লুকিয়ে আছে। এই শক্তিই মাঝে মাঝে পৃথিবীর পৃষ্ঠে বের হয়ে অগ্ন্যুৎপাত আকারে বিস্ফোরিত হয়। আগ্নেয়গিরি থেকে লাভা, ছাই, গ্যাস এবং অন্যান্য পদার্থ বের হয়ে ভূ-ভৌগোলিক ও বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন ঘটায়। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জানব কেন অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, এর বৈজ্ঞানিক কারণ, আগ্নেয়গিরির প্রকারভেদ এবং এর প্রভাব।
এক. আগ্নেয়গিরি হলো Lithosphere-এর ফাটল বা ভূ-পৃষ্ঠের ওপরে তৈরি পাহাড় বা পর্বত, যার মাধ্যমে মোল্টেন রক বা ম্যাগমা পৃথিবীর পৃষ্ঠে আসে। এটি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হলেও কখনো কখনো বিস্ফোরণাত্মক ঘটনা ঘটায়, যা পরিবেশ ও মানবজীবনে প্রভাব ফেলে। তেমনি একটি আগ্নেয়গিরি হলো ইথিওপিয়ায় অবস্থিত, যা ১২ হাজার বছর পর অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। ইথিওপিয়ার উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের একটি আগ্নেয়গিরিতে প্রায় ১২ হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অগ্ন্যুৎপাত হয়েছে। এতে ঘন ধোঁয়া উঠে ১৪ কিলোমিটার (৯ মাইল) উঁচু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে বলে জানিয়েছে তুলুজ ভলকানিক অ্যাশ অ্যাডভাইজরি সেন্টার (ভিএএসি)। পরে এ ছাই লোহিত সাগর পেরিয়ে ইয়েমেন, ওমান ও ভারতের দিকে ধাবিত হয়। এ আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ছাইয়ের মেঘ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজস্থান, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, দিল্লি ও পাঞ্জাবের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মাটি থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার গতিতে ভেসে আসা এ মেঘের কারণে আকাশ অন্ধকার হয়ে যায় এবং দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় বিমান চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
দুই. হাইলি গুবি নামের আগ্নেয়গিরিটি রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার (৫০০ মাইল) দূরে ইরিত্রিয়া সীমান্তের কাছে আফার অঞ্চলে অবস্থিত। ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর কয়েক ঘণ্টা ধরে এ আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাত চলে। আগ্নেয়গিরিটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০০ মিটার উঁচু এবং রিফট ভ্যালির মধ্যে অবস্থিত, যেখানে দুটি টেকটোনিক প্লেটের মিলনক্ষেত্র হওয়ায় অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয়। ভলকানিক অ্যাশ অ্যাডভাইজরি সেন্টারের তথ্যে বলা হয়েছে, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে সৃষ্টি হওয়া ছাইয়ের মেঘ ভেসে ইয়েমেন, ওমান, ভারত ও পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোয় দেখা যায়, সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠছে।
তিন. স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের গ্লোবাল ভলকানিজম প্রোগ্রাম জানায়, হলোসিন যুগে হাইলি গুবি আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কোনো রেকর্ড নেই। এই যুগ শুরু হয় প্রায় ১২ হাজার বছর আগে শেষ হওয়া বরফযুগের পর থেকে। মিশিগান টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ সাইমন কার্নও ব্লুসকাই একই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, হাইলি গুবির হলোসিন যুগে অগ্ন্যুৎপাতের কোনো রেকর্ড নেই। স্থানীয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ সেইদ বলেন, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে অগ্ন্যুৎপাতের প্রভাব স্থানীয় গবাদি পশুপালক সম্প্রদায়ের অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা, এএফপি, টাইমস অব ইন্ডিয়া।
চার. আল-জাজিরার খবর অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট মারাপির আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর দেশটির পশ্চিম সুমাত্রা দ্বীপের ২ হাজার ৮৯১ মিটার চূড়ায় মাউন্ট মারাপি থেকে আকাশে ছাই উদগিরণ শুরুর মাধ্যমে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। এ সময় পাহাড়ে ট্রেকিংয়ে ছিলেন পর্বতারোহীরা। মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ২২-এ। এর মধ্যে ৯ পর্বতারোহীর লাশ উদ্ধার করা হয়। আহত আরও ১২ পর্বতারোহী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৬০টির মতো অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে। কোনো কোনোটি আমাদের চোখে পড়ে। কোনোটি তেমন আলোচনায় আসে না। ইন্দোনেশিয়ার ঘটনাটি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পাঁচ. ইতিহাসে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান নগরী পম্পেই ধ্বংস হওয়ার ঘটনা। ৭৯ খ্রিষ্টাব্দে এ নগর ধ্বংস হয়ে যায়। পৃথিবীতে সক্রিয় আগ্নেয়গিরির সংখ্যা দেড় হাজার। এসব আগ্নেয়গিরি ছড়িয়ে আছে ৮১টি দেশে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পরিসংখ্যান ঘেঁটে বলেছেন, ১৫০০ সালের পর থেকে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে মাত্র ৬টি অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায়। আগ্নেয়গিরির গ্যাসে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ক্যামেরুনে, ১৯৮৬ সালে। সে সময় লেক নয়েজ আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডে প্রাণ হারায় প্রায় দেড় হাজার মানুষ। ১৯০২ সালে ক্যারিবীয় একটি দ্বীপে নিহত হয় ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ২০০০ সালের পর থেকে মারা গেছে প্রায় ২ হাজার মানুষ। এসব মৃত্যুর বেশিরভাগই হয়েছে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, জাপান ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে। একটি আগ্নেয়গিরি দীর্ঘসময় ধরে জ্বলতে পারে। যেমন পৃথিবীতে যত সক্রিয় আগ্নেয়গিরি আছে, তার একটি কিলাওয়ে। প্রায় ৩৫ বছর আগে এই আগ্নেয়গিরি থেকে অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে বলছে, এখানে সাম্প্রতিক সময়ে অগ্ন্যুৎপাতের মাত্রা বেড়েছে। উত্তপ্ত লাভা পাঁচ কিলোমিটার দূরে চলে গেছে। যেতে যেতে পথে ধ্বংস করেছে বাড়িঘর। সরিয়ে নেওয়া হয়েছে হাজার হাজার মানুষ। লাভা যে পথ দিয়ে যায়, সেখানে সবকিছু পুড়িয়ে ফেলে। কারণ, উত্তপ্ত লাভার তাপমাত্রা থাকে প্রায় ১২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ছয়. বেশিরভাগ আগ্নেয়গিরির সঙ্গে প্লেট টেকটোনিকের সম্পর্ক আছে। প্লেট টেকটোনিক মানে, আমাদের পৃথিবীর ভূত্বক প্রধানত সাতটি বড় এবং কয়েকটি ছোট গতিশীল কঠিন প্লেট বা স্তর দিয়ে গঠিত, যেগুলো এর নিচের উত্তপ্ত পদার্থের ওপর ভাসমান। এই প্লেটের নড়াচড়া ও সংঘর্ষের কারণে ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত ও পর্বত সৃষ্টি হয়। এসব প্লেট জাপান, আইসল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্য অনেক জায়গায় আগ্নেয়গিরি তৈরি করেছে। আগ্নেয়গিরি মূলত দুটি প্লেটের মাঝখানে তৈরি হয়। বিশাল কঠিন পাথুরে প্লেটের প্রান্তে একটি প্লেট অন্যটির নিচে স্লাইড করে বা ঢুকে যায়। তখন দুটি প্লেটের মধ্যে নিচের ডুবন্ত প্লেটে আটকে থাকা তরল প্রচণ্ড চাপে বের হতে চায়। এই তরলের কাছাকাছি থাকা শিলা গলে যায়। যথেষ্ট তাপ উৎপন্ন হওয়ার ফলে ম্যাগমা তৈরি হয়। ম্যাগমা আশপাশের শিলাগুলোর চেয়ে বেশি উত্তপ্ত, তাই পরিচলন পদ্ধতিতে (চুলায় পানি ফোটালে গরম পানি ওপরে চলে আসে, ঠাণ্ডা পানি নিচে যায়। ক্রমাগত চলতে থাকা এই পদ্ধতিকে পরিচলন বলে) এটি ওপরে উঠে যায়। এরপর পৃথিবীপৃষ্ঠের কাছাকাছি খালি জায়গায় উত্তপ্ত ম্যাগমা জমতে থাকে। খালি জায়গা বা চেম্বার পূর্ণ হওয়ার পর চাপ বাড়তে থাকে। সাইকেলের টিউবে বাতাস ভরে যাওয়ার পরও বাতাস দিতে থাকলে যেভাবে চাপ বাড়বে, ঠিক তেমন।
সাত. ভূ-অভ্যন্তরে যখন তাপমাত্রা এবং চাপের প্রভাবে রক গলে মোল্টেন ম্যাগমা তৈরি হয়, তখন তা হালকা হয়ে ওপরের Lithosphere-এর ফাটল বা ভাঙনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ওঠে। ম্যাগমার সঙ্গে থাকা গ্যাস এবং চাপের কারণে এটি বিস্ফোরিত হয় এবং ল্যাভা, ছাই ও গ্যাস আকারে বের হয় এটাই অগ্ন্যুৎপাত। নিস্তেজ (Dormant) অগ্নেয়গিরি বর্তমানে শান্ত, ভবিষ্যতে আবার সক্রিয় হতে পারে। উদাহরণ মাউন্ট রেইনিয়ার। মৃত (Extinct) অগ্নেয়গিরি বহু বছর ধরে অগ্ন্যুৎপাত করেনি এবং ভবিষ্যতেও সম্ভব নয়। উদাহরণ : সেন্ট হেলেন্সের প্রাচীন শৃঙ্গ।
আট. অগ্ন্যুৎপাতের ধরণ; ল্যাভা ফ্লো গলিত পাথর ভূমির ওপর ছড়ায়। পিরোক্লাস্টিক ফ্লো; ছাই, গ্যাস ও পাথরের টুকরা নিয়ে নেমে আসে। স্ট্রোম্বোলিয়ান ছোটখাটো বিস্ফোরণ, চূড়ার কাছে সীমাবদ্ধ। প্লিনিয়ান খুব ধ্বংসাত্মক, প্রচুর ধোঁয়া, ছাই ও গ্যাস ছড়ায়। অগ্ন্যুৎপাতের ধ্বংসাত্মক প্রভাব হলো; বসতবাড়ি ধ্বংস, ফসল নষ্ট, মানুষের প্রাণহানি। আগ্নেয়গিরি ও অগ্ন্যুৎপাত হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রকাশ। সক্রিয়, নিস্তেজ এবং মৃত অগ্নেয়গিরি অনুযায়ী এর প্রভাব ও ঝুঁকি ভিন্ন। আধুনিক ভূবিজ্ঞানীরা সিসমোলজি ও জ্যোথরীতিবিদ্যার মাধ্যমে অগ্ন্যুৎপাতের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা বিপদের সময় সতর্কতা ও পরিকল্পনায় সহায়ক।
লেখক: সাংবাদিক।