রহস্যময় এক ‘ভবঘুরে’ গ্রহ
১২ মার্চ ২০২৬ ১০:৪৩
॥ এম ওবায়দুল্লাহ আনসারী ॥
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সৃষ্টিজগতে মহাকাশের অসীম শূন্যতায় রয়েছে কোটি কোটি নক্ষত্র আর গ্রহের মেলা। সেখানে নিয়মটাই হলো- প্রতিটি গ্রহ কোনো না কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তিত হবে; যেমন পৃথিবী ঘোরে সূর্যকে কেন্দ্র করে। কিন্তু মহাবিশ্বের এ চিরচেনা নিয়মের বাইরেও কিছু নিঃসঙ্গ পথিক আছে, যাদের কোনো ‘অভিভাবক’ নক্ষত্র নেই।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা মহাকাশের অতল অন্ধকারে একা একা ভেসে বেড়ানো এমনই এক রহস্যময় ‘ভবঘুরে’ গ্রহের সন্ধান পেয়েছেন। ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ একাকী গ্রহের রোমাঞ্চকর উপাখ্যান, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের জগতে নতুন করে কৌতূহল উসকে দিয়েছে। সাধারণত গ্রহ মানেই তার নির্দিষ্ট কক্ষপথ থাকবে এবং তারার আলোয় সে আলোকিত হবে। কিন্তু এ ভবঘুরে বা ‘রোগ প্ল্যানেট’গুলোর জীবন সম্পূর্ণ আলাদা। এদের নিজস্ব কোনো সূর্য নেই; নেই কোনো নির্দিষ্ট ‘ঘরবাড়ি’। মহাজাগতিক অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়িয়ে এরা ছায়াপথের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাযাবরের মতো ঘুরে বেড়ায়। বিজ্ঞানীদের কাছে এ গ্রহগুলো দীর্ঘকাল ধরে এক গভীর রহস্য হয়ে ছিল। কারণ অন্য গ্রহদের খুঁজে পাওয়া যতটা সহজ, এ অন্ধকারের বাসিন্দাদের খুঁজে বের করা ততটাই দুরূহ।
সাধারণত কোনো গ্রহ যখন তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন নক্ষত্রের আলোর হ্রাস-বৃদ্ধি দেখে সেই গ্রহটিকে শনাক্ত করা হয়। কিন্তু যার কোনো নক্ষত্রই নেই, তাকে খুঁজে পাওয়ার উপায় কী? বিজ্ঞানীরা এ অসাধ্য সাধন করেছেন ‘মাইক্রো-লেন্সিং’ নামক এক বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে। এটি মহাকাশের এক অদ্ভুত আলোকবিভ্রম। যখন কোনো বিশাল ভরের বস্তু তার পেছনের কোনো দূরবর্তী নক্ষত্রের আলোরেখার সামনে চলে আসে, তখন সেই বস্তুর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি অনেকটা আতশি কাচ বা লেন্সের মতো কাজ করে। এর ফলে পেছনের নক্ষত্র থেকে আসা আলোটি বেঁকে যায় এবং বহুগুণ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এ সূক্ষ্ম আলোর বিকৃতি পর্যবেক্ষণ করেই বিজ্ঞানীরা মহাকাশের এ নিঃসঙ্গ আগন্তুকের অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছেন।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এ প্রভাব একইসঙ্গে পৃথিবী এবং মহাকাশের টেলিস্কোপÑ উভয় জায়গা থেকেই পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা যখন দুই ভিন্ন অবস্থানের তথ্য তুলনা করেছেন, তখনই বেরিয়ে এসেছে গ্রহটির প্রকৃত পরিচয় এবং তার ওজন বা ভর। গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন আবিষ্কৃত এ গ্রহটি আমাদের সৌরজগতের দানব গ্রহ বৃহস্পতির ভরের তুলনায় প্রায় ২২ শতাংশ। এটি আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩ হাজার পারসেক বা প্রায় ১০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে। এ আবিষ্কারের শেকড় মূলত ছড়িয়ে আছে গত কয়েক দশকের গবেষণায়। ২০০০ সালে প্রথমবার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ ভবঘুরে গ্রহের সংকেত পেয়েছিলেন।
তবে ২০২৪ সালে এসে দূরবর্তী এক তারকার আলোর বিশেষ বিকৃতি তাদের গবেষণাকে চূড়ান্ত রূপ দেয়। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত ‘গাইয়া’ স্পেস টেলিস্কোপ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানমন্দিরগুলো মিলে এ মহাজাগতিক রহস্যের জট খুলেছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে- এ গ্রহটি কেন এমন একা হয়ে গেল? তার কি কখনো কোনো পরিবার ছিল? বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এ গ্রহটির জন্ম হয়েছিল কোনো এক সুশৃঙ্খল গ্রহমণ্ডলীতেই। হয়তো কোনো একসময় সেই গ্রহমণ্ডলীর ভারসাম্য নষ্ট হয়েছিল। হয়তো পাশের কোনো বিশাল গ্রহের সঙ্গে তার প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়েছিল, অথবা কোনো অস্থির নক্ষত্রের প্রবল মহাকর্ষীয় টানে সে তার ঘরছাড়া হয়েছে।
মহাজাগতিক সেই বিশৃঙ্খলার তোড়ে কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়ে গ্রহটি এখন মহাকাশের চিরস্থায়ী এক যাযাবর। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কম ভরের গ্রহগুলোর ক্ষেত্রেই এমন ছিটকে পড়ার প্রবণতা বেশি থাকে। এখন পর্যন্ত মহাকাশে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র ভবঘুরে গ্রহের দেখা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তবে তারা বিশ্বাস করেন, এটি শুধু হিমশৈলের চূড়ামাত্র। মহাকাশের অন্ধকারে এমন কোটি কোটি গ্রহ হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের চোখের আড়ালে। এ আবিষ্কারটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্সে’ প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।
বিশেষ করে নাসার আসন্ন ‘ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস’ টেলিস্কোপ যখন মহাকাশে পাড়ি জমাবে, তখন এ ভবঘুরেদের নিয়ে গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। হয়তো সেদিন আমরা জানতে পারব, মহাকাশের এ নিঃসঙ্গ পথিকরা আসলে কতটা সংখ্যায় আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে।
নিঃসঙ্গ এ গ্রহটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্ব কতটা বিশাল এবং বিচিত্র। যেখানে কোথাও প্রাণের স্পন্দনে কোলাহল মুখর পৃথিবী আছে, আবার কোথাও আছে কোটি কোটি মাইল দূরের একাকী অন্ধকার যাত্রা। কোনো গন্তব্য ছাড়াই মহাকাশের ব্ল্যাক হোলে হারিয়ে যাওয়ার এ নিরন্তর সংগ্রাম আমাদের মহাজাগতিক অস্তিত্বকে আরো বেশি কৌতূহলী করে তোলে।
এ আবিষ্কার শুধু একটি গ্রহ খুঁজে পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমাদের সৌরজগৎ তৈরির প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। সাধারণত মনে করা হয়, একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করেই গ্রহের জন্ম ও বেড়ে ওঠা অনিবার্য। কিন্তু এ ভবঘুরে গ্রহের অস্তিত্ব প্রমাণ করে, মহাবিশ্বের শৈশব ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল এবং অস্থির। সেখানে প্রতিনিয়ত গ্রহদের মধ্যে মহাকর্ষীয় যুদ্ধ চলত, যেখানে ছোট ও দুর্বল গ্রহগুলো বড়দের ধাক্কায় কক্ষপথ থেকে চিরতরে বিচ্যুত হয়ে যেত। নক্ষত্রহীন এ গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বা পরিবেশ কেমন হতে পারে, তা নিয়ে এখন চলছে বিস্তর জল্পনা। কোনো তাপীয় উৎস না থাকায় সেখানে কি শুধুই জমাটবাঁধা বরফ, নাকি গ্রহটির অভ্যন্তরে থাকা নিজস্ব তেজস্ক্রিয়তা আজো তাকে কিছুটা উষ্ণ করে রেখেছে- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মুখিয়ে আছেন গবেষকরা।
(তথ্যসূত্র : ইন্টারনেট)।
লেখক : সাংবাদিক।