বরকতে ভরপুর রমাদান মাস শুরু
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৪
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
প্রতি বছরের মতো এবারও রমাদান মাস আমাদের মাঝে হাজির হয়েছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পয়গাম নিয়ে। আবার এবারই প্রথম রোজার আগে দেশের মানুষের ভোটে নির্বাচিত সরকার ও সংসদ সদস্যরা শপথ নিল। আমরা যেমন রমাদানের পয়গামকে স্বাগত জানাই। সাথে সাথে সরকারি দল ও বিরোধীদল মিলে দেশটাকে সুখী-সমৃদ্ধিশালী দুর্নীতিমুক্ত একটি দেশ গড়ার কাজে একে অপরের সহযোগিতা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার উদ্যোগ নিবে।
রমাদান মাস ১২ মাসের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে রাখা হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে রাখা হয়। শয়তানকে শিকল পরিয়ে রাখা হয়। মানুষের জন্য তার কাজের বা ইবাদাতের মর্যাদা ৭০ থেকে ৭০০ গুণ আবার হিসাব ছাড়া আমলের মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়া হয়। মহান আল্লাহ বলেন, যারা আমার জন্যই না খেয়ে পিপাসায়ও পানি পান না করে সারা দিন আল্লাহর স্মরণে তাঁর ইবাদতের কারণে উপবাস করল, তিনি নিজ হাতে তাদের ফল দেবেন। মানবজাতিকে তার কাজের মর্যাদা এজন্যই বাড়িয়ে দেবেন যে, মাত্র আল্লাহকে হাজির-নাজির জেনে একাকী হলেও কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকল। দুনিয়ায় সবকিছুই প্রকাশ্যে কাজের অবস্থা দেখা যায়। একমাত্র রোজাদারের রোজার খবর আল্লাহ ছাড়া আর কারো নজরে আসে না। গোপনেও কোনো বান্দা কোনোকিছু খায় না বা পান করে না। শুধুমাত্র আল্লাহকেই মেনে তাঁর স্মরণে তাঁর নির্দেশে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত না যাওয়া পর্যন্ত খানাপিনা থেকে বিরত থাকে। আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য এবং আল্লাহর নির্দেশ-আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করার জন্য। তাই তো মহান আল্লাহ খুশি হয়ে বান্দার চাওয়া-পাওয়া সবই পূরণ করে দেন বান্দার সারা দিন রোজা থাকার জন্য।
রোজার দিনে মানুষ একে অপরের জন্য দোয়া করে। রোজাদারদের ইফতারের সময় ইফতার করায় তা একটু পানি দিয়ে হোক, একটি খেজুর দিয়ে হোক বা পেট ভরে খাওয়ানো হোক, সব ইফতারের সওয়াবের আওতায় পড়বে। রোজাদারদের একে অপরের সওয়াব কম হবে না। রজব-শাবান মাস থেকেই পবিত্র রোজার মাসের প্রস্তুতি চলতে থাকে। তাই তো নবী মুহাম্মদ সা. রজব মাস থেকেই রমাদানের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। আমরা রজব ও শাবান কাটিয়ে রমাদানে পড়েছি। আমরা এবার নিজে, স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সবাইকেই রোজার হক আদায় করার ব্যাপারে সজাগ করব। তাদের যথাযথভাবে রমাদান মাস কাটানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করব। একে অপরকে সাথে নিয়ে রোজার মাসলা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করব, একে অপরকে নিয়ে সবাই মিলে উৎসবের সাথে ইফতার পার্টি করব। গোটা দেশ বা দুনিয়ার সব দেশে রমাদানের আবহাওয়া বইতে শুরু করেছে। আরবী মাস গোটা দুনিয়ায় রোজার দিন একদিন আগে-পিছে হয়। এটা নির্ভর করে রমাদানের চাঁদ দেখা নিয়ে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাঁদ দেখা খুব একটা অসুবিধা হয় না। শরীয়াকেই প্রাধান্য দিয়ে চাঁদ দেখার বিষয়টি সুরাহা করতে হবে।
সরকার বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় রোজার সময় কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেয়ার প্রমাণ আছে। আমরা সেটা চেষ্টা করব। রোজার দিনে রাস্তাঘাটে প্রকাশ্যে দোকান খুলে খাওয়া-দাওয়া করা যাবে না। রমাদানে গোটা পরিবেশটাই রমাদানের আলোকে মেইনটেইন করতে হবে। সফরের সময় রোজা না রাখতে পারলে গোপনে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। রোজার শেষে দ্রুততম সময়ে কাজা রোজা করে নিতে হবে। মেয়েদের কাজা রোজা দ্রুততম সময়ে আদায় করে নিতে হবে।
রমাদানে একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চাইতেও উত্তম। সেই রাতটি তালাশ করার জন্য রমাদানের ২১ তারিখ থেকে বেজোড় রাতগুলোয় তালাশ করতে হবে। শুধুমাত্র ২৭ রমাদানে তালাশ করা যাবে না। কারণ হাজার মাস হলো ৮৩ বছরের চেয়েও বেশি। এক রাতে যদি এত মাসের সওয়াব পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই আমাদের সচেতনভাবে সেটি পাওয়ার জন্য বেজোড় রাতগুলোই তালাশ করা হবে। এই বেজোড় রাত আমাদেরকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। সারারাত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, তসবি-তাহলিল, আলোচনার মাধ্যমে ইসলামের জীবনবিধান মানতে হবে। ইসলামী জীবনবিধান সমাজে কার্যকর করার জন্য ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই সময়ে স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রমাদানের জন্য ছুটি থাকে বা ক্লাস কমিয়ে দেয়া হয়।
মহান আল্লাহ রমাদানের ব্যাপারে উল্লেখ করেন যে, ‘পবিত্র মাস রমাদান, এই মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে। কুরআন হলো মানুষের জন্য হেদায়েতস্বরূপ। কুরআন ভালো-মন্দের পার্থক্যকারী’। তাই রমাদানের গুরুত্ব এভাবেই আমাদের কাছে এসেছে। রমাদানে নাজিলকৃত কুরআন নবী মুহাম্মদ সা.-এর নবী জীবনের মক্কার ১৩ বছর এবং মদিনার ১০ বছর মোট ২৩ বছরের কর্মকাণ্ড মানুষের চলার পথ ভালো-মন্দ যাচাই-বাছাইয়ের সব পথ বাতলিয়ে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নবী মুহাম্মদের সা. অনুকরণ ও অনুসরণের ওপরই নির্ভর করবে দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে মুক্তির পথ। যারা কুরআনের আলোকে জীবন পরিচালিত করবে তারা দুনিয়ায় সমাজ পরিচালিত করতে পারবে শান্তিতে আর তার বিনিময়ে সীমাহীন আখিরাতে থাকবে সুখ ও শান্তিতে। তাই আজকের দিনেও আমরা যদি এই রমাদানে গোটা কুরআনের আলোকে নিজেরা চলতে পারি, অন্যকেও উদ্বুদ্ধ করতে পারি, তবেই আমাদের দুনিয়াও ভালো আর আখিরাতে রয়েছে অফুরন্ত সুখ আর শান্তি। রমাদানে আমাদের পূর্বের যাবতীয় গুনাহ-খাতা মাফ নেওয়ার বড় সুযোগ। শুধু তাই না, যারা এ রমাদান পেয়ে তাদের গুনাহখাতা মাফ নিতে পারল না, তারা মহান আল্লাহর লানতে পড়ে যাবে। তাই রোজা রাখা, তারাবি পড়া, সময়মতো ইফতার করার সুযোগমতো এতেকাফ করা, রমজানের সময় তাহাজ্জুদ পড়ার সুযোগও আসে আবার গুনাহ মাফের বড় অসিলা। সাহরি খাওয়া, উল্লেখ থাকে যে, একটি খেজুর খেলেও সাহরি আদায় হয়ে যাবে। ইফতারও খেজুর বা পানি দিয়ে করতে হবে। অন্যান্য খাবার খেলে অসুবিধা নাই। তবে সাহরি বেশি খেলে সারা দিন বায়ু আসা বন্ধ করা যাবে না। সাহরি ও ইফতারে পানি বেশি করে পান করা শরীরের জন্য ভালো।
ভোররাতে ফজরের মাত্র ৩০ মি. আগে উঠলেই কিন্তু তাহাজ্জুদ পড়ার সুযোগ থাকে। ২ রাকাত করে ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ার ব্যাপারে হযরত আয়েশা রা. উল্লেখ করেছেন। তাহাজ্জুদের পর বেতর নামাজ পড়া ভালো। এশার পর বেতর নামাজ আদায় করলেও চলবে। কিন্তু দিনের শেষ নামাজ হিসেবে ফজরের পূর্বে বেতর পড়া ভালো। একবার অভ্যাস করলে গোটা জীবন সহজ হয়ে যাবে। জেলখানায়ও শেষ রাতে বেতর পড়া আমাদের অসুবিধা হয়নি। মহান আল্লাহ আপনার হয়ে গেলে তিনি আপনার সব কাজে রহমত ও বরকত দেবেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আমার হয়ে যাও, আমিও তোমাদের হয়ে যাব।’ রমাদানে ইফতার বা ইফতার পার্টিতে বাড়তি খরচ না করাই ভালো। সারা দিন না খাওয়ার পর ইফতারে বেশি খেলে শরীরের জন্য ভালো নাও হতে পারে।
বর্তমানে সাহরি খাওয়ার সময় ওঠার কোনো অসুবিধা নেই। আগে মাইকে অথবা গান গেয়ে মানুষকে ডাকা হতো। বর্তমানে স্মার্টফোন থাকার কারণে অ্যালার্ম দিয়ে রাখলেই শেষ রাতে উঠতে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। আমরা অন্য সময়ে তারাবি পড়ে রাতের খাওয়া শেষ করে বেশি দেরি না করে ঘুমাতে গেলে শেষ রাতে ওঠা সহজ হবে।
রোজার সময় ছোট সন্তানদেরও রোজা রাখার অভ্যাস করাতে হবে। সব কয়টা না পারলেও মাঝে মাঝে রাখার অভ্যাস করাতে হবে। মহান আল্লাহ তার বান্দাকে ভালো পথেই চালাতে চান। রোজার আলাদা মর্যাদা রয়েছে। ইফতারের সময় বাড়ির সবাই একসাথে সাহরি এবং ইফতার করলে বাড়ির পরিবেশ ইসলামের দিকে ঝুঁকবে এবং বরকত বেশি পাওয়া যাবে। ইফতারের সময় আত্মীয়-স্বজনকেও দাওয়াত দিতে হবে। একদিকে রমাদানের সওয়াব; অন্যদিকে আত্মীয়তার হকও আদায় হয়ে যাবে।
দেশকে মানবিক দেশ হিসেবে গড়ার একটি বড় সময় হলো রমাদানের সময়কে সঠিক প্রয়োগ করা। মানুষের মন রমাদানে নরম থাকে। আল্লাহর প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকে। মানুষের প্রতি আচার-আচরণ নমনীয়ভাবে পালন করলে সমাজ ও রাষ্ট্র উগ্র আচরণ থেকে রক্ষা পায়। তাই এই নতুন সরকারের শুভ সময়ে আমরা সরকারি ও বিরোধীদল দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে আমরা যদি একে অপরের সহযোগিতায় দেশ ভালো চালাতে পারি, তবে দুনিয়া ও আখিরাতে আমরা ভালো ফল পাওয়ার আশা করতে পারি।
রোজার হক আদায়ে আমরা সবাই মিলে সচেতন হলে বাংলাদেশের মানুষকে গাইড করা খুবই উপযোগী সময়। আমাদের আচার-ব্যবহার দিয়ে সাধারণ মানুষকে আল্লাহর পথে পরিচালিত করতে পারলে আমরা যৌথভাবে যেমন লাভবান হবো, তেমনি ব্যক্তিগতভাবেও ভালো ফল পাবো।
সওয়াবের আশায় রমাদানে আমরা জাকাত দিতে পারি। যেহেতু রমাদানের সওয়াব অন্য সময়ের চেয়ে ৭০ থেকে ৭০০ গুণ আবার মহান আল্লাহ চাইলে অফুরন্ত ফল বান্দাকে দিতেই পারেন। অনেকে জাকাতের কাপড় বলে জনগণকে দিয়ে থাকে, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা জাকাত আদায় করতে জাকাতের নির্দিষ্ট ৭ খাতেই ব্যয় করে থাকে। জাকাত নগদ টাকা না দিয়ে গরিবদের ভবিষ্যতে যাতে আর গরিব না থাকে তাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য গরু-ছাগল, দোকানপাট করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একদিকে গরিবানা দূর করা যাবে; অন্যদিকে জাকাতও আদায় হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ ও নবী মুহাম্মদ সা. কাজকে প্রাধান্য দিয়েছেন আর ওপরের হাতকে নিচের হাতের থেকে উত্তম বলেছেন। তাই আমরা ওপরের হাত তৈরিতে জাকাতের টাকা বিনিয়োগ করব আর অসহায়দের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করব।
বর্তমান সরকারেরও এরূপ প্রোগ্রাম করার আমরা পরামর্শ দেব। তারা যাতে দেশের সব প্রতিষ্ঠান থেকে তাদের জাকাত আদায় করার ব্যবস্থা করে গরিবদের বিভিন্ন প্রজেক্ট করে কাজে লাগানো যায়, তবে দেশ থেকে বেকার সমস্যা দূর করা যাবে আবার জাকাতদাতাদেরও বড় উপকার হবে। জাকাতের সওয়াবের সাথে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াবও যোগ হবে। আসুন, আমরা দেশের কথা ভাবি। বেকার সমস্যা দূর করার জন্য জাকাত ফান্ড করে দরিদ্রতার অভিশাপ থেকে দেশ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই। রমাদানের শিক্ষায় আমরা শিক্ষিত হই। ভালো কাজে লোকদের উদ্বুদ্ধ করি।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com