নজরুল মানস ও ইসলামী সঙ্গীত


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:১৮

॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥
‘সকাল হলো শোনরে আযান
ওঠরে শয্যা ছাড়ি
তুই মসজিদে চল দ্বীনের কাজে
ভোল দুনিয়াদারি’।
ওপরের অন্তরাটি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কালজয়ী ইসলামী সঙ্গীতের অংশবিশেষ। এ গানে ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ সালাত তথা নামাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মূলত ফজর সালাতই এ গানের উপজীব্য বিষয়বস্ত। শুধুমাত্র এ গানের অংশবিশেষ থেকেই প্রমাণিত হয়, কাজী নজরুল ছিলেন ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী; সর্বোপরি ইসলামী মনন ও মনীষার একজন তৌহিদবাদী কবি। কেউ মনেপ্রাণে তৌহিদ, আখিরাত ও রিসালাতকে বিশ্বাস না করলে তার লেখনী থেকে এমন ইসলামের আদর্শভিত্তিক মুক্তো ঝরানো বাণী প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই। তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তৌহিদের অনুসারী; ধারক ও বাহক ছিলেন। তার বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার সে কথারই প্রমাণ বহন করে।
বহুমুখী, বিরল ও কালজয়ী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা, আত্মসচেতন, স্বাধীনচেতা ও অনন্য এক সাহিত্য প্রতিভা। উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে ধূমকেতুর মতো আগমন ঘটেছিলো তার। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি দুঃখজনকভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ রোগ ভোগ তথা বাকশক্তিহীন থাকার পর অন্তর্ধানও ঘটেছিলো বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে। তিনি তার কাব্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটাতে পেড়েছিলেন খুবই সীমিত পরিসরে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বাংলা সাহিত্যে যা দিয়ে গেছেন, তা অসাধারণ ও অদ্বিতীয়। বিশ্বের কোনো সাহিত্য প্রতিভা এতো স্বল্প পরিসরে সাহিত্যভাণ্ডারকে এতো সমৃদ্ধ করে যেতে পারেননি। মূলত তিনি ছিলেন একজন সব্যসাচী কলমসৈনিক। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা-প্রশাখা নেই, যেখানে এ দ্রোহের কবি প্রতিভার সবর উপস্থিতি ছিলো না। তিনি সকল ক্ষেত্রেই সফলতার সাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প, নাটক, উপন্যাস এবং অসংখ্য সঙ্গীত রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে সমৃদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে কাজী নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন, যা ছিলো অনন্যসাধারণ ও বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এ দুটি হচ্ছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও ‘ভাঙ্গার গান’ সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলো। যা বাংলা সাহিত্যকে বৈশ্বিক সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মূলত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য কাজী নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা ও পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, যা নজরুল মানস ও মনীষাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সর্বোপরি কবিতাটি বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে। মূলত ১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি অভিনবত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়। এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্-আরব, বিদ্রোহী’ ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো। তার শিশুতোষ কবিতা বাংলা কবিতায় এনেছে নান্দনিকতা। খুকী ও কাঠবিড়ালি, লিচু-চোর, খাঁদু-দাদু ইত্যাদি তারই প্রমাণ। নজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের অধিক।
১৯৩৮ সালে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। সেখানে তিনটি অনুষ্ঠান যথাক্রমে ‘হারামণি’, ‘নবরাগমালিকা’ ও ‘গীতিবিচিত্রা’র জন্য তাকে প্রচুর গান লিখতে হতো। ‘হারামণি’ অনুষ্ঠানটি কলকাতা বেতার কেন্দ্রে প্রতি মাসে একবার করে প্রচারিত হতো, যেখানে তিনি অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় রাগরাগিণী নিয়ে গান পরিবেশন করতেন।
উল্লেখ্য, এ অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি কোনো একটি লুপ্তপ্রায় রাগের পরিচিতি দিয়ে সে রাগের সুরে তার নিজের লেখা নতুন গান পরিবেশন করতেন। এ কাজ করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম নবাব আলী চৌধুরীর রচনায় ফার্সি ভাষায় রচিত আমীর খসরুর বিভিন্ন বই পড়তেন এবং সেগুলোর সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের রাগ আয়ত্ত করতেন। এসব হারানো রাগের ওপর তিনি চল্লিশটিরও বেশি গান রচনা করেন। তবে স্বভাবে অগোছালো হওয়ার কারণে নজরুল টুকরো কাগজে এসব গান লিখলেও সেগুলো মাসিক ভারতবর্ষের সঙ্গীত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জগৎ ঘটক একটি মোটা বাঁধানো খাতায় স্বরলিপিসহ তুলে রাখতেন। বাংলা সাহিত্যের চরম দুর্ভাগ্য যে, এ সংকলনটি পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায়; যার বিজ্ঞপ্তি তিনি সে সময়কালের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোয় দিয়েছিলেন কিন্তু সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মূলত বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে নজরুল একমাত্র ব্যক্তি, যিনি প্রায় সব বিষয় নিয়ে গান লিখেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যকে এক অনন্যসাধারণ মর্যাদা দিয়েছে।
নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: ‘হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে’। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান। এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।
কাজী নজরুল ‘ধূপছায়া’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এটিতে তিনি একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন তিনি। গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’ এবং সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রের। ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলেও সেটার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন তিনি।
বস্তুত নজরুল সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হলো ইসলামী সঙ্গীত। তিনি তার কালজয়ী ইসলামী সংগীত রচনার জন্য বাংলা সাহিত্যাকাশে এক ধ্রুবতারা হিসেবে চিরঅম্লান ও স্মরণীয় হয়ে আছেন। কবি তার অমর কীর্তি ইসলামী সংগীতগুলো না লিখলে বাংলার ইসলামী সংস্কৃতি হাজার বছর পিছিয়ে থাকত। শানিত লেখনীর আঁচড়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তুলে ধরেছেন ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধসহ ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে কুরআন ও হাদিসের আলোকে হাজার বছরের সেরা সব ইসলামী সঙ্গীত, গজল, হামদ, না’ত। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, তাওহিদ, রিসালাত, ঈদ, রমজান, লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল বরাত, মিরাজ, মহররম, ইসলামী জাগরণী গান, সাহাবাগণের জীবনাদর্শ, মহিয়ান-মহীয়সী নারী-পুরুষের জীবনীসহ সব বিষয়ের সুন্দর উপস্থাপন একমাত্র কাজী নজরুল ইসলামের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের ৭৫ নম্বর সুরা ‘আল-কিয়ামাহ’র ছোট্ট ছোট্ট ৪০টি আয়াতের ছায়াশ্রয়ে কবি লিখেছেন, ‘যেদিন রোজ হাশরে করতে বিচার, তুমি হবে কাজী/সেদিন তোমার দিদার আমি, পাব কি আল্লাহ জি?’
সুরা আল-কিয়ামার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’। ‘তারা তার পালনকর্তা, আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকবে’। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যারা আল্লাহকে দেখতে পাবেন, তারা জান্নাতি। অথবা যারা বেহেশতের ফায়সালা পেয়ে যাবেন, তারা আল্লাহকে দেখতে পাবেন। কাজী নজরুল ইসলাম তার ঐ গানের দ্বিতীয় অন্তরার শেষে বেশ কায়দা করে লিখলেন, ‘আমি তোমায় দেখে হাজার বার, দোজখে যেতে রাজি!’ আহ! কী সুন্দর, সুললিত ভাষায়, আবেগাপ্লুত সুরে কবি আল্লাহর বাণীগুলো তার ইসলামী গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন!
কবরবাসীর জন্য দোয়া করা ইসলামী মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের অংশ। এ বিষয়ে অনেক হাদিস রয়েছে। হাদিসগুলোর আলোকে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায়, কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।’ মুসল্লি ঘর থেকে অজু করে মসজিদে যাওয়া পর্যন্ত তার প্রতিটি কদমে সওয়াব লেখা হয়। এ হাদিসের আলোকে কবি ঐ গানের দ্বিতীয় অন্তরায় লিখলেন, ‘আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজিরা যাবে, পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি, এই বান্দা শুনতে পাবে। গোর আজাব থেকে এই গুনাহগার, পাইবে রেহাই।’
কবি কাজী নজরুল ইসলাম লোকসঙ্গীতশিল্পী আব্বাস উদ্দিনের অনুরোধে ইসলামী সঙ্গীতের ধূমকেতু হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন বাংলার ইসলামী সংস্কৃতির সাহিত্যাকাশে। ১৯৩১ সালে তার লেখা, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ।’ গানটি উপমহাদেশের প্রতিটা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে সমর্থ হয়েছিল। রমজান মাসের রোজার শেষে শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দেখে ঐ গানটা শুনলে নিজেকে পূতঃপবিত্র মনে হয়।
অতিঅল্প বয়সে পিতা কাজী ফকির আহমদের মৃত্যুর পর দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম হয়েছিলেন মসজিদের মুয়াজ্জিন এবং মক্তবের ওস্তাদ। যুবক বয়সে যোগ দিয়েছিলেন লেটো দলে। তখনই তিনি লিখেছিলেন, ‘নামাজি, তোর নামাজ হলো রে ভুল’। আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, বাংলার পাণ্ডিত্বপূর্ণ ভাষাশৈলী প্রয়োগের মাধ্যমে এবং হৃদয়-মন শীতল করা ভাবাবেগী সুরের মূর্ছনায় ইসলামী সঙ্গীতগুলোকে তিনি করেছেন চিরঅম্লান, চিরসবুজ, চির অপ্রতিদ্বন্দ্বী, চির অমর। সিদ্ধহস্তে বিদেশি ভাষার সুন্দর প্রয়োগের পাণ্ডিত্যে, কখনো বিদেশি সুরের ছায়াশ্রয়ে তিনি ইসলামী সঙ্গীতকে করেছেন বাঙালি হৃদয়ের তৃষ্ণা নিবারণের শরাবসম। তুরস্কের বিখ্যাত ‘কাটিবিম ইশকাদার’ গানের সুরাশ্রয়ে কবি লিখলেন, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ, এলো রে দুনিয়ায়’ অথবা ‘শুকনো পাতার নূপুর বাজে, নাচিছে ঘূর্ণিবায়’ ইত্যাদি। শিশু নবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর ধরাধামে আগমন নিয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে আবেগী হয়ে কবি লিখলেন, ‘হেরা হতে হেলে দুলে, নূরানী তনু’ অথবা ‘তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে’ অথবা ‘আমিনা দুলাল নাচে, হালিমার কোলে’, যা ইসলামী সঙ্গীতাঙ্গনের এক অমূল্য সম্পদ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
দারিদ্র্য ও চরম প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হজে যাওয়ার আকুতি ফুটিয়ে তুলেছেন তার অনেক অমর কীর্তিতে। তার লেখা ‘দূর আরবের স্বপন দেখি’ কিংবা ‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়’ বা ‘ওরে ও দরিয়ার মাঝি, মোরে নিয়ে যারে, মদিনায়’ অথবা ‘আমি যদি আরব হতাম, মদিনারই পথ’সহ বহু গানের কথাগুলোয় পবিত্র মক্কা ও মদিনায় যাওয়ার পরম আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। মোনাজাত বিষয়ে তিনি লিখলেন, ‘হে খোদা দয়াময় রহমানির রহিম’ অথবা ‘খোদা, এই গরিবের শোন মোনাজাত’ অথবা ‘শোনো শোনো, ইয়া ইলাহী, আমার মোনাজাত’ ইত্যাদি।
নজরুল মানস বিচারে সাহিত্য আলোচকদের চিন্তাসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা (১৯৮৫) ও সাঁকো বাঁধার প্রত্যয় (২০১৬) গ্রন্থের কিছু প্রবন্ধে এবং বাংলা কবিতার মূলধারা এবং নজরুল (২০১২) গ্রন্থে। নজরুল ইসলামের স্বকীয়তা অনুধাবন করে সাহিত্য আলোচক যতীন সরকার বলেছেন যে, নজরুল উত্তরসাধক আসেননি। অর্থাৎ নজরুলের একাকি উদ্ভাসন, একাকি অভিযাত্রা, নিজের নিজের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা গ্রন্থের ‘তাঁর রচিত নীল আকাশে’ প্রবন্ধে এরকম একটি ধারণার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নজরুলকে তিনি রেনেসাঁ-চেতনার প্রাগ্রসর মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ‘নজরুলের কাব্যে ঐতিহ্যমণ্ডিত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী সারবত্তা বিদ্যমান। এজন্যে নজরুলের কবিতায় বিপরীতের ‘দ্বন্দ্ব দকখনো বিপ্রতীপ নয়, সমানুপাতী। এরই ফলে নজরুল রচিত নীল আকাশ একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও বজ্রমণ্ডিত, উদার ও প্রাতিস্বিক, প্রেমময় ও নির্মম।’
যতীন সরকারের এ মূল্যায়ন কেবল মনগড়া উক্তি নয়, প্রকৃত বিচারেই যৌক্তিক এবং ন্যায্য বলেই প্রতীয়মান হয়। বাংলা কবিতার মূলধারা এবং নজরুল গ্রন্থের ‘নজরুল: খাঁটি বাঙালি কবি’ প্রবন্ধে যতীন সরকার নজরুল-মানসের দুটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তা হলো, নজরুল লোক কবিদের খাঁটি বাঙালিত্ব নিজের সমগ্র সত্তায় ধারণ করেছেন ও তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে তাঁর মধ্যে গ্রহণ করেছেন।
এ বিবেচনার মধ্য দিয়ে নজরুলকে তিনি ‘খাঁটি বাঙালি কবি’ হিসেবে অভিষিক্ত করেছেন। যতীন সরকারের এ মূল্যায়ন যথার্থ। ‘অখণ্ড নজরুলের খণ্ডীকরণ’ প্রবন্ধে নজরুলের খণ্ডিত মূল্যায়নের প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলমানরাও নজরুলের খণ্ডীকরণেই প্রবৃত্ত হলেন, তাঁর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বাঙালি সত্তাটিকে আড়াল করে তাঁকে ‘মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি’ বলে প্রতিনিয়ত প্রচার করে চললেন।’
‘নজরুলের বিদ্রোহ: সদর্থকতা ও সমগ্রতা’ নামের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নয়, নজরুলের সমস্ত সৃষ্টিই তো বিদ্রোহের বাণীরূপ।’ এ বিদ্রোহের স্বরূপকেও তিনি চিহ্নিত করেছেন যুক্তির মাপকাঠিতে। তিনি বলেছেন, ‘তাঁর বিদ্রোহকে অনেকেই দেখেছেন একমাত্রিক রূপে, এর বহুমাত্রিকতা প্রায় সকলেরই নজর এড়িয়ে গেছে।’ এ-কারণেই নজরুল নিজে ‘বিদ্রোহী কবি’ আখ্যাটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। ১৯২৯ সনে কলকাতার এলবার্ট হলে তাঁকে যে সংবর্ধণা প্রদান করা হয়েছিল, সে সংবর্ধনার ‘প্রতিভাষণ’-এর একস্থানে তিনি বলেছিলেন- ‘আমাকে ‘বিদ্রোহী’ বলে খামাখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতিটাকে আঁচড়ে কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনো দিনই নেই। তাড়া যারা খেয়েছে, অনেক আগে থেকেই মরণ তাদের তাড়া করে নিয়ে ফিরছে। আমি তাতে এক-আধটু সাহায্য করেছি মাত্র। এ-কথা স্বীকার করতে আজ আমার লজ্জা নেই যে, আমি শক্তিসুন্দর রূপ-সুন্দরকে ছাড়িয়ে আজো উঠতে পারিনি।
তিনি যে কেবল বিদ্রোহের জন্যই বিদ্রোহের কথা বলেননি, তাঁর বিদ্রোহ যে কেবল পুরনোকে ভাঙ্গার জন্য নয়, নতুনের সৃষ্টিই যে তাঁর মূল লক্ষ্য এ কথার স্পষ্ট অভিব্যক্তি তো তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতে আছে ‘আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্বে অবহেলে নবসৃষ্টির মহানন্দে।’ যতীন সরকার মনে করেন ‘বিপ্লবচেতনাকে তার সমগ্রতায় ধারণ ও প্রকাশ করতে পারেন যে-শিল্পী, তিনিই মহৎ শিল্পী।’ সে বিচারে সমালোচক যতীন সরকার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মহৎ শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করেন।
‘মানবজমিনে চাষাবাদ, কবি নজরুল ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে যতীন সরকার জানিয়েছেন যে, কবি নজরুল ইসলাম ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’-নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন। এ সংগঠন যে ইশতেহারে ‘নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভই এই দলের উদ্দেশ্য। ভূমির চরম স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণক্ষম স্বায়ত্তশাসন বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের ওপর বর্তিবে-এ পল্লীতন্ত্র ভদ্র শূদ্র সকল শ্রেণির শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’ এরকম ঘোষণার ভেতর থেকেই নজরুলের চেতনায় বিদ্রোহের বীজ খুঁজে পাওয়া যায়।
‘উৎসবে বিপ্লবী শক্তির উদ্বোধন’ প্রবন্ধে নজরুলের উৎসব-ভাবনার স্বরূপের সন্ধান করে বলা হয়েছে ‘কেবল সমাজ-বিপ্লবের মধ্য দিয়েই যে সকল উৎসবে সমাজের সকল মানুষকে সমান মর্যাদায় সম্মিলিত ও আনন্দমুখর করে তোলা যায়-এমনটিই সারা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন আমাদের বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।’ যে নজরুল রমজানের শেষে খুশির ঈদের গান রচনা করেছেন তিনিই আবার কবিতায় লিখেছেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’ অর্থাৎ নজরুল সকল রকমের শোষণ ও বঞ্চনার অবসান চেয়েছেন, সেটিই যতীন সরকার খুঁজে পেয়েছেন।
যতীন সরকার নজরুল-মূল্যায়নে যে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন, তা নজরুল-গবেষক হিসেবে পরিচিত অনেক গবেষকই পারেনি। নজরুল-মূলায়নে যতীন সরকারের নির্মোহ দৃষ্টিকে মান্য করা যায়। নজরুলকে নিয়েও তাই যতীন সরকারের মূল্যায়নকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। নজরুলচিন্তা যতীন সরকারের সামগ্রিক সাহিত্যচিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। লাভ হলো, নজরুল-মানস আমরা দেখতে পেলাম যতীন সরকারের দৃষ্টিতে।
এ কথা কারো অজানা নয় যে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রাক-কৈশোরে ছিলেন মসজিদের মুয়াজ্জিন। তার শুরুর জীবন কেটেছে ইসলাম চর্চার মাধ্যমে। তার সাহিত্যকর্মেও ইসলামের প্রভাব প্রকট। তিনি প্রায় চার সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন। তার মধ্যে ইসলামী গানের সংখ্যা ২৮০টি। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে। তবে যে কয়টি ইসলামী গান তার থেকে পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই বলা যায়, বাংলা ইসলামী গান রচনায় তিনি সর্বাধিক রচয়িতা হিসেবে আজ পর্যন্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার রচিত প্রায় ৮০ ভাগ গানে তিনি নিজেই সুর সংযোজন করেছেন। তিনি সুর সংযোজনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত নান্দনিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
নজরুল ইসলামী গান রচনা শুরু করেন ১৯৩১ সালে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছিল তার রচিত প্রথম ইসলামী গান। এটি বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর নিয়ে কালজয়ী একটি গান। ঈদের আনন্দ, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক দিক তুলে ধরা হয়েছে এই গানে। গানটি বাঙালি মুসলিম সমাজে ‘ঈদের আবহ গান’ হিসেবে পরিচিত, যা বাঙালির ঈদ আনন্দের এক আবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে কবি নজরুল এই গান রচনা ও সুরারোপ করেন।
এ গান রচনার পেছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। কবি নজরুল তখন শ্যামাসংগীত লিখতেন। এক রাতে রেকর্ডিং শেষে নজরুল বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তাকে থামান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। কবির কাছে একটা আবদার ছিল তার। না শোনা পর্যন্ত তাকে যেতে দেবেন না। নজরুল বললেন, বলে ফেলো তোমার আবদার। আব্বাসউদ্দীন বললেন, কাজী দা, একটা কথা আপনাকে অনেক দিন ধরেই বলব বলব ভাবছি। দেখুন, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়ালরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালি গায়। শুনেছি তাদের গান প্রচুর বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামী গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামী গান গাইলে কেমন হয়? আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান বাজবে। ‘সকাল হলো শোনরে আযান
ওঠরে শয্যা ছাড়ি
তুই মসজিদে চল দ্বীনের কাজে
ভোল দুনিয়াদারি’।
ওপরের অন্তরাটি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত একটি কালজয়ী ইসলামী সঙ্গীতের অংশবিশেষ। এ গানে ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ সালাত তথা নামাজ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। মূলত ফজর সালাতই এ গানের উপজীব্য বিষয়বস্ত। শুধুমাত্র এ গানের অংশবিশেষ থেকেই প্রমাণিত হয়, কাজী নজরুল ছিলেন ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী; সর্বোপরি ইসলামী মনন ও মনীষার একজন তৌহিদবাদী কবি। কেউ মনেপ্রাণে তৌহিদ, আখিরাত ও রিসালাতকে বিশ্বাস না করলে তার লেখনী থেকে এমন ইসলামের আদর্শভিত্তিক মুক্তো ঝরানো বাণী প্রকাশিত হওয়ার সুযোগ নেই। তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তৌহিদের অনুসারী; ধারক ও বাহক ছিলেন। তার বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার সে কথারই প্রমাণ বহন করে।
বহুমুখী, বিরল ও কালজয়ী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা, আত্মসচেতন, স্বাধীনচেতা ও অনন্য এক সাহিত্য প্রতিভা। উনিশ শতকের শেষ প্রান্তে ধূমকেতুর মতো আগমন ঘটেছিলো তার। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তিনি দুঃখজনকভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ রোগ ভোগ তথা বাকশক্তিহীন থাকার পর অন্তর্ধানও ঘটেছিলো বিংশ শতাব্দীর আশির দশকে। তিনি তার কাব্য প্রতিভার স্ফুরণ ঘটাতে পেড়েছিলেন খুবই সীমিত পরিসরে। এতো অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বাংলা সাহিত্যে যা দিয়ে গেছেন, তা অসাধারণ ও অদ্বিতীয়। বিশ্বের কোনো সাহিত্য প্রতিভা এতো স্বল্প পরিসরে সাহিত্যভাণ্ডারকে এতো সমৃদ্ধ করে যেতে পারেননি। মূলত তিনি ছিলেন একজন সব্যসাচী কলমসৈনিক। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা-প্রশাখা নেই, যেখানে এ দ্রোহের কবি প্রতিভার সবর উপস্থিতি ছিলো না। তিনি সকল ক্ষেত্রেই সফলতার সাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, ছোট গল্প, নাটক, উপন্যাস এবং অসংখ্য সঙ্গীত রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে সমৃদ্ধ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে কলকাতা ফেরার পথে কাজী নজরুল দুটি বৈপ্লবিক সাহিত্যকর্মের জন্ম দেন, যা ছিলো অনন্যসাধারণ ও বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এ দুটি হচ্ছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও ‘ভাঙ্গার গান’ সঙ্গীত। এগুলো বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এক নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলো। যা বাংলা সাহিত্যকে বৈশ্বিক সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মূলত ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য কাজী নজরুল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা ও পাঠকপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, যা নজরুল মানস ও মনীষাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সর্বোপরি কবিতাটি বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হয়ে উঠেছে। মূলত ১৯২২ সালে তার বিখ্যাত কবিতা-সংকলন ‘অগ্নিবীণা’ প্রকাশিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থ বাংলা কবিতায় একটি অভিনবত্ব সৃষ্টিতে সমর্থ হয়। এর মাধ্যমেই বাংলা কাব্যের জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়। এ কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে সাড়া জাগানো কবিতাগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘প্রলয়োল্লাস, আগমনী, খেয়াপারের তরণী, শাত-ইল্-আরব, বিদ্রোহী’ ইত্যাদি। এগুলো বাংলা কবিতার মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলো। তার শিশুতোষ কবিতা বাংলা কবিতায় এনেছে নান্দনিকতা। খুকী ও কাঠবিড়ালি, লিচু-চোর, খাঁদু-দাদু ইত্যাদি তারই প্রমাণ। নজরুলের গানের সংখ্যা চার হাজারের অধিক।
১৯৩৮ সালে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছিলেন। সেখানে তিনটি অনুষ্ঠান যথাক্রমে ‘হারামণি’, ‘নবরাগমালিকা’ ও ‘গীতিবিচিত্রা’র জন্য তাকে প্রচুর গান লিখতে হতো। ‘হারামণি’ অনুষ্ঠানটি কলকাতা বেতার কেন্দ্রে প্রতি মাসে একবার করে প্রচারিত হতো, যেখানে তিনি অপেক্ষাকৃত কম প্রচলিত ও বিলুপ্তপ্রায় রাগরাগিণী নিয়ে গান পরিবেশন করতেন।
উল্লেখ্য, এ অনুষ্ঠানের শুরুতে তিনি কোনো একটি লুপ্তপ্রায় রাগের পরিচিতি দিয়ে সে রাগের সুরে তার নিজের লেখা নতুন গান পরিবেশন করতেন। এ কাজ করতে গিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম নবাব আলী চৌধুরীর রচনায় ফার্সি ভাষায় রচিত আমীর খসরুর বিভিন্ন বই পড়তেন এবং সেগুলোর সহায়তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের রাগ আয়ত্ত করতেন। এসব হারানো রাগের ওপর তিনি চল্লিশটিরও বেশি গান রচনা করেন। তবে স্বভাবে অগোছালো হওয়ার কারণে নজরুল টুকরো কাগজে এসব গান লিখলেও সেগুলো মাসিক ভারতবর্ষের সঙ্গীত বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জগৎ ঘটক একটি মোটা বাঁধানো খাতায় স্বরলিপিসহ তুলে রাখতেন। বাংলা সাহিত্যের চরম দুর্ভাগ্য যে, এ সংকলনটি পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায়; যার বিজ্ঞপ্তি তিনি সে সময়কালের দৈনিক সংবাদপত্রগুলোয় দিয়েছিলেন কিন্তু সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। মূলত বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে নজরুল একমাত্র ব্যক্তি, যিনি প্রায় সব বিষয় নিয়ে গান লিখেছেন, যা বিশ্বসাহিত্যকে এক অনন্যসাধারণ মর্যাদা দিয়েছে।
নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’। ১৯১৯ সালের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন। এখান থেকেই মূলত তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত। এখানে বসেই বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। এর মধ্যে রয়েছে: ‘হেনা, ব্যথার দান, মেহের নেগার, ঘুমের ঘোরে’। ১৯২২ সালে নজরুলের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় যার নাম ব্যথার দান। এছাড়া একই বছর প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।
কাজী নজরুল ‘ধূপছায়া’ নামে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। এটিতে তিনি একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছিলেন। ১৯৩১ সালে প্রথম বাংলা সবাক চলচ্চিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’র ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘গৃহদাহ’ চলচ্চিত্রের সুরকার ছিলেন তিনি। গীতিকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৩ সালে পায়োনিয়ার ফিল্মস কোম্পানির প্রযোজনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’ এবং সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন ১৯৩৭ সালের ‘গ্রহের ফের’ চলচ্চিত্রের। ১৯৩৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘পাতালপুরী’ চলচ্চিত্রের ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৩৮ সালে নির্মিত ‘গোরা’ চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। ১৯৩৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাপুড়ে’ চলচ্চিত্রের কাহিনীকার ও সুরকার ছিলেন তিনি। ‘রজত জয়ন্তী’, ‘নন্দিনী’, ‘অভিনয়’, ‘দিকশূল’ চলচ্চিত্রের গীতিকার ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ চলচ্চিত্রের গীতিকার, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নজরুল। চৌরঙ্গী হিন্দিতে নির্মিত হলেও সেটার জন্য ৭টি হিন্দি গান লেখেন তিনি।
বস্তুত নজরুল সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ হলো ইসলামী সঙ্গীত। তিনি তার কালজয়ী ইসলামী সংগীত রচনার জন্য বাংলা সাহিত্যাকাশে এক ধ্রুবতারা হিসেবে চিরঅম্লান ও স্মরণীয় হয়ে আছেন। কবি তার অমর কীর্তি ইসলামী সংগীতগুলো না লিখলে বাংলার ইসলামী সংস্কৃতি হাজার বছর পিছিয়ে থাকত। শানিত লেখনীর আঁচড়ে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তুলে ধরেছেন ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধসহ ইসলামের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতির সঙ্গে কুরআন ও হাদিসের আলোকে হাজার বছরের সেরা সব ইসলামী সঙ্গীত, গজল, হামদ, না’ত। নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, তাওহিদ, রিসালাত, ঈদ, রমজান, লাইলাতুল কদর, লাইলাতুল বরাত, মিরাজ, মহররম, ইসলামী জাগরণী গান, সাহাবাগণের জীবনাদর্শ, মহিয়ান-মহীয়সী নারী-পুরুষের জীবনীসহ সব বিষয়ের সুন্দর উপস্থাপন একমাত্র কাজী নজরুল ইসলামের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। পবিত্র কুরআনুল কারীমের ৭৫ নম্বর সুরা ‘আল-কিয়ামাহ’র ছোট্ট ছোট্ট ৪০টি আয়াতের ছায়াশ্রয়ে কবি লিখেছেন, ‘যেদিন রোজ হাশরে করতে বিচার, তুমি হবে কাজী/সেদিন তোমার দিদার আমি, পাব কি আল্লাহ জি?’
সুরা আল-কিয়ামার ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘সেদিন অনেক মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে’। ‘তারা তার পালনকর্তা, আল্লাহর দিকে তাকিয়ে থাকবে’। অর্থাৎ কিয়ামতের দিন যারা আল্লাহকে দেখতে পাবেন, তারা জান্নাতি। অথবা যারা বেহেশতের ফায়সালা পেয়ে যাবেন, তারা আল্লাহকে দেখতে পাবেন। কাজী নজরুল ইসলাম তার ঐ গানের দ্বিতীয় অন্তরার শেষে বেশ কায়দা করে লিখলেন, ‘আমি তোমায় দেখে হাজার বার, দোজখে যেতে রাজি!’ আহ! কী সুন্দর, সুললিত ভাষায়, আবেগাপ্লুত সুরে কবি আল্লাহর বাণীগুলো তার ইসলামী গানের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন!
কবরবাসীর জন্য দোয়া করা ইসলামী মূল্যবোধ ও ঐতিহ্যের অংশ। এ বিষয়ে অনেক হাদিস রয়েছে। হাদিসগুলোর আলোকে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখলেন, ‘মসজিদেরই পাশে আমায়, কবর দিও ভাই, যেন গোরে থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই।’ মুসল্লি ঘর থেকে অজু করে মসজিদে যাওয়া পর্যন্ত তার প্রতিটি কদমে সওয়াব লেখা হয়। এ হাদিসের আলোকে কবি ঐ গানের দ্বিতীয় অন্তরায় লিখলেন, ‘আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজিরা যাবে, পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি, এই বান্দা শুনতে পাবে। গোর আজাব থেকে এই গুনাহগার, পাইবে রেহাই।’
কবি কাজী নজরুল ইসলাম লোকসঙ্গীতশিল্পী আব্বাস উদ্দিনের অনুরোধে ইসলামী সঙ্গীতের ধূমকেতু হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন বাংলার ইসলামী সংস্কৃতির সাহিত্যাকাশে। ১৯৩১ সালে তার লেখা, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে, এলো খুশির ঈদ।’ গানটি উপমহাদেশের প্রতিটা মানুষের হৃদয় স্পর্শ করতে সমর্থ হয়েছিল। রমজান মাসের রোজার শেষে শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ দেখে ঐ গানটা শুনলে নিজেকে পূতঃপবিত্র মনে হয়।
অতিঅল্প বয়সে পিতা কাজী ফকির আহমদের মৃত্যুর পর দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম হয়েছিলেন মসজিদের মুয়াজ্জিন এবং মক্তবের ওস্তাদ। যুবক বয়সে যোগ দিয়েছিলেন লেটো দলে। তখনই তিনি লিখেছিলেন, ‘নামাজি, তোর নামাজ হলো রে ভুল’। আরবি, ফারসি, উর্দু, হিন্দি, বাংলার পাণ্ডিত্বপূর্ণ ভাষাশৈলী প্রয়োগের মাধ্যমে এবং হৃদয়-মন শীতল করা ভাবাবেগী সুরের মূর্ছনায় ইসলামী সঙ্গীতগুলোকে তিনি করেছেন চিরঅম্লান, চিরসবুজ, চির অপ্রতিদ্বন্দ্বী, চির অমর। সিদ্ধহস্তে বিদেশি ভাষার সুন্দর প্রয়োগের পাণ্ডিত্যে, কখনো বিদেশি সুরের ছায়াশ্রয়ে তিনি ইসলামী সঙ্গীতকে করেছেন বাঙালি হৃদয়ের তৃষ্ণা নিবারণের শরাবসম। তুরস্কের বিখ্যাত ‘কাটিবিম ইশকাদার’ গানের সুরাশ্রয়ে কবি লিখলেন, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ, এলো রে দুনিয়ায়’ অথবা ‘শুকনো পাতার নূপুর বাজে, নাচিছে ঘূর্ণিবায়’ ইত্যাদি। শিশু নবি হজরত মুহাম্মদ (স.)-এর ধরাধামে আগমন নিয়ে হৃদয়ের গভীর থেকে আবেগী হয়ে কবি লিখলেন, ‘হেরা হতে হেলে দুলে, নূরানী তনু’ অথবা ‘তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে’ অথবা ‘আমিনা দুলাল নাচে, হালিমার কোলে’, যা ইসলামী সঙ্গীতাঙ্গনের এক অমূল্য সম্পদ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
দারিদ্র্য ও চরম প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হজে যাওয়ার আকুতি ফুটিয়ে তুলেছেন তার অনেক অমর কীর্তিতে। তার লেখা ‘দূর আরবের স্বপন দেখি’ কিংবা ‘মনে বড় আশা ছিল যাব মদিনায়’ বা ‘ওরে ও দরিয়ার মাঝি, মোরে নিয়ে যারে, মদিনায়’ অথবা ‘আমি যদি আরব হতাম, মদিনারই পথ’সহ বহু গানের কথাগুলোয় পবিত্র মক্কা ও মদিনায় যাওয়ার পরম আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। মোনাজাত বিষয়ে তিনি লিখলেন, ‘হে খোদা দয়াময় রহমানির রহিম’ অথবা ‘খোদা, এই গরিবের শোন মোনাজাত’ অথবা ‘শোনো শোনো, ইয়া ইলাহী, আমার মোনাজাত’ ইত্যাদি।
নজরুল মানস বিচারে সাহিত্য আলোচকদের চিন্তাসূত্র খুঁজে পাওয়া যায় সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা (১৯৮৫) ও সাঁকো বাঁধার প্রত্যয় (২০১৬) গ্রন্থের কিছু প্রবন্ধে এবং বাংলা কবিতার মূলধারা এবং নজরুল (২০১২) গ্রন্থে। নজরুল ইসলামের স্বকীয়তা অনুধাবন করে সাহিত্য আলোচক যতীন সরকার বলেছেন যে, নজরুল উত্তরসাধক আসেননি। অর্থাৎ নজরুলের একাকি উদ্ভাসন, একাকি অভিযাত্রা, নিজের নিজের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন। সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা গ্রন্থের ‘তাঁর রচিত নীল আকাশে’ প্রবন্ধে এরকম একটি ধারণার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। নজরুলকে তিনি রেনেসাঁ-চেতনার প্রাগ্রসর মানুষের মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, ‘নজরুলের কাব্যে ঐতিহ্যমণ্ডিত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বিপ্লবী সারবত্তা বিদ্যমান। এজন্যে নজরুলের কবিতায় বিপরীতের ‘দ্বন্দ্ব দকখনো বিপ্রতীপ নয়, সমানুপাতী। এরই ফলে নজরুল রচিত নীল আকাশ একই সঙ্গে স্বচ্ছ ও বজ্রমণ্ডিত, উদার ও প্রাতিস্বিক, প্রেমময় ও নির্মম।’
যতীন সরকারের এ মূল্যায়ন কেবল মনগড়া উক্তি নয়, প্রকৃত বিচারেই যৌক্তিক এবং ন্যায্য বলেই প্রতীয়মান হয়। বাংলা কবিতার মূলধারা এবং নজরুল গ্রন্থের ‘নজরুল: খাঁটি বাঙালি কবি’ প্রবন্ধে যতীন সরকার নজরুল-মানসের দুটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। তা হলো, নজরুল লোক কবিদের খাঁটি বাঙালিত্ব নিজের সমগ্র সত্তায় ধারণ করেছেন ও তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যকে তাঁর মধ্যে গ্রহণ করেছেন।
এ বিবেচনার মধ্য দিয়ে নজরুলকে তিনি ‘খাঁটি বাঙালি কবি’ হিসেবে অভিষিক্ত করেছেন। যতীন সরকারের এ মূল্যায়ন যথার্থ। ‘অখণ্ড নজরুলের খণ্ডীকরণ’ প্রবন্ধে নজরুলের খণ্ডিত মূল্যায়নের প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ‘স্বাতন্ত্র্যবাদী মুসলমানরাও নজরুলের খণ্ডীকরণেই প্রবৃত্ত হলেন, তাঁর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী বাঙালি সত্তাটিকে আড়াল করে তাঁকে ‘মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি’ বলে প্রতিনিয়ত প্রচার করে চললেন।’
‘নজরুলের বিদ্রোহ: সদর্থকতা ও সমগ্রতা’ নামের প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ‘শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নয়, নজরুলের সমস্ত সৃষ্টিই তো বিদ্রোহের বাণীরূপ।’ এ বিদ্রোহের স্বরূপকেও তিনি চিহ্নিত করেছেন যুক্তির মাপকাঠিতে। তিনি বলেছেন, ‘তাঁর বিদ্রোহকে অনেকেই দেখেছেন একমাত্রিক রূপে, এর বহুমাত্রিকতা প্রায় সকলেরই নজর এড়িয়ে গেছে।’ এ-কারণেই নজরুল নিজে ‘বিদ্রোহী কবি’ আখ্যাটি সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। ১৯২৯ সনে কলকাতার এলবার্ট হলে তাঁকে যে সংবর্ধণা প্রদান করা হয়েছিল, সে সংবর্ধনার ‘প্রতিভাষণ’-এর একস্থানে তিনি বলেছিলেনÑ ‘আমাকে ‘বিদ্রোহী’ বলে খামাখা লোকের মনে ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন কেউ কেউ। এ নিরীহ জাতিটাকে আঁচড়ে কামড়ে তেড়ে নিয়ে বেড়াবার ইচ্ছা আমার কোনো দিনই নেই। তাড়া যারা খেয়েছে, অনেক আগে থেকেই মরণ তাদের তাড়া করে নিয়ে ফিরছে। আমি তাতে এক-আধটু সাহায্য করেছি মাত্র। এ-কথা স্বীকার করতে আজ আমার লজ্জা নেই যে, আমি শক্তিসুন্দর রূপ-সুন্দরকে ছাড়িয়ে আজো উঠতে পারিনি।
তিনি যে কেবল বিদ্রোহের জন্যই বিদ্রোহের কথা বলেননি, তাঁর বিদ্রোহ যে কেবল পুরনোকে ভাঙ্গার জন্য নয়, নতুনের সৃষ্টিই যে তাঁর মূল লক্ষ্য এ কথার স্পষ্ট অভিব্যক্তি তো তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাতে আছে ‘আমি উপাড়ি’ ফেলিব অধীন বিশ্বে অবহেলে নবসৃষ্টির মহানন্দে।’ যতীন সরকার মনে করেন ‘বিপ্লবচেতনাকে তার সমগ্রতায় ধারণ ও প্রকাশ করতে পারেন যে-শিল্পী, তিনিই মহৎ শিল্পী।’ সে বিচারে সমালোচক যতীন সরকার কবি কাজী নজরুল ইসলামকে মহৎ শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করেন।
‘মানবজমিনে চাষাবাদ, কবি নজরুল ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রবন্ধে যতীন সরকার জানিয়েছেন যে, কবি নজরুল ইসলাম ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়’-নামক একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন। এ সংগঠন যে ইশতেহারে ‘নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা-সূচক স্বরাজ্য লাভই এই দলের উদ্দেশ্য। ভূমির চরম স্বত্ব আত্ম-অভাব-পূরণক্ষম স্বায়ত্তশাসন বিশিষ্ট পল্লীতন্ত্রের ওপর বর্তিবে-এ পল্লীতন্ত্র ভদ্র শূদ্র সকল শ্রেণির শ্রমজীবীর হাতে থাকিবে।’ এরকম ঘোষণার ভেতর থেকেই নজরুলের চেতনায় বিদ্রোহের বীজ খুঁজে পাওয়া যায়।
‘উৎসবে বিপ্লবী শক্তির উদ্বোধন’ প্রবন্ধে নজরুলের উৎসব-ভাবনার স্বরূপের সন্ধান করে বলা হয়েছে ‘কেবল সমাজ-বিপ্লবের মধ্য দিয়েই যে সকল উৎসবে সমাজের সকল মানুষকে সমান মর্যাদায় সম্মিলিত ও আনন্দমুখর করে তোলা যায়-এমনটিই সারা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন আমাদের বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।’ যে নজরুল রমজানের শেষে খুশির ঈদের গান রচনা করেছেন তিনিই আবার কবিতায় লিখেছেন, ‘জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’ অর্থাৎ নজরুল সকল রকমের শোষণ ও বঞ্চনার অবসান চেয়েছেন, সেটিই যতীন সরকার খুঁজে পেয়েছেন।
যতীন সরকার নজরুল-মূল্যায়নে যে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন, তা নজরুল-গবেষক হিসেবে পরিচিত অনেক গবেষকই পারেনি। নজরুল-মূলায়নে যতীন সরকারের নির্মোহ দৃষ্টিকে মান্য করা যায়। নজরুলকে নিয়েও তাই যতীন সরকারের মূল্যায়নকে গুরুত্ব না দিয়ে উপায় নেই। নজরুলচিন্তা যতীন সরকারের সামগ্রিক সাহিত্যচিন্তার দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। লাভ হলো, নজরুল-মানস আমরা দেখতে পেলাম যতীন সরকারের দৃষ্টিতে।
এ কথা কারো অজানা নয় যে, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রাক-কৈশোরে ছিলেন মসজিদের মুয়াজ্জিন। তার শুরুর জীবন কেটেছে ইসলাম চর্চার মাধ্যমে। তার সাহিত্যকর্মেও ইসলামের প্রভাব প্রকট। তিনি প্রায় চার সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন। তার মধ্যে ইসলামী গানের সংখ্যা ২৮০টি। যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে। তবে যে কয়টি ইসলামী গান তার থেকে পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই বলা যায়, বাংলা ইসলামী গান রচনায় তিনি সর্বাধিক রচয়িতা হিসেবে আজ পর্যন্ত অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তার রচিত প্রায় ৮০ ভাগ গানে তিনি নিজেই সুর সংযোজন করেছেন। তিনি সুর সংযোজনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত নান্দনিকতার পরিচয় দিয়েছেন।
নজরুল ইসলামী গান রচনা শুরু করেন ১৯৩১ সালে। ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছিল তার রচিত প্রথম ইসলামী গান। এটি বাঙালি মুসলমানদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর নিয়ে কালজয়ী একটি গান। ঈদের আনন্দ, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক দিক তুলে ধরা হয়েছে এই গানে। গানটি বাঙালি মুসলিম সমাজে ‘ঈদের আবহ গান’ হিসেবে পরিচিত, যা বাঙালির ঈদ আনন্দের এক আবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের অনুরোধে কবি নজরুল এই গান রচনা ও সুরারোপ করেন।
এ গান রচনার পেছনে একটি ইতিহাস রয়েছে। কবি নজরুল তখন শ্যামাসংগীত লিখতেন। এক রাতে রেকর্ডিং শেষে নজরুল বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তাকে থামান শিল্পী আব্বাসউদ্দীন। কবির কাছে একটা আবদার ছিল তার। না শোনা পর্যন্ত তাকে যেতে দেবেন না। নজরুল বললেন, বলে ফেলো তোমার আবদার। আব্বাসউদ্দীন বললেন, কাজী দা, একটা কথা আপনাকে অনেক দিন ধরেই বলব বলব ভাবছি। দেখুন, পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়ালরা কী সুন্দর উর্দু কাওয়ালি গায়। শুনেছি তাদের গান প্রচুর বিক্রি হয়। বাংলায় ইসলামী গান তো তেমন নেই। বাংলায় ইসলামী গান গাইলে কেমন হয়? আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন, তাহলে মুসলমানদের ঘরে ঘরে আপনার জয়গান বাজবে।