যুক্তরাষ্ট্রের অংশ নয়, স্বাধীনতা চায় জনগণ
২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৪
॥ মুহাম্মদ আল-হেলাল ॥
গ্রিনল্যান্ড হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। এ দ্বীপটি আয়তনের দিক থেকে ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটি ১৯৭৯ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত। প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ডেনমার্কের হাতে। জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী ভবিষ্যতে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চায়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়ার ব্যাপারে বিরোধিতা রয়েছে। ট্রাম্প তার প্রথম রাষ্ট্রপতিত্বের সময় গ্রিনল্যান্ড কেনার চেষ্টা করেছিলেন। ২০২০ সালে বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে গ্রিনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালে নির্বাচনের পর ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে ন্যাটো সংরক্ষণের চেয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলে অগ্রসর হয়েছেন।
গ্রিনল্যান্ড : সারা বছর প্রায় বরফে ঢাকা থাকে গ্রিনল্যান্ড। ভৌগোলিক অবস্থান মেরু অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে সূর্যের আলো দেখা পাওয়া যায় মাত্র ৩ ঘণ্টার মতো। জানা যায়, অনেক ঔপনিবেশিক শক্তির মতো ডেনমার্ক এমন নীতি বাস্তবায়ন করেছিল, যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল, যার মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক পুনর্বাসন, সাংস্কৃতিক একত্রীকরণের প্রচেষ্টা এবং অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা। এই নীতিগুলো ইনুইট জনগোষ্ঠীর জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি ঘটিয়েছিল। এমনকি অনেক ইনুইট মহিলা সন্তান ধারণ করতে পারেননি কারণ ডেনিশ ডাক্তাররা তাদের শরীরে হস্তক্ষেপ করে মহিলাদের অজ্ঞাতসারে স্পাইরাল বসিয়েছিলেন। তথ্যমতে, ইনুইটরা সর্বপ্রথম গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশ করে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে। ইতিহাসমতে এরিক দ্য রেড গ্রিনল্যান্ডের নামকরণ করেন। কথিত আছে- তিনি আইসল্যান্ড থেকে খুনের অপরাধে গ্রিনল্যান্ডে নির্বাসিত হন এবং এর নাম গ্রিনল্যান্ড রাখেন। অনেকে মনে করেন, এরিক দ্য রেড মার্কেটিং পার্স্পেক্টিভ থেকে এর নাম গ্রিনল্যান্ড রাখেন যেন এর নাম শুনে মানুষ এখানে প্রত্যাবর্তন করতে আগ্রহী হয়। গ্রিনল্যান্ডবাসীরা এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াতে নিজেদের তৈরি যানবাহন স্লেজ, কায়াক এবং স্নো স্যু ব্যবহার করে। বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরের রাজধানী শহর গ্রিনল্যান্ডের নুক। গ্রিনল্যান্ডের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাঙ্গারলুসুয়াক, যা রাজধানী নুক থেকে ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে। স্লেজ কুকুর গ্রিনল্যান্ডে পরিবহনের একটি প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম; বিশেষ করে দূরবর্তী এবং দুর্গম এলাকায় যেখানে পরিবহন অবকাঠামো সীমিত।
গ্রিনল্যান্ড আমাদের হতেই হবে -ট্রাম্প : যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সুরক্ষার জন্য গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন ও দ্বীপটি আমাদের হতেই হবে বলে বারবার ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে একজন বিশেষ দূত নিয়োগ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে ডেনমার্কে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশেষ দূত নিয়োগের তাৎপর্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের চোখে গ্রিনল্যান্ডকে ডেনমার্ক থেকে আলাদা করে দেখা এবং নতুন বিশেষ দূতের প্রকাশ্য বক্তব্য যে তিনি দ্বীপটিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে কাজ করবেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পও লিখেছিলেন, জেফ ল্যান্ড্রি গ্রিনল্যান্ডের ‘জাতীয় নিরাপত্তায় অপরিহার্য গুরুত্ব’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ভালোভাবেই বোঝেন।
যদিও বিশেষ দূতরা আনুষ্ঠানিক কূটনীতিক নন। তাই তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। এই নিয়োগ গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আকাক্সক্ষার একধাপ অগ্রগতি।
উল্লেখ্য, জেফ ল্যান্ড্রি আগেও গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন। জানুয়ারিতে এক্সে তিনি লেখেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্প একদম ঠিক বলেছেন! গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রে যুক্ত করা দরকার। তাদের জন্য ভালো, আমাদের জন্যও ভালো। চলুন কাজটা শেষ করি!
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লকে রাসমুসেন বিশেষ দূত জেফ ল্যান্ড্রির নিয়োগকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব সম্মান করার আহ্বান জানান। তবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতায় তারা প্রস্তুত, কিন্তু সেটি হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসিরা ডেনমার্ক দখল করলে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি ও রেডিও স্টেশন স্থাপনের জন্য সেখানে প্রবেশ করে। সেই সময় থেকেই দ্বীপটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ওই ঘাঁটি পরিদর্শন করেন ও গ্রিনল্যান্ডবাসীকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার আহ্বান জানান।
২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ কনস্যুলেট পুনরায় চালু করে, যা ১৯৫৩ সালে বন্ধ করা হয়েছিল। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ ও কানাডারও সেখানে সম্মানসূচক কনস্যুলেট রয়েছে।
ট্রুথ সোশ্যালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ডেনমার্ক ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে শুল্ক না নিয়ে ‘ভর্তুকি’ দিয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী পরে এখন ‘ডেনমার্কের ফেরত দেওয়ার সময়’। ট্রাম্প দাবি করেন, ‘বিশ্বশান্তি ঝুঁকির মুখে! চীন গ্রিনল্যান্ড চায়, আর ডেনমার্ক সেটি ঠেকানোর কিছুই করতে পারবে না’। তিনি আরও বলেন, গ্রিনল্যান্ড শুধু ‘দুটি ডগস্লেজ’ দ্বারা সুরক্ষিত। তিনি অভিযোগ করেন যে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড ‘অজানা উদ্দেশ্যে’ গ্রিনল্যান্ডে গিয়েছে এবং তারা ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি খেলা’ খেলছে।
ট্রাম্পের মতে, এই ‘সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি দ্রুত এবং প্রশ্নহীনভাবে শেষ করতে’ এখন ‘কঠোর ব্যবস্থা’ নেওয়া জরুরি। এর জবাবে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ডে হামলা চালায়, তাহলে তা ন্যাটো জোটের সমাপ্তি ঘটাবে। উল্লেখ্য, ডেনমার্কের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র যত ইচ্ছা সেনা গ্রিনল্যান্ডে পাঠাতে পারে। ট্রাম্পের দাবি, সম্ভাব্য রুশ বা চীনা হামলার বিরুদ্ধে সঠিকভাবে প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গ্রিনল্যান্ডের মালিক হওয়া’ প্রয়োজন।
‘আমাদের বিশাল ক্ষমতা’ : ‘আমি জানিয়েছি যে, জাতীয় ও বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড অপরিহার্য।’ দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগ দিতে যাওয়ার আগে এ কথা সরাসরি ঘঅঞঙ-এর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুটেকে জানিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। দাভোসের মঞ্চেও একই কথার প্রতিধ্বনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কণ্ঠে। পাশাপাশি আধিপত্য বিস্তারের কায়দায় তিনি গর্জে উঠলেন, ‘আমেরিকা ছাড়া কোনো দেশ বা একাধিক দেশের গোষ্ঠী মিলেও গ্রিনল্যান্ডকে নিরাপত্তা দিতে পারবে না। আমাদের বিশাল ক্ষমতা। মানুষ যা ভাবে তার থেকেও বেশি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেখেছি, যখন মাত্র ছয় ঘণ্টা যুদ্ধের পর ডেনমার্ক জার্মানির কাছে পরাজিত হয়েছিল। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে অনুভব করে ডেনমার্কের জন্য লড়াই করছে।’
ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির ঘোষণা ট্রাম্পের : ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে, গোটা আর্কটিক বা উত্তর মেরু অঞ্চল নিয়ে ভবিষ্যৎ চুক্তির একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করছি।’
ট্রাম্প বলেছেন, ‘এই চুক্তিতে সকলে খুশি হবেন। এটা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হবে। সকলের জন্য ভালো হবে; বিশেষ করে নিরাপত্তা ও খনি সংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের ভালো হবে।’
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর মার্ক রুটে জানিয়েছেন, ‘দূরপাল্লার মিসাইল থেকে বাঁচার জন্য গোল্ডেন ডোম ডিফেন্স সিস্টেম নিয়ে ইউরোপিয়ান দেশগুলো ট্রাম্পের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ মুখোমুখি : গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে এক যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ইইউ নেতারা জোর দিয়ে বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মতোই আগ্রহী ও সচেতন। তবে তাদের মতে, এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও থাকবে। সেইসঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা মেনে চলতে বলেন। যার মাঝে আছে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা ও আন্তর্জাতিক সীমান্ত মান্য করা। গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই যৌথ বিবৃতিকে স্বাগত জানান এবং সম্মানজনক সংলাপের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এ নিয়ে আলোচনা করতে হবে আন্তর্জাতিক আইন এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার নীতির প্রতি সম্মান রেখে।
অন্যদিকে গ্রিনল্যান্ড দখলের বিরোধিতাকারী আট মিত্র দেশের ওপর নতুন করে শুল্কারোপের যে হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দিয়েছেন, সেটিরও নিন্দা জানিয়েছেন ইইউ নেতারা।
শুল্কারোপের ঘটনার আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ‘সহজ’ অথবা ‘কঠিন’ উপায়ে অঞ্চলটিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিবে।
ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি অ্যান্তোনিও কস্তা বলেন, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘সর্বদা অত্যন্ত দৃঢ় থাকবে’। তবে ইইউ’র নিজস্ব কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেই এবং এর ২৭টি সদস্য দেশের বেশিরভাগই ন্যাটোর অংশ।
জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে আসলে গ্রিনল্যান্ডবাসীর জীবন ‘আরও নিরাপদ, শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ’ হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহকারী স্টেফেন মিলারের স্ত্রী কেটি মিলার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রং ব্যবহার করা হয় এবং তাতে লেখা ছিল, ‘শিগগিরই’। অন্যদিকে সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার বলেন, ‘গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক লড়াইয়ে কেউই যাবে না’।
ওয়ান ফর অল, অল ফর ওয়ান : ন্যাটো চুক্তিগুলোয় বাইরের দেশ বা আরেকটি ন্যাটো মিত্রের আক্রমণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫; যেটিকে ‘একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন’ ধারা বলা হয়, সে অনুযায়ী এক ন্যাটো দেশ আরেক ন্যাটো দেশকে আক্রমণ করলে তা প্রযোজ্য নয়।
উল্লেখ্য, ন্যাটো সদস্য তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যে সাইপ্রাস ইস্যুতে সংঘাতে ১৯৭৪ সালে, যখন তুরস্ক হামলা চালায়। সেবার ন্যাটো হস্তক্ষেপ করেনি, তবে জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতায় সহায়তা করতে পেরেছিল।
কেন গ্রিনল্যান্ড এত গুরুত্বপূর্ণ : গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের লম্বা তালিকা রয়েছে দ্য জিয়োলজিক্যাল সার্ভে অব ডেনমার্ক অ্যান্ড গ্রিনল্যান্ডের ওয়েবসাইটে। সেমতে সেখানে যেমন আছে সোনা, প্লাটিনাম, হীরা ও রুবির মতো দামি খনিজ, তেমনি আছে লিথিয়াম, টাইটেনিয়ামসহ বিরল সব ধাতুর খনি এবং জ্বালানি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়লা ও ইউরেনিয়ামের খনি। বড় ধরনের তেলের খনি ও প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রও রয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের ধারণা, ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী এসব খনিজ সম্পদের চাহিদা পাঁচগুণ বেড়ে যাবে। ট্রাম্প বলেছেন যে, চীন ও রাশিয়ার জাহাজগুলোর গতিবিধিতে নজর রাখার জন্য দ্বীপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের এয়ারফোর্স স্পেস কমান্ড ও নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডও গ্রিনল্যান্ড সামরিক ঘাঁটিটি ব্যবহার করে থাকে।
গ্রিনল্যান্ড দখলের উপায় : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্কের দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড দখল বা অধিগ্রহণের বিষয়ে ‘বিভিন্ন উপায়’ নিয়ে আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। এই বিকল্পগুলোর মধ্যে সামরিক বাহিনী ব্যবহারের বিষয়টিও রয়েছে। হোয়াইট হাউস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘প্রেসিডেন্ট ও তার দল এই গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নানা বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করার মতো বিকল্পও তার হাতে আছে।’ রয়টার্সকে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা জানান, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনায় থাকা বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, দ্বীপটিকে সরাসরি কিনে নেওয়া অথবা, ওই অঞ্চলের সঙ্গে একটি বিশেষ সহযোগিতা চুক্তি (কমপ্যাক্ট অব ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন) করা। এর আগে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্ক জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের দাবির বিষয়ে তারা দ্রুত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও’র সাথে আলোচনায় বসতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর এরিক স্মিট গত ২৭ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় বলেন, ‘আমি আশা করি, ইউরোপ বুঝবে যে শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা সভ্যতার জন্য ভালো।’ চলতি বছরের মার্চে ট্রাম্প বলেন, এই অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে যত দূর যেতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র তত দূর যাবে। গত গ্রীষ্মে কংগ্রেসের এক শুনানিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে জিজ্ঞেস করা হয়, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো পরিকল্পনা পেন্টাগনের আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতির পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে।
গ্রিনল্যান্ড আর… : ট্রাম্প কি সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খাল দখল করার চিন্তা করছেন? সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে।
‘না, এই দুটির কোনোটির ব্যাপারেই আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারছি না’, জবাবে বলেন মি. ট্রাম্প। ‘তবে আমি এটা বলতে পারি যে, (যুক্তরাষ্ট্রের) অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য ওই এলাকাগুলো আমাদের প্রয়োজন’, যোগ করেন তিনি। মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার পরামর্শও দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিকে পাশের দেশ কানাডাকেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার প্রচেষ্টা চালাবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে মি. ট্রাম্প ‘অর্থনৈতিক শক্তি’ কাজে লাগানোর কথা বলেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যকার সীমান্তকে ‘কৃত্রিমভাবে আঁকা লাইন’ বলে অভিহিত করেন মি. ট্রাম্প।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মের সময়েই ওই সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন যে, কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্টের অর্থাৎ ‘তাদের একটি (মার্কিন) অঙ্গরাজ্য হওয়া উচিত’, সাংবাদিকদের বলেন মি. ট্রাম্প। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার একীভূত হওয়ার ‘কোনো সুযোগ নেই’ বলে জানিয়েছেন দেশটির সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। মি. ট্রাম্প এমন একটি সময় গ্রিনল্যান্ড ও পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মন্তব্য করলেন, যার আগে তার ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র গ্রিনল্যান্ড সফর করেছেন। যদিও সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প জুনিয়র সাংবাদিকদের বলেছিলেন যে, তিনি গ্রিনল্যান্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ‘ব্যক্তিগত সফরে’ যাচ্ছেন।
অন্যদিকে কিছুদিন ধরেই পানামা খালকে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে আনার হুমকি দিয়ে আসছেন মি. ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘পানামা খালে মার্কিন জাহাজের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ রেখে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।’ পানামা খাল দিয়ে মার্কিন জাহাজ চলাচলের শুল্ক কমানো না হলে খালটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানান তিনি। ‘এই প্রতারণা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত’, গত ডিসেম্বরে অ্যারিজোনায় এক সমাবেশে বলেন মি. ট্রাম্প। পানামার প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো অবশ্য মি. ট্রাম্পের দাবি নাকোচ করে বলেন ‘পানামা খাল ও এর আশেপাশের এলাকার মালিক পানামা এবং সেগুলো আগামীতেও দেশটির অধীনেই থাকবে’, বলেন মি. মুলিনো। উল্লেখ্য যে, লাতিন আমেরিকার দেশ পানামার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল।
তবে ২০২৩ সালে পানামার সাথে চীন নতুন করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের আলোচনা শুরুর পরই পানামার সাথে সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রই এই খালটিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে থাকে। ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এবং এটি বিশ্ব বাণিজ্যে মালামাল পরিবহনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর প্রায় ১৪ হাজার জাহাজ এ খাল ব্যবহার করে থাকে। পানামা খালের কারণে দেশটির বিশাল ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর ২০১৬ সালের জুনে পানামা খালকে আরো প্রশস্ত করার পর খালটিকে জাহাজ চলাচলের জন্যে আবারও খুলে দেওয়া হয়।
শতাব্দীর প্রাচীন এই খালটি ১৯০০ সালের শুরুর দিকে তৈরি করা হয়েছিল এবং ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত এর রক্ষণাবেক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই ছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে পানামার হাতে ছেড়ে দেয়ার জন্য করা এক চুক্তির আওতায় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত খালটি যৌথ ব্যবস্থাপনায় ছিল। ১৯৯৯ সালে এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায় পানামা। খালটির নিয়ন্ত্রণ পানামাকে দিয়ে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ‘নির্বোধের মতো কাজ’ করেছেন বলে মনে করেন মি. ট্রাম্প।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার পরামর্শ, কানাডা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য হওয়া উচিত, পানামা খালটির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেওয়ার এবং অঞ্চলটি নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে যত দূর যেতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র তত দূর যাবে এ ধরনের মন্তব্য বিশ্বরাজনীতিতে নয়া মার্কিন উপনিবেশবাদের উপস্থিতির অংশ। এই উপনিবেশবাদের ছোবল ভবিষ্যতে আরো অঞ্চলের জন্য অপেক্ষা করছে। তবে শান্তির জন্য গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের মতো বিশ্ব নেতৃবৃন্দের আলোচনায় বসা এখন সময়ের দাবি।
সূত্র : ট্রুথ সোশ্যাল, আল-জাজিরা, রয়টার্স, US Central Command (CENTCOM),, এএফপি, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
alhelaljudu@gmail.com