মিসরের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষে পাওয়া গিয়েছে রসুনের মাটির তৈরি প্রতিরূপ ও চিত্রকর্ম, যা খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ সালেরও আগে থেকে রসুনের ব্যবহার প্রমাণ করে। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ সালের কোডেক্স ইবার্স নামের প্রাচীন চিকিৎসার নথিপত্রে রসুনের উল্লেখ আছে হজম ও রক্ত চলাচলজনিত রোগের ওষুধ হিসেবে। পিরামিড নির্মাণে নিযুক্ত শ্রমিকদের দৈনিক খাদ্যতালিকায় রসুন ও পেঁয়াজ ছিল বাধ্যতামূলক, বিশ্বাস করা হতো এতে দেহশক্তি বাড়ে ও রোগ প্রতিরোধ হয়।
পরবর্তীকালে গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস ও ডিওসকোরিডিস রসুনকে ‘রক্তনালি পরিষ্কার রাখার উপাদান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ভারতে চরক সংহিতা রসুনকে বলবর্ধক খাদ্য হিসেবে বিশেষায়িত করেছে, আর চীনের হান রাজবংশের চিকিৎসাগ্রন্থে রসুনের মাধ্যমে শরীরের ‘ইন-ইয়াং’ ভারসাম্য রক্ষার বর্ণনা পাওয়া যায়।
নিরাময়ের রসায়ন
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ জানত, রসুনে আছে আরোগ্যশক্তি। তবে কেন তা কার্যকর সেটা জানা ছিল না। ১৯৪৪ সালে মার্কিন রসায়নবিদ চেস্টার জন ক্যাভালিটো এক রহস্যময় যৌগ আবিষ্কার করেন, যার নাম দেন অ্যালিসিন (Allicin)।
কাঁচা রসুনের কোয়া চূর্ণ হয়ে alliinase নামের এনজাইম alliin নামের যৌগকে ভেঙে অ্যালিসিন তৈরি করে। এ ক্ষণস্থায়ী রাসায়নিক প্রতিক্রিয়াই রসুনের ঝাঁজ, তীক্ষ্ণ ঘ্রাণ ও জীবাণুনাশক শক্তি সৃষ্টি করে।
তবে সব রসুন সমান নয়। কাঁচা, রান্না করা, ফারমেন্টেড বা ক্যাপসুলজাত রসুনের রাসায়নিক গঠন সম্পূর্ণ আলাদা। কোথাও অ্যালিসিন নষ্ট হয়ে যায়, কোথাও অন্য যৌগে রূপান্তর হয়। এর চিকিৎসাশক্তি নির্ভর করে প্রস্তুতির পদ্ধতির ওপর, এটি আধুনিক বিজ্ঞানও স্বীকার করে।
হৃদয়ের বন্ধু
রসুনের সবচেয়ে প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র হলো হৃদরোগ প্রতিরোধ। ১৯৯০-এর দশকের প্রাথমিক গবেষণাগুলো আজ শতাধিক আধুনিক গবেষণার ভিত্তি। দেখা গেছে, Aged Garlic Extract বা পরিপক্ব রসুনের নির্যাস নিয়মিত সেবনে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের সিস্টোলিক চাপ গড়ে ৮ mmHg এবং ডায়াস্টোলিক চাপ ৫-৬ mmHg পর্যন্ত কমে আসে। এটি অনেক ওষুধের সমান কার্যকর।
রসুনের সালফার যৌগগুলো রক্তনালি প্রসারিত করে, নাইট্রিক অক্সাইড উৎপাদন বাড়ায় এবং যকৃতের কোলেস্টেরল তৈরির প্রক্রিয়া সামান্য দমন করে। এছাড়া রসুন রক্তের প্লেটলেট জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে, ফলে রক্তপ্রবাহ উন্নত হয়। তবে মনে রাখতে হবে, মাত্রা এবং অন্যান্য ওষুধের সংমিশ্রণে সতর্কতা জরুরি। অতিরিক্ত রসুনের ব্যবহার রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রক্তের প্লেটলেট জমাট বাঁধা রোধ এবং যকৃতের কোলেস্টেরল তৈরির প্রক্রিয়া দমন এ দ্বিমুখী কাজই প্রাচীন যুগে রসুনকে ‘গরিবের পেনিসিলিন’ উপাধি দিয়েছিল, আর আধুনিক চিকিৎসায় এটি হয়ে উঠেছে হৃদ্রোগ প্রতিরোধের একটি প্রাকৃতিক সহায়ক।
প্রকৃতির জীবাণুনাশক
মিসর, ভারত বা চীনের পুরনো চিকিৎসকরা রসুনকে ব্যবহার করতেন সংক্রমণ প্রতিরোধে। আধুনিক গবেষণাগারও তা সমর্থন করেছে। পরীক্ষাগারে দেখা যায়, রসুন অ্যালিসিন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, এমনকি কিছু ভাইরাসের বিরুদ্ধেও সক্রিয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রুশ সেনারা ক্ষত পরিষ্কারে রসুনের রস ব্যবহার করত, তখনই জন্ম নেয় ‘রাশিয়ান পেনিসিলিন’ নামটি। আজও গবেষণাগারে প্রমাণিত যে রসুনের নির্যাস অনেক জীবাণু দমন করতে পারে। যদিও মানবদেহে এর সরাসরি প্রয়োগ সীমিত, কারণ অ্যালিসিন দ্রুত ভেঙে যায় ও রক্তে স্থায়ীভাবে শোষিত হয় না।
তবু একে উপেক্ষা করা যায় না। আধুনিক চিকিৎসকরা এখন রসুনকে মূল ওষুধের পাশাপাশি সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে ভাবছেন, বিশেষ করে ত্বক বা মুখগহ্বরের সংক্রমণে, কিংবা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে।
ক্যান্সারের প্রতিষেধক
রসুনের আরেকটি আলোচিত ভূমিকা হলো ক্যান্সার প্রতিরোধ। প্রাচীনকালে যেমন এটিকে শরীর ‘পরিশোধক’ হিসেবে দেখা হতো, আধুনিক গবেষণায়ও দেখা যায়, রসুনের সালফার যৌগগুলো টিউমার কোষে apoptosis বা কোষমৃত্যু ঘটাতে পারে, ক্যান্সার উদ্রেককারী nitrosamine গঠনে বাধা দেয় এবং শরীরের ডিটক্সিফিকেশন এনজাইমগুলোকে সক্রিয় করে।
তবে ময়ার্স যেমন সতর্ক করেছিলেন, এ ফলাফলগুলো এখনো ‘সম্ভাবনামূলক, নিশ্চিত নয়।’ সাম্প্রতিক পর্যালোচনাগুলোও একই কথা বলছে, যদিও কিছু জনসংখ্যাভিত্তিক গবেষণায় গ্যাস্ট্রিক ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাসের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে সামগ্রিকভাবে মানবদেহে এর কার্যকারিতা এখনো পুরোপুরি প্রমাণিত নয়।
সাধারণ মানুষের ওষুধ
রসুনের জনপ্রিয়তা কেবল তার গুণে নয়, সহজলভ্যতার কারণেও। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে এটি চাষ হয়; এর চাষাবাদে বিশেষ প্রযুক্তি বা জলবায়ু লাগে না। মধ্যযুগের ইউরোপের মঠে যেমন এটি ওষুধ, তেমনি এশিয়ার গ্রামীণ রান্নাঘরেও এটি ছিল রোগের প্রতিকার।
ময়ার্স রসুনকে বলেন, লোকঔষধ ও আধুনিক বিজ্ঞানের মধ্যে এক সেতু। কারণ আজও যখন বিজ্ঞানীরা অ্যালিসিনের অণু ভেঙে তার ক্রিয়া বিশ্লেষণ করছেন, তখনো রসুন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে প্রকৃতিই মানবজাতির প্রথম চিকিৎসক।
আধুনিক চিকিৎসার দৃষ্টিতে রসুন
রসুনকে নিয়ে গবেষণাগারে নানা মতের উদ্ভব হলেও বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা রসুন সম্পর্কে বেশ কয়েকটি বিষয়ে একমত হয়েছেন। যেমন রসুন রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল কমাতে সক্ষম, বিশেষত মানসম্মত নির্যাস আকারে। এটি জীবাণুবিরোধী, তবে চিকিৎসায় এর প্রয়োগ সীমিত। খাদ্য হিসেবে রসুন নিরাপদ, কিন্তু ঘন নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট নেয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। ক্যান্সার প্রতিরোধে একটি বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। রসুন তাই কেবল একটি খাদ্য উপাদান নয়, বরং ইতিহাস ও বিজ্ঞানের সংযোগস্থল, যেখানে প্রাচীন বিশ্বাস ও আধুনিক গবেষণা একে অন্যকে প্রতিফলিত করে।
প্রাচীন যুগ থেকে রসুন আমাদের মাটি, ঐতিহ্য ও জীবনের সঙ্গে এক আত্মিক সংযোগ স্থাপন করেছে। আজ নতুন গবেষণায় তা আরো সুস্পষ্ট। রসুন টিকে আছে মসলা হিসেবে, ওষুধ হিসেবে। এটি মনে করিয়ে দেয় চিকিৎসা কেবল ওষুধের বিজ্ঞান নয়, এটি মানুষের অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতা, যেখানে প্রকৃতি ও জ্ঞানের মিশ্রণে আমরা খুঁজি আরোগ্যের গোপন ভাষা। উৎস: বণিক বার্তা, সিল্করোড, অন লাইন ভার্সন।