দুনিয়ায় জান্নাতের নিয়ামতপ্রাপ্ত যারা
২৮ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৪১
॥ ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ ॥
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে জান্নাতের বর্ণনা দিয়েছেন-যেখানে থাকবে চিরস্থায়ী সুখ, প্রশান্তি ও অপরিসীম নাজাত। জান্নাতের মানুষ সেখানে পাবে ফলমূল, গোশত ও বিশুদ্ধ পানীয়, যা কখনো শেষ হবে না। সেখানে নেই ক্লান্তি, নেই কষ্ট, নেই দুঃখের ছোঁয়া।
তবে কুরআন ও তাফসিরের আলোকে আমরা জানতে পারি, আল্লাহ তাঁর কিছু প্রিয় বান্দাকে দুনিয়াতেই এমন এক বিশেষ রিযিক দান করেছেন, যা জান্নাতীয় খাবারের অনুরূপ। অর্থাৎ এমন রিজিক, যা মানবিক প্রচেষ্টা ছাড়াই সরাসরি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। এই অলৌকিক অনুগ্রহপ্রাপ্তদের মধ্যে সবচেয়ে মহীয়সী ব্যক্তিত্ব ছিলেন মরিয়ম (আ.)- নবী ঈসা (আ.)-এর মা। মরিয়ম (আ.), যিনি দুনিয়াতেই জান্নাতীয় রিজিক পেয়েছিলেন।
কুরআনের বর্ণনায় আমরা পড়ি- যখনই জাকারিয়া (আ.) তাঁর মেহরাবে প্রবেশ করতেন, তিনি মরিয়মের কাছে রিজিক দেখতে পেতেন। তিনি বলতেন, ‘হে মরিয়ম! এগুলো তোমার কাছে কোথা থেকে আসে?’ তিনি বলতেন, ‘এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩৭)।
তাফসিরে ইবনে কাসির ও অন্য ব্যাখ্যাকাররা বলেন, মরিয়ম (আ.)-এর কাছে এমন ফল ও খাবার আসত, যা দুনিয়ার নিয়মে পাওয়া সম্ভব নয়। শীতকালে গ্রীষ্মের ফল, গ্রীষ্মকালে শীতের ফল পাওয়া যেত তাঁর কাছে।
এগুলো কোনো মানুষের কাছ থেকে নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা এক বিশেষ রিজিক ছিল। কেউ কেউ বলেন, এগুলো ছিল জান্নাতীয় খাবারের অনুরূপ, বরকতময় ও অলৌকিক রিজিক।
ইবনে কাসির তাফসিরে উল্লেখ করেছেন- আল্লাহ তায়ালা মরিয়ম (আ.)-এর ওপর এমন অনুগ্রহ করেছেন, যা সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে ঘটে না। তাঁর কাছে আসত এমন ফলমূল, যা পৃথিবীর বাজারে পাওয়া যেত না। অতএব বলা যায়, মরিয়ম (আ.) দুনিয়াতেই জান্নাতীয় রিজিকের স্বাদ পেয়েছিলেন, যা ছিল আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও ভালোবাসার নিদর্শন।
রাসূলুল্লাহ (সা.)- আল্লাহর দানকৃত বরকতময় রিজিক
নবী মুহাম্মাদ সা.-এর জীবনেও দেখা যায় বহু মুজিজা, যেখানে খাবার বা পানীয় আল্লাহর অনুমতিতে অলৌকিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত- একবার খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়ার ফলে জাবির (রা.)-এর ঘরের সামান্য খাবার দিয়ে শত শত সাহাবী আহার করেছিলেন, অথচ খাবার শেষ হয়নি। (বুখারী ও মুসলিম)।
আবার সহীহ মুসলিমে এসেছে- একবার তিনি অল্প পানি থেকে তাঁর হাতের বরকতে বহু মানুষকে পান করিয়েছিলেন। পানি শেষ হয়নি, বরং বেড়েই চলেছিল। (মুসলিম)।
এ ঘটনাগুলো জান্নাতীয় খাবার না হলেও আল্লাহর পক্ষ থেকে দুনিয়ায় প্রেরিত অলৌকিক বরকতময় রিজিক, যা জান্নাতের অনুগ্রহেরই এক প্রতিফলন।
মরিয়ম (আ.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে সহীহ হাদীস
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, নারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মরিয়ম বিনতে ইমরান। (বুখারী ও মুসলিম)। এ শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম কারণ ছিল তাঁর তাকওয়া, ইবাদত, ধৈর্য এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ ভরসা। তাঁর এই পবিত্রতার ফলেই আল্লাহ তাঁকে দুনিয়াতেই এমন রিজিক দান করেন, যা দুনিয়ার নিয়মে সম্ভব ছিল না।
জান্নাতীয় রিজিকের বৈশিষ্ট্য
কুরআনে জান্নাতের খাবার সম্পর্কে বলা হয়েছে
-তাদের জন্য থাকবে, যা কিছু মন চায় এবং যা কিছু চোখকে আনন্দ দেয়; আর তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” (সূরা যুখরুফ : ৭১)।
মরিয়ম (আ.)-এর কাছে যে ফল ও রিজিক আসত, তা ছিল এই জান্নাতীয় রিজিকেরই এক ক্ষুদ্র ঝলক। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সন্তুষ্টি ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে দুনিয়াতেই তাঁকে সেই রিজিকের স্বাদ দিয়েছিলেন।
আল্লাহর রিজিক সীমাহীন
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন, তাঁকে অগণিতভাবে রিজিক দান করেন।” (সূরা আলে ইমরান : ৩৭)। মরিয়ম (আ.)-এর ঘটনা এ আয়াতের এক জীবন্ত উদাহরণ। তাঁর নিষ্কলুষতা, পরহেজগারি ও ইবাদতের প্রতি অনুরাগের ফলেই তিনি পেয়েছিলেন সেই অসাধারণ রিজিক।
আমাদের জন্য শিক্ষা ও বার্তা
১. আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাঁকে বিশেষ অনুগ্রহে ভূষিত করেন। মরিয়ম (আ.)-এর জান্নাতীয় রিজিক ছিল সেই ভালোবাসার প্রতিফলন।
২. রিজিক শুধু বস্তুগত নয়- এটি আধ্যাত্মিকও হতে পারে। আল্লাহ এমনভাবে দান করেন, যা মানুষের বোধের বাইরে।
৩. সৎ আমল, তাকওয়া ও ধৈর্য জান্নাতীয় দানের চাবিকাঠি। যেমন মরিয়ম (আ.) বলেছিলেন, “এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে।”
৪. যে ব্যক্তি কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তাকেই আল্লাহ অলৌকিকভাবে রিজিক দান করেন।
৫. আল্লাহর দান সীমাহীন। তিনি চাইলে মানুষকে দুনিয়াতেই জান্নাতের স্বাদ অনুভব করাতে পারেন।
পরিশেষে কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে নিশ্চিতভাবে বলা যায়- দুনিয়ায় থেকেই যিনি জান্নাতীয় রিযিকের স্বাদ পেয়েছিলেন, তিনি ছিলেন মরিয়ম (আ.)। তিনি ছিলেন আল্লাহর প্রিয়, পরিশুদ্ধ ও পরহেজগার এক নারী- যাকে আল্লাহ এমন রিজিক দান করেছিলেন, যা দুনিয়ার উৎস থেকে আসেনি। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরও মরিয়ম (আ.)-এর মতো পরিশুদ্ধ হৃদয়, ঈমান ও তাকওয়ার অধিকারী বানান- যাতে দুনিয়াতেই তাঁর রহমত অনুভব করতে পারি, আর পরকালে জান্নাতের স্থায়ী সুখ লাভ করতে পারি। আমিন।
লেখক : প্রবন্ধকার, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।