দেওয়ারন সিরাজুল ইসলাম মতলিবের ইন্তেকাল

সংবাদদাতা
২১ জুন ২০২৫ ১৪:৪৯

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রবীণ সদস্য (রুকন) মৌলভীবাজার জেলার সাবেক আমীর ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সাবেক সদস্য দেওয়ারন সিরাজুল ইসলাম মতলিব

 

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রবীণ সদস্য (রুকন) মৌলভীবাজার জেলার সাবেক আমীর ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সাবেক সদস্য দেওয়ারন সিরাজুল ইসলাম মতলিব বার্ধক্যজনিত কারণে ১৮ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ৮০ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন)। তিনি স্ত্রী, ৬ পুত্র, ৩ কন্যা ও অনেক নাতি-নাতনিসহ বহু আত্মীয়-স্বজন রেখে গিয়েছেন।
শোকবাণী

দেওয়ারন সিরাজুল ইসলাম মতলিব এর ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ১৮ জুন এক শোকবাণী প্রদান করেছেন।

শোকবাণীতে তিনি বলেন, প্রবীণ রাজনীতিবিদ দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম একজন সুনামধন্য লেখক ও গবেষক ছিলেন। তিনি বহু সামাজিক কর্মকা-ের সাথে জড়িত ছিলেন। একজন দক্ষ সংগঠক হিসেবে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কাজকে একটি মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর ইন্তিকালে আমরা ইসলামী আন্দোলনের একজন নিবেদিত প্রাণ দাঈকে হারালাম। তিনি ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছেন এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রচার ও প্রসারে তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। আমি তাঁর ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করছি।

শোকবাণীতে তিনি আরও বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁকে ক্ষমা ও রহম করুন এবং তাঁর কবরকে প্রশস্ত করুন। তাঁর গুনাহখাতাগুলোকে ক্ষমা করে দিয়ে নেকিতে পরিণত করুন। কবর থেকে শুরু করে পরবর্তী প্রত্যেকটি মঞ্জিলকে তাঁর জন্য সহজ, আরামদায়ক ও কল্যাণময় করে দিন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর শোকাহত পরিবার-পরিজনদেরকে এ শোক সহ্য করার তাওফিক দান করুন।

অপর এক যুক্ত শোকবাণীতে মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের আমীর ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শাহেদ আলী, সাবেক জেলা আমীর মোঃ আব্দুল মান্নান ও জেলা সেক্রেটারী মোঃ ইয়ামীর আলী গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, অমায়িক ব্যবহারের অধিকারী দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিব ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক জীবন-যাপনের চেষ্টা করতেন। তিনি দ্বীন প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছেন। আমরা তাঁর ইন্তিকালে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তাঁর জীবনের বিরাট খেদমতকে নাজাতের উসিলা হিসেবে কবুল করে মহান রব তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের আ’লা মাক্বাম দান করুন। দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত পরিবারের সকল সদস্য, আত্মীয়-স্বজন এবং দ্বীনের পথের সহযাত্রীদের সাবরে জামিল দান করুন।

উল্লেখ্য, দেশের বাহিরে অবস্থানরত মরহুমের ছেলে ও মেয়েরা দেশের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েছেন। পারিবারিক ও সাংগঠনিক দায়িত্বশীলদের সমন্বয়ে আলাপ আলোচনা করে জানাজার নামাজের সময় ও দাফনের স্থান পরে ঠিক করা হবে।

আমাদের মৃত্যুকে সব সময় স্মরণ রাখতে হবে: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, আমাদের মৃত্যুকে সকল সময় স্মরণে রাখতে হবে। আমাদের মৃত্যুর সময় নির্দিষ্ট করা আছে, সেই সময়ই মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাকিয়ে তাকিয়ে সেই সময় চলে আসবে। কখন আসবে সেটা বলা যায়না। মৃত্যু থেকে আমাদের শিক্ষা হলো প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর জন্য নেক আমল করে প্রস্তুত থাকা। হারাম খাবো না, কবিরা গুনাহ করবো না, কোন ফরজ তরক করবো না, জেনা-ব্যভিচার করবো না, পাপাচার করবো না। সালাত ও পর্দাসহ পরিবারকে দ্বীনের উপরে রাখতে হবে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ তায়ালার দ্বীন মানা এবং কায়েমের জন্য জানমাল দিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে।

বৃহস্পতিবার (১৯ জুন) দুপুরে মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিবের জানাযায় অংশ নিয়ে উপরোক্ত অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা মরহুম দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিব ভাইয়ের জীবনে ইসলামী আন্দোলনের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই। আমরা যা বলি, নিজের জীবনে তা খুব কমই প্রতিফলিত হয়। আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, সদাচার, বিনয়, ভদ্রতা, ধৈর্য ও মানুষকে আপন করে নেওয়ার অপূর্ব কৌশল ছিল দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিব ভাইয়ের জীবনে।

তিনি বলেন, রাসূল (সা.) হাদীসে বলেছেন, হাশরের দিনে কারা ক্ষমা পাবেন তার মধ্যে এই গুণটা মৌলিক যারা বেশি সবর করতে পারে, মানুষের সাথে সদাচারণ করতে পারে। এর বিনিময়ে সে বড় আমলনামার ভাগীদার হবে। তাঁর রচিত ‘একটুখানি মিষ্টি হাসি ও ইসলামী আন্দোলন’ বইটি আর দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম ভাইয়ের জীবনী এক। তিনি মানুষকে খুব আপন করে নিতেন। আমাদের মধ্যে এতো অসাধারণ গুণ ধরে রাখা কঠিন। কিন্তু মতলিব ভাই ছিলেন ব্যতিক্রম।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসলামী আন্দোলনের চরম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে, অনেক ঝড়-ঝাপটা, মামলা হামলার মধ্য দিয়ে কত যে মঞ্জিল পার করেছেন তিনি তার ইয়ত্তা নেই। তার দিকে তাকিয়ে এই অঞ্চলের মানুষ ইসলামী আন্দোলনের দিকে অগ্রসর হয়েছে। অনেকেই বলেছেন আমরা অভিবাবককে হারিয়েছি। আমরা সবর করি। হায় আল্লাহ! এতো মানুষের স্বাক্ষী, এতো মানুষের সুধারণা যার প্রতি, তুমি তার প্রতি তোমার রহমত বর্ষণ করো।

তিনি বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন, যখন কোন মানুষের মৃত্যু হয়ে যায় তখন তার কাছ থেকে আমলগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন তিনটি আমল থাকে, একটি হলো সদকায়ে জারিয়া, অন্যটি উপকারি শিক্ষা এবং অপরটি নেক সন্তান-সন্ততি।

জানাযা পূর্ব আলোচনায় আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমীর মোঃ ফখরুল ইসলাম, সিলেট জেলা আমীর মাওলানা হাবিবুর রহমান, মৌলভীবাজার জেলা আমীর ইঞ্জিনিয়ার মোঃ শাহেদ আলী, জেলা বিএনপির আহবায়ক এডভোকেট ফয়জুল করিম ময়ূন, খেলাফত মজলিসের জেলা সভাপতি মাওলানা ফখরুল ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, হবিগঞ্জ জেলা আমীর হাজী মাওলানা মোখলেসুর রহমান, সুনামগঞ্জ জেলা আমীর মাওলানা তোফায়েল আহমদ খান, সিলেট জেলা নায়েবে আমীর হাফেজ মাওলানা আনোয়ার হোসেন খান, জেলা সেক্রেটারী জয়নাল আবেদীন, সিলেট মহানগরী সেক্রেটারি মোঃ শাহজাহান আলী, মৌলভীবাজার জেলা নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুর রহমান, সেক্রেটারি মোঃ ইয়ামির আলী, ঢাকা পল্টন থানা আমির শাহীন আহমদ খান, হবিগঞ্জ জেলা সেক্রেটারি কাজী মহসিন আহমদ, মাওলানা আহমদ বেলাল, আব্দুর রহিম রিপন ও মরহুমের বড় ছেলে দেওয়ান শরীফুজ্জামান চৌধুরী। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোওয়ার।

এর আগে বুধবার (১৮ জুন) সন্ধ্যা ৬.১০ মিনিটে তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে সিলেট ইবনে সিনা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল ৮০ বছর। তিনি ৬ ছেলে ৪ কন্যা সন্তানের জনক। স্ত্রী, সন্তান, নাতী-নাতনী সহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। দেওয়ান সিরাজুল ইসলাম মতলিব দীর্ঘদিন মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের আমীরের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও সিলেট আঞ্চলিক বিভাগের টিম সদস্য ছিলেন। দেওয়ান মতলিব ১৯৯১ সালে মৌলভীবাজার-৩ সংসদীয় আসন থেকে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

তিনি ১৫টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার মধ্যে ইসলামী সংগঠন ও আমরা, সাতান্ন বছর জামায়াতে ইসলামীতে কি দেখলাম, শান্তিপূর্ণ পরিবার, মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব, রাষ্ট্রপ্রধান হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, একটুখানি মিষ্টি হাসি ও ইসলামী আন্দোলন , একটুখানি চোখের পানি ও ইসলামী আন্দোলন, সর্বোত্তম জীবন, কারাগারের স্মৃতি, কাবার পথে ইত্যাদি।

প্রেসবিজ্ঞপ্তি