দীর্ঘদিন পর স্বস্তিতে ঈদ
১০ এপ্রিল ২০২৫ ১৩:১৬
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
বিরানব্বই পার্সেন্ট মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে দীর্ঘদিন মানুষ স্বাধীনভাবে ঈদ করতে পারেনি। পুলিশের গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়েই মাঠে যেতে হতো। ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের জাঁতাকল থেকে আগস্ট বিপ্লবের পর এবারই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, সিলেট থেকে সাতক্ষীরা সব জায়গায়ই মানুষ স্বস্তিতে ঈদ পালন করতে পেরেছে, আলহামদুলিল্লাহ।
আমি নিজেও বহু বছর পর গ্রামের বাড়ি করমজা সাঁথিয়ায় ঈদ করতে ঈদের আগের দিন বাড়ি গেলাম। আরিচা হয়ে নগরবাড়ীর পাশে ফেরি পার হলাম চিন্তামুক্ত অবস্থায়। সাথে ছোট ভাই কর্নেল সাহেব থাকায় ভিআইপি রুমে জায়গা হলো। প্রায় দুই ঘণ্টা নদীর মধ্যে ঘুমিয়ে কাটালাম। মাঝেমধ্যে নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার সুযোগ হলো। এলাকার গণ্যমান্য লোকদের নিয়ে মাহে রমযানের শেষ ইফতার করলাম স্বস্থির সাথে।
গোটা দেশেই সড়ক, রেল ও নদীপথে যানজট ছাড়াই মানুষ নাড়ির টানে যার যার এলাকায় পৌঁছাতে পেরেছে। দীর্ঘ ৯ দিন সরকারি ছুটির কারণে মানুষ আগ থেকেই পরিবারসহ গ্রামে পৌঁছে গেছে। এমনকি ঈদের দিন সকালেও অনেকে বাড়িতে গিয়ে ঈদের মাঠে নামায আদায় করতে পেরেছে। আমি ঈদের দিন বড় দুটি ঈদের মাঠে মতবিনিময় করে নিজের গ্রামের মাঠে বড় জামাতে ঈদের নামায আদায় করে আত্মীয়-স্বজনের বাসায় দেখা করে শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবের কবর জিয়ারতে দলেবলে গেলাম। আমার গ্রামের শহীদ খলিলের বাসায় গেলাম, কবর জিয়ারত করে সাঁথিয়ার প্রায় সব এলাকায় দলেবলে দেখা-সাক্ষাৎ করলাম। দীর্ঘদিন পর আমরা আনন্দ উপভোগ করলাম।
মানুষের উৎসুক্য বক্তব্য, আর যেন আমাদের এই স্বাধীন দেশ স্বৈরাচারীর আবির্ভাব না ঘটে। ১৬ বছরের পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসররা মাঠে-ময়দানে অনুপস্থিত। দল-মত-নির্বিশেষে বেশিরভাগ এলাকায় খোলা মাঠে নামায আদায় করে শুকরিয়া আদায় করেছে। বজ্রশপথ নিয়েছে আগামী দিন হবে স্বৈরাচারমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত সৎ, যোগ্য লোকের শাসন। কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। সবাই ভালো পথে চলব, মন্দ দূরীভূত করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে।
ঈদের মধ্যেও প্রতিবেশী দেশে পতিত সরকারের লোকেরা পাজামা-পাঞ্জাবি পরে দেখানোর চেষ্টা করেছে তারা পরের বাড়িতে অনাহূত অবস্থায় পরাজিত সৈন্যের মতো। দীর্ঘসময় স্বৈরাচারী দেশ চালিয়ে দেশের সকল বিভাগ ও প্রশাসনে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী বসিয়ে দেশটাকে পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত করেছিল। ফলে আগস্ট বিপ্লবের পর এমপি, মন্ত্রী, চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, কমিশনার; এমনকি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ইমাম সাহেবও পালিয়ে গেছে। পালানোর এমন ঘটনা যা সভ্য পৃথিবীর ইতিহাসে আর দেখা যায় না। আমরা এর প্রতিকার চাই। আইনের আওতায় এনে বিচারের মাধ্যমে শাস্তি কার্যকর দেখতে চাই।
বলছিলাম স্বস্তিতে ঈদ উদযাপন। শুধু দেশের মানুষই নিজ ঘরে ফিরে ঈদ করেনি। বিদেশ থেকেও অনেকে দেশে ঈদ করার জন্য এসেছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সাথে সাক্ষাৎ হলো, তিনি ১৬ বছর পর বিদেশ থেকে দেশে এসেছেন ঈদ করার জন্য। মহান আল্লাহ এদের ঈদের সব বরকত ও রহমত দান করুন। দেশটাকে রাহুমুক্ত রাখুন। মুসলিম দেশ হিসেবে গোটা দুনিয়ার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর তাওফিক দান করুন।
এবারের ঈদে সবচেয়ে আকর্ষণ ছিল প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জাতীয় ঈদগাহে ঈদের নামায আদায় করা এবং ঈদের দিন ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময়ে সবার উদ্দেশে হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেয়া। সবেমাত্র ৪ দিনের সফল চীন সফর সেরে ঈদের দিন সরকারি বাসভবন যমুনায় শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় হাস্যোজ্জ্বল বক্তব্যে নজরকাড়া ভঙ্গিমায় সবাইকে আপন করে জড়িয়ে ধরে ইসলামী কালচারের প্রচার ও প্রসার ঘটিয়েছেন। আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের সাথে হাস্যোজ্জ্বল কোলাকুলি দেশের মানুষ উপভোগ করেছে। দেশ ও জাতির জন্য এ এক শুভ লক্ষণ।
গ্রাম-গঞ্জে চায়ের দোকান, রিকশাওয়ালা, ভ্যানওয়ালা, ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবার সাথে মতবিনিময় করার সুযোগ হয়েছে। তারা সবাই বর্তমান সরকারের নেয়া পদক্ষেপ, জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা, চাঁদাবাজি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা জনগণ ভালো চোখে দেখছে। রাজনীতির জন্য রাজনীতি না করে মানুষের জন্য ভালো ও উন্নত দেশ গড়ার সরকারের নেয়া পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দিকগুলো জনগণ ভালো চোখে দেখছে। আর নয় দলবাজি, দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক পরিবেশ। আমরা স্বচ্ছ রাজনীতির পরিবেশ চাই। যে দলেরই হোক, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজ মুক্ত সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে জনগণ অপেক্ষা করছে।
পতিত সরকারের গণহত্যা, শহীদ ও আহতদের সেবা করা, ন্যায়বিচারের মাধ্যমে আগস্ট বিপ্লবের বিরোধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের জন্য মানুষ ড. ইউনূস সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে সঠিক বিচার করা সম্ভব হবে না। দেশ ছোট, সবারই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব টাকার খেলায় বিচার ব্যাহত হতে বাধ্য। তাই এ অরাজনৈতিক সরকার এবং ড. ইউনূসের মতো একজন দেশ ও বিদেশে খ্যাতি অর্জনকারীর পক্ষেই সঠিক ও ন্যায়বিচার করা সম্ভব।
বিএনপির কয়েকজন বড় নেতার ভাব দেখলে মনে হয় আগস্ট বিপ্লবের ২ হাজার শহীদ ও ৩০ হাজার আহত ব্যক্তি তাদেরকে মসনদে বসানোর জন্যই বিপ্লব করেছেন। নির্বাচনের কোনো দাবিই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ছিল না। আমরা সরাসরি এ আন্দোলনে জড়িত ছিলাম। ৫ আগস্ট ছেলেসহ জেলে ছিলাম। তাই সংস্কার হোক, বিচার হোক, তার পরে নির্বাচন হবে। কোনো সন্দেহ নেই।
আমি তো এবার ঈদে দেশ-গ্রাম ঘোরার সুযোগ পেলাম। দেশের মানুষ এলাকার পালানো ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বার, মেয়র, কমিশনার নির্বাচন আগে দেখতে চায়। কারণ ইউএনও সাহেবরা স্থানীয় প্রশাসন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অতিসত্বর ভোটার লিস্ট সংশোধন করে অনতিবিলম্বে স্থানীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। স্থানীয়ভাবে যারা নতুন চাঁদাবাজ তৈরি হচ্ছে, দুর্নীতিবাজ তৈরি হচ্ছে, তারা স্থানীয় নির্বাচন হলে পরিত্যক্ত হবে। ভালো লোক, সৎ লোক নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। সে যে দলের হোক। আমরা দলবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত, চাঁদাবাজদের থেকে দূরে থাকতে চাই।
ইতোমধ্যে পতিত স্বৈরশাসকের অনেকে আমাদের কোনো কোনো দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করছে। টাকার লোভে আমাদের কিছু লোক তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। কোনো কোনো জায়গায় ঈদের কথা বলে এলাকায় বিশৃঙ্খলা করার পাঁয়তারা করছে। অনেক জায়গায় বিক্ষোভের মুখে পড়েছে। আমরা এর বিচার চাই। যারাই পতিত স্বৈরশাসকদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে, তাদেরই সমাজচ্যুত করতে হবে। তারা যে দলের থেকেই হোক।
এবারের ঈদে জামায়াতে ইসলামী-ছাত্রশিবিরসহ ইসলামী দলগুলো স্থানীয়ভাবে ইফতার পার্টি করে, ঈদ পুনর্মিলনী করে জনগণকে দালালমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ার শপথ নিয়েছে। জনগণের মধ্যে বিপুল সাড়া পড়েছে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমার কাছে মনে হয়েছে গত ৫৪ বছর পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতার নতুন স্বাদ পেয়েছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লব গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে তুলেছে। দলীয় বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে সৎ লোকের শাসন কায়েমের জন্য ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে।
মানুষ সব দলের শাসন দেখেছে। এবার যোগ্য, সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত লোকের শাসন দেখতে চায়। জামায়াতে ইসলামী-ছাত্রশিবিরসহ ইসলামী দলগুলো মাঠে-ময়দানে তাদের সৎ লোক নিয়ে জনগণের সামনে ঈদের মধ্যে হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করেছে। দেশে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিগ্রস্ত লোক ছাড়াও ভালো লোক সমাজে আছে। সব দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের পরিহার করতে হবে। আমরা ভালো লোকের শাসন চাই, মন্দ লোক প্রত্যাখ্যান করতে চাই।
প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের যোগ্য নেতৃত্বে দেশ ও বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা এই ৮ মাসে অনেক উন্নতি হয়েছে। সাম্প্রতিক চীন সফর, ব্যাংকক সফরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। পতিত স্বৈরাচারের দোসররা যতই হুমকি-ধমকি দিক না কেন, তারা ও তাদের প্রভুদের আর বাংলাদেশে খাওয়া নেই। মহান আল্লাহ ৫ আগস্ট বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। ভবিষ্যতেও বাংলাদেশকে হেফাজত করবেন, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।