জাপানের নাগোয়া শহরে বিশাল নাগরিক সংবর্ধনাকালে বিরোধীদলীয় নেতা

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হবেই


৭ মে ২০২৬ ০৯:২৩

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হবেই হবে, ইনশাআল্লাহ। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই, যেখানে গণভোট ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশেও গণভোট ব্যর্থ হবে না। দেশের প্রায় ৭০% মানুষ গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়ে নিজেদের রায় জানিয়ে দিয়েছেন। এখন গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করা মানে দেশের প্রতিটি নাগরিককে অপমান করা। বিরোধীদল হিসেবে সংসদে এবং সংসদের বাইরে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সকল প্রকার আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন বলে উপস্থিত সকলকে আশ্বস্ত করেন। এ সময় ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানে অনুষ্ঠানের হল মুখরিত হয়ে ওঠে। জাপানের বৃহত্তর নাগোয়া শহরে তাকে দেয়া এক বিশাল নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি এসব কথা বলেন।
গত ৫ মে মঙ্গলবার জাপানের ‘সিবুকাওয়া ওয়েলফেয়ার সেন্টারে’ বাংলাদেশ কমিউনিটির পক্ষ থেকে ইসলামিক মিশন জাপান নাগোয়া শাখার তত্ত্বাবধানে এই নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। ইসলামিক মিশন জাপানের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ড. মাজেদুল ইসলামের সঞ্চালনায় প্রোগ্রাম উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র আল-কুরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়।
নাগোয়া শহরসহ বৃহত্তর আইচি প্রিফেকচারে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পেশাজীবীসহ বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক বিশাল জনসমাবেশে পরিণত হয়। আয়োজক ইসলামিক মিশন জাপান নাগোয়া শাখার পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা দিয়ে আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানসহ উপস্থিত অতিথিদের বরণ করে নেওয়া হয়।
ডা. শফিকুর রহমান এমপি সর্বপ্রথম উপস্থিত প্রবাসীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, বিগত সময়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ৫ জনসহ বিএনপির আরও একজন নেতা তাদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। সুযোগ থাকার পরও তাঁরা অন্যায়ের পক্ষে বা ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করেননি। উপস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে সংবর্ধনা দিয়ে আসলে বাংলাদেশকেই সম্মানিত করেছেন। প্রবাসে থেকেও আপনারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন। গত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীরা রেমিট্যান্স শাটডাউনসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আবার ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। এজন্য আমি আপনাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে কারাবন্দী ৩৯ জন প্রবাসী ভাইয়ের মুক্তির বিষয়ে তিনি প্রবাসী মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করার অঙ্গীকার করেন। একইসঙ্গে প্রবাসীদের অন্যান্য দাবি-দাওয়া নিয়েও কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন।
জাপানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, জাপান বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। জাপানের আদলে একটি নৈতিক, শিক্ষিত এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রগামী রাষ্ট্র গড়তে তিনি কাজ করে যাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শুধু জাপান নয়, বিশ্বের সকল বন্ধু রাষ্ট্রের সাথে একযোগে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিতে তিনি তার কাজ অব্যাহত রাখবেন। তিনি দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ একদিন একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে, যেদিন দেশে কোনো গুম, খুন থাকবে না, থাকবে না দারিদ্র্য কিংবা দুর্নীতি। এজন্য তিনি তরুণ সমাজকে কাজ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজি এবং বাজার সিন্ডিকেটের কারণে পণ্যের দাম অনেক বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, জাতির এই দুর্ভোগ কমাতে সরকারকে সকল প্রকার চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে। সকল চাঁদাবাজের শেকড় উপড়ে ফেলার অঙ্গীকার করেন তিনি।
উপস্থিত সকলকে দীনি শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে অবহিত করে তিনি বলেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা এবং আল্লাহর দীন মেনে চলা অপরিহার্য। একটি সমাজে যতদিন আল্লাহর ভয় প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন দেশের গুম, খুন ও দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব হবে না।
সর্বশেষ তিনি সকলকে দেশের জন্য দোয়া করতে বলেন এবং বিরোধীদলের যেকোনো ভুল নির্দ্বিধায় ধরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কোনো ভুল হলে জানালে তিনি নিজেদের সংশোধন করে নেবেন। একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য বিরোধীদল হিসেবে যা যা করা দরকার, তার সবকিছুই তিনি করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। বক্তব্য শেষে তিনি উপস্থিত সকলকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিসে আমন্ত্রণ জানান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি এবং বিরোধীদলীয় নেতার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এমপি।
সাইফুল আলম খান মিলন এমপি বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী তাদের শীর্ষ ১১ জন নেতাকে হারিয়েছে। জাতিসংঘের রেফারেন্স উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। এত মানুষের ত্যাগের পরও এখনো গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি বলেন, যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হয়, তাহলে জনগণ কখনো আমাদের ক্ষমা করবেন না। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর বিগত ফ্যাসিবাদের সময়কার নির্যাতনের কথা উল্লেখ করে বলেন, ভবিষ্যতে যাতে অন্য কোনো ফ্যাসিবাদের উত্থান না হয়, সেজন্য গণভোটের রায় বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান এমপি বলেন, ৭০% জনগণ যে গণভোটের রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতেই হবে। তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, প্রয়োজনে জান দেবেন, কিন্তু শহীদ ওসমান হাদীসহ হাজারো শহীদের জুলাইকে বৃথা যেতে দেবেন না। গণভোটের একটি দাঁড়ি-কমাও ছাড় দেওয়া হবে না। ক্ষমতাসীনরা যদি জুলাইয়ের সাথে গাদ্দারি করে, তাহলে তাদেরও রাজপথে মোকাবিলা করা হবে। তিনি ঘোষণা করেন, হয় জন্মভূমি, নয়তো মৃত্যু। জুলাইয়ের মতো আবারও সকল প্রবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
নাগরিক সংবর্ধনার পাশাপাশি ইসলামিক মিশন জাপানের উদ্যোগে একটি পিঠা উৎসবের আয়োজন করা হয়, যেখানে সব শ্রেণি-পেশার প্রবাসীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। এছাড়া উপস্থিত শিশুদের জন্য ছিল ইসলামিক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পুরো অনুষ্ঠানটি ইসলামিক মিশন জাপান নাগোয়া শাখার তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়। সর্বশেষ ইসলামিক মিশন জাপানের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ মাওলানা সাবের আহমদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। তিনি নাগোয়াবাসীকে সুন্দর এই আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য ইসলামিক মিশন জাপানের সহায়তা সবসময় অবারিত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। প্রেস বিজ্ঞপ্তি।