কর্মক্ষম বেকারত্ব কমছে না
১৩ জুন ২০২৫ ০৭:৪৪
কর্মমুখী ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার অভাব
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
দেশের শিক্ষিত লোক বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে বেকারের সংখ্যা। শিক্ষিত লোকদের মধ্যেই বরং বেকারের সংখ্যা বেশি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হলেও বেকার থাকছেন অনেকে। বিএ ও এমএ পাশ করেও বেকার বসে আছেন অনেকে। অথচ বিশ্বে এমন অনেক দেশ রয়েছে তারা কাজ করানোর লোক পায় না, বিদেশ থেকে শ্রমিক আনতে হচ্ছে তাদের। পৃথিবীর উন্নত কিছু দেশেও বেকারত্ব রয়েছে, তবে তা অবশ্যই সহনীয় পর্যায়ে। কিন্তু বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার। ফলে কাগজে কলমে দারিদ্র্যহার কম দেখানো হলেও কোটি কোটি মানুষ বাস করছে দারিদ্র্যসীমার নিচে। গত ১৮ মে ২০২৫ শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সেই জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ৭ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার। এর মধ্যে যুব শ্রমশক্তি ২ কোটি ২৬ লাখ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মোট বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৬ লাখ ২০ হাজার। যা সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ কারো কাছেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে যে জরিপ করা হয় তাতে প্রকৃত চিত্র উঠে আসছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রায় ৫৪ বছর আগে দেশ স্বাধীন হলেও কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান না থাকায় বেকারত্ব বেড়েই চলছে। কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান দূরে থাক জীবন চালিয়ে নেওয়ার মতো কর্মসংস্থান না হওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা যুবকরাই আত্মহত্যার মতো অভিশাপের পথ বেছে নেওয়ার কাণ্ডও ঘটাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজারে বড় ধাক্কা : গত বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমবাজার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগের দেওয়া প্রতিবেদনের আলোকে গত বছরের আগস্টের শুরুতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) একটি প্রতিবেদন করে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখিত তথ্যানুযায়ী গত জুলাইয়ে দেশটিতে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে, যা ২০২১ সালের পর সর্বোচ্চ। জুনে বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। তবে ডাটা ফার্ম ফ্যাক্টসেটের অর্থনীতিবিদদের এক সমীক্ষায় আভাস দেয়া হয়েছিল, নতুন কর্মসংস্থানের সংখ্যা কম হলেও যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ১ শতাংশেই স্থির থাকবে। এর চেয়ে বেশি বাড়লেও তা স্থির থাকবে না বরং কমে আসবে। সেখানে নতুন নতুন কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সেখানে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বৃদ্ধিও অব্যাহত রয়েছে। গত জুনের তুলনায় জুলাইয়ে ঘণ্টাপ্রতি মজুরি বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। অবশ্য পূর্বাভাস ছিল দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় জুলাইয়ে মজুরি বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। যদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ টার্গেটের চাইতে দশমিক ১ শতাংশ কম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ২ লাখ ২২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রতি মাসে গড়ে কর্মসংস্থান হয় ২ লাখ ৫১ হাজার মানুষের। এর আগের বছর গড় কর্মসংস্থানের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৭৭ হাজার। আর ২০২১ সালে কোভিড লকডাউনের পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরুর বছর প্রতি মাসে কর্মসংস্থান হয় রেকর্ড ৬ লাখ ৪ হাজার মানুষের।
জাপানে বেকার কমেছে প্রায় ৯ লাখ
জাপানের সরকারি দপ্তরের দেওয়া তথ্যানুযায়ী এএফপি একটি প্রতিবেদন করে। সেই প্রতিদবেদনের আলোকে গত ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) একটি প্রতিবেদন করেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী জাপানের জনসংখ্যা ২০২৪ সালের অক্টোবরে ১২ কোটি ৩ লাখে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ লাখ ৯৮ হাজার জন কমেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশটিতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা ও ভোক্তার সংখ্যা কমছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী নিয়োগে হিমশিম খাচ্ছে। জাপান শ্রমের উৎস হিসেবে বিদেশি তরুণদের দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু দেশটির সরকার কঠোর অভিবাসন নীতি বজায় রেখেছে। শুধু অস্থায়ী ভিত্তিতে বিদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। সরকার সেখানকার তরুণদের জন্য মজুরি বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং শিশু লালন-পালনে সহায়তাও প্রদান করছে। সেখানকার সরকারের ভাষ্য যে, আমরা একটি সমাজ প্রতিষ্ঠায় পদক্ষেপ নেব, যেখানে সন্তান ধারণে ইচ্ছুক প্রত্যেক পরিবারই যাতে তা নিতে পারে এবং মানসিক শান্তিতে তাদের লালন-পালন করতে পারে। জাপানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক দ্য মাইনিচি’র প্রতিবেদন বলছে, জাপানেও বেকারত্বের হার ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেখানে বেকারত্ব পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। চাকরি পাওয়ার অনুপাত ওই বছরের জুন থেকে দশমিক ১ পয়েন্ট কমে ১ দশমিক ২৯ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। অন্য তথ্যানুযায়ী, এ সময়ে কর্মসংস্থানের সুযোগের বিপরীতে আরো বেশিসংখ্যক প্রার্থী চাকরির খোঁজ করেছিল। চাকরির চেয়ে চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেশি ছিল। অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, কর্মসংস্থানে নিয়োজিত কর্মীর সংখ্যা দশমিক ১ শতাংশ কমে ৬ কোটি ৭৪ লাখ ৫০ হাজার হয়েছে। অন্যদিকে বেকারের সংখ্যা ৬ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৮ লাখ ৪০ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে বেড়েছে সোয়া ১৬ লাখ
বাংলাদেশে বেকারের সঠিক পরিসংখ্যান নেই। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ করে থাকে। গত ১৮ মে প্রকাশিত বিবিএস এর শ্রমশক্তি জরিপ প্রতিবেদন বলছে, দেশে মোট বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজার। ২০২৩ সাল শেষে দেশে মোট বেকার মানুষের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার। প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, দেশে পুরুষ বেকার ১৮ লাখ এবং নারী বেকার ৮ লাখ ২০ হাজার। দেশে বেকারের হার বেড়ে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বেকার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ। বিবিএসের জরিপে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে ৭ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজার হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার। আর যুব শ্রমশক্তি ২ কোটি ২৬ লাখ যা ২০২৩ সালে ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নিয়ম অনুসারে, বেকার জনগোষ্ঠী মূলত তারাই যারা গত সাত দিনের মধ্যে মজুরির বিনিময়ে এক ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পায়নি এবং গত এক মাস ধরে কাজ খুঁজলেও মজুরির বিনিময়ে কোনো কাজ পায়নি। বিবিএস এ নিয়ম অনুসারেই বেকারের হিসাব দিয়ে থাকে। সরকারি সংস্থার এ পরিসংখ্যান অবশ্য সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করে না।
বেকারের পুরো পরিসংখ্যান নেই
দেশের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা জানানো সম্ভব নয়। কারণ সরকারের কাছে সেভাবে হিসাব নেই বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছেও সঠিক পরিসংখ্যান নেই। বেসরকারি সংস্থাগুলো অনেকটা সরকারের সঙ্গে মিল রেখে তথ্যভাণ্ডার সাজায়। আর তারা পুরো পরিসংখ্যান তৈরি করার মতো সামর্থ্য থাকলেও এ কাজে প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ দিতে চায় না। ফলে সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া অনেকটাই কঠিন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা এক কোটির বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ২৭ লাখ বেকার, তা কেউ মানবেন না; কিন্তু বেকারের সংজ্ঞার মারপ্যাঁচে এটাই সত্য। অর্থাৎ এটাকেই সত্যি বলে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাদের মতে, প্রতিবছর কমপক্ষে ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তাদের এক-তৃতীয়াংশ বিদেশে কর্মরত। বাকি ১৪-১৫ লাখ দেশে থাকেন। যেকোনো দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে ধরা হয় ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সীদের। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, নতুন কর্মসংস্থান বেড়েছে তার তুলনায় একেবারেই সামান্য। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংকের এক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ হারে। যদিও একই সময়ে কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধি হয়েছে দশমিক ২ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মক্ষম হয়ে উঠলেও তাদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করা যায়নি। এমনকি বিভিন্ন খাতের সবচেয়ে উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান বা ফ্রন্টিয়ার ফার্মগুলোও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক নানা দুর্বিপাকে চাকরি হারিয়েছেন অনেকে। এতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ও নতুন কর্মসংস্থানের গড় প্রবৃদ্ধিকেও ছাড়িয়ে গেছে কর্মহীনতা বৃদ্ধির গড় হার।
বিশ্বব্যাংকের ভাষ্যমতে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রকৃত জিডিপির গড় প্রবৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে (৬ দশমিক ৪ শতাংশ) বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে বেশি। এমনকি দারিদ্র্যের হার নব্বইয়ের দশকের ৩০ শতাংশের বেশি হার থেকে কমিয়ে এনে ২০২২ সালে ৫ শতাংশ দেখানো হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান কাজে লাগিয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশকে অনুন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিয়ে আসা হচ্ছে। কিন্তু এসব পরিসংখ্যানের প্রতিফলন দেশে নতুন কর্মসৃজনের তথ্যে দেখা যাচ্ছে না। ব্রেটন উডস সংস্থাটির গত মাসে প্রকাশিত ‘ফ্রন্টিয়ার ফার্মস অ্যান্ড জব ক্রিয়েশন ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন পর্যালোচনা উঠে আসে। প্রতিবেদনের ভাষ্যমতে, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার বেড়েছে গড়ে দেড় শতাংশ করে। যদিও নতুন কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল মাত্র দশমিক ২ শতাংশ।
বিগত বছরগুলো দেশে তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সংকুচিত হয়েছে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ। ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হারে। এতে দেশে তরুণ বেকারত্বের হার ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে পৌঁছেছে ১৬ শতাংশে।
বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) একেএম ফাহিম মাসরুর এর ভাষ্য, ‘স্বাভাবিকভাবে বছরে নতুন যে ২৪-২৫ (কারো কারো মতে ২০ থেকে ২২ লাখ) লাখ শ্রমশক্তি বাজারে আসে, তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট; বিশেষ করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বিভিন্ন কলেজ থেকে পাস করা। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেকারত্ব খুবই বেশি। কারণ তারা গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর কৃষি, কারখানাসহ নিম্ন আয়ের কাজ করতে চায় না। আগে মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট ছিল; এখন তা ১০ শতাংশ। গ্র্যাজুয়েশন করে তারা অন্যান্য কাজে আগ্রহী হচ্ছে না। আমাদের কৃষি ও শিল্প কারখানায় গ্র্যাজুয়েটের চাহিদার চেয়ে নন-গ্র্যাজুয়েটদের চাহিদা বেশি। ফলে এখানে পেশা নির্বাচনে সামাজিক অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসছে, যা তরুণ ও সামগ্রিক বেকারত্বের একটা বড় কারণ।’
বেকারদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর
পরিসংখ্যান ও কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলাদেশে বিশালসংখ্যক বেকার আছেন। এ সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। যেকোনো দেশে এ বয়সের তরুণ-তরুণীরা হয় পড়াশোনায় থাকার কথা, নতুবা কাজের মধ্যে থাকার কথা। কিংবা প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা; কিন্তু তারা এ তিনটির কোনোটিই করছেন না, তাহলে তারা কী করেন? তারা মূলত ‘ছদ্মবেকার’ নামেই পরিচিতি। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এমন নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী আছেন ৯৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। ১০ বছর ধরে এমন ছদ্মবেকার বা নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণীর সংখ্যা এক কোটির মতো রয়েছে। এর মানে, দেশে ২৭ লাখ বেকার আছেন। এর সঙ্গে ছদ্মবেকার এক কোটি যুক্ত হলে দেশের প্রায় সোয়া এক কোটি মানুষকে বেকার বলা যায়।
বেকারত্ব দূরীকরণে কাজ করা বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক উন্নয়ন সংস্থা ‘পাথওয়ে’ এর নির্বাহী পরিচালক মো. শাহীন জানান, আমাদের কাছে প্রকৃত বেকারের কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং বেকারত্ব কমাতে কাজ করি। তিনি বলেন, আমাদের ডিগ্রিধারী বাড়ছে কিন্তু মেধাবী ডিগ্রিধারী বাড়ছে না। মেধাবীরা অনেক ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত কর্ম পাচ্ছেন না ঠিকই, কিন্তু তারা বেকারও থাকছেন না। কোনো না কোনো কর্মে নিয়োজিত হয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, বেশি মেধাবীরা বিদেশে কর্মসংস্থান খুঁজে নিচ্ছেন, ফলে তারা দেশের জন্য খুব একটা কিছু করতে পারছেন না। যারা বিদেশে স্থায়ী বসবাস করছেন তারা খুব একটা রেমিট্যান্সও পাঠাচ্ছেন না। তার মতে, নতুন নতুন শিল্প কলকারখানা স্থাপনসহ নানাখাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না হলে বেকারত্ব কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
তরুণ রাজনীতিক, ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির মনে করেন, বর্তমান প্রজন্মকে কারিগরি শিক্ষা দিতে হবে, কেননা কারিগরি শিক্ষা হচ্ছে কর্মমুখী শিক্ষা। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত শিক্ষা বাড়াতে হবে যাতে তারা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সক্রিয় অংশীদার হতে পারেন।
কেন না এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুরোনো পদ্ধতি, জ্ঞান ও অনমনীয় মানসিকতা আজকের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারবে না। পুরোনো প্রজন্মের নীতিনির্ধারকেরা এক পরীক্ষার মুখে পড়েছেন। তা হলো নতুন প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এ প্রযুক্তি এখন ব্যাবসা ও সেবার গতি-প্রকৃতিকে রূপান্তরিত করছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব হচ্ছে, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যাবসা, সেবাসহ সামগ্রিক মানবজীবনকে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করেছে। প্রচলিত প্রথাগুলো সে অনুযায়ী পুনর্গঠন হচ্ছে। এ প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগে ডিজিটাল, ফিজিক্যাল ও জৈবিক ব্যবস্থা একত্র হচ্ছে। আগের শিল্পবিপ্লবগুলোতে বাষ্পশক্তি, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল কম্পিউটিংয়ের মতো বিশেষ কিছু উদ্ভাবন প্রধান চালিকা শক্তি ছিল। আর চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বিভিন্ন উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোর সমন্বয়ে ফিজিক্যাল ও ডিজিটাল জগতের মধ্যে সীমানা মুছে দিয়েছে। এ চতুর্থ বিপ্লব নির্মিত হচ্ছে ডিজিটাল বিপ্লব বা তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের ওপর ভিত্তি করে। এটি আন্তসংযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়তার নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে। নতুন প্রজন্মকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে বেকারত্ব কমবে না।
যেভাবে দূর হতে পারে বেকারত্ব
কিছু কাজ আছে যেগুলোতে দক্ষতা বিকাশের প্রয়োজন হয় না ও দ্রুত টাকা আয় করা যায় সেগুলোকে আমরা আনস্কিলফুল জব বলি। বসে না থেকে যুক্ত হয়ে যেতে হবে এমন কাজে। যেমন, দেশে বড় শহরগুলোতে খাবার ডেলিভারি, রাইড শেয়ারিং, ওয়েটার, কার ওয়াশ, সেলসম্যান, ক্লিনিং ইত্যাদি কাজে স্কিল বা দক্ষতা লাগে না। আবার স্কিলফুল জবও রয়েছে। যেমন- কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিকস ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডিজাইন, এফিলিয়েট মার্কেটিং, মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ড্রপ শিপিং ইত্যাদি। দক্ষতা অর্জন করে এসবে ঢুকে যেতে হবে, বসে থাকার চেয়ে এটা উত্তম, এতে মোটামুটি ভালো টাকা আয় করা যাবে। চাইলে সেলভ ইনফ্লোয়েডও হওয়া যাবে। সেলভ ইনফ্লোয়েড হলো নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করা। সেলভ ইনফ্লোয়েড ব্যক্তিরা সাধারণত নিয়োগকর্তার দ্বারা কাজ প্রদান করার পরিবর্তে নিজে নিজে নিজের কর্মসংস্থান গড়ে তুলে। বর্তমানে ফেসবুক ও ইন্টারনেটের কল্যাণে বহু তরুণ-তরুণী নিজের কর্মসংস্থান নিজেই তৈরি করছে। কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ফটোগ্রাফি, অনলাইন ই-কমার্স, এফ কমার্স ব্যবসা, কোর্স বিক্রি করা, ই-বুক বিক্রি করা ইত্যাদি কাজ করে মানুষ নিজেই নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করছে ও সেখানে তারা সফলও হচ্ছে। তাছাড়া চাকরি করার সুযোগ না পেলে ছোট ব্যাবসা শুরু করে দিতে হবে। ছোট ব্যবসায় লাভ বেশি। আশেপাশে তাকালে দেখা যাবে অনেকেই ভাজা বাদাম বিক্রি, বুট ভাজা বিক্রি, ঝালমুড়ি বিক্রি, আইসক্রিম বিক্রি, শনপাপড়ি বিক্রি, ফুসকার দোকান, সবজির দোকান, কাপড়ের দোকান, জুতার দোকান, মুদি দোকান, বেগুনি ও পেঁয়াজুর দোকান দিচ্ছেন। ঝালমুড়ি ও ফুচকার দোকানে যথেষ্ট আয় হয়। একজন ঝালমুড়ি বিক্রেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের, যিনি একটি মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে এ ব্যবসা শুরু করেছিলেন। চার ছেলে মেয়ের সবাই এমএ পাশ করেছে। তারাও ব্যবসায় নিয়োজিত। নিজের পাকা বাড়ি ও শপিংমলে প্রসাধনীর ব্যাবসাও রয়েছে তার। কোনো দ্বিধা না করে অকপটে জানালেন তিনি।