সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ কার্যত আরেকটা ফ্যাসিবাদ: বিরোধীদলীয় নেতা

সোনার বাংলা অনলাইন
১০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২২

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান 

জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেছেন, বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নির্লজ্জভাবে দলীয়করণ করছে, যা কার্যত আরেকটি ফ্যাসিবাদ এবং ‘অলিখিত বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার শামিল। তিনি বলেন, বিগত স্বৈরাচারী শাসনের পতন হলেও তাদের অনুসৃত দমনমূলক নীতিগুলো এখনো বিদ্যমান।

বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগ ও স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিতর্কিত কিছু বিল পাসের প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদ থেকে সাময়িক ওয়াকআউট করে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকের অধিবেশনে এমন কিছু জনবিরোধী বিল উত্থাপন করা হয়েছে যা সুষ্পষ্টভাবে জনগণের অধিকার হরণ করে। আমরা এর প্রতিবাদ জানাতে চাইলে সংসদে আমাদের কথা বলার সুযোগ সীমিত করা হয়। বিরোধীদলীয় সদস্যদের জন্য মাত্র ২ থেকে ৬ মিনিট সময় বরাদ্দ করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা কোনো সময়সীমা ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন। স্পিকারের এই ধরনের ভারসাম্যহীন আচরণ সংসদীয় রীতির পরিপন্থী এবং এটি বিরোধী দলের কণ্ঠরোধের চেষ্টা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, আমরা বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন দেখতে চাই। কিন্তু সরকার এমন সব বিল পাস করছে যার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের হাতের মুঠোয় চলে যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচার বিভাগ নিয়ে যে নিরপেক্ষ অধ্যাদেশ ছিল, বর্তমান সরকার তা বাতিল করে পুরনো ব্যবস্থায় ফিরে গেছে। এর মাধ্যমে তারা প্রমাণ করল—হাসিনা খারাপ হলেও হাসিনার নীতি তাদের কাছে ভালো। এটি বিচার বিভাগের ওপর নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ এবং এর ফলে অতীতে যেভাবে বিচারপতি খায়রুল হক বা মানিকের মতো দলীয় বিচারপতিদের জন্ম হয়েছে, ভবিষ্যতেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

স্থানীয় সরকারের জেলা পরিষদ, উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা সম্পর্কিত বিলগুলোর কড়া সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে বেপরোয়াভাবে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিএনপি তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে পরিষ্কার বলেছিল যে বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া প্রশাসক বসানো যাবে না। কিন্তু সরকার কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে দলীয়করণ সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।

এদিন অনুষ্ঠিত শেরপুর ও বগুড়া উপ-নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ৯৪ সালে মাগুরায় যে কলঙ্কিত নির্বাচন হয়েছিল, আজ বগুড়া ও শেরপুরে একই ধরনের ‘স্টাইল’ দেখা গেছে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় তা আবারও প্রমাণিত হলো। শেরপুর-৩ আসনে আমাদের একজন কর্মীকে হত্যার পর আজ আরেকজন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই খুনিদের বিচার দাবি করছি। ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা সংসদ বর্জন করিনি। আমরা সংসদে যাবো এবং জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলবো। তবে যদি জনস্বার্থবিরোধী কোনো আইন পাস হয়, তবে আমাদের কণ্ঠ আবারো গর্জন করে উঠবে। জনগণ এর আগে ফ্যাসিবাদকে রুখে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে কেউ যদি নতুন করে ফ্যাসিবাদ বা বাকশাল কায়েম করতে চায়, তবে ইনশাআল্লাহ জনগণকে সাথে নিয়ে আবারো তা রুখে দেওয়া হবে।

এসময় বিরোধী দলীয় চিফ হুইফ নাহিদ ইসলাম বলেন, সেই অধ্যাদেশগুলো নিয়ে মূলত সেগুলোকে বিল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং আইনে পরিণত করা হচ্ছে। যে একটি বিশেষ কমিটির মাধ্যমে একটা প্রাথমিক যাচাই-বাছাই হয়েছিল এই অধ্যাদেশগুলোর, যেখানে ৯৮টি অধ্যাদেশে সরকার দল এবং বিরোধী দল ঐক্যমত পোষণ করেছে। এবং সরকার দলের পক্ষ থেকে এর কিছু অধ্যাদেশকে তারা অধিকতর সংশোধনের জন্য বলেছে এবং কিছু অধ্যাদেশকে তারা রহিতকরণ এবং হেফাজতে নিয়েছে। এবং এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ ছিল—যে রকম গুম প্রতিকার প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য বিচার বিভাগ সচিবালয় অধ্যাদেশ, মানবাধিকার অধ্যাদেশ ইত্যাদি। স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অনেকগুলো অধ্যাদেশ ছিল। তিনি বলেন, আজকে এর কয়েকটি অধ্যাদেশ যেগুলো নিয়ে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল, সেই অধ্যাদেশগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল। উপস্থাপন করার পরবর্তীতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আমরা সেখানে আমাদের সুষ্পষ্ট বক্তব্য বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা সেখানে পেশ করেন এবং তার সুষ্পষ্ট কোনো জবাব সরকারের যারা দায়িত্বশীল, যারা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ছিলেন, তাদের থেকে আমরা পাইনি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আজকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার বিষয়ক অধ্যাদেশ এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য আমাদের এত লড়াই-সংগ্রাম, সেই স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং বিচার বিভাগের স্বতন্ত্র সচিবালয়ের যে অধ্যাদেশটি ছিল, সেই অধ্যাদেশগুলো কিন্তু তারা বাতিল করে দিচ্ছে। এছাড়াও স্থানীয় সরকার সম্পর্কিত অনেকগুলো অধ্যাদেশ, যেটার মাধ্যমে সংবিধানবিরোধী অবস্থান তারা নিচ্ছে। যারা নিজেরাই এত সংবিধানের কথা বলে, প্রশাসক নিয়োগ করে দলীয়করণ করে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানটি যদি না দাঁড়ায়, সেই ব্যবস্থার জন্য তারা কিছু অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করেছে বিরোধী দলের যৌক্তিক আপত্তি সত্ত্বেও। এবং একটা পর্যায়ে মাননীয় বিরোধী দলের নেতার নেতৃত্বে আমরা আজকে একটি সাময়িক ওয়াকআউটও করতে বাধ্য হয়েছি। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামী ও বিরোধী জোটের শীর্ষস্থানীয় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তারা একযোগে সরকারের এই ‘গণবিরোধী’ অবস্থানের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

ডা. শফিকুর রহমান বিরোধীদলীয় নেতা

সম্পর্কিত খবর