বিদ্রোহী কবি নজরুল সবসময় শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন
২৫ মে ২০২৬ ২০:০৭
রফিকুল আলম রঞ্জু, পাবনা
বাংলা সাহিত্য ও সংগীতাঙ্গনের অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, বিদ্রোহ ও মানবতার প্রতীক জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মদিনে উপলক্ষে পাবনায় আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনু৭ষ্ঠানের আয়োজন করেছে পাবনা সাংস্কৃতিক সংসদ।
সোমবার (২৫ মে) বিকেলে শহরের একটি স্থানীয় মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পাবনা সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি মো: আমান উল্লাহ।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আব্দুল গাফফার খান।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক শফিকুর রহমান, সাংবাদিক, গবেষক ড. ইদ্রিস আলম। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট গবেষক সোহেল রানা, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, শিল্পী আবু সালেক, সুলতান মাহমুদ সবুজ প্রমুখ।
নজরুলের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা, কবিতা পাঠ, নজরুল সংগীত এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা জাতীয় কবির সাহিত্য, সংগীত, সাংবাদিকতা ও সমাজচিন্তা নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আব্দুল গাফফার খান বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন কেবল একজন কবি নন, তিনি ছিলেন যুগজাগরণের অগ্রদূত। তার সাহিত্য মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে। তিনি সাম্য, মানবতা, স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে আজীবন কলম ধরেছেন। বর্তমান সমাজে তার আদর্শ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, নজরুলের সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে তরুণ সমাজ দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হতে পারে। আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নজরুলচর্চা যত বৃদ্ধি পাবে, সমাজে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চেতনার বিকাশ তত বেশি হবে।
বিশেষ অতিথি ,শফিকুর রহমান বলেন, “বিদ্রোহী কবি নজরুল সবসময় শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির কথা বলেছেন, সাম্যের কথা বলেছেন, মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। তার রচিত গান, কবিতা ও প্রবন্ধ আজও মানুষকে আন্দোলিত করে।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে সমাজে যে বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে, তা থেকে উত্তরণে নজরুলের আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন প্রজন্মকে মোবাইল ও প্রযুক্তিনির্ভরতার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে।
ডক্টর ইদ্রিস আলম বলেন, নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে সাহসী কণ্ঠগুলোর একটি। তিনি অন্যায়ের কাছে কখনো মাথানত করেননি। তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আজও বঞ্চিত মানুষের সাহসের প্রতীক। তিনি কেবল মুসলিম জাগরণের কবি নন, তিনি ছিলেন সমগ্র মানবজাতির কবি।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় কবির সাহিত্যকে শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। তার দর্শন, চেতনা ও মানবিক আদর্শ সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। তাহলেই একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সংস্কৃতিমনা সমাজ গঠন সম্ভব হবে।
সভাপতির বক্তব্যে আমান উল্লাহ বলেন, পাবনা সাংস্কৃতিক সংসদ দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে কাজ করছে। জাতীয় কবির জন্মজয়ন্তী পালন আমাদের জন্য গৌরবের বিষয়। নজরুলের চেতনা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এ আয়োজন।
তিনি বলেন, নজরুল ছিলেন গণমানুষের কবি। তার সাহিত্য ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগ্রত করেছে। আজকের প্রজন্মকে সুস্থ সংস্কৃতি ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে নজরুলচর্চার বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আব্দুল আলিম।
তিনি অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পর্বে নজরুলের সাহিত্যকর্ম, সাংবাদিকতা ও সংগীতজীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জাতীয় কবির সাহিত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সমাজে ন্যায়, সাম্য ও মানবতার প্রতিষ্ঠায় নজরুলের দর্শন আমাদের পথ দেখায়।
আলোচনা শেষে শিল্পীরা পরিবেশন করেন নজরুল সংগীত। পাশাপাশি আবৃত্তি করা হয় জাতীয় কবির বিভিন্ন কবিতা। উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় কবির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তার আদর্শ বাস্তবায়নে সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদারের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
২৫ শে মে ২০২৬