শ্রদ্ধেয় জাকী ভাই : স্মৃতির আকাশে এক চিরভাস্বর নক্ষত্র

সোনার বাংলা অনলাইন
১৯ মে ২০২৬ ১৪:৪৪
আবদুর রহমান
নোম্যান্সল্যান্ডে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছি। ২০২২ এ জাকী ভাইয়ের সাথে ইন্ডিয়ায় গিয়েছিলাম। উভয়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজ। সাথে ছিলেন হেরার আলো কালচারাল একাডেমির তৎকালীন সভাপতি আতাউর রহমান। তার কোভিট টিকা সনদ আপডেট না থাকায় এই অপেক্ষা। আমি অনেকের অ্যারাইভাল ফর্ম পূরণ করে দিচ্ছি আর জাকী ভাই গুনগুনিয়ে গান গাইছেন।ইমিগ্রেশন পার হয়ে পেট্রাপোল থেকে ট্যাক্সিযোগে গেলাম বনগাঁ রেলস্টেশন। বনগাঁ থেকে প্রায় দুই ঘন্টা রেল গাড়িতে চড়ে শিয়ালদহ পৌছালাম। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শেয়ার করলেন। বিশাল এক চিন্তার চালক ছিলেন তিনি। রেলে পরিচয় হলো নওগাঁর এক ভদ্রলোকের সাথে। জাকী ভাইয়ের সাথে কথা বললে যেকোন মানুষের মস্তিষ্কে জাদুর মতো আকর্ষণ করে। এক বিশেষ বায়োলজিক্যাল ম্যাচিং কাজ করে। আস্থার অনুভূতি তৈরি হয়। ভদ্রলোক ব্যক্তিগত সহকারী সহ যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। তারাও আমাদের সাথে এক হোটেলে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করলেন। আমি আর আতাউর ভাই হোটেল খুজতে বের হলাম। হোটেল খুজতে অনেক সময় লেগে যায়। জাকী ভাই একদৃষ্টে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্তভাবে বললেন দুজন অসুস্থ মানুষ রেখে এতো সময় পার করলেন। একসাথে কাটানো সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। তিনি ছিলেন ছায়ার মতো। জাকী ভাইয়ের উপস্থিতি আমাকে সর্বদা সাহস যোগাতো।
অবশেষে এক পুরনো হোটেলে উঠলাম। এখানে ব্রিটিশ আমলের সিঁড়ি বেয়ে তিনতলায় উঠতে বেশ বেগ পেতে হলো। আমার ভিসার মেয়াদ কম থাকায় রাতেই জাকী ভাই বললেন মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদনের জন্য। সকালে একসাথে গেলাম ৯, সার্কাস এভিনিউ, লোয়ার রেঞ্জ, কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশন। কর্তারা বললেন এফআরআর অফিসে যোগাযোগ করুন।
কলকাতার রবীন্দ্র সদন মেট্রো স্টেশন এবং এক্সাইড ক্রসিং-এর খুব কাছে ২৩৭, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বোস রোডে অবস্থিত ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে (FRRO) গেলাম ভিসা এক্সটেনশনের জন্য। সেখানে জাকী ভাই হঠাৎ মোশন সিকনেস হয়ে পড়লেন, মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, ক্লান্তি, অবসাদে শরীর ঘেমে দুর্বল হয়ে পড়ে। মাথায় পানি দিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বিশ্রামের পর ধীরে ধীরে শরীরের দুর্বলতা কেটে যায়।
এফআরআর অফিসের বড়বাবু লম্বা প্রসিডিওরের নির্দেশনা দিলেন আর বললেন আপনার এই সময়ের মধ্যে সম্ভব নয়, মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্বেই চলে যাবেন, নতুবা জরিমানা গুনতে হবে।
পরদিন গেলাম ইন্ডিয়ান রেলওয়ের প্রধান রিজার্ভেশন অফিস ফেয়ার্লি প্লেসে। ব্যাঙ্গালুরু যাওয়ার জন্য ৩০-৩২ ঘন্টা জার্নির কথা শুনে আমরা চলে গেলাম কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আসা-যাওয়ার পথে কলেজ স্ট্রিটে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ও সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ইন্ডিয়ান কফি হাউস ও নিউটাউনে অ্যামিটি ইউনিভার্সিটির ঠিক বিপরীতে নিউ কফি হাউজে কিছুটা সময় কাটায়। কলেজ স্ট্রিটের পুরাতন কফি হাউস (পূর্বে অ্যালবার্ট হল) কেবল একটি ক্যাফে নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডার এক জীবন্ত ইতিহাস। ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে বাঙালির এক নস্টালজিয়া অনুভূত হয়। রবীন্দ্র-নজরুল, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন সহ বহু কবি, সাহিত্যিকদের পদচারণায় মুখরিত হয়েছে এই স্থান। কিছু মানুষ চলে গেলেও তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো সারাজীবন ছায়ার মতো সাথে থেকে যায়। এক বছর হয়ে গেলো জাকী ভাই ইন্তেকাল করেছেন। মৃত্যু মানুষকে কেড়ে নেয় ঠিকই, কিন্তু মানুষের রেখে যাওয়া স্মৃতিকে কখনো কেড়ে নিতে পারে না। স্মৃতিই মানুষের অমরত্বের প্রমাণ। ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টার থেকে শুরু করে ইমিগ্রেশন, কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি, একসাথে থাকা, সময় কাটানো নানান স্মৃতি মনের কোণে জমা হয়ে আছে। ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করবো ইনশাআল্লাহ।   ( লেখকের ফেসবুক ওয়াল থেকে)

জাকী ভাই সাহিত্য

সম্পর্কিত খবর