পেইড অ্যাওয়ার্ডে বদলে যাচ্ছে সম্মাননার সংস্কৃতি
১৯ মে ২০২৬ ১৭:৫৯
প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম
১৯ মে ২০২৬
একসময় প্রবাসে সম্মাননা, ক্রেস্ট, অ্যাওয়ার্ড কিংবা গুণীজন সংবর্ধনা ছিল সমাজে অবদান রাখা ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও স্বীকৃতি জানানোর একটি মর্যাদাপূর্ণ মাধ্যম। সমাজসেবক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিককর্মী, ব্যবসায়ী কিংবা মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের অবদানকে মূল্যায়ন করতেই আয়োজন করা হতো এসব অনুষ্ঠান। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সম্মাননার সংস্কৃতির একটি অংশ এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।
বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, আর সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্স-বাংলাদেশ কমিউনিটিতে তথাকথিত ‘পেইড অ্যাওয়ার্ড’ বা অর্থের বিনিময়ে সম্মাননা দেওয়ার অভিযোগ ক্রমেই আলোচনায় আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই চোখে পড়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড, ডায়াসপোরা সম্মাননা কিংবা এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডের রঙিন পোস্টার। জমকালো হলরুম, আলোকসজ্জা, অতিথির তালিকা এবং বিশাল ব্যানারে ভরপুর এসব আয়োজনের আড়ালে কতটা স্বচ্ছতা রয়েছে—সেই প্রশ্ন তুলছেন কমিউনিটির সচেতন ব্যক্তিরা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন অনেক অনুষ্ঠানে যোগ্যতা বা সামাজিক অবদানের চেয়ে অর্থনৈতিক অংশগ্রহণই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। কোথাও স্পন্সর ফি, কোথাও টেবিল চার্জ, কোথাও আবার ডোনেশন কিংবা সদস্য ফি’র বিনিময়ে সম্মাননা নিশ্চিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের কাজ, ত্যাগ কিংবা কমিউনিটির প্রতি অবদানের চেয়ে কে কত অর্থ ব্যয় করলেন, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে মূল বিবেচনায় পরিণত হচ্ছে।
ফ্রান্স-বাংলাদেশ কমিউনিটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা কিছু নামসর্বস্ব সংগঠন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সংগঠনের সারা বছরে দৃশ্যমান কোনো সামাজিক কার্যক্রম না থাকলেও বছরে একবার জমকালো অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান আয়োজনই যেন তাদের প্রধান কাজ। কোনো কোনো সংগঠন শুধুমাত্র একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই সক্রিয় হয়ে ওঠে, অনুষ্ঠান শেষে যাদের কার্যক্রম প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
প্রবাসে ব্যবসায়ীদের বৃহৎ সংগঠন আয়েবা’র মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ ইনু বলেন, এখন অনেকেই সম্মাননাকে সামাজিক পরিচিতি বাড়ানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। আগে মানুষ কাজের স্বীকৃতি পেত, এখন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়—টাকা দিলেই মঞ্চে ওঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের পদক-বাণিজ্য কমিউনিটিকে বিভক্ত করছে। তাঁর মতে, একশ্রেণির সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
ফ্রান্স কমিউনিটির প্রবীণ সদস্য ও ব্যবসায়ী আশরাফুল ইসলাম বলেন, সম্মাননা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু যখন নির্বাচন প্রক্রিয়া অস্পষ্ট থাকে, তখন সেটি আর সম্মানের জায়গায় থাকে না। এতে প্রকৃত গুণীজনদের অবদানও ম্লান হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পদক যিনি নিচ্ছেন এবং যিনি দিচ্ছেন—অনেক সময় কেউই বিষয়টির গভীরতা সত্যিকার অর্থে অনুধাবন করতে পারেন না। তিনি এ ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সম্মাননা নির্বাচনের প্রক্রিয়া নিয়ে। আন্তর্জাতিক মানের কোনো পুরস্কার বা সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণত থাকে নিরপেক্ষ জুরি বোর্ড, মনোনয়ন প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই এবং অবদানের বিস্তারিত মূল্যায়ন। কিন্তু ফ্রান্সের প্রবাসী কমিউনিটির কিছু অনুষ্ঠানে সেই কাঠামোর কোনো দৃশ্যমান উপস্থিতি নেই বলেই অভিযোগ উঠেছে।
বিএনপি নেতা ও ফ্রান্স বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের প্রেসিডেন্ট জুনায়েদ আহমেদ বলেন, কমিউনিটিতে যাদের গ্রহণযোগ্যতা শূন্যের কোঠায়, তারা সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার লক্ষ্যেই পদক-বাণিজ্যের মতো নোংরা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।তিনি এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে সমাজবিরোধী উল্লেখ করে বলেন, এই অসৎ তৎপরতা বন্ধে আমাদের সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে।
কমিউনিটির সচেতন মহলের দাবি, অনেক সময় যারা সম্মাননা পাচ্ছেন, তাদের কী অবদানের জন্য পুরস্কৃত করা হচ্ছে—সেটিরও পরিষ্কার ব্যাখ্যা থাকে না। নেই কোনো লিখিত মূল্যায়ন কিংবা নির্দিষ্ট মানদণ্ড। ফলে পুরো বিষয়টি অনেকের কাছে ‘স্টেজ সোয়াপ’ সংস্কৃতি হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে। অর্থাৎ আয়োজক পক্ষ অর্থ পেয়ে সন্তুষ্ট, আর সম্মাননা গ্রহণকারী ব্যক্তি মঞ্চে উঠে ছবি তুলে সামাজিক মর্যাদার অনুভূতি পাচ্ছেন।
এমন বাস্তবতায় প্রকৃত সমাজকর্মী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা মানবিক কাজে যুক্ত মানুষেরা আড়ালে পড়ে যাচ্ছেন বলেও মনে করছেন অনেকে। কারণ বছরের পর বছর কমিউনিটির জন্য কাজ করা একজন মানুষের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সম্মাননা পাওয়া ব্যক্তিকে একই মঞ্চে দাঁড় করালে প্রকৃত সম্মাননার মূল্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকেই ব্যবহার করছে কিছু বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম। প্রবাসে নিজের পরিচিতি বাড়ানো, ছবি প্রচার করা কিংবা বিশেষ ব্যক্তিদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগি করার আগ্রহ থেকেই অনেকে এসব অনুষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছেন। আর সেই সুযোগকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে এক ধরনের সম্মাননা-বাণিজ্য।
তবে সব আয়োজনকে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না। ফ্রান্সে এখনও অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সংগঠন আন্তরিকভাবে কাজ করছে এবং নীরবে কমিউনিটির উন্নয়নে অবদান রাখছে। কিন্তু কিছু প্রশ্নবিদ্ধ আয়োজন পুরো অঙ্গনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সচেতন মহল বলছে, এখন সময় এসেছে প্রবাসী সমাজের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার। যেকোনো সম্মাননা প্রদানের আগে আয়োজকদের গ্রহণযোগ্যতা, পরিষ্কার নির্বাচন প্রক্রিয়া, জুরি বোর্ড এবং মূল্যায়নের মানদণ্ড প্রকাশ করা জরুরি। একইসঙ্গে প্রবাসীদেরও বুঝতে হবে—সম্মাননা তখনই মর্যাদাপূর্ণ হয়, যখন তা আসে কাজের স্বীকৃতি থেকে, অর্থের বিনিময়ে নয়।
প্রশ্ন এখন একটাই—প্রবাসে বাড়তে থাকা এই অ্যাওয়ার্ড সংস্কৃতি কি সত্যিই গুণী মানুষদের সম্মানিত করছে, নাকি ধীরে ধীরে তৈরি করছে নতুন এক সামাজিক মর্যাদা-বাণিজ্যের বাজার?