গণভোটের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করুন
২২ জুলাই ২০২৬ ১৯:৫৩
দেশের সিংহভাগ মানুষ জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার চায়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ সেই বার্তা দিয়েছে। এটি কোনো অদৃশ্য দেয়ালের লিখন নয়। রীতিমতো গণরায়। জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে পরিণতি কী হয়, তা আশা করি ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তাই ইতিহাসের পাঠ বলছে, জনগণের সার্বভৌম ম্যান্ডেট ও গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। কারণ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ (Constitution Reform Council-CRC) ২০২৫ সালের ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’ এবং ২০২৬ সালের গণভোটের ম্যান্ডেট অনুযায়ী নির্ধারিত করা হয়েছে।
আমরা জানি, গণভোটের মূল প্রস্তাবনা ছিল ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর অনুমোদন ও বাস্তবায়ন। এর অধীনে প্রধান সংস্কার ইস্যুগুলো হলোÑ প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা : একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। সংবিধানে পরিবর্তন এনে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ (সিনেট) বিশিষ্ট দ্বিকক্ষ সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন এবং বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও বিভিন্ন কমিটির সভাপতি নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ। এখানে কোনো ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে কোনো অনুষঙ্গ নেই। তাই দল-মত নির্বিশেষে দেশপ্রেমিক জনগণ এর পক্ষে বিপুল ভোট দিয়েছে। সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের দুজন শীর্ষনেতা, তাদের শরিক দলের সবাই নির্বাচনী প্রচারণার সময়-গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। জনগণ তাদের ওপর আস্থা রেখে তাদের কথা মতো রায় দিয়েছে। অর্থাৎ জনগণ নেতাদের কথা রেখেছেন, এখন নেতাদের দায়িত্ব জনগণকে দেয়া ওয়াদা রক্ষা করা। কিন্তু সরকারি দলের একটি অংশ সংবিধানে গণভোট নেই এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে পানি ঘোলা করছে। অথচ ইতোপূর্বে দেশে গণভোটের নজির আছে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতিও গণভোটের মাধ্যমে তার বৈধতা যাচাই করেছিলেন। জনগণ তার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, এ ইতিহাস সবার জানা। তারপর এমন টালবাহানা রহস্যজনক। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, ফ্যাসিস্ট মনোবৃত্তির পরিচায়ক।
এমন মনে করার কারণ ৭ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ২৩ জন মানুষ ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। শতকরা হিসাবে ৬০.২৬%। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’-সূচক ভোট ৪ কোটি ৮২ লাখ ৬৬০ জন (৬৮.৫৯%)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য (এমপি) হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। জনগণের রায়কে সম্মান করে তাদের উচিত দ্রুত শপথ নেয়া এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর করে এ প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেয়া।
আমরা জানি, সংবিধান একটি রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি এবং জনগণের আকাক্সক্ষার আয়না। ফলে, গণভোটে প্রকাশিত চূড়ান্ত জনমতকে অগ্রাহ্য বা পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ গণতান্ত্রিক রীতিনীতির পরিপন্থী। অথচ বিএনপি ১৭ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করে সেই কাজটিই করছে। প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী গণরায়ের পক্ষে অনড় রয়েছে। জনগণের এই সুস্পষ্ট বার্তাকে আমলে না নিয়ে একতরফা বা বিশেষ সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের যে উদ্যোগ সরকার নিয়েছে তা দেশে রাজনৈতিক আস্থার নতুন সংকট তৈরি করছে। একটি টেকসই, গ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যহীন সংবিধান প্রণয়ন কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠ দলীয় সিদ্ধান্ত বা নির্দিষ্ট কোনো সংসদীয় কমিটির দ্বারা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্য এবং সর্বস্তরের অংশীজনের কার্যকর অংশগ্রহণ।
একটি সুষম সংবিধান পুনর্গঠনে সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল, আইনি বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজ এবং সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। গণভোটের স্পষ্ট রায়কে বাস্তব রূপ দেওয়া সরকারের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রে কেবল রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নয়, বরং সমাজের সর্বস্তরের কণ্ঠস্বরকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে অংশগ্রহণমূলক পরিষদের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হলে দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থায়িত্ব বজায় থাকবে।
রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এই ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তহীনতা বা একপেশে পদক্ষেপ গোটা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে ব্যাহত করতে পারে। দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিয়ে অবিলম্বে গণভোটের রায়ের আলোকেই ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করা উচিত। জনআকাক্সক্ষাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে একটি সর্বজনীন ও গণতান্ত্রিক সংবিধান গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আজ সবার কাম্য।