ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দায়মুক্তি ছাড়া জুলাই শহীদদের ঋণ শোধ হবে না

হারুন ইবনে শাহাদাত
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০০

‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ এবারের নির্বাচনের মতো আগে এতটা আলোচনায় ছিল না। গত বছরের ২ মার্চ নির্বাচন ভবনে জাতীয় ভোটার দিবস উপলক্ষে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সভায় প্রথম প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীন বলেছেন, ‘ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে, ভোট-সন্ত্রাস করে আপাতদৃষ্টে জেতা যায়। কিন্তু আখেরে দেশের জন্য, দলের জন্যও ভালো হয় না। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়ায় এরকম ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়।’ তিনি নির্বাচনে জয়ী হতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ ও ভোট-সন্ত্রাসের চেষ্টা বা উদ্যোগ না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে পড়ছে সেই প্রবাদ, ‘পাগলকে নৌকা দুলাতে (নাড়াতে) না করো না।’ তাকে এ কথা মনে করিয়ে দিলেই, দুলিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দেবে। তার মানে তার এ সতর্কবার্তাই কি শেষে ফলে গেল।
অনিয়ম, কারচুপি, জাল ভোট, কেন্দ্র দখলের কালচার এদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের অনেক পুরনো অনুষঙ্গ। ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক গোলাম আযম প্রবর্তিত কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে দুটি নির্বাচন নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৯১, বিচারপতি লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের নির্বাচনের ইতিহাস উজ্জ্বল। ১৯৭৩ থেকে নিয়ে বাকিগুলো বিভিন্ন বিশেষণে সমালোচিত। যেমন: ১৯৭৩-এর নির্বাচন হেলিকপ্টারে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, এরপর স্বৈরশাসক এরশাদের আমলের কারচুপির নির্বাচন, ২০০৮-এর সেগুনবাগিচায় ব্যালট বাক্স ভরার নির্বাচন, ফ্যাসিস্ট হাসিনার ২০১৪ সালের একতরফা, ২০১৮-তে রাতের ভোট এবং ২০২৪-এ ডামি প্রার্থীর নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছে।
২০২৬-এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগের কলঙ্কে কলঙ্কিত। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল অভিযোগের যথাযথ তদন্তের পর গেজেট প্রকাশ করা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদার সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে বলেন, ‘গেজেট প্রকাশের আগে অভিযোগগুলোর সুরাহা করা উচিত ছিলো। তাদের সেই অধিকার ও ক্ষমতা ছিলো। এখন আদালতে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করতে হবে।’
নির্বাচনের বিভিন্ন পর্যায়ে কারচুপি হয়। ব্যালট বাক্স অথবা পেপার ছিনতাই, জাল ভোট, এজেন্ট বের করে দিয়ে ইচ্ছেমতো ভোট দেয়া গণনায়। উল্লেখিত অপকর্মগুলো করতে নীলনকশা আঁকা হয় আগে থেকেই। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি এবং সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কারণে তাদের নীলনকশা যেন জনগণ জানতে না পারে, তাই পছন্দের প্রার্থী বা দল বিজয়ী করতে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর আশ্রয় নেয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন, মিডিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তি যেমন: মোবাইল, ইন্টারনেট ব্যবহার করে। অপরদিকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বাপর এবং এ প্রতিবেদকের সরেজমিন কেন্দ্র পরিদর্শনে এমন কিছু বিষয় উঠে এসেছে।
সরেজমিন কেন্দ্র পরিদর্শন
ঢাকা মহানগরীর সংসদীয় আসন ৮, ১৩, ১৫ ও ১৭সহ কয়েকটি নির্বাচনী এলাকা সরেজমিন প্রত্যক্ষ করে দেখা গেছে, অভিযুক্ত আসনগুলোয় কেন্দ্র থেকে ৪শ গজ দূরে ভোট দেয়ার পর সাংবাদিক, পর্যবেক্ষক, এজেন্ট, নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছাড়া কারো থাকার কথা না থাকলেও বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা গেটের দুই পাশে লাইন করে দাঁড়িয়ে ভোট প্রার্থনা করে ভোটারদের বিব্রত করেছেন। এলাকায় মাস্তান হিসেবে পরিচিত, যারা ভোটগ্রহণের আগে ভোটারদের হুমকি-ধমকি দিয়েছেন, তারা কেন্দ্রের ভিতর অবস্থান করছেন, কোথাও কোথাও এজেন্ট হিসেবে থেকে বোঝাতে চেয়েছেন, তারা সব প্রত্যক্ষ করছেন, অতএব সাবধান। বুথ করা হয়েছে জানালার পাশে। বিকেলের দিকে সূর্যের আলোয় ভেতরে ভোটারের অবস্থা বাইরে থেকে দেখা গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কেন্দ্রের ভেতর মোবাইল নিতে দেয়া হয়নি, কিন্তু তারা ঠিকই নিয়েছেন। ভোটগণনা সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে বাইরের মনিটরে, রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনের মিডিয়া সেল এবং স্মাট ইলেকশন বিডি অ্যাপে সবাই প্রত্যক্ষ করার ঘোষণা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু ভোটগণনার ফলাফলে রাতে যখন জামায়াতে ইসলামী ১৭ আসনে এবং বিএনপি ১২ দেখা যায়। এরপর থেকেই সরাসরি সম্প্রচার রহস্যজনক কারণে বন্ধ হয়ে যায়। অ্যাপ এখনো সক্রিয় আছে, কিন্তু তাতে প্রার্থীরা কে কত ভোট পেয়েছেন, তা ১৭ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না।
পর্যবেক্ষকদেরও অভিমত, ভোটগ্রহণ তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু হলেও গণনায় ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। ঢাকা-১৩সহ অনেকগুলো আসনে প্রথমে ১১ দলের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণার পর পুনর্গণনার কথা বলে পরে বিএনপির প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কিছু নির্বাচনী এলাকায় সবগুলো কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার আগেই বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এ প্রতিবেদকের কাছে ঘষামাজা করা এবং কেটে লেখা ফলাফল সিটের ফটোকপি আছে। পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনেরও উল্লেখিত অনেকগুলো বিষয় উঠে এসেছে।
পর্যবেক্ষক সংস্থার পর্যবেক্ষণ
ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কথা স্বীকার না করলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাল ভোট পড়া নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর গণমাধ্যমে প্রেরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টিআইবির মাঠপর্যায়ের গবেষণার জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে নমুনাভিত্তিকভাবে নির্বাচিত ৭০টি আসনের মধ্যে ২১.৪ শতাংশ আসনে এক বা একাধিক জাল ভোট প্রদানের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অন্তত চল্লিশ শতাংশ আসনে একাধিক অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসনে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে অনিয়মের চিত্র দেখতে পেয়েছে টিআইবি। অর্থাৎ যে চল্লিশ শতাংশ আসনে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো মোট তিনশত আসনের চল্লিশ শতাংশ নয়, বরং ৭০টি আসনের মধ্যে চল্লিশ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নিলেও ‘ফ্যাক্ট যেটা বলছে যে, এটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে।’
টিআইবির চোখে ৭০ আসনে অনিয়ম
টিআইবি ৭০টি আসনে যেসব অনিয়ম দেখতে পেয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম ঘটেছে ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেয়া। ভোটারদের জোর করে ‘নির্দিষ্ট মার্কায়’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে ৩৫.৭ শতাংশ আসনে। জাল ভোট দেয়া হয়েছে ২১.৪ শতাংশ আসনে। বুথ দখলের ঘটনা ১৪.৩ শতাংশ আসনে। প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া ১৪.৩ শতাংশ। ভোটগ্রহণের আগেই ব্যালটে সিল মারার ঘটনাও একই হারে ঘটেছে অর্থাৎ ১৪.৩ শতাংশ আসনে। রিটার্নিং অফিসারসহ নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতমূলক কার্যক্রম পাওয়া গেছে ১০.৩ শতাংশ আসনে। ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিকদের বাধা প্রদানের ঘটনা ৭.১ শতাংশ আসনে। ভোটগণনায় জালিয়াতির অভিযোগ ৭.১ শতাংশ আসনে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণে টিআইবি বলেছে, ‘শুরুতে তুলনামূলক সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনী কার্যক্রমের পুরনো রাজনৈতিক চর্চা বজায় রেখেছেন।’
১১ দলের দাবি
‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর দায় নির্বাচন কমিশনের বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ১১ দল। ১১ দলের অন্যতম শীর্ষনেতা নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টার বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হওয়া প্রমাণ করে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে। ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ভোট গ্রহণকালীন সময়ে বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করে আমরা অসুস্থ পরিবেশের নানা দিক প্রত্যক্ষ করেছি। ৩২টি আসন চিহ্নিত করেছি, যেখানে অল্প ভোটের ব্যবধানে আমাদের হারানো হয়েছে। এসব আসনে পুনর্গণনার দাবি জানিয়েছি।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে ফলাফল ঘোষণা করায় তাদের কাছে কলঙ্ক মোচনের যে সুযোগ ছিলো, তা হারিয়েছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে বিষয়টি সমাধান করতে হবে। তা না হলে ২০২৪-এর ৩৬ জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের বিনিময়ে লাভ করা ২০২৬-এ এর নির্বাচনের অনিয়ম ও ইঞ্জিনিয়ারিং-এর দায় থেকে ইতিহাস এ নতুন সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে কোনোদিন মুক্তি দেবে না।

হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর