ভুল পথে হাঁটলে বিপদ বাড়বে
১৭ মার্চ ২০২৬ ১০:১৭
॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
‘ভুলে ভুলে মানব জনম গড়া, এক ভুলে হয় কর্ম সারা’, অর্থাৎ ভুল করতে করতে কিছু মানুষ মনে করে ভুলের কোনো প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না। এমন অবজ্ঞা-অবহেলার কারণে শেষে এমন ভুলের ফাঁদে পড়ে, যার জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হয়। চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রথম অধিবেশনে সরকারি দলের ভূমিকা দেখে এমনটা মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তারা ভুলে গেছেন, চলমান সংসদ অতীতের আর ১২টির মতো নয়। এ সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে ‘ডামি-আমি’ বা অন্য কোনো নামে ফ্যাসিস্ট হাসিনার ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য। কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের পক্ষের আবাবিল এদেশের ছাত্র-জনতা বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের ‘ডামি-আমি’ সরকারকে মাত্র সাত মাসে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে প্রায় দুই হাজার তরুণ-তাজা জীবনের বিনিময়ে। ২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির বিশাল দায়িত্ব এসে পড়ে নবগঠিত জাতীয় সংসদের উপর। এ নিয়ে বসেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন।
‘বিজনেস এন্ড পলিট্রিক নো ইথিকস’- ফ্যাসিস্ট রাজনীতির এ মন্ত্র মিথ্যা প্রমাণ করতেই হয়েছে জুলাই বিপ্লব। কিন্তু সরকারি দল হাঁটছে সেই পুরনো পথেই। অথচ জাতি আশা করেছিল, জুলাই সনদের পক্ষে জনগণ রায় দেয়ার কারণে অধিবেশনের যাত্রা শুরু হবে এটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে; যেমন হয়েছিল ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা পুনরায় শুরু হয়েছিল। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দলই এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৫১টি আসন) লাভ করতে পারেনি। ওই নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর প্রাপ্ত আসন ছিলÑ বিএনপি ১৪০টি, আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় জামায়াত বিএনপিকে সরকার গঠনে নিঃশর্ত সমর্থন প্রদান করেছিল। উল্লেখ্য সেই সময়ে আওয়ামী লীগও সরকার গঠনের জন্য জামায়াতের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জামায়াত বিএনপিকেই সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সহযোগিতার মাধ্যমে ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। যা দীর্ঘ সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক ধারা পুনরুদ্ধার করে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী সরকারি ও বিরোধীদল সর্বসম্মতক্রমে পাস করার মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসে।
গত ১২ মার্চ তেমন একটি ঘটনা আবার আশা করেছিল গোটা জাতি। দেশ ও জাতির আশার বাস্তবায়ন ঘটাতে জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও বিরোধীদল বিরোধিতা ভুলে ১৯৯১ সালের মতোই একটি স্মরণীয় ঘটনা ঘটাবে, জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান পরিবর্তন হবে। কিন্তু বড় একটি ভুল দিয়ে শুরু হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। সাধারণ জনগণ এবং রাজনীতি বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে গাদ্দারি বা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে দেখছেন এবং এর পরিণতি দেখার অপেক্ষা করছেন।
এবারের জাতীয় সংসদের বিস্ময়কর এবং ঐতিহাসিক ঘটনা হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধীদল হিসেবে ১১ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই ১১ দল হলো জুলাইযোদ্ধা, নতুন বন্দোবস্তের পক্ষের তারুণ্যের প্রতিনিধি। গোটা জাতি তাকিয়ে আছে তারা কী ভূমিকা রাখছেন জাতীয় সংসদে তা দেখার।
প্রতিবাদ দিয়ে শুরু
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনেই জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও তাদের জোটসঙ্গী ১১ দল জুলাই চেতনার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। জাতি টেলিভিশনের মাধ্যমে দেখেছে, স্পিকারের শূন্য আসন নিয়ে সংসদ অধিবেশন শুরু, প্লাকার্ড দেখিয়ে ১১ দলের রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ এবং ভাষণ শুরুর পরপরই বিরোধীদলীয় এমপিদের ওয়াকআউট। গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের প্রায় ১৯ মাস পর যাত্রা করল বাংলাদেশে নতুন সংসদ। এবার ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে সংসদ অধিবেশন শুরুর প্রক্রিয়া, স্পিকার নির্বাচন এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণে থাকা বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এদিন নিয়ম অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে আহ্বান জানান নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। সে সময় সংসদে দাঁড়িয়ে প্লাকার্ড হাতে বিক্ষোভ শুরু করেন জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সংসদ সদস্যরা।
সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকার বারবার আহ্বান জানালেও প্রতিবাদ চালিয়ে যান বিরোধীদলের এমপিরা। তাদের প্রতিবাদের মধ্যেই নিজের ভাষণ চালিয়ে যান রাষ্ট্রপতি। বক্তব্যের একপর্যায়ে নানা স্লোগান দিয়ে অধিবেশন কক্ষ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা। অবশ্য এমন ঘটনা এবারই প্রথম নয়।
ঘটনা এবারই প্রথম নয়
রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি নবম জাতীয় সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিনে বিএনপি তাদের দলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগ এনে তার ভাষণ বর্জন করে ওয়াকআউট করেছিল। সেদিন শহীদ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাষ্ট্রপতির ভাষণের আগে মাইক ছাড়াই বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সংবিধানের ৫৮ (ঘ) ধারা অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ নির্বাচন করার কথা ছিল। তা না করে রাষ্ট্রপতি সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।’ ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। শপথ না নিয়ে সংসদ বয়কট করে আওয়ামী লীগ। নিজ দলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের ভাষণ শোনেনি আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংসদের বিরোধীদল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট করেছিল। ১৯৯১ সালের পঞ্চম এবং সপ্তম সংসদে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধীদল রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনেছিল। তবে একানব্বইয়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের ভাষণের সময় নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ওয়াকআউট করেছিলেন জাতীয় পার্টির ৩৫ এমপি।
এবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় ওয়াকআউট করে সংসদ থেকে বের হয়ে গেলেও তার ভাষণ চলাকালে এর সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়াতে দেখা গেছে। বিরোধীদলের ওয়াকআউট ছাড়াও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে প্রথম অধিবেশনের শুরুর দিনটি ছিল ঘটনাবহুল।
ঘটনাবহুল প্রথম অধিবেশন
সাধারণত বিদায়ী সংসদের স্পিকার অথবা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এবার এর ব্যতিক্রম হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। আর হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে। এমন পরিস্থিতিতে সংসদ কক্ষে স্পিকারের আসনটি ফাঁকা রেখেই শুরু হয় অধিবেশন। পরে সংসদের সম্মতিতে প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
তার সভাপতিত্বে স্পিকার হিসেবে বিএনপি নেতা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার হিসেবে নির্বাচন করা হয় ভূমি প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে। পরে সংসদের অধিবেশন ৩০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের উপস্থিতিতে স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
প্রথম অধিবেশনের শুরুতে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। এ সময় স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘দলের প্রতিনিধিত্ব করলেও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছি। দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ ও জনগণের স্বার্থের রাজনীতি’।
বিরতির পর স্পিকার হিসেবে নিজের প্রথম অধিবেশনের বক্তব্যে মি. আহমেদ বলেন, ‘রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হবে জাতীয় সংসদ’। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকারকে বলেন, ‘আজ থেকে আপনারা আর কোনো দলের নয়। আপনারা এই সংসদের স্পিকার।’
এরপর বক্তব্য রাখেন বিরোধীদলের প্রধান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। স্পিকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আপনি ইতোমধ্যে বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন আপনি সকলের। আমরা মনে করি, আপনার কাছে সরকারি দল ও বিরোধীদল আলাদা কিছু হবে না’।
তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এর আগে সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে আগে থেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। ভবিষ্যতে যেসব বিষয়ে আলোচনা সম্ভব, সেসব বিষয়ে যেন তাদের সঙ্গে আলাপ করা হয়- এটা তারা আশা করবেন। এদিন সংসদে শোক প্রস্তাবের ওপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস জর্জ মারিও বার্গোগ্লিও এবং ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুতে সংসদে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করা হয়।
সাবেক বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যের মৃত্যুতেও শোক প্রস্তাবে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়। জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের নিয়ে আলোচনার সময় সংসদের শোক প্রস্তাবে ওসমান হাদি, আবরার ফাহাদ ও ফেলানী খাতুনের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আবেদন জানান সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ কেউ যেন সংসদে বক্তব্য দিতে না পারে, সেই আহ্বানও জানান তিনি। এছাড়া প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ শুরু করার জন্য আমন্ত্রণ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। এ সময় জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিসহ বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা এর বিরোধিতা করে প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যান। এসব প্লাকার্ডে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘জুলাই আন্দোলনের সাথে গাদ্দারি জনগণ সইবে না’। তীব্র প্রতিবাদের মুখেই এ সময় স্পিকার সংসদের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আহ্বান জানান সংসদ সদস্যদের। এ সময় প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি।
স্পিকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ দেওয়ার অনুরোধ করলে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা আবারো চিৎকার করতে থাকেন, দাঁড়িয়ে পড়েন।
স্পিকার বারবার রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনার অনুরোধ করেন, একপর্যায়ে ভাষণও শুরু করেন রাষ্ট্রপতি। বিরোধীদলের হট্টগোলের মধ্যেই নিজের বক্তব্য চালিয়ে যান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। একপর্যায়ে সংসদ থেকে বেরিয়ে যান বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা।
সংসদে নিজের বক্তব্যে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের পরিকল্পনা, জুলাই আন্দোলনে সাবেক আ’লীগ সরকারের মানবতাবিরোধী ভূমিকা, স্বাধীনতার ঘোষক, দুর্নীতিসহ নানা বিষয়ে বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে’। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধ ও ৩৬ জুলাইসহ বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নিহত ও আহতদের স্মরণ করেন রাষ্ট্রপতি। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট যখন রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয় তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায় বলেও উল্লেখ করেন সাহাবুদ্দিন।
দ্বিতীয় দিন সংস্কার পরিষদ বিতর্ক
জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন গত ১৫ মার্চ রোববার জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে জাতীয় সংসদে বিতর্ক হয়। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান না করায় জাতীয় সংসদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে তা করেননি। বিরোধীদলীয় নেতাকে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনার প্রস্তাব দেন তিনি। গত ১৫ মার্চ বেলা ১১টায় সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। শুরুতেই অনির্ধারিত আলোচনার জন্য দাঁড়ান জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তখন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে সুযোগ দেওয়া হবে।
প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে ডা. শফিকুর রহমানকে মাইক দেন স্পিকার। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদ স্বাভাবিকভাবে তার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আসেনি। এটি রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এসেছে। এটি জারি করা হয়েছে ১৩ নভেম্বর ২০২৫ সালে। সংসদে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটা পড়ে শোনান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, এই আদেশ অনুযায়ী নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা রয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, ‘কিন্তু এর মধ্যে এই অধিবেশন ডাকা হয়নি। আমার উদ্বেগের বিষয়টি এখানে।’
জুলাই সনদ আদেশের বিভিন্ন ধারা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আদেশে বলা রয়েছে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। কিন্তু এটি গঠন হয়নি।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যে পদ্ধতিতে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে, সেই একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। এবারের সংসদ সদস্যরা দুটি আলাদা ভোটের মাধ্যমে দুটি ‘ক্যাপাসিটিতে’ নির্বাচিত হয়েছেন উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী বিরোধীদলের ৭৭ জন সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এ আদেশ অনুসারে তাঁরা একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতে চান।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি সরকারি দল থেকে বক্তব্য আশা করছেন।
এরপর বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শুরুতে তিনি স্পিকারের কাছে প্রশ্ন রাখেন কোন বিধিতে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফ্লোর দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো মুলতবি প্রস্তাব আনতে হয়, সেটার জন্য বিধি আছে। সেই বিধিতে কোনো নোটিশ তিনি দিয়েছেন কি না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এখন যদি বিরোধীদলের প্রশ্ন অনুসারে রাষ্ট্রপতির জারি করা আদেশটা সাংবিধানিক হয়, সেটা নিয়ে এখানে আলোচনা হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ এইটা এবং গণভোট অধ্যাদেশের নির্দিষ্ট অংশ কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না মর্মে আদালত রুল জারি করেছেন। এখানে হয়তো বিচার বিভাগ মতামত দেবে। কিন্তু তাদের মতামত এই সার্বভৌম সংসদের ওপর কখনো বাইন্ডিং (বাধ্যতামূলক) না।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এখন যদি বলা হয় যে, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে, মানলাম। আমরা নির্বাচিত হয়েছি সাংবিধানিক ভোটে। নির্বাচন কমিশনের দুইটাই এখতিয়ার। একটা হচ্ছে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, আরেকটা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা হচ্ছে কনস্টিটিউশনাল ম্যান্ডেট, যেটা নির্বাচন কমিশন পালন করতে বাধ্য।’
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারপরও গণভোটের রায় যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, সংবিধানে আগে সংস্কার আসতে হবে। তিনি বলেন, এই অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন বিল আনা যাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ ১৩৩টা অধ্যাদেশ এখানে উত্থাপিত হয়েছে প্রথম দিনে। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি কোনো কিছু অস্বীকার করছি না। জনরায়কে সম্মান দিতে হবে, কিন্তু সেটা সাংবিধানিকভাবে দিতে হবে, আইনগতভাবে দিতে হবে। এখানে ইমোশনের কোনো জায়গা নেই। রাষ্ট্র ইমোশন দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে, আইন দিয়ে, কানুন দিয়ে।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের কার্য-উপদেষ্টা কমিটিতে আলোচনা করার প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতাকে। পরে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উদ্দেশে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আপনি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন। এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন দ্য স্পট সলিউশন দেওয়া যায় না। এটার জন্য আপনি নোটিশ দেবেন। নোটিশ পাওয়ার পর আমি সিদ্ধান্ত দেব।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারি দল যত বিলম্ব করবে, জনগণের ক্ষোভ তত বাড়বে। তাই সরকারি দলের উচিত এই ভুল পথে না হাঁটা।