নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের চাঞ্চল্যকর ঘটনার এক যুগ
২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২৭
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের চাঞ্চল্যকর ঘটনার এক যুগ পূর্ণ হলো সোমবার (২৭ এপ্রিল)। ২০১৪ সালে এই দিনে আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেন ও র্যাবে-১১ এর তৎকালীন সিইও তারেক মোহাম্মদ সাঈদ এবং তাদের সহযোগীরা সাতজনকে গুমের পর হত্যা করে। কিন্তু, সারা দেশে আলোচিত এ ঘটনার চূড়ান্ত বিচার আটকে আছে আপিল বিভাগে। দোষীদের সাজার বাস্তবায়ন দেখতে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি সাত খুনের মামলায় নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত ৩৫ আসামির মধ্যে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে ভিন্ন মেয়াদের সাজা দেন। এরপর আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করেন। ২০১৭ সালে ২২ আগস্ট রায়ে প্রধান আসামি নূর হোসেন, র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার (অব.) এম মাসুদ রানাসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ১১ জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন উচ্চ আদালত। অন্য ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও বহাল রাখেন হাইকোর্ট।
সাত খুন মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। এ মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা আসামিদের আপিল আবেদন সর্বোচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে দীর্ঘ ৯ বছর ধরে। তবে ঘটনার দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও রায় কার্যকর না হওয়ায় নিহতদের স্বজনরা চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা বলেন, তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আশ্বাস দিয়েছিলেন বিএনপি সরকার নির্বাচিত হলে প্রথমেই এই সাত খুনের বিচার কাজ সম্পন্ন করা হবে। কিন্তু আজ তিনি নেই, কিন্তু সরকারের নেতৃত্বে আছেন তার সন্তান তারেক রহমান। তাই নিহতদের স্বজনরা প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের প্রতি দ্রুত এই সাত খুনের হত্যার বিচারের রায় কার্যকরের দাবি জানান।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালতে এক মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লা স্টেডিয়াম এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনকে অপহরণ করা হয়। ওই সময় বিষয়টি দেখে ফেলায় আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিমকেও অপহরণ করা হয়। এর দুদিন পর শীতলক্ষ্যা নদীর বন্দরের শান্তিরচর থেকে সাতজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত সাতজন হলেন—নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহিম। এ ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ও নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় পৃথক দুটি মামলা করেন।
দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিচার কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী ও মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি এনটিভি অনলাইনকে বলেন, আজও সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা মনে পড়লে বুকটা হাহাকার করে ওঠে। আমরা আমাদের প্রিয় মানুষদের হারিয়েছি—স্বামী, ভাই, সন্তান; যাদের আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। এই শোক আমরা বুকে ধারণ করে বেঁচে আছি। কিন্তু আমাদের একটাই প্রত্যাশা ছিল, তা হলো ন্যায়বিচার পাওয়ার।
মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি আরও বলেন, আদালত রায় দিয়েছেন, কিন্তু সেই রায় এখনও সম্পূর্ণ কার্যকর হয়নি। এতে আমরা গভীরভাবে হতাশ ও ব্যথিত। প্রশ্ন জাগে—আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে?
সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আমার একটাই আকুল আবেদন—তিনি যেন আমাদের পাশে দাঁড়ান এবং বিচার কার্যকরের উদ্যোগ নেন। আমি আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতিও অনুরোধ জানাই—এই বহুল আলোচিত সাত খুনের মামলার রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। আমরা ন্যায়বিচার চাই এবং এটি যেন আর বিলম্বিত না হয়।সাত খুনের ঘটনায় অপর নিহত তাজুল ইসলামের বাবা মোহাম্মদ আবুল খায়ের বলেন, ২০১৪ থেকে আজ ২০২৬, ১২টি বছর অতিক্রান্ত হলো। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা চাতকের মতো তাকিয়ে আছি, কবে আমরা ন্যায্যবিচার পাব। সরকারের কাছে আমাদের একটাই অনুরোধ—আমরা যেন ন্যায়বিচার পাই, সেজন্য ব্যবস্থা নিন।
নিহত তাজুল ইসলামের ছোট ভাই মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সংঘটিত নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বিশেষ করে র্যাবের কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নূর হোসেন জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এক যুগ পার হয়ে গেলেও আমরা আজও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত। হাইকোর্টে রায় হওয়ার পরও মামলাটি দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে ঝুলে আছে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ও বেদনাদায়ক। বর্তমানে নতুন সরকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় ভূমিকা রাখবে, এটাই আমাদের আশা।
রাজু আহমেদ আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের শিকার পরিবারগুলো তাদের উপার্জনক্ষম প্রিয়জনদের হারিয়েছে। রাষ্ট্রের উচিত ছিল শুরু থেকেই অপরাধীদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দোষীদের ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন নির্মম ঘটনা যেন আর না ঘটে, সরকারকে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সাত খুন মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আসলে এই সাত খুনের খুনি পক্ষ ছিল বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের কারণেই এই মামলার বিচার কার্যক্রম বিলম্বিত হয়েছে। যখন অপরাধী পক্ষ ক্ষমতাশালী হয়, তখন বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে দেখা যায় আমাদের দেশে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী বারবার অঙ্গীকার করেছেন, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনাটি শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়—এটি সারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি বাঙালির হৃদয়ে নাড়া দিয়েছিল। এই নির্মম ও বিভৎস হত্যাকাণ্ডটি সবাই গভীর উদ্বেগের সাথে দেখেছিল এবং নিন্দা জানিয়েছিল। হত্যাকাণ্ডের পদ্ধতি এবং পরবর্তীতে যেভাবে লাশ গুম করা হয়েছিল, তা দেশের মানুষসহ বিচার বিভাগকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল।অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান আরও বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে এবং উচ্চ আদালতেও রায় বহাল রয়েছে। মামলার বাদীপক্ষও এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। বর্তমানে আপিল সংক্রান্ত বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে আমি ইতোমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুতই এই বিচার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে এবং ন্যায়বিচার পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে—ইনশাআল্লাহ। আমরা চাই, যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি কার্যকর করা হোক। এতে করে দেশের বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ জাকির বলেন, নারায়ণগঞ্জ সাত খুন মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ২০১৪ সালে সাতজন মানুষকে অপহরণের পর হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়, যা এই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জবাসী ও দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। সেই আন্দোলনের ফলেই মামলাটি দৃশ্যমান অগ্রগতি পায় এবং বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। মামলাটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং যেকোনো সময় চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে পারে বলে আশা করছি। আমরা আশা করি, এই মামলার চূড়ান্ত রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দোষীদের যথাযথ শাস্তি কার্যকর করা হবে।