ফজলুর রহমান কী শপথ ভঙ্গ করেছেন ( তিনটি ভিডিওসহ)
২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:৪৬
সোনার বাংলা রিপোর্ট : ‘শিয়ালে চাটে বাঘের গাল হায় এ কী হাল/রাজ আসনে বসে চিল্লায় পাগলা শিয়াল’ অতি প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের কথক কবিদের এমন হাজার হাজার পঙক্তি মুখে মুখে প্রচলিত। কোনো অসঙ্গতি দেখলে এবং ইতর প্রকৃতির স্থুলবুদ্ধির কারো মুখে ভদ্রলোকের নিন্দার শিল্পিত ভাষায় তারা এভাবে জবাব দিয়ে থাকেন। গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে ঘটা ঘটনা দেখার পর হঠাৎ মনের মাঝে প্রাচীন বাংলার কবিদের প্রচলিত কথক কবিতাটি মনে পড়ে গেল। না, মাননীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে নয়। স্বঘোষিত এক পাগল, যিনি নিজেকে পাগলা বলার পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, ‘কিশোরগঞ্জে পাগলা মসজিদ আছে। আর আছে ফজলু পাগলা। তাই পাগলা বলে যারা সম্বোধন করেন, তাদের বিরুদ্ধে তার কোনো রাগ, ক্ষোভ ও অভিযোগ নেই। বরং এতে তিনি গর্ব অনুভব করেন।’
শপথ ভঙ্গকারী ফজলুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না
ফজলুর রহমান শপথ ভঙ্গ করেছেন গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার জনগণের রাজনৈতিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন, নিজেকে পাগল ঘোষণা করে। কারণ ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ফজলুর রহমান মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন না। তাই তার গর্ব নিয়ে তিনি থাকুন। কিন্তু এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলতে গিয়ে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ ভঙ্গ করেছেন। এ কথা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের দল বা সংগঠন গড়ার স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘কোনো শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না।’ এ বক্তব্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। অথচ তিনি এমপি হিসেবে সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। এ বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তার সাথে তুলনা চলে নর্দমার বর্জ্য এবং অসভ্য ইতরশ্রেণির গালির সাথে। গত ২৮ এপ্রিল তিনি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ১৯৭১-এর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এবং ২০২৪-এর ৩৬ জুলাই বিপ্লব ও বিপ্লবের নায়কদের অপমান করেছেন। তিনি নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা দাবি করেন, অথচ ইতিহাস সাক্ষী তিনি স্বঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশবিরোধী ভারতের পাচাটা মুজিব বাহিনীর সদস্য ছিলেন।
ফজলুর রহমান যে মুক্তিযোদ্ধা না কবি তাজ ইসলাম কিশোরগঞ্জের বিশিষ্ট কবি লেখক ও মুক্তিযুদ্ধের কোম্পানি কমান্ডার লেখক আইয়ুব বিন হায়দারের ভিডিও’র উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “আইয়ুব বিন হায়দার বলেছেন, ‘ফজলুর রহমান কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন মুজিব বাহিনীর লোক।’ ইতিহাস বলে মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল মুক্তিবাহিনীকে খতম করার জন্য। ফজলুর রহমান সেই লোক যার সাবেক দল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও ফ্যাসিবাদের কারণে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ শহীদ জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা মানতে চায় না। ফজলুর রহমানের মতো মুক্তিযোদ্ধারাই শহীদ করেছে প্রেসিডেন্ট জিয়াকে। ফজলুর রহমানের এ দলই উৎখাত করেছে বেগম খালেদা জিয়াকে তার বাসভবন থেকে।
ঐতিহাসিকভাবে সত্য, ফজলুর রহমানের সাবেক দল আওয়ামী লীগেই রাজাকারের সংখ্যা অন্য যেকোনো দলের চেয়ে বেশি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটি তালিকার প্রথম পর্ব প্রকাশের পর তা বাতিল করা হয় । কারণ এতে দেখা যায়, ১০ হাজার ৭৮৯ জনের একটি তালিকায় আওয়ামী লীগে ৮ হাজার ৬০ জন, বিএনপিতে ১ হাজার ২৪ জন, অন্যান্য দলে ৮৭৯ জন এবং জামায়াতে ইসলামীতে মাত্র ৩৭ জন রাজাকার রয়েছে। এই তথ্য প্রমাণ করে, আওয়ামী লীগই প্রকৃত রাজাকারের দল।”
ফজলুর রহমানের অশালীন বক্তব্য তুলে ধরে লেখার পরিসর বাড়ানো এবং আবার দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অপমান করা সঙ্গত মনে করছি না। তাই সেদিকে না গিয়ে তার বক্তব্যে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা তুলে ধরা হলো।
বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা
বিএনপির সংসদ সদস্য ও ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। তার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন।’ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকাল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের অধিবেশন শুরু হয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, অথচ জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না।’ ফজলুর রহমানের এ-সংক্রান্ত বক্তব্যের পর বিরোধীদলের সদস্যরা হইচই শুরু করেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে জাতীয় সংসদে প্রায় ১০ মিনিট চরম উত্তেজনা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি (ফজলুর রহমান) মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান সবকিছু বলেছেন। কিন্তু নিজের অবদান বলতে… তিনি আরেকজনের অবদানের ওপরে হাতুড়ি পেটানোর অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। তিনি পার্সোনালি আমাকে হার্ট করেছেন।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘তিনি বলেছেন যে, আমি বলে থাকি আমি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। বলেই তিনি এটাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। দুই নম্বর উনি বলেছেন, কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না। তাহলে উনাকে জিজ্ঞেস করা লাগবে? আমি এটার তীব্র নিন্দা জানাই। আমার আইডেন্টিটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে, এটা গুরুতর অপরাধ করেছেন। আবার আমার আদর্শ সিলেকশনের ব্যাপারে উনি কথা বলেছেন, এটা বাড়তি অপরাধ করেছেন।’
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের অসংসদীয় অংশ এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই সংসদকে ফাংশন করার জন্য বর্তমান জ্বালানি অব্যবস্থাপনা সংকট যেটাই বলি, সেই ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে এসেছিলাম, কথা বলেছি, আলোচনা হয়েছে এবং পরের দিন এসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা সাথে সাথে এটা গ্রহণ করেছি। তিনি (ফজলুর রহমান) এইটাকে শেষ পর্যন্ত কনক্লুশন রাখলেন কী দিয়েÑ যার মগজ যে রকম, তার কনক্লুশন সে রকম। তাঁর মতো একজন প্রবীণ ব্যক্তির কাছ থেকে, রাজনীতিবিদের কাছ থেকে আমি এই ধরনের আচরণ আশা করি না।’
পরে ফজলুর রহমান আবার বক্তব্য দিতে চাইলে স্পিকার তাকে ফ্লোর না দিয়ে বলেন, ‘এখন আর তো না বললেও চলে। আমরা সংসদ উত্তপ্ত হোকÑ এরকম চাই না। আপনি একটু দয়া করে বসুন।’ স্পিকার বলেন, ফজলুর রহমান যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার মধ্যে যদি অসংসদীয় কোনো কিছু থাকে সেটা এক্সপাঞ্জ করা হবে। বিরোধীদলের নেতা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার মধ্যেও যদি কোনো কিছু অসংসদীয় থাকে, সেটিও এক্সপাঞ্জ করা হবে।