তৈরি করেছে ৭০ জনের হিট লিস্ট

নির্বাচন ভণ্ডুল করতে বসে নেই ফ্যাসিস্ট আ’লীগ ও দোসররা

প্রিন্ট ভার্সন
২৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ২১:৫৯

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ নির্বাচন ঘিরে বসে নেই রাজনৈতিক দলগুলো। ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো মাঠে দলীয় প্রতীকের পক্ষে প্রচার চালাতে ব্যস্ত। এছাড়া অন্যান্য নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনায় তৎপর দলগুলো। অন্যদিকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার দোসর দলগুলোও ব্যস্ত। তারা ব্যস্ত নানা কৌশল-অপকৌশলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ঢুকে ভোট বানচাল করতে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরও বসে নেই। শুরুতে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ধারণা ছিল, আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫ বছর তাদের শাসন আমলে সংঘটিত গুম-খুন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে চালানো গণহত্যার দায় স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমতা চেয়ে অনুশোচনা করবে। কিন্তু না, বাস্তবে দেখা গেল তার উল্টোটা, দলটির শীর্ষনেতা শেখ হাসিনা, দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ যারাই গণমাধ্যমে কথা বলেছেন, তারা কোনো অনুশোচনার কথা বলেননি, উল্টো তারা প্রতিসিংসা দেখিয়েছেন। ক্ষমতাচ্যুতের জন্য বদলা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। আগামী নির্বাচন নিয়ে দলটির রয়েছে অপতৎপরতা।
আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, নির্বাচন সামনে রেখে তারা যেন অভ্যুত্থানের স্বপক্ষের শক্তির দলগুলোয় ঢুকে পড়ে এবং অভ্যন্তরীণ তথ্য দিয়ে দলকে সহযোগিতা করেন। এছাড়া পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতেও তৎপরতা রয়েছে আওয়ামী লীগ ও তার দোসর দলগুলো। আওয়ামী লীগর সবচেয়ে পরীক্ষিত ও শক্তিশালী দোসর জাতীয় পার্টি আরও এক মাসে আগে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। জানা গেছে, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর থেকে ৩০০ আসনে নির্বাচন করার একক শক্তি-সামর্থ্য নেই জাতীয় পার্টির। আওয়ামী লীগের দয়া ও আশীর্বাদে দলটি গত ১৫ বছরের ক্ষমতার সঙ্গে ছিল। এবার দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় ও সামর্থ্যবান লোক খুঁজছে দলটি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় পার্টি প্রার্থী হয়ে জনগণের বিপক্ষে যেতে অনেকই রাজি হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ডামি নির্বাচনে (৭ জানুয়ারি ২০২৪) যারা জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়েছেন এবং যারা মনোনয়ন নেওয়ার জন্য লবিং তদবির করেছেন, তারাও এবার ভোটে আসতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। ফলে তারা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে নেই এমন আওয়ামী লীগারদের খুঁজছে।
আওয়ামী লীগ ব্যস্ত গণ্ডগোল পাকাতে, অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে
আওয়ামী লীগের এখন টার্গেট কী? এমন প্রশ্নের উত্তরে বিশ্লেষকরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ এবং নির্বাচন বানচালই এখন আওয়ামী লীগের মূল টার্গেট। কারণ তারা জনগণকে বোঝাতে চায় আওয়ামী লীগের আমলে জনগণ ভালো ছিল এমন কিছু। সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ, যারা রাজনীতি করেন, রাজনীতি বুঝতে চায় না, তারা সবসময় চায় দেশ শান্তিতে চলুক। কে বা কারা ক্ষমতায় আসবে বা দেশ চালাবে, তাদের এ নিয়েও মাথাব্যথা নেই। আওয়ামী লীগ এ জাতীয় মানুষকে ভুল মেজেস দিতে চায়। বোঝাতে চায়, দেশ এখন ভালো নেই। তাই একের পর এক দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্র। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ক্ষমতা ধরে রাখতে গুম-খুনসহ সব ধরনের অবিচারের পথ বেছে নেয় দলটি। এরই মধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল থেকে জুলাই গণহত্যা মামলার ফাঁসির দণ্ডাদেশ ও বেশকিছু মামলায় সাজা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতেও শুধরানোর পরিকল্পনা নেই আওয়ামী লীগের। নতুন করে চক্রান্ত শুরু করেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটি।
এমন বাস্তবতায় দেশে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে বিদেশে অবস্থানরত দলটির নেতাকর্মীরা এ নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা নির্বাচন প্রতিহতের ঘোষণাও দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে তাদের সমর্থকরা ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ‘বন্ধ’ করে দেবে। তাদের আন্দোলন সহিংস রূপ নিতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। এ বক্তব্য এমন একসময়ে এসেছে, যখন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ আশঙ্কা প্রকাশ করছেনÑ পরিকল্পিত সহিংসতা, অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হতে পারে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা, হামলার অভিযোগ ও নাশকতার আশঙ্কা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর মাস্টারপ্লানের অংশ হিসেবেই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া আরও বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় হুমকি হলো পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের লুকিয়ে থাকা সহযোগী দোসররা।
আ’লীগ বিদেশে বসে উসকানি দিচ্ছে নেতাকর্মীদের, সামাজিকমাধ্যমে ছড়াচ্ছে মিথ্যা তথ্য
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেখ হাসিনার একটি অডিও কল রেকর্ড ফাঁস হয়। ওই কল রেকর্ডে শেখ হাসিনাকে তার দলের একজন বলছিলেন, আমরাও প্রতিশোধ নেব, আমরা ওদের (যারা আওয়ামী লীগের শত্রু) মেরে ফেলবো এসব কথার প্রেক্ষিতে শেখ হাসিনা বলছিলেন, কথা বেশি বলে লাভ নেই, পারলে মেরে দেখাও। অর্থাৎ তিনি হত্যাকাণ্ড করে দেখাতে বলেন। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই নানা অপরাধের ভিডিও চোখে পড়ে। এসব ভিডিও শেয়ার করে আওয়ামী অ্যাকটিভিস্টরা বোঝানোর চেষ্টা করছে এগুলো ফ্যাসিবাদবিরোধীরা করছে। অথচ এমন অনেক ভিডিও ফ্যাক্ট চেক করে দেখা গেছে, অনেক আগের এবং কোনো ভিডিও ভারতেরও রয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করার ঘটনাকে ঘিরে আওয়ামীপন্থিরা অপতথ্য প্রচার এবং উল্লাস প্রকাশ করেছে বলে শনাক্ত করেছে বাংলাফ্যাক্ট। প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) ফ্যাক্ট চেক ও মিডিয়া রিসার্চ টিম বাংলাফ্যাক্ট জানায়, গত নভেম্বর থেকে আওয়ামীপন্থিরা শরীফ ওসমান হাদিকে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল। আরও বলা হয়েছে, হামলার ঘটনার পর আওয়ামীপন্থিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ায় এবং প্রকাশ্যে উল্লাসও দেখায়। বাংলাফ্যাক্ট অনুসন্ধান টিম জানায়, অভিযুক্ত ফয়সালের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এলে তা অস্বীকার করে নতুন করে অপতথ্য প্রচার শুরু করা হয়। একই সঙ্গে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামীপন্থিদের উল্লাস প্রকাশের একাধিক উদাহরণও শনাক্ত করেছে বাংলাফ্যাক্ট। এদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে আওয়ামী লীগের অপতৎপরতার নানা তথ্য উঠে এসেছে। গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন বানচালে চোরাগোপ্তা হামলা ও আগুন সন্ত্রাসের চেষ্টা চালাতে পারে পতিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এছাড়া সাইবারজগতে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা চালাতে পারে। গোয়েন্দা সংস্থার অনুন্ধানে বেশকিছু ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচনী আসনও চিহ্নিত হয়েছে। ওইসব আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পরবর্তী টার্গেট ও হাসিনার অডিও ফাঁস
হাদিকে হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার টার্গেট করা হয়েছে হাসনাত আব্দুল্লাহকে। ভারতের সাবেক সেনা কর্মকর্তা কর্নেল অজয় রায়না তার এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে হাসনাতের ছবি শেয়ার করে সরাসরি হুমকি দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, হাদির পর পরবর্তী লক্ষ্য জুলাইযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক ও ভারতবিরোধী এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। এটি একটি সার্বভৌম দেশের রাজনৈতিক নেতার ওপর বিদেশি হস্তক্ষেপ ও প্রকাশ্য হত্যার হুমকি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিভিন্ন সূত্র বলছে, ওসমান হাদিসহ মোট ৭০ জনের একটি তালিকা করেছে সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, জুলাইযোদ্ধা ও সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন জুলাইযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক ও ভারতবিরোধী এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। হাসনাতের ছবিসংবলিত ‘ব্যাটালিয়ন সেভেন্টি ওয়ান’ নামের একটি অ্যাকাউন্টের পোস্ট শেয়ার করে অজয় লিখেছেন, হাদির পর পরবর্তী টার্গেট হাসনাত আব্দুল্লাহ। তার দেওয়া ওই পোস্টটি শেয়ার করে রওশন হক নামে এক বাংলাদেশি জবাব দিয়ে লিখেছেন, যিনি পোস্ট করেছেন তিনি একজন ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য, ২৯টি বইয়ের লেখক এবং একজন চলচ্চিত্র পরামর্শক। গত ১৫ ডিসেম্বর সোমবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হাসনাত আব্দুল্লাহ ভারতের আধিপত্যবাদী নীতির কড়া সমালোচনা করে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ববিরোধী অপশক্তিকে আশ্রয় দেয়, তবে বাংলাদেশও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সহযোগিতা করতে পারে। এ বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা গত ১৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি ভারতকে একটি ‘পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র’ উল্লেখ করে বাংলাদেশকে ‘শিক্ষা দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছেন। তার এ বক্তব্যকে কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত এবং উসকানিমূলক বলে মনে করছে সচেতন মহল।
এদিকে হাদিকে গুলি করার পর ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে হাসিনাকে বলতে শোনা গেছে, নিজেরাই নিজেদের গুলি করছে। তাদের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে, ঘরবাড়ি ছাড়া করা হচ্ছে। তিনি ওই অডিওতে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের উসকানি দিয়ে এবং জুলাইযোদ্ধাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে আরও বলেন, যতজনের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই রাস্তায় নামলে ওরা যাবে কোথায়। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলতে শোনা যায়, হাসিনার কিলিং মিশন বাস্তবায়নে ঢাকায় প্রবেশ করবে একদল দক্ষ ঘাতক। হাসিনার কিলিং মিশনের আরও একটি অডিও ফাঁস হয়েছে। ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, মাঠে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেই। যা করার তাদেরই করতে হবে। বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের ধরে ধরে হত্যার কথাও বলেন তিনি।
জাতীয় পার্টির নির্বাচনে প্রস্তুতি, বিশেষ গোষ্ঠীর সিগন্যালের অপেক্ষায়
গত ১৭ ডিসেম্বর রাজধানীর কাকরাইলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জাতীয় পার্টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখার খবর জানায়। তবে এদিন দলটি এককভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে, নাকি কোনো জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে লড়বে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। দলের মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম পাটোয়ারী নিশ্চিত করেছেন যে, তারা নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেবেন। সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের জানিয়েছেন, আপাতত ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তারা এগোচ্ছেন। তবে দলের নেতাকর্মী ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে জোট গঠন বা অন্য দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের চিন্তাও তাদের রয়েছে, তবে সবকিছুই দলীয় ফোরামের আলোচনার পর চূড়ান্ত হবে। সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যোগাযোগ করছে জাতীয় পার্টি। দলটি চাচ্ছে আওয়ামী লীগ যেহেতু ভোটে আসতে পারছে না, সেহেতু তাদের ভোটগুলো যাতে জাপার বাক্সে যায়, তা নিশ্চিত করতে। তাছাড়া দলটি চায় যেখানে আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো, সেখানে পদে নেই আওয়ামী লীগের এমন কাউতে প্রার্থী করতে, যিনি আওয়ামী লীগের হয়ে সংসদে ভূমিকা পালন করবেন। গত ২৩ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের হাইকান্ড থেকে চূড়ান্ত কোনো মেসেজ পায়নি জাতীয় পার্টি।
আনিস-মঞ্জুদের জোট মিশতে চায় ফ্যাসিবাদবিরোধীদের সঙ্গে
জাতীয় পার্টির নেতা ও শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অপর অংশ এবং তাদের গঠিত ১৮ দলীয় নতুন জোটও নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচক রয়েছে। তারা নির্বাচনী তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে মনোনয়ন জমার সময়সীমা বাড়ানোর দাবি করে। জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ অধিকাংশ দল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধের দাবি তুললেও জাপা এবং আনিস-মঞ্জুদের জাতীয় পার্টি এবং জোট নির্বাচনের মাঠেই থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার চেষ্টাও চালাচ্ছে।
পাশের দেশ থেকে বিশৃঙ্খলার ইন্ধন, বলছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা কেবলই স্থানীয় নয়, বরং এগুলোর সঙ্গে পাশের দেশের কিছু কার্যক্রম ও বার্তা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মনে করেন, কিছু মহল দেশে ধর্মীয় উসকানি, গুজব ও মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে পরিবর্তনের পর অনেকেই অখুশি হয়েছে, তিনি বলেন। এখন সেই অখুশি গোষ্ঠী বাইরে বসে ভিন্ন কৌশলে দেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, ধর্মের আবেগ ব্যবহার করতে চায়, সামাজিকমাধ্যমে ঘৃণা ছড়াতে চায়। আমরা সেসব নজরদারিতে রেখেছি। তিনি জানান, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব ইন্ধনের উৎস ও নেপথ্যের যোগসূত্র শনাক্তে কাজ করছে। আমরা জানি, কোথা থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, কে কার পক্ষে কাজ করছে, বলেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, গুজব ছড়ানো, ভুয়া ছবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু জনগণ এখন অনেক সচেতন। কেউ চাইলেই আগের মতো উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারবে না।
যা বলছেন রাজনীতিকরা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মনে করেন, আওয়ামী লীগের অপতৎপরতা বন্ধের দায়িত্ব সরকারের। তিনি বলেন, দলটি নিষিদ্ধ হলেও তাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যখন যেখানে অপতৎপরতা চালাবে, সেখানেই কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এখন অন্তর্বর্তী সরকারকেই এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। এদিকে সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ ও মালিকদের সংগঠন নিউজ পেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (নোয়াব) এর আয়োজনে ২২ ডিসেম্বর রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ‘মব ভায়োলেন্সে আক্রান্ত বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ যৌথ প্রতিবাদ সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে দেশবিরোধী অনেক ষড়যন্ত্র হচ্ছে ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার’ কার্যালয়ে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা তারই অংশ। তিনি বলেন, আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভণ্ডুল ও প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি অপশক্তি এ ধরনের চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র করছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসররা নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে অনুরোধ করবো তাদের চিহ্নিত করুন।’ তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে বলেন, শরীফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যা, খুলনায় এনসিপির নেতাকে গুলি করা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অংশ। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এসব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে দেশকে একটি সত্যিকারার্থে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার উপহার দেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক উপমন্ত্রী এডভোকেট আব্দুস সালাম পিন্টু মনে করেন, আওয়ামী লীগ নেই, তবে এখনো তাদের দোসররা নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা বাসস্ট্যান্ডে কৃষক দলের এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। আব্দুস সালাম পিন্টু বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা যদি আরও চার-পাঁচ মাস ক্ষমতায় থাকত, তাহলে আমি হয়তো বেঁচে থাকতাম না। গত ১৭ বছরে অসংখ্য মানুষ মারা গেছে তার নিপীড়নে। আমরা সংগ্রাম করেছি ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আজ আওয়ামী লীগ নেই, তবে এখনো তাদের দোসররা নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি করছে। আব্দুস সালাম পিন্টু আরও বলেন, আমাদের দলেও কিছু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট সরকারের লোক প্রবেশ করেছে। তাদের থেকে সতর্ক থাকতে হবে। যে ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য মানুষ রক্ত দিয়েছে, প্রাণ দিয়েছে সেই ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষা করাই আমাদের মূল দায়িত্ব।