নির্বাচন নয়, থামতে পারে রাষ্ট্র

প্রিন্ট ভার্সন
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:৫৩

॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর ‘নির্বাচন হবে কি না’ তা নয়, বরং প্রশ্ন হলো- এই নির্বাচন পার হয়ে রাষ্ট্র কোন দিকে যাবে। অন্তর্ঘাত, সহিংসতা কিংবা রাজনৈতিক অচলাবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন বন্ধ করার আলোচনা যতই জোরালো হোক, বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে- নির্বাচন থামানো কঠিন, কিন্তু নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য ধরে রাখা আরও কঠিন।
এখানে দুটি বিষয়কে একসাথে দেখা হচ্ছে-
একদিকে অন্তর্ঘাত দিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করা কতটা সম্ভব অন্যদিকে নির্বাচনের পর ২০২৬ সালে কোন কোন জায়গায় রাষ্ট্র ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’-এ পৌঁছাতে পারে।
নির্বাচন কি অন্তর্ঘাতে থামানো সম্ভব?
তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এর সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এখন আর শুধু ব্যালট বা ভোটকেন্দ্র নির্ভর নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
নির্বাচন বন্ধ করতে হলে অন্তর্ঘাত হতে হবে- দেশব্যাপী ও ধারাবাহিক; প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে তা ছড়িয়ে পড়বে এমন মাত্রায়, যা রাষ্ট্র ‘ম্যানেজ’ করতে অক্ষম; কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে- নির্বাচন কমিশন ও নির্বাহী বিভাগ একই লাইনে, আর সেনা, পুলিশ, বিজিবি সবাই প্রস্তুত এবং কোনো কারণে কম ভোটার উপস্থিতিও হয় তাতেও নির্বাচনকে ‘বৈধ’ হিসেবে চালিয়ে নেওয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই গৃহীত হয়েছে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্ন সহিংসতা, কর্মসূচি বা সীমিত অন্তর্ঘাত নির্বাচন বন্ধ করবে না। সর্বোচ্চ যা হতে পারে- কিছু কেন্দ্রে ভোট স্থগিত, পুনঃতফসিল কিংবা ভোটার উপস্থিতির পতন।
অতএব ফেব্রুয়ারির নির্বাচন থামবে না; বরং তা বড়জোর একটি ‘স্বল্প গ্রহনীয় নির্বাচন হিসেবে পার হয়ে যাবার অবস্থা হতে পারে।
নির্বাচনের পর প্রকৃত সংকট শুরুর আশঙ্কা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন কখনোই শেষ কথা নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো- নির্বাচনের পর রাষ্ট্র কতটা কার্যকর থাকে। এখানেই এসে ২০২৬ সাল হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়।
নিচে সম্ভাব্য প্রধান ব্রেকিং পয়েন্টগুলো তুলে ধরা হলো- ১. বৈধতা-ঘাটতির পর রাষ্ট্রীয় কার্যক্ষমতা সংকট : নির্বাচনে যদি- ভোটার উপস্থিতি ২৫-৩৫ শতাংশে নেমে আসে, তাহলে সংসদ গঠিত হলেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা দুর্বল থাকতে পারে আর সেক্ষেত্রে সরকার আইনি দিক থেকে বৈধ হলেও রাজনৈতিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়বে। এর ফল হবে-
প্রশাসনের সিদ্ধান্তহীনতা; নীতি বাস্তবায়নে অনীহা ও মাঠপর্যায়ে ‘নীরব অসহযোগিতা’।
বাংলাদেশে রাষ্ট্র মূলত চলে বৈধতা এবং ভয়-এর সমন্বয়ে। বৈধতা দুর্বল হলে ভয় বাড়াতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ভয়নির্ভর শাসনে একসময় ভয় আর কাজ না করার অবস্থা তৈরি হয়, যা ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ স্পষ্ট হতে পারে। অবশ্য এমনটা হবেই তা নয়, হতে পারে।
অর্থনৈতিক ‘হার্ড শক’: বিপজ্জনক ট্রিগার
নতুন বছর ২০২৬ সালের শুরুতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি আসতে পারে অর্থনীতি থেকে। সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো হলো- আইএমএফের কর্মসূচির কঠিন শর্ত; বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবার সংকটসীমায় নেমে যাওয়া; বড় ব্যাংক বা ইসলামী ব্যাংকে তারল্য সংকট; ডলারের কালোবাজার বিস্ফোরণ।
অর্থনৈতিক সংকট যখন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আঘাত করে- তখন আর রাষ্ট্রের কোনো রাজনৈতিক ভাষ্য অনেক সময় কাজ করে না। আর একবার যদি- আমদানি বন্ধ হয়, পে-রোল দিতে দেরি হয়; বড় শিল্পগোষ্ঠী ডিফল্ট করে, তাহলে তা সরাসরি রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত হানতে পারে।
প্রশাসনের ভেতর নীরব ভাঙন
সবচেয়ে বিপজ্জনক কিন্তু কম দৃশ্যমান সংকট আসতে পারে প্রশাসনের ভেতর থেকে।
এটি বিদ্রোহ নয়, বরং ফাইল আটকে রাখা, ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নেওয়া, অতিরিক্ত নির্দেশনির্ভরতা ও মাঠ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা।
এ ধীরগতি একসময় রাষ্ট্রকে কার্যত অচল করে দিতে পারে যেখানে সরকার আছে, কিন্তু শাসন নেই।
নিরাপত্তা বা আন্তর্জাতিক মাত্রার ধাক্কা
কম সম্ভাবনাময় হলেও উচ্চমাত্রার প্রভাব ফেলতে পারে বড় সন্ত্রাসী হামলা, সীমান্ত বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা ভিসা-ফিন্যান্সিয়াল রেস্ট্রিকশন।
বিশেষ করে যদি নির্বাচনের পর দমন-পীড়ন বাড়ে, তখন পশ্চিমা শক্তিগুলোর অবস্থান আবার কঠোর হতে পারে। এজন্য অবশ্য অনেক ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয় রয়েছে।
নির্বাচন থামেনি, কিন্তু রাষ্ট্র থামতে পারে
এ পুরো চিত্র থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার-অন্তর্ঘাত দিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বন্ধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই নির্বাচন পার হয়ে বাংলাদেশ এমন এক পথে ঢুকতে পারে, যেখানে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে কার্যক্ষমতা হারাতে শুরু করবে।
২৬ সালের ব্রেকিং পয়েন্ট মানে সরকার পতন নয়;
এর মানে- রাষ্ট্র আগের মতো আর কাজ না করা।
সেখান থেকেই খুলে যেতে পারে তিনটি সম্ভাব্য পথ
১. নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক রিসেট, ২. ব্যবস্থাপিত ট্রানজিশন অথবা, ৩. আকস্মিক ও বিশৃঙ্খল ভাঙন।
বাংলাদেশ এখন কি সেই মোড়ের দিকে এগোচ্ছে- যেখানে নির্বাচন আর শেষ অধ্যায় নয়, বরং নতুন সংকটের সূচনামাত্র। এগোচ্ছে হয়তো বলা যাবে না। তবে নিয়ে যাবার চেষ্টা হচ্ছে। সেটি সফলও হতে পারে আবার ব্যর্থও। এটি নির্ভর করবে জুলাই ঐক্য কতটা সক্রিয় থাকে তার ওপর।