হাসিনার ভারতে অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কাঁটা

প্রিন্ট ভার্সন
২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৬:৩২

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ফ্যাসিস্ট হাসিনার মৃত্যুদণ্ড কি কার্যকর করতে পারবে বাংলাদেশ সরকার? ভারত কি তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে? ফ্যাসিস্ট পলাতক হাসিনাকে গণহত্যার দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়ার পর থেকেই এ প্রশ্ন জনগণের মুখে মুখে। কারণ যেসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে। এ নিয়ে দেশ-বিদেশের আইনজ্ঞদের মাঝে কোনো বিতর্ক নেই।
এ প্রসঙ্গে গবেষক ও গণমাধ্যমকর্মী আরিফ রহমান লিখেছেন, “যখন শেখ হাসিনা ও তাঁর অনুসারীরা এ রায়কে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে অভিহিত করেন, তখন তারা কেবল সত্যকেই অস্বীকার করেন না; বরং ইতিহাসের এক নির্মম পরিহাসের মুখোমুখি হন।” কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, “এই প্রমাণের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি শীর্ষনেতাদের বিচারের সময় প্রসিকিউটরদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল হলোকাস্টের জন্য অ্যাডলফ হিটলারের সরাসরি দায় প্রমাণ করা। আমরা জানি, হিটলার গ্যাস চেম্বার চালু করার জন্য কোনো আদেশে স্বাক্ষর করেননি বা তার কণ্ঠের কোনো রেকর্ডিং পাওয়া যায়নি, যেখানে তিনি গণহত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন। হিটলারের বিচার করার জন্য আইনজীবীদের অগণিত নথি, বৈঠক ও পরোক্ষ নির্দেশনার জাল বুনে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে, পুরো নিধনযজ্ঞটি তারই ‘অপরাধমূলক অভিপ্রায়’ থেকে উৎসারিত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনকে সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়নি। এখানে রাষ্ট্রপ্রধানের নিজের কণ্ঠেই হত্যার ফরমান জারি হয়েছে। নুরেমবার্গের বিচারকদের হাতে যদি এমন অকাট্য প্রমাণ থাকত, তবে হিটলারের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের রায় হতে সময় লাগত মাত্র কয়েক সপ্তাহ। এ প্রমাণ-শৃঙ্খলের দ্বিতীয় গ্রন্থিটি হলোÑ সেই নির্দেশ বাস্তবায়নের জীবন্ত সাক্ষ্য। ক্ষমতাচ্যুত সরকারেরই সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়ে শেখ হাসিনার কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি বিতর্কের পথ রুদ্ধ করে দেন। সাবেক আইজিপি তার জবানবন্দিতে বলেছেন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে অবহিত করেন যে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিথাল ওয়েপন ব্যবহারের সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন।’ এ সাক্ষ্য ফাঁস হওয়া অডিওর নির্দেশ ও রাজপথে ঘটে যাওয়া হাজারো হত্যাকাণ্ডের মধ্যে একটি জীবন্ত ও অকাট্য সেতু তৈরি করে। এটি প্রমাণ করে, পুলিশ বা অন্যান্য বাহিনী বিচ্ছিন্নভাবে বা আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়নি; তাদের কাছে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল এবং সেই নির্দেশ পালনের জন্য একটি সুসংগঠিত কাঠামো কার্যকর ছিল।” (প্রথম আলো, ২৩-১১-২০২৫)।
বিচার নিয়ে যারা প্রশ্ন তুলছেন, তারা ফ্যাসিস্ট হাসিনার অন্ধসমর্থক। যেমন হিটলারের কিছু অন্ধ সমর্থক এখনো দেখা যায়। ইউরোপ-আমেরিকায় পুলিশের হাত ধরে ধরে জেলখানায় যায়, সাজা শেষে বের হয়ে আসে, তারপরও আবার একই কর্ম শুরু করতে গিয়ে চরম সাজা; এমনকি দেশান্তরিত হয়। ভারত কেন হাসিনাকে সহজে ফেরত পাঠাবে না, তা সবারই জানা- তিনি তাদেরই লোক। জীবনের বিভিন্ন পর্বে তারা তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। সময়-সুযোগমতো অবৈধ সুবিধা নিয়ে তাকে বাঁচানোর মূল্য সুদে-আসলে আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু এবারের হিসেব আলাদা। কারণ এবার তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজা দেয়া হয়েছে। এখন চলছে হাসিনার জীবন সায়াহ্ন। সুবিধা আদায়ের পর তাদের জীবন সায়াহ্নে ভারত সেই ব্যক্তির সাথে ভালো ব্যবহার করেছে- এমন উদাহরণ নেই। অবশ্য ভারতের দাবি, তারা তাদের সাথে অতিথির মতো ব্যবহার করে।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বিদেশি নেতা-নেত্রীদের আশ্রয় দেওয়ার ঐতিহ্য আছে ভারতের। তিব্বতি ধর্মগুরু দালাইলামা আজ ছেষট্টি বছরের বেশি ভারতে আছেন। সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট মহম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবারও এদেশে আছেন তিরিশ বছরের ওপর। আমি নিশ্চিত, শেখ হাসিনাকেও ভারত যতদিন দরকার হবে রাখবে এবং তার প্রাপ্য সম্মান দিয়েই রাখবে।’
তিনি অবশ্য লেন্দুপ দর্জির কথা বলেননি। কারণ তার দেশ সিকিমকে ভারত গ্রাস করার পর ভারতে তাকে গৃহবন্দির মতো করেই রাখা হয়েছিলো। অন্য যাদের কথা পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী বলেছেন, তারাও কী খুব ভালো আছে? অন্যদিকে হাসিনা এমন একজন অতিথি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। জাতিসংঘ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ বাংলাদেশের পক্ষে থাকবে। তারা অবশ্য সব অপরাধীর জন্যই সে যত বড় অপরাধই করুক না কেন, মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী। কিন্তু শাস্তির বিরোধী নয়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক আশা প্রকাশ করেছেন, ‘বাংলাদেশ সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষতিপূরণ এবং ন্যায়বিচারের একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত, অর্থবহ ও রূপান্তরমূলক নিরাপত্তা খাত সংস্কার থাকা উচিত- যাতে এসব লঙ্ঘন ও নির্যাতন পুনরায় না ঘটে। এ কাজে বাংলাদেশ সরকার ও জনগণকে সহযোগিতা করতে হাইকমিশনারের কার্যালয় সদা প্রস্তুত।’ মৃত্যুদণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের অবস্থান যাই থাক, পৃথিবীর দেশে আইনের ধারাগুলো হিসেবে মৃত্যুদণ্ড আছে এবং থাকবে।
পৃথিবীকে বাঁচাতে মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োজন আছে
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে না থাকলেও অপরাধ বিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ এবং ইসলামসহ সব ধর্মের স্কলারদের মতামত হলো, ‘জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীকে বাঁচাতে যেমন অপারেশনের মাধ্যমে শরীরের পচনের শিকার অংশ কেটে ফেলে দিতে হয়, পৃথিবীকে বাঁচাতেও তেমনি মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োজন আছে। ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’ ২০২৫ সালে তাদের এক প্রতিবেদনে মৃত্যুদণ্ড বৈধ এমন ৫৫টি দেশ ও অঞ্চলের একটি তালিকা দিয়েছে। দেশগুলো হলো- ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, বাংলাদেশ, ইথিওপিয়া, জাপান, মিশর, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো), ভিয়েতনাম, ইরান, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, সুদান, উগান্ডা, ইরাক, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া ও তাইওয়ান। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ধারণা, চীনই বিশ্বের সবচেয়ে বড় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ। দেশটিতে প্রতি বছর কয়েক হাজার মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে দেশটি এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ না করায় সঠিক সংখ্যা জানা অসম্ভব।
আরও আছে সোমালিয়া, জিম্বাবুয়ে, দক্ষিণ সুদান, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কিউবা, বেলারুশ, লিবিয়া, সিঙ্গাপুর, লেবানন, ফিলিস্তিন, ওমান, কুয়েত, কাতার, জ্যামাইকা, গাম্বিয়া, বতসোয়ানা, লেসোথো, বাহরাইন, ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগো, কোমোরস, গায়ানা, বেলিজ, বাহামাস, বার্বাডোস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রানাডাইনস, অ্যান্টিগুয়া ও বার্বুডা, ডোমিনিকা এবং সেন্ট কিটস ও নেভিস। চীন বাদে ২০২২ সালে বিশ্বে ৮৮৩টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এটি ২০১৭ সালের পর সবচেয়ে বেশি। তবে ১৯৮৮, ১৯৮৯ বা ২০১৫ সালের তুলনায় এ সংখ্যা অনেক কম। এ সালগুলোয় প্রতি বছর ১ হাজার ৫০০-এর বেশি মানুষ মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।
অ্যামনেস্টির হিসাবে, ২০২২ সালে অন্তত ২ হাজার ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৫২টি দেশে। ওই বছর বিশ্বজুড়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা নিয়ে কারাগারে ছিলেন ২৮ হাজার ২৮২ জন। অনেক বন্দী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে বছরের পর বছর, কখনো কখনো দশক ধরে কনডেমড সেলে অপেক্ষা করেন। এখন প্রশ্ন হলো- হাসিনার অপেক্ষার পালা শেষ হবে কবে?
হাসিনার অপেক্ষার পালা শেষ হবে কবে?
ভারত সরকারের অনেক বিশ্বস্ত সেবাদাসী হাসিনা। তার অবস্থার জন্য তাদেরও দায় আছে। কারণ ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪-এর বিতর্কিত ও ভোটারবিহীন নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়ে ভারতই তাকে ফ্যাসিস্ট হতে সহযোগিতা করেছে। সেই দায় মেটাতে ভারত সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে নতুন করে একটি চিঠি পাঠিয়েছে বাংলাদেশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সংক্ষেপে বলেছেন, ‘দিন দুয়েক আগে (গত ২১ নভেম্বর শুক্রবার) চিঠিটি পাঠানো হয়েছে’। উপদেষ্টা এর চেয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, নোট অব ভার্বালটি নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনা এবং তার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া সাবেক পুলিশপ্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ আগেও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য আবেদন করেছিল, কিন্তু দিল্লি সাড়া দেয়নি। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে এবং তারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনেই বাংলাদেশ প্রত্যাশা করছে ভারত হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো চুক্তি বা আন্তর্জাতিক চাপ নয়, ভারতের জনগণ সেই দেশের সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করলেই হাসিনাকে ফেরত দিতে বাধ্য হবে। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত সেই কৌশল কাজে লাগানো। এখন প্রশ্ন হলোÑ কী সেই কৌশল? এর উত্তরে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘ভারতের সাথে বাণিজ্য বন্ধ করলেই ভারতের অর্থনীতিতে কী বিরূপ প্রভাব পড়ে, তা তো দেখেছেন?’
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। সেই চুক্তির আওতায় ভারত প্রায় আইনগতভাবেই তাকে ফেরত পাঠাতে বাধ্য। বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে ভারতকে বাংলাদেশের আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়ে বিলম্ব ছাড়াই হাসিনাকে ফেরত পাঠানো উচিত বলে আমি মনে করি। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুনিরুজ্জামান বলেন, যদি ভারত আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন, নীতি ও শৃঙ্খলাকে সম্মান করে, তবে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী হিসেবে তাদের বাংলাদেশের আইনগত ব্যবস্থাকেও সম্মান জানানো উচিত। যদি সেই সম্মান থাকে, তবে সবদিক থেকেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত।’
হাসিনার ভারতে অবস্থান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কাঁটা
ভারতীয় বিশ্লেষকরা হাসিনার শাস্তিতে ন্যায় প্রতিষ্ঠার কথা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে স্বীকার করলেও তাকে মৃত্যুমুখে ঠেলে না দিতে সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছে। ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত আল-জাজিরাকে বলেছেন, হাসিনার বিষয়ে ভারত জটিলতার মধ্যে পড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে তার প্রতি জনগণের ক্ষোভকে তারা উপেক্ষা করতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই নয়াদিল্লি চাইবে, ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরুক। তিনি (হাসিনা) ভারতের জন্য সবসময়ই সর্বোত্তম পছন্দ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারতকে মানতে হবে বাংলাদেশে হাসিনাকে আর কখনো সুযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এর পরিবর্তে ভারতের উচিত, ঢাকার অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। শ্রীরাধা দত্ত বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু আমাদের অবশ্যই এ নির্দিষ্ট এজেন্ডা (হাসিনার প্রত্যর্পণ) ছেড়ে এগিয়ে যেতে হবে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যদি আর মিত্রতা নাও থাকে, তবু তাদের একে অপরের প্রতি শিষ্টাচার বজায় রাখা প্রয়োজন।’
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছিল ভারত। ভারতের সঙ্গে হাসিনার ব্যক্তিগত সম্পর্কটাও পুরোনো। ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে তার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানসহ পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। ওইসময় হাসিনা এবং তার ছোট বোন রেহানা জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখন তাদের আশ্রয় দেন। হাসিনা নয়াদিল্লিতে তার স্বামী এম এ ওয়াজেদ, সন্তান এবং রেহানার সঙ্গে একাধিক বাড়িতে ছিলেন এবং অল ইন্ডিয়া রেডিওর বাংলা বিভাগে খণ্ডকালীন কাজও করেছেন।
ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক চক্রবর্তী বলেন, ‘এবার আমরা হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাইনি। একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তাকে স্বাভাবিকভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। কারণ তিনি তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারত তাকে থাকতে দিয়েছিল। কারণ সেটা ছাড়া আর বিকল্প কী ছিল?’
পিনাক আরও বলেন, ‘তিনি (হাসিনা) কি বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবেন; বিশেষ করে এখন যখন তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে? তিনি ভারতের প্রতি বন্ধুত্বসুলভ ছিলেন এবং এ ব্যাপারে ভারতের নৈতিক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।’ ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক দক্ষিণ এশীয় বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “ভারতে হাসিনার উপস্থিতিটা ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে কাঁটা’ হয়ে থাকবে।”
বিশ্লেষকরাও মনে করেন, হাসিনাকে ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না। হাসিনার নাম এ ভারতের উপড়ে ফেলা উচিত দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই।

হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর