জানুয়ারিতে নতুন বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটছে না
১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪৭
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বছরের শুরুতে নতুন বই পাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটছে না। বিশেষ করে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই ছাপাতে সবগুলো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি শেষ করতে ব্যাপক বিলম্ব এবং প্রাথমিকের বই মুদ্রণে নিম্নমানের কাগজসহ নানা অভিযোগ আসায় শুরু হতেই লেজেগোবরে অবস্থা বিরাজমান। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক নবম শ্রেণির বই ছাপানোর কাজ শুরু হলেও ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপাতে ব্যাপক গড়িমসি এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)তে আওয়ামী লীগ দোসরদের অস্থিরতার খেসারত দিতে হবে শিক্ষার্থীদের। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র প্রায় অর্ধ-মাস বাকি।
শুরুতেই হোঁচট খায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড
বিগত ১৫ বছর ধরে শেখ হাসিনা এবং দীপু মনি গংদের ছত্রছায়ায় নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপানো এবং কোটি কোটি টাকার ছাপানোর কাজ করে ফুলেফেঁপে উঠা চক্রটি এ বছর শুরু হতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে। খোদ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)’র সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক রিয়াজুল হাসানের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ ওঠে।
জানা যায়, চাকরির বয়সসীমা শেষ হওয়ায় আওয়ামী লীগপন্থি এ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার পিআরএলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চেয়ারম্যান পদে আঁকড়ে থাকতে কয়েক মাস ধরে তদবির করে আসছিলেন তিনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে আরও তিন মাস চেয়ারম্যান পদে রাখার সব বন্দোবস্তও করেছিল। বিগত আওয়ামী লীগের সময় ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ এনসিটিবিতে সদস্য (প্রাথমিক) পদ পান অধ্যাপক রিয়াজুল হাসান। ডা. দীপু মনির সময়েও তিনি সাড়ে চার বছর এ পদে চাকরি করেন। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম ও সদস্য অধ্যাপক মশিউজ্জামানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানোয় ২০২৩ সালে এপ্রিল মাসে তাকে ওএসডি করা হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তদবির করে তিনি নিজেকে ‘বৈষম্যের শিকার’ দাবি করে এনসিটিবির চেয়ারম্যান পদ বাগিয়ে নেন। সর্বশেষ এ বছর ব্যাপক সমালোচনার মুখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসানকে সরিয়ে দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ বছর ২৬ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়। কিন্তু এতে এনসিটিবির কার্যক্রমের অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।
তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোস্তফা জব্বারের ভাই রাব্বানী জব্বারের আনন্দ প্রিন্টার্সকে এবং আরেক দোসর অগ্রণী প্রিন্টার্সকে অনিয়ম করে বিপুল কাজ দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। এসব অনিয়মের কারণে গত সেপ্টেম্বরে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার ক্রয়সংক্রান্ত আদেশ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় বাতিল করা হয়।
মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে বেশি সমস্যা
এনসিটিবির উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রক সূত্র জানায়, ২০২৬ সালের বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রাথমিক স্তরের মোট পাঠ্যবই ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার ৩৭৯ কপি। আর মাধ্যমিক ও ইবতেদায়ি স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ২১ কোটির বেশি বই ছাপানো হবে। এর মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের সংখ্যা ৪ কোটি ৪৩ লাখের বেশি, সপ্তম শ্রেণির ৪ কোটি ১৫ লাখের বেশি ও অষ্টম শ্রেণির মোট বই ৪ কোটি ২ লাখের বেশি। নবম শ্রেণির মোট পাঠ্যবই ৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ২৮ কপি। এর মাঝে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যবই ছাপাতে বেশির কাজই এখনো বাকি।
অভিযোগে জানা যায়, মোট বইয়ের এক-দশমাংশের বেশি কাজ পেয়েছে চারটি প্রেস। সেগুলো হলো অগ্রণী প্রিন্টিং প্রেস, কর্ণফুলী প্রিন্টিং প্রেস, কচুয়া ও আনোয়ারা প্রিন্টিং প্রেস। এনসিটিবির অনুরোধ ছিল কার্যাদেশ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করে প্রেসগুলো যেন বই ছাপার কাজ শুরু করে। কিন্তু এ চারটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি সময়ক্ষেপণ করে একেবারে শেষ সময় গত ৪ ডিসেম্বর সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার চুক্তি করে। ফলে এসব বই ছাপা শেষ করতে আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত লেগে যাবে। নতুন বছর শুরু হতে না হতেই চলে আসবে জাতীয় নির্বাচন ও পবিত্র রমজান মাস। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান যদি নির্ধারিত সময়ে বই দিতে না পারে, তাহলে একেবারে ঈদের পর শিক্ষার্থীরা বই হাতে পেতে পারে।
এ কারণে আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরুতে এসব শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পাবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক নবম-দশম শ্রেণির বই ছাপানোর কাজ শুরু হলেও ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম-তিন শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপাতে এভাবে গড়িমসি করা হলে তার খেসারত দিতে হবে শিক্ষার্থীদের।
জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৪ ডিসেম্বর মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টমের চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়। তার আগে গত ২৭ নভেম্বর পর্যন্ত ষষ্ঠ শ্রেণির ৫৪টি লটে বই ছাপানো-সংক্রান্ত চুক্তি হয়েছে। বাকি ৪৪টি লটের চুক্তি কয়েকদিন আগে সম্পন্ন হয়। ৭ম শ্রেণির ২৪টি লটের চুক্তি হলেও আরও ৭৬টি লট বাকি ছিল, যা কয়েকদিন আগে শেষ হয়। আর ৮ম শ্রেণির ১৮টি লটে চুক্তি হলেও বাকি আরও ৮২টি লট শেষ হয় কয়েকদিন আগে।
দরপত্রের শর্তানুযায়ী, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এনসিটিবির চুক্তির পর বই ছাপার জন্য ৫০ থেকে ৭০ দিন সময় পায়। নতুন বছর আসার আগে এত কম সময়ে এত বিপুল পরিমাণ বই ছেপে সরবরাহ করা কঠিন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
মুদ্রণ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত এ সময় নতুন শিক্ষাবর্ষের সব বই ছাপানো শেষ হয়ে থাকে। সেখানে বই ছাপানোর চুক্তিই হলো কয়েকদিন আগে। বছরের শুরুতে মাধ্যমিকের কিছু বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো সম্ভব হলেও সব বই ছাপা শেষ হতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। যার মধ্যে মাধ্যমিকের প্রায় ১৪ কোটির বেশি বই ছাপানো বাকি রয়েছে।
নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের বই দেওয়ার চেষ্টা করছি -এনসিটিবি সচিব
এনসিটিবির বর্তমান সচিব অধ্যাপক মো. সাহতাব উদ্দিন জানান, আমরা নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের বই দেওয়ার চেষ্টা করছি। বই ছাপানোর সব চুক্তি শেষ করা হয়েছে। তবে এবার মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা অনুযায়ী বই ছাপানোর কাজ দেয়া হয়েছে। তাই দ্রুত বই ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব। শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছানো যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কাজের মান নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা যেখানেই সমস্যা পাচ্ছি সেখানেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। আমাদের একাধিক টিম, মন্ত্রণালয়ের টিম ও ইন্সপেকশন এজেন্ট সবাই কাজ করছে। এরপরও আমরা যে শতভাগ সফল হব সেটা বলতে পারছি না। তবে আপনাদের কাছে যদি নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের তথ্য থাকে, তাহলে আমাদের জানাবেন। আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’
এত বিপুল পরিমাণ বই এক মাসের মধ্যে ছাপানো সম্ভব নয় -সাবেক সভাপতি
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, মাধ্যমিকের তিন শ্রেণির বই ছাপানোর চুক্তি শেষ করার পর বই ছাপাতে আরও ৫০-৭০ দিন সময় লাগবে। ফলে এত বিপুল পরিমাণ বই এক মাসের মধ্যে ছাপানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে নবম-দশম শ্রেণির বইয়ের কাজ চলছে। সেখানে বইয়ের ফর্মা অনেক বড়। ফলে মাধ্যমিকের কিছু বই জানুয়ারির শেষের দিকে সরবরাহ করা গেলে শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই পৌঁছাতে ফেব্রুয়ারি মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।
তিনি আরও বলেন, ‘এনসিটিবি বছরের শুরুতেই একটি সুন্দর পরিকল্পনা নিয়েছিল। ক্যালেন্ডার করেছিল, কোন কাজটা কীভাবে হবে। সে অনুযায়ী কাজ করতে পারছে না। এতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের বিষয় আছে, আরও আনুষঙ্গিক বিষয়ও আছে। এনসিটিবি তার ছক অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিতে পারছে না, এ কথাটা সত্য।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নূর-ই-আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘সারা দেশের সব প্রতিষ্ঠানেই এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা রয়ে গেছে। এখন আমরা কাজ করতে গিয়ে প্রতিটি জায়গায় দেখছি, সেই আগের মানুষগুলোই ঘুরেফিরে আসছে।’
এনসিটিবি অবশ্য বলছে, নিয়ম মেনেই সব কাজ হচ্ছে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বলেছেন, আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের সব কাজ হয়ে থাকে। এখানে যত রকমের অংশগ্রহণ বা যাই হোক, সবক্ষেত্রেই পিপিআর ফলো করেই আমরা কাজগুলো করছি। শুধু এনসিটিবিই নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গাফিলতির কারণেও বই ছাপানোর সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
সরকারের আগেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল- অভিভাবক পরিষদ
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সংগঠন বাংলাদেশ অভিভাবক পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ রকিব উদ্দিন ফারাবি বলেন, এনসিটিবি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওয়ামী লীগের দোসররা এখনো বহাল তবিয়তে আছে। তাই শুরু হতেই অন্তর্বর্তী সরকার সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। আর মুদ্রণ সংশ্লিষ্ট শিল্পে কালো টাকা কামিয়ে আওয়ামী লীগ দোসররা ওত পেতে আছে এ সেক্টরে ঝামেলা পাতাতে।
রাজধানীর মিরপুর মনিপুর স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তনিমা রহমানের বাবা বেসরকারি চাকরিজীবী আকবর আলী বলেন, বই পেতে পেতেই যদি বছরের কয়েক মাস লেগে যায়, তাহলে বাচ্চারা পড়বে কখন। আওয়ামী লীগের সময় বিভিন্ন চক্রগুলো এখনো সক্রিয়, যা এ সরকারের সতর্ক থাকা দরকার ছিল। ইতঃপূর্বে দেখা গেছে, প্রকাশিত পাঠ্যপুস্তকগুলোয় কোথাও একটি অধ্যায়ের অংশবিশেষ নেই, আবার কোথাও এক পৃষ্ঠার সঙ্গে পরবর্তী পৃষ্ঠার মিল নেই। ভুলে ভরা এমন পাঠ্যপুস্তক নিয়ে অতীতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। ভুলে ভরা পাঠ্যপুস্তক শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কাজেই মানসম্মত ও ত্রুটিমুক্ত বই প্রকাশে কর্তৃপক্ষকে মনোযোগী হতে হবে। শিক্ষার্থীদের বই তুলে দেওয়ার দায়িত্ব এনসিটিবির ওপর ন্যস্ত। কাজেই তাই সময়মতো বই না পাওয়া গেলে তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে। বস্তুত মানসম্মত বই শিক্ষার্থীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। একইসঙ্গে তারা যাতে উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের চর্চায় আগ্রহী হয়, সে বিষয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এসব বিষয়ে সমাজ যদি পিছিয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।