শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা রাজনীতির ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৯:৪২
সোনার বাংলা রিপোর্ট
: জুলাই ৩৬ বিপ্লব-পরবর্তী মুক্ত বাংলাদেশে আজ সাংবাদিক সমাজ সবচেয়ে বেশি যাদের মনে করছে, তাদের অন্যতম হলেন আবদুল কাদের মোল্লা। তিনি শুধু একজন জননেতা ছিলেন না, ছিলেন একজন সাংবাদিক নেতাও। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের দাবি আদায়ের সংগ্রামে।
আবদুল কাদের মোল্লা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি স্মরণীয় নাম। আবদুল কাদের মোল্লা ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে এ নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন ওপারে মহান রবের সান্নিধ্যে। নির্বাহী আদেশে রশিতে ঝুলিয়ে তার ফাঁসি কার্যকর করেছে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। জাতিসংঘের মহাসচিব থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, মানবাধিকার সংগঠনের অনুরোধ উপেক্ষা করেই ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। এক্ষেত্রে মৌলিক মানবাধিকারের ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। নানা কারণে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে একটি আলোচিত এবং ঘটনাবহুল মামলা হিসেবে স্থান করে নিয়েছে আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলাটি। এ মামলাকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একের পর এক ঘটনার কারণে বার বার বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম হয় মামলাটি।
কারণ ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের আপিল বেঞ্চ গঠন করা হয় আপিল আবেদন শুনানির জন্য। ১ এপ্রিল থেকে শুনানি শুরু হয়। ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় কাদের মোল্লাকে। ৫ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন। এরপরই শুরু হয় ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি। ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাত ১০টা ১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয় সরকার পক্ষের জন্য আপিলের বিধান রেখে। আইন সংশোধনের পর সরকার আবদুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করে। বিচার ব্যবস্থার সকল নজির উপেক্ষা করে বিচার চলাকালে আইন সংশোধন করা হয় তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে।
জন্ম ও শৈশব : আবদুল কাদের মোল্লা একটি নাম, একটি বিস্ময়কর প্রতিভা ও একটি জীবন্ত ইতিহাস। আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৪৮ সালের ২ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলাস্থ সদরপুর উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের জরিপের ডাংগি গ্রামে নিজ মাতুলালয়ে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম সানাউল্লাহ মোল্লা ও মাতার নাম বাহেরুন্নেসা বেগম। আবদুল কাদের মোল্লা ছিলেন ৯ ভাই-বোনের মাঝে ৪র্থ।
তিনি মেধাবী একজন ছাত্র হিসেবে ১৯৫৯ ও ১৯৬১ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বৃত্তি লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিস্টিটিউট থেকে প্রথম শ্রেণিতে মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতকার্য হন। ফরিদপুরের বিখ্যাত রাজেন্দ্র কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৬ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৮ সালে তিনি একই কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। কিন্তু প্রবল আর্থিক সংকটের কারণে এরপর তাকে শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া হয়নি তখন আর। ফরিদপুরের এস এস একাডেমি নামক একটি স্কুলে তিনি শিক্ষকতা করেন কিছুকাল।
১৯৬৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএসসি করার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। মিষ্টভাষী ও আকর্ষণীয় চারিত্রিক মাধুর্যের অধিকারী হওয়ায় আবদুল কাদের মোল্লা হয়ে উঠেছিলেন তার সহপাঠী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক সবার প্রিয়পাত্র। মুক্তিযুদ্ধের কারণে ১৯৭১ সালে মাস্টার্স পরীক্ষা না হওয়ায় তিনি বাড়ি চলে যান।
২৩ মার্চ ১৯৭১-এ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জেসিও মফিজুর রহমানের ডাকে এলাকার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের সাথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে অংশগ্রহণ করেন শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা। ১ মে তারিখে হানাদার বাহিনী ফরিদপুরে পৌঁছার দিন পর্যন্ত তার এ ট্রেনিং অব্যাহত থাকে।
পরবর্তীতে তিনি ১৯৭২-এর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। যুদ্ধের সময় প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা না হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই আরো অনেকের মতো আবদুল কাদের মোল্লার লেখাপড়ায়ও ছন্দপতন ঘটে। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিক্ষা প্রশাসনের ডিপ্লোমায় অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরে আবার ১৯৭৭ সালে শিক্ষা প্রশাসন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন।
আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এমএড পরীক্ষার রেজাল্টের পরে তিনি বাংলাদেশ রাইফেলস পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরে তিনি একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এ সংস্কৃতি কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে রিসার্স স্কলার হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী সেন্টারে যোগ দেন। জনাব মোল্লা বেগম সানোয়ার জাহানের সাথে ১৯৭৭ সালের ৮ অক্টোবর তারিখে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। দুই পুত্র ও চার কন্যার সুখী সংসার তাদের। সব সন্তানই দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
সাংবাদিকতা : একজন নির্ভীক সাংবাদিক ছিলেন আবদুল কাদের মোল্লা। বর্ণাঢ্য জীবনের শেষ দৃশ্যে তিনি আমাদের কাছে একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল সময়টা অতিবাহিত করেছেন একজন নির্ভীক সাংবাদিক হিসেবে। গৌরব-সাফল্যের ধারাবাহিকতায় উদয়ন উচ্চ-বিদ্যালয়, রাইফেল পাবলিক স্কুল এবং মানারাত স্কুলের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে সাব-এডিটর পদে যোগদান করেন তিনি। শিক্ষকতা পেশায় যে সত্যের পরশ পেয়েছিলেন, তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি সাংবাদিকতার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনি পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ সময়ে তার ক্ষুরধার ও বস্তুনিষ্ঠ লেখা প্রকাশ হতে থাকে দেশের জাতীয় দৈনিকসমূহে। ‘বীক্ষণ’ ছদ্মনামে তার লেখা আর্টিকেলগুলো সচেতন পাঠক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে।
আবদুল কাদের মোল্লা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য ছিলেন। সাংবাদিকতা ও লেখালেখির পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েন সাংবাদিকদের দাবি আদায়ের সংগ্রামে। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ১৯৮২ ও ১৯৮৪ সালে পরপর দুবার তিনি ঐক্যবদ্ধ ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অন্তরে দ্রোহ আর বিপ্লবের চেতনা লালন করেও সদা হাস্যোজ্জ্বল এ মানুষটি ছিলেন সাংবাদিক আড্ডার প্রাণকেন্দ্র।
কিন্তু একজন সাংবাদিকের জীবন সাধারণভাবেই কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। কখনো সমাজের বিপথগামী অংশ, কখনো কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল আবার কখনো বা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তির রোষানলে পড়তে হয় তাকে। সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্বে উৎসর্গিত হয় সাংবাদিকের জীবন। চারপাশের চেনাজন, পরিচিত বন্ধুমহল একসময়ে পরিণত হয় তার শত্রুতে। হানে প্রাণঘাতী ছোবল। যে ছোবলের রূপ হয় নানারকম। মানসিক যন্ত্রণায় বিপন্নতা, শারীরিক আঘাতে পঙ্গুত্ববরণ, প্রাণঘাতী হামলায় মৃত্যু, কারাবন্দিত্বের নিঃসঙ্গ যাতনা কিংবা প্রহসনের বিচারে জীবনাবসান। এসবই ছিল যুগে যুগে সাংবাদিক জীবনের অনিবার্য উপাদান। আবদুল কাদের মোল্লার জীবনেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় একসময় সাংবাদিকতার পেশাকে বিদায় জানাতে হয় তাকে। কিন্তু যে পেশা তার জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে এর মহত্তকে তিনি ধারণ করতেন সবসময়।
রাজনৈতিক জীবন : আবদুল কাদের মোল্লার রয়েছে সংগ্রামী রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তিনি কমিউনিজমের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ সংগঠনের সাথে যুক্ত থাকার পর বাঁক পরিবর্তন করে ইসলামী আদর্শে আকৃষ্ট হন এবং ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করনে। ছাত্র আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭৯ সালের মে মাসে জামায়াতের রুকন (সদস্য) হয়ে যান। তিনি অধ্যাপক গোলাম আযমের ব্যক্তিগত সেক্রেটারি এবং ঢাকা মহানগরীর শূরা সদস্য ও কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে অল্পদিনের ব্যবধানেই জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য হন। ১৯৮২ সালে তিনি ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি ও পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের প্রথম দিকে ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর, অতঃপর ১৯৮৭ সালে ভারপ্রাপ্ত আমীর এবং ১৯৮৮ সালের শেষ ভাগে তিনি ঢাকা মহানগরীর আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিনি জামায়াতের প্রধান নির্বাচনী মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ২০০০ সালে জামায়াতে ইসলামীর এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে মনোনীত হন। তিনি ২০০৪ সালের মার্চ মাসে স্বল্প সময়ের জন্য ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। উক্ত দায়িত্বের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে তিনি চারদলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশর প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন আবদুল কাদের মোল্লা। বিশেষ করে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
কারাবরণ : আবদুল কাদের মোল্লাকে বিভিন্ন মেয়াদে পাঁচবার জেলে যেতে হয়। আইয়ুব সরকারের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালনের দায়ে ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো তিনি বাম রাজনীতিক হিসেবে গ্রেফতার হন। জেনারেল এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের কারণে আবদুল কাদের মোল্লাকে আবারও আটক করে রাখা হয় ১৯৮৫ সালের ২২ এপ্রিল থেকে ১৪ আগস্ট। প্রায় চার মাস আটক থাকার পরে উচ্চ আদালত তার এ আটকাদেশকে অবৈধ ঘোষণা করলে তিনি মুক্ত হন। এরপর ১৯৯৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের সাথে একই দিনে গ্রেফতার হন। সাত দিন পরে তিনি মুক্ত হন। সর্বশেষ ২০১০ সালের ১৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের প্রধান গেট থেকে গ্রেফতার হন আবদুল কাদের মোল্লা।
কারাগারেও নির্যাতন : আবদুল কাদের মোল্লা ২০১৩ সালের ৪ এপ্রিল ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে অভিযোগ করে বলেন, কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে নানাভাবে নির্যাতন করছে।
ছয়টি অভিযোগে আবদুল কাদের মোল্লার সাজা হয় ৪:১ ভিত্তিতে। অর্থাৎ বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা আপিল বিভাগের ছয়টি সাজার ক্ষেত্রেই ভিন্ন মত এবং ভিন্ন রায় প্রদান করেন। ছয়টি অভিযোগের মধ্য থেকে পাঁচটি অভিযোগ থেকে তিনি অবদুল কাদের মোল্লাকে সম্পূর্ণরূপে খালাস দেন। আইন সংশোধনের পর সরকার আবদুল কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আপিল আবেদন করে।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়ার পরপরই শুরু হয় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি। ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয় আবদুল কাদের মোল্লার। সকালে রিভিউ আবেদন খারিজের পর রাতেই কার্যকর করা হলো তার ফাঁসি। কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে ফাঁসি সম্পন্নের পর রাত সোয়া ১১টায় পুলিশ, বিজিবি ও এপিবিএন সদস্যরা ১৫টি গাড়িযোগে কাদের মোল্লার লাশ নিয়ে রওনা হয় ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলায়। লাশ পৌছার আগেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কবর খুঁড়ে রাখে। রাত ৩টায় আমিরাবাদ গ্রামে লাশ পৌঁছার পর গভীর রাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির মধ্যে এবং তাদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় জানাযা নামায। রাত ৩টা ৫৭ মিনিটে জানাযার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লাশ দাফনের ব্যবস্থা করে। ফাঁসির পর লাশ নিয়ে রওনার খবর পেয়েই রাতের শীত উপেক্ষা করে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন ছুটতে থাকে আমিরাবাদের দিকে। কিন্তু সমস্ত রাস্তায় পুলিশ প্রহরা বসিয়ে তাদের আটকে দেয়া হয়।
ইসলামের বিজয় আসবে : ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পরিবারের সদস্যরা আবদুল কাদের মোল্লার সাথে সর্বশেষ সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা চরম ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে আমার রক্তকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজে লাগায়। কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে যেন জনশক্তি নিয়োজিত না হয়। যারা আমার জন্য আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দিয়েছে আমি তাদের শাহাদাত কবুলিয়াতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করি এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করি। আল্লাহ তাদের সর্বোত্তম পুরস্কার দান করুন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি পূর্বেই বলেছি, সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে এ সরকার আমাকে হত্যা করতে চাচ্ছে। আমি মজলুম। আমার অপরাধ আমি ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছি। শুধুমাত্র এ কারণেই এ সরকার আমাকে হত্যা করছে। আমি আল্লাহ, রাসূল ও কুরআন ও সুন্নাহে বিশ্বাসী। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমার এ মৃত্যু হবে শহীদি মৃত্যু। আর শহীদের স্থান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের মৃত্যু দিলে এটা হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ পাওয়া। এর জন্য আমি গর্বিত।’
বিশ্বজনমত উপেক্ষা : আবদুল কাদের মোল্লার বিচারিক প্রক্রিয়া, রায় এবং রায়-পরবর্তী কার্যক্রমকে গোটা বিশ্ব অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করে। আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পরপরই এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় খ্যাতিমান ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান বলেন, ‘এ ফাঁসি কার্যকরের ঘটনাটি একটি দুর্ভাগ্যজনক। সরকারের একটি দুর্ভাগ্যজনক কাজ ছাড়া আর কিছুই নয়।’ রায় বাস্তবায়নের পরপরই কাতার সরকার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে এ অন্যায় কাজের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায়।
তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি রজব তৈয়ব এরদোগানও এক প্রতিক্রিয়ায় এ বিচারিক হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি তার বিবৃতিতে বলেন, আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি ইতিহাসের এক ন্যক্কারজনক ঘটনা যার কারণে ইতিহাস আজকের ক্ষমতাসীনদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না। ১২ ডিসেম্বর এ ফাঁসি কার্যকর করার পরদিনই ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন এক বিবৃতি দিয়ে এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানান। রায়ের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি এই ফাঁসির প্রতিক্রিয়ায় তীব্র উদ্বেগ জানান। একই রকম উদ্বেগ জানান ব্রিটিশ ও অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান নেভি পিল্লাই তীব্র সমালোচনা করে এ কার্যক্রমকে স্থগিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। ব্রিটিশ অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান লর্ড কার্লাইলও একই ভাবে এ ফাঁসির সিদ্ধান্তকে অন্যায় অভিহিত করে তা স্থগিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
স্লোবদন মিলাসোভিচের আইনজীবী স্যার জিওফ্রি নাইস বলেন, এ বিচার প্রক্রিয়াটিতে মোটেও আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা হয়নি। এরকম ত্রুটিপূর্ণ বিচার শেষে ফাঁসি কার্যকর করার জন্য যে তাড়াহুড়ো করা হচ্ছে তা অন্যায় ও দুঃখজনক। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বার হিউম্যান রাইটস কমিটির চেয়ারম্যান ক্রিস্টি ব্রাইমলো বলেন, আন্তর্জাতিক মহল এখন এ বিষয়ে একমত যে, এ বিচারটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত করার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেয় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটেন।
এদিকে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকারিতা স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী সাঈদা ওয়ার্সি এক বিবৃতিতে বলেন, কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডে আমি উদ্বিগ্ন। ব্রিটেন সব পরিস্থিতিতে মৃতুদণ্ডবিরোধী। এটা মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও (এইচআরডব্লিউ) আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রকাশিত ডেইলি স্টারের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি শেখ হাসিনাকে টেলিফোন করে বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ সময় কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর নিয়ে আলোচনা করেন। এ রায় বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে সহিংসতা বাড়তে পারে এমন আশঙ্কার কথাও জানান মার্কিন মন্ত্রী। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বিচার করা সম্ভব না হলে এ ধরনের কার্যক্রম এড়ানোরও পরামর্শ দেন জন কেরি। বিশ্বের ৪০টি দেশে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লার গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। শুধুমাত্র তুরস্কেই ৮০টিরও বেশি জায়গায় জানাযা অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্বের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রম ঘটনা।