সেক্যুলারিজম নয়, ইসলামই দেশবাসীকে স্বস্তি দেবে
১ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৬
॥ মাহবুবুল হক ॥
বাংলাদেশ একটি বহুত্ববাদের দেশ। শুধু বহুত্ববাদ বললে বিষযটি পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করা যায় না। ধর্মকে যেমন আদর্শবাদ বলে চালানো যায় না- তেমনি আদর্শবাদকে ধর্ম বলে চালানো যায় না। যেমন ইসলাম ধর্মকে আমরা মানবরচিত আদর্শবাদ বলে উল্লেখ করতে পারি না। আবার পুঁজিবাদ, সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্রবাদ- এসবকে ধর্ম বলে চিহ্নিত করতে পারি না। প্রধান যে ৪টি ধর্ম পৃথিবীতে এখনো বিদ্যমান রয়েছে এবং সম্ভবত কিয়ামত পর্যন্ত এসব ধর্ম বিরাজমান থাকবে- এটা বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে উপলব্ধি করা যায়। কিন্তু মানব রচিত কোনো আদর্শ বা মতবাদ ৮০ থেকে ১০০ বছরের বেশি জীবন্ত থাকে বলে বাস্তব দৃষ্টান্ত চোখে পড়ে না। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজনে আদর্শের উদ্ভব হয়, কিন্তু যখনই দেখা যায় এ আদর্শের মধ্যে ঝুলন্ত বিষয় রয়েছে অর্থাৎ যে আদর্শ সাথে সাথে বা কিছু সময়ের ব্যবধানে অকার্যকর হয়ে পড়ছে, তখনই ধীরে ধীরে সেই আদর্শ লোপ পাওয়ার গতিতে শক্তি সঞ্চারিত হয়। প্রধান ধর্মগুলোর বাইরে গত প্রায় ১২ হাজার বছরে দেশে দেশে, রাজ্যে রাজ্যে স্থানীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদলে রত আদর্শবাদ বা মতবাদ সৃষ্টি হয়েছে, প্রায় সবগুলোই অর্থাৎ শত শত মতবাদ বা আদর্শবাদের জন্ম ও মৃত্যু সংঘটিত হয়েছে। এ যাবত ধর্ম ও জীবন দর্শনের বাইরে এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে যেসব আদর্শ ও মতবাদ টিকে আছে, তা হলো সাম্যবাদ বা তার অনুষঙ্গ সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ এবং বৃহত্তর ক্যানভাসে জাতীয়তাবাদ। সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্রবাদ বা পুঁজিবাদকে চ্যালেঞ্জ করে পৃথিবীর দেশে দেশে জোরালোভাবে ৭০ থেকে ৮০ বছর অবস্থান করেছিল তারপর থেকে পূর্বের মতো সেই মতবাদ বা আদর্শে জৌলুস আর নেই। ধীরে ধীরে শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। এখন বিশ্বের অল্প কিছু দেশে; বিশেষ করে রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, কিউবা, আমেরিকার দক্ষিণে লাতিন আমেরিকার ছোট কিছু দেশে এখনো সমাজতন্ত্রের বা সাম্যবাদের গবেষণা চলছে। মজার ব্যাপার হলো সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র আন্তর্জাতিক মতবাদ বা আদর্শবাদে চিহ্নিত হলেও জাতীয়তাবাদকে কখনো ছাড়তে পারেনি। সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ সে কারণে দেশে দেশে নানারূপে বিকশিত হওয়ার চেষ্টা করেছে। রাশিয়ার সাম্যবাদের সাথে, চীনের সাম্যবাদ বা সমাজতন্ত্র কখনো এক ধরনের ছিল না। জাতীয়তাবাদ ও স্থানীয় সংস্কৃতি সব দেশে সর্বকালে আমরা জ¦লজ্যান্ত থাকতে দেখেছি। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ভেঙে গেল, তখন আমরা লক্ষ করেছি যে, রাশিয়ার অধীনে বা সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে যত দেশ ছিল প্রায় সব দেশ পুনরায় ধর্ম, স্থানীয় সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবাদ নিয়ে সমুজ্জ্বল হওয়ার চেষ্টা করতে থাকলো। এখনো সেই চেষ্টা দেশে দেশে অব্যাহত থাকলো। ৭০ দশক থেকে এ পর্যন্ত ছোট ছোট দেশের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধ চলতে থাকলো। এখনো ইউক্রেনের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে। পুঁজিবাদে তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। পুঁজিবাদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সংমিশ্রণ সবসময় ছিল। এখনো আছে। ব্রিটেনে সাম্যবাদ ভিন্নরূপে সমুজ্জ্বল আছে। এখানে পুঁজিবাদ পূর্বের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। কিন্তু সরলতা একদম হারায়নি। গ্রেট ব্রিটেনকে এখনো ইউরোপের কিছু দেশ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আফ্রিকার কিছু ছোট ছোট দেশ এবং কানাডা ব্রিটেনকে ফলো করে। এখনো করে। কিন্তু কার্লমার্কস ও এঞ্জেল যে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদের কথা বলেছিলেন, সেই সাম্যবাদ পৃথিবীতে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবুও নানা ধরনের আবেগীয় কারণে উপযুক্ত দেশসমূহে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাম্যবাদকে টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চলছে।
পুঁজিবাদ মানুষের রক্তের সঙ্গে সংযুক্ত বলে পুঁজিবাদ বা ক্যাপিটালিজম সময়ে সময়ে কিছুটা দুর্বল হলেও স্থায়ীভাবে সফলতার মধ্যেই তো অবস্থান করছে। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শক্তিশালী ও সরল রাষ্ট্রগুলো যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স, জার্মানি, খোদ রাশিয়া, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামান্য কিছু দেশ এবং বলতে গেলে পরমাণু অস্ত্র তৈরির দেশসমূহ জাতীয়তাবাদ ও পুঁজিবাদের মধ্যেই সন্তরণ করছে। একসময় রাশিয়াকে বলা হতো রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের দেশ। চীনকেও বলা হতো। এখন রাশিয়া ও চীন কিছু কিছু পুঁজি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মধ্যে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে চীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। রাশিয়াও গবেষণার মাধ্যমে কমিউনিজমের মধ্যে নানা বিভক্তি এনে বাস্তবমুখী এন্টারপ্রাইজ তৈরির চেষ্টা করছে। এসব আলোচনার মধ্যে আমরা বিস্ময়করভাবে উপলব্ধি করছি যে, মানুষ পুঁজির ভক্ত। পুঁজির কারণে মানুষের বিকাশ ঘটছে। ব্যক্তি পুঁজি গোষ্ঠী পুঁজি ও রাষ্ট্রীয় পুঁজির মধ্যে দারুণভাবে এখন প্রতিযোগিতা চলছে। বলা হচ্ছে, ব্যক্তি পুঁজি ও গোষ্ঠী পুঁজি রাষ্ট্রীয় পুঁজিকে পরাভূত করছে। দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী ব্যক্তিগণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পুঁজির মালিক। তারাই এখন সারা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক। তাদের হাতেই দুনিয়ার শান্তি ও সুখ অনেকাংশে নির্ভরশীল। তারাই নাকি দুনিয়ার মধ্যমমানের দেশগুলো পরিচালনা করে থাকে। সব দেশেই নির্বাচনের মাধ্যমে বা বিপ্লব-বিদ্রোহ ও অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়। এর পেছনের নিয়ন্ত্রক শক্তি থাকে তিন ধরনের শক্তি ও পুঁজি। রাষ্ট্রীয়, গোষ্ঠীয় ও ব্যক্তিগত শক্তি ও পুঁজি। এ তিন পুঁজি যখন যেখানে অর্থাৎ যখন যে দেশের সরকার পরিবর্তন করতে চায়, দূরাগত পরিকল্পনার মাধ্যমে তার অবসান ঘটায় অথবা ঘটাতে পারে। এ কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে আমরা শুনে আসছি যে, এ পৃথিবী দুইশত ফ্যামিলি পরিচালনা করে। যেসব দেশে নিশ্চয়ই সরকার আছে, সেই সরকারের অধীনে মন্ত্রিসভা আছে, মন্ত্রিসভার অধীনে নানারকম থিঙ্কট্যাঙ্ক আছে। কিন্তু এসব হলো ছায়া মন্ত্রিসভার মতো। যেই ফ্যামিলি বা যেই গোষ্ঠী এ ধরনের রাষ্ট্র চালায়, তাদের ওপরই সবকিছু নির্ভর করে।
শুরুতে আমরা বলেছিলাম, বাংলাদেশ বহুত্ববাদের দেশ এবং সেক্ষেত্রে আমরা কিছুক্ষণ আদর্শ বা মতবাদের বিষয়টি খুবই সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করলাম। সে আলোচনা বাংলাদেশে কোন কোন আদর্শবাদ ও মতবাদ এখন সঞ্জীবিত, সে আলোচনায় আমরা যেতে পারিনি। মোটাদাগে বলতে গেলে বাংলাদেশে সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রবাদ এখন দুর্বল স্থানে রয়েছে। তারা মূলত সেক্যুলার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে। এদের বাইরে রয়েছে জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তি ও গোষ্ঠী পুঁজিবাদ। এ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীবাদ গোটা বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই গলধঃকরণ করে ফেলেছে। ব্যাংক ও ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি মোটামুটি গিলে ফেলেছে। প্রোডাক্টিভ ইন্ডাস্ট্রিগুলো পূর্বের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই। এর কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পুঁজি, সরকারি পুঁজি, ব্যক্তিগোষ্ঠী পুঁজি, মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে পুঞ্জীভূত হয়েছে। বড় বড় শক্তিশালী দেশে সেই পুঁজি সেখানে হয়তো বাচ্চা ফুটাচ্ছে। সুইচ ব্যাংকসহ মানিলন্ডারিংয়ের টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে জমা করা হয়েছে এবং যারা এসব করেছে, তাদের প্রায় সবাই সেক্যুলার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। সুতরাং দেখা যাচ্ছে মানবরচিত মতবাদ বা আদর্শ বাংলাদেশে বহুফ্রন্ট খুলতে পারেনি। সেক্যুলার মতবাদের ব্যক্তি ও মানুষ বাংলাদেশে ‘উলিল আমর’ বা ‘উলিল আলবাবে’ নিমজ্জিত ধর্ম বা জীবনবিধান বাংলাদেশে খুব বেশি পূর্বে সঞ্চারিত হয়নি। বলতে গেলে আশির দশক থেকে ধর্ম বা জীবনবিধান ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক, বীমা, শিল্প-কারখানা ও কৃষিতে ধর্ম ও জীবন বিধানবাদী মানুষ অগ্রসর হয়েছে। মোটামুটিভাবে প্রায় সাড়ে চার দশক বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ জীবনের সর্বক্ষেত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সাধনা করছে।
এখন শুধু বাংলাদেশকে বহুত্ববাদী দেশ বললে ভুল বলা হবে। এখানে তো এখন বিশেষ কোনো আদর্শ বা মতবাদকে আমরা চাঙ্গা হতে দেখছি না। আমরা দেখছি জাগতিক বা ইহকালীনবাদ ছাড়া সামনে রয়েছে ধর্ম বা জীবনবিধান। মানবরচিত যেসব বাদ অর্থাৎ মতবাদ ও আদর্শ বাংলাদেশে সমুজ্জ্বল নয়, জাতীয়তাবাদ, পুঁজিবাদ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। যেটুকু পেরেছে, তার প্রায় সবটুকু বিদেশে চালান হয়ে গেছে।
এসব বাদ বা আদর্শ দেশের সম্মান ও মর্যাদা রাখতে পারেনি। ধর্ম এবং জীবন ব্যবস্থা কিছুটা হলেও এ দেশ এবং এ দেশের মানুষকে আশাজাগানিয়া করে রেখেছে। সে কারণে বহুত্ববাদের দেশ না বলে বহু ধর্মের দেশ বলাই বাঞ্ছনীয়। যদিও এ দেশে মুসলিমের সংখ্যা শতকরা ৯১%, সনাতন ধর্ম ৮%, বৌদ্ধ ধর্ম ৩.৬%, খ্রিস্টান ০.৩%, বাকিটা অন্যান্য উপজাতি ও নৃগোষ্ঠী। (২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী)।
কিন্তু আবেগ বাদ দিয়ে যদি আমরা বাস্তবের সম্মুখীন হই, তাহলে কি এ দেশকে বহু ধর্মের দেশ বলা যায়? মুসলিম ছাড়া অন্যান্য ধর্মের পার্সেন্টেজ খুবই কম। যে কারণে পূর্বে সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘু বলা হতো। কিন্তু মাঝে দেশটিকে সেক্যুলার দেশ অভিহিত করায় নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশকে আমরা আর মুসলিম দেশ বলতে পারছি না। কিন্তু মুসলিমকে কি সেক্যুলার বলা যায়। নিশ্চয়ই বলা যায় না। কারণ মুসলিম হতে হলে পরকালকে বিশ্বাস করতে হয়। আর পরকালকে বিশ্বাস করলে সেক্যুলার থাকা যায় না।
শুধু এ দিকটাই যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টানদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ পরকালকে বিশ্বাস করে। এখানে একটা বড় ধরনের কন্ট্রাডিকশন রয়ে গেছে। মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিস্টান নিজ নিজ ধর্ম পালন বা উদযাপন করে সেক্যুলার হতে পারে না। অথচ আমরা এ তিন শ্রেণির মানুষের সম্ভারে যে দেশটি প্রতিষ্ঠিত তাকে আমরা সেক্যুলার দেশ বলে অভিহিত করছি।
একজন ব্যক্তি বিভিন্নভাবে খণ্ডিত হতে পারে না। সে ধর্মে একরকম, রাজনীতিতে আরেক রকম। অর্থনীতি, দর্শন ও সমাজনীতিতে বিভিন্ন রকম হতে পারে না। যে সমাজে সে বাস করে, সেই সমাজের মৌলিক স্বপ্ন, ঐতিহ্য, চিন্তাধারা, সমাজ ব্যবস্থা। তাকে নানাভাবে আচ্ছন্ন করে। সেই আচ্ছন্নতা থেকেও সে মুক্ত হতে পারে না। সুতরাং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনন, চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, বোধ ও বিশ্বাসকে মানুষ উপেক্ষা করতে পারে না। কিন্তু এ বাস্তব অবস্থাকেই মধ্যযুগে অস্বীকার করা হয়েছিল। সেই ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। বিজ্ঞানের জয়যাত্রার সাথে এর সম্পর্ক ছিল। বিজ্ঞানের উন্নতি ও বিকাশ যখন তীব্রতর হয়, তখনই মানুষ আল্লাহকে ছেড়ে চার্চ, পাদ্রি, ইত্যাদির দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেটাকে ইসলামে শিরক হিসেবে সাব্যস্ত করা আছে। শুধু কুরআনে কেন? তাওরাত, যবুর, ইঞ্জিল সবগুলো আসমানী গ্রন্থেই মহান আল্লাহর সাথে কাউকে বা কোনো সৃষ্টিকে শরিক করার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও শক্তিকে কাগজে-কলমে খণ্ডিত করে ফেলে। যার ফলে একদিকে বিজ্ঞান; অপরদিকে উপাসনালয়গুলো নানাভাবে বিভক্ত হয়ে যায়। রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। ধর্ম বন্দী হয়ে যায় ধর্মালয়ে এবং ধর্মগুরুদের মাঝে। ধর্মালয় থেকে প্রোডাক্টিভ কিছু মানুষ অবলোকন করতে পারে না। এ অবস্থায় ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ ধীরে ধীরে ধর্মবিরোধী হয়ে ওঠে। একদিকে সামন্ত রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অপরদিকে চার্চের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং অন্যদিকে শুধু বিজ্ঞানকে নিয়ে অগ্রসর হওয়ার ফলে মানুষ ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এরই সূত্র ধরে যারা ধর্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তাদের বলা হয় প্রোটেস্ট্যান্ট। বিদ্রোহী এ লোকগুলোই জমা হয় ইংল্যান্ডে। যারা বিশ্বাসী, তারা ঐতিহ্যবাহী খ্রিস্টান ধর্মকে আঁকড়ে ধরে থাকে। তাদের বলা হয় ক্যাথলিক। ক্যাথলিকরা জড়ো হয় আয়ারল্যান্ড এবং স্কটল্যান্ডে। এ কথাগুলো কেন বললাম। মানুষ সবসময় এক ধর্মের মতবাদের ও দর্শনের লোজন নিয়ে বসবাস করতে চায়। সেভাবেই সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। ধর্মবিরোধী হলেও প্রোটেস্ট্যান্টরা কিন্তু চার্চকে একেবারে বিলুপ্ত করেনি। তাদের মধ্যে সংশয় থেকে যায়। যেটার ব্যাখ্যা করেছেন বার্টেন রাসেল।
যেটার ইংরেজি নাম এগনস্টিজম বাংলায় সংশয়বাদ অর্থাৎ আল্লাহ আছেন অথবা নেই। এ নিয়ে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। মানুষের কাজ হলো উন্নতি করা ও অগ্রসর হওয়া। এসব পাল্লায় পড়ে মানুষ কিন্তু ধীরে ধীরে নাস্তিক হয়ে পড়ে। এতে দেখা যায় ব্রিটেনের প্রোটেস্ট্যান্টদের চার্চগুলো গত ২০০ বছরে বিলুপ্ত প্রায় হয়ে গেছে। অর্থাৎ বেচা-বিক্রি হয়ে গেছে। সুখের বিষয় এ শতাব্দীতে এসে মানুষ আবার ধর্মের দিকে ফিরে আসার চিন্তা-ভাবনা করছে। সেটা অন্য কথা। আমরা এখানে যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, সেটা হলো ভারত বিভাগের সময় টু-ন্যাশন থিউরি ব্রিটেনের মতোই সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। ব্রিটেনের মানুষ যেমন নিজ নিজ আদর্শ নিয়ে বিভক্ত সমাজ গড়ে তুললো, তেমনি ১৯৪৭ সালে হিন্দু ও মুসলমান আলাদা ভূখণ্ড নিয়ে বিভক্ত হওয়ার চেষ্টা করলো। ভারত যেমন এটা সঠিকভাবে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্ন সম্ভব হয়নি, গ্রেট ব্রিটেনেও সেই একই অবস্থা। কিন্তু এর মধ্যেও সংখ্যাগুরুদের অধীনেই বা পৃষ্ঠপোকতার মধ্যেই সংখ্যালঘুদের অবস্থান তৈরি হয়ে আছে। এখানে মেজরিটির কথা এসেছে। ‘মেজরিটি ইজ এ মাস্ট’ অর্থাৎ মেজরিটিই শাসন। এখান থেকে আবার গণতন্ত্রের জন্ম্ সেদিকে আমরা এখন যাচ্ছি না। আমরা আমাদের প্রসঙ্গেই এখন থাকব। আমরা বাংলাদেশকে সেক্যুলার দেশ বলছি।
এটা কোনোভাবেই বলা যায় না। কোনো সূত্রেই বলা যায় না। এটা একটা বড় ধরনের বিভ্রম। এটা কারা করেছে? কেন করেছে? কী উদ্দেশে করেছে? এবং কোন লক্ষ্য সামনে রেখে করেছে, সেসব ইতিহাস আমাদের সবার জানা। ভারত নিজেকে সেক্যুলার দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু সেখানে শুরু থেকেই গোঁড়া হিন্দু ও লিবারেল হিন্দুদের শাসন চলে আসছে। কয়েকজন মুসলিমকে প্রেসিডেন্ট বানিয়ে তারা বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা ধর্মনিরপেক্ষ। অর্থাৎ সারা বিশ্বই জানে যে, ভারত কোনোদিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাউকে (হিন্দু ছাড়া) মনোনীত করবে না। মোটাদাগে সেখানে হিন্দুত্বের শাসনেই চলছে। মাইনরিটির কোনো স্বাধীনতাই সেখানে নেই। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সেখানে অবরুদ্ধ। বাংলাদেশেও মুসলিম ছাড়া কখনো একজন হিন্দু প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হবেন না- এটাই বাস্তবতা। তবে এখানকার মাইনরিটি পৃথিবীর যেকোনো স্থানের মাইনরিটির চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে এবং ভবিষ্যতে নিশ্চিত করে বলা যায়, এ অবস্থায় বিবর্তন ঘটবে না। কারণ শতকরা ৯০% মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী। যারা পরমত ও পরধর্ম সহিষ্ণু।