গার্মেন্টস খাতে অস্থিরতার নেপথ্যে দেশি-বিদেশি অপশক্তি


৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৫:৪২

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥

ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে বিপুল ক্ষতির মুখে দেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী রফতানি খাত। আন্দোলনে হতাহতসহ দেশের সাত শতাধিক পোশাক কারাখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। এতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার লোকসানসহ রফতানি বাজার ধরে রাখা ও ধারাবাহিক ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। সরকার ও শ্রমিক সংগঠন এবং আটটি ট্রেড ইউনিয়ন নতুন মজুরি বোর্ড নিয়ে কাজও করছে। কিন্তু আন্দোলনে শ্রমিকরা একটি অপশক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে অভিযোগ করছেন শ্রমিক নেতা ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা।

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর ও সাভারে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে গত ৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালেও মিরপুরে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে মেট্রো স্টেশনের নিচে সংঘর্ষের সময় পুলিশকে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে দেখা যায়। মূলত শ্রমিকদের আন্দোলনের সূচনা হয় গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা। দুই দফায় প্রায় ছয় ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে।

তৈরি পোশাক খাতের এ অস্থিরতার পেছনে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয় থাকলেও এর পেছনে রাজনৈতিক ও বিদেশি ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। দেশের গার্মেন্টসশিল্প এলাকা ঢাকার মিরপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। গাড়ি ভাঙচুরসহ অগ্নিসংযোগ করে আন্দোলনকারী কিছু দুর্বৃত্ত। তবে সহিংসতার সাথে নিরেট পোশাক শ্রমিকরা জড়িত নয় বলে দাবি সরকারের।

সরকার বলছে, এ আন্দোলনের নেপথ্যে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা জড়িত, মূলত তারাই এসব সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগ করছে। গত ২ নভেম্বর সোমবার পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদারের দেয়া তথ্যমতে, রাজধানীর মিরপুরে চলমান শ্রমিক আন্দোলেন থেকে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর, গাড়ি পোড়ানো ও ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের ঘটনায় ৫টি মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গত দুই দিনে ২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোনে সহিংসতার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংযোগ থাকতে পারে। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে কোনো কিছু করতে পারবে, সরকার তা বিশ্বাস করে না। তবে দলটির কাছে লুটপাটের প্রচুর টাকা রয়েছে। সেই অর্থ খরচ করে কোথাও কোথাও কোনো না কোনোভাবে নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা তারা করতে পারে।

শ্রমিক আন্দোলনে পতিত আওয়ামী লীগের যে সম্পৃক্ততা রয়েছে, তা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ গাজীপুরে চলমান পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সাজবুল ইসলামকে সরাসরি নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে শ্রমিক বিক্ষোভে সম্পৃক্ত থাকতে দেখে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির সুযোগ নিয়ে বহিরাগত ও অপশক্তি আন্দোলনের আড়ালে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে দেশের বৃহৎ এ রফতানি খাতটিকে অস্থির করতে পতিত সরকারের কিছু মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ও পোশাকশিল্প মালিককে দায়ী করেছে সরকার। তবে তাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে বা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকি তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, পোশাক শ্রমিক আন্দোলনের নামে এই অস্থিরতা সৃষ্টির সঙ্গে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত। যাদের কেউ কেউ বিগত সরকারের আমলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
এদিকে তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আইনের ১৩-এর ১ ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য পোশাক কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হবে মালিকরা এবং পরবর্তীতে সাত শতাধিক কারখানা বন্ধও হয়ে যায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও কারখানার নিরাপত্তার জন্য।
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, শ্রমিকরা বলছে, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা। সরকার একটি বোর্ড গঠন করেছে। আমরা চাই এই বোর্ড সব পক্ষের কথা বিবেচনায় রেখে যেটাকে যৌক্তিক মনে করবে, সেরকম একটা মজুরি তারা নির্ধারণ করুক। শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনের মধ্যে সরকার ছয় সদস্যবিশিষ্ট মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়। গত ১ নভেম্বর রোববার শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এ ঘোষণা দিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান। পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন ও পুলিশের সঙ্গে ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়ে গত ১ নভেম্বর মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কিন্তু এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

চলমান এ আন্দোলনে গাজীপুরে আহত তৈরি পোশাক শ্রমিক তৌফিক শেখ (২২) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবিবর রহমান তবির ছেলে। গত ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার ঢাকার উত্তরার শিন শিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। গত ৪ নভেম্বর বুধবার ছয়ঘরিয়ে গ্রামে তার জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে বিদেশি ষড়যন্ত্র ও পতিত ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগের যে সম্পৃক্ততা রয়েছে, তা ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বক্তব্যেও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং ভারত সেসব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। গত ৩ নভেম্বর মঙ্গলবার নয়াদিল্লিতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এমন মন্তব্য করেন। উল্লেখ্য, রফতানি মার্কেটে বাংলাদেশের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। একইসঙ্গে পতিত ফ্যাসিবাদের পৃষ্ঠপোষকও দেশটি।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান চলমান পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতায় পরিস্থিতি উসকে দিয়ে এ খাতকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে ষড়যন্ত্রকারী ও ধান্দাবাজরা। কারণ শীত মৌসুম সামনে রেখে পোশাকশিল্পে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়, তা ধ্বংস করার জন্য গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করেন তিনি। একইসঙ্গে ষড়যন্ত্রের ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান।
আমীরে জামায়াত সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনাও করেছেন। বলেন, দেশের প্রধান রপ্তানি খাত গার্মেন্টসশিল্প কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকারের ব্যর্থতা, জ্বালানির উচ্চমূল্য, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বিশ্ববাজারে এ খাতের অনিশ্চয়তা এবং ক্রয়াদেশ বাতিল, প্রত্যাহার কিংবা আগের মতো না পাওয়ার কারণে তৈরি পোশাক খাত সত্যিই এক কঠিন সময় পার করছে। অন্যদিকে ঘরভাড়া, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা খরচসহ এ শিল্পে কর্মরত জনশক্তির জীবনও কঠিন সংকটের মুখোমুখি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, শিল্প বাঁচলে শুধু মালিক বাঁচবে না, দেশও বাঁচবে। সুতরাং শিল্প উদ্যোক্তা ও শিল্পে নিয়োজিত জনশক্তি— দুটিকেই বাঁচানোর দায়িত্বশীল ভূমিকা সরকারকে পালন করতে হবে। সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শন ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনটি মূলত গত জুন মাসে শুরু হয়েছে। মজুরি বোর্ড আগে প্রতি পাঁচ বছর পরপর গঠন করা হতো। এবার দুই বছরের মাথায় গঠিত হয়েছে। তবে সরকারের বিলম্বিত পদক্ষেপের কারণে পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন এই পর্যায়ে এসেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এ আন্দোলনে শ্রমিকরা ফ্যাসিস্টদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছেন। পোশাক কারখানা মালিকদের ক্ষুদ্র একটি অংশ এর সাথে জড়িত। আমরা ট্রেড ইউনিয়নগুলো বিজিএমইএ, বিকেএমইএ মজুরি বোর্ড নিয়ে কাজ করছি। গত ৪ অক্টোবর বুধবার মজুরি বোর্ডের প্রথম সভা হয় এবং ছয়-সাতটি সভা শেষে এর চূড়ান্ত রূপ পাবে। আমরা আশা করছি এবং সরকারকে চাপ দিচ্ছি— যাতে ডিসেম্বরের মধ্যে এটি চূড়ান্ত হয় এবং জানুয়ারি থেকে শ্রমিকরা নতুন মজুরি বোর্ডের অধীনে বেতন পায়, তা শ্রমিকরা নিশ্চিত হতে পারে। আমরা শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর। আমরা তাদের সাথে আছি। সোনার বাংলার প্রতিবেদক সরকারের সিদ্ধান্তের আগেই তার এ বক্তব্য নিয়েছেন। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, তার এ দাবি মেনে নেয়া হয়েছে।

কারখানাগুলো সচল রাখতে শ্রমিকদের আন্দোলন থেকে সরে আসার আহ্বান জানান এডভোকেট আতিকুর। তার মতে, কারখানা বন্ধ হলে বিদেশি বায়াররা চলে যাবে এবং ক্রয়াদেশ বাতিল হবে। এতে দেশের রফতানি বাজার নষ্ট হবে, সে জায়গাগুলোয় স্থান করে নেবে প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত। এজন্য দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে ইতোমধ্যে মন্তব্যও করেছেন। চলমান শ্রমিক আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার এবং সরকার দলীয় কর্মীদের বাড়াবাড়ি আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এ শ্রমিক নেতা।