২৮ অক্টোবর : দুই দশক পর ফিরে দেখা

দেশকে রাজনীতিশূন্য করার গভীর ষড়যন্ত্র


২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:৫২

॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বহুল আলোচিত ও রক্তাক্ত অধ্যায়। আজ থেকে বিশ বছর আগে চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় সংঘটিত সহিংসতা দেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। লগি-বৈঠা নিয়ে সংঘর্ষ, মানুষের প্রাণহানি এবং নিহত ব্যক্তিদের লাশের ওপর উল্লাস প্রকাশের দৃশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল সুদূরপ্রসারী। তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা হস্তান্তর, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং পরবর্তী নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছিল। এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াকে আরও সংঘাতময় করে তোলে।
এই ঘটনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও পরবর্তী প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। মূলত ২৮ অক্টোবর ছিল বাংলাদেশের রাজনীতিকে ধ্বংস করে দেশকে রাজনীতিশূন্য করার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র। রাজনৈতিক বিরোধের নিষ্পত্তি যখন যুক্তি, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে সহিংসতার মাধ্যমে করার চেষ্টা করা হয়, তখন তার ক্ষতিকর প্রভাব কেবল তাৎক্ষণিক সময়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, জনগণের নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও এর অভিঘাত বহন করে।
২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে শুধু একটি দিনের সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। বরং বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি, ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে ঘটনাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পর্ব হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নিচে এর কয়েকটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হলো—
১. রাজনীতিতে ভয়ের সংস্কৃতি
রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণ, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জনসমর্থনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা। রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে নিজেদের আদর্শ, কর্মসূচি ও কার্যক্রম তুলে ধরবে; জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের সমর্থন কিংবা বিরোধিতা করবে— এটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক ধারা।
কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন মানুষের মন জয়ের পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে ভীত ও দুর্বল করার প্রবণতা তৈরি হয়। ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে।
এ ধরনের সহিংসতার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এমন একটি বার্তা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় যে, বিরোধিতা করলে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে। এর ফলে সাধারণ কর্মী-সমর্থক থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও ভীতি ছড়িয়ে পড়ে।
গণতন্ত্রে রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি হওয়া উচিত জনগণের আস্থা ও সমর্থন। ভয় দেখিয়ে সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করা সম্ভব হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে পারস্পরিক অবিশ্বাস, প্রতিহিংসা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে পারে।
২. প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর চাপ
রাষ্ট্রের প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রশাসনের দায়িত্ব হলো আইন, সংবিধান ও বিধিবিধান অনুসরণ করে জনগণের সেবা করা। সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রশাসনের পেশাগত নিরপেক্ষতা ও ধারাবাহিকতা বজায় থাকা জরুরি।
রাজনৈতিক সংঘাত যখন তীব্র হয় এবং প্রশাসনের ওপর দলীয় আনুগত্যের চাপ সৃষ্টি হয়, তখন কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রাজনৈতিক প্রভাব, ভয়ভীতি কিংবা প্রতিশোধের আশঙ্কা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেললে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়।
২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উত্থাপিত হয়, সেগুলো বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার বৃহত্তর সংকটের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রশাসনের শক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যে নয়; বরং আইনের শাসন, পেশাগত দক্ষতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতায়।
৩. বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থা হলো নাগরিকের অধিকার রক্ষার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাবের ঊর্ধ্বে থেকে বিচারকরা আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন— এটাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মৌলিক শর্ত।
রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবেশ বিচার বিভাগের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপ সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়াতে পারে। বিচারক, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা যদি মনে করেন যে, রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাব বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থের বিষয় নয়; এটি সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রশ্ন। বিচারককে ভয়মুক্ত পরিবেশে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
৪. জনগণের নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিক অধিকারের সংকট
রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, সম্পদ, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষা করা। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকলে কিংবা শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে ভয় পেলে তার নাগরিক স্বাধীনতা কার্যত সংকুচিত হয়।
২৮ অক্টোবরের সহিংসতা মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রাণহানি এবং প্রকাশ্য সহিংসতার ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্ক সৃষ্টি করে । বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা সম্পর্কে উদ্বেগ বাড়ায়।
নাগরিকের নিরাপত্তা কোনো দলীয় অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপদে বসবাস, মতপ্রকাশ এবং আইনসম্মত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
২৮ অক্টোবরের ঐতিহাসিক শিক্ষা হলো— রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে তার ক্ষতি কোনো একটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। শেষ পর্যন্ত গোটা সমাজে অবিশ্বাস, নিরাপত্তাহীনতা এবং সহিংসতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। তাই রাজনৈতিক বিরোধের নিষ্পত্তি হতে হবে আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে।
৫. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংস
২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার সহিংসতার অন্যতম সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার ওপর নেতিবাচক অভিঘাত। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবেশ তৈরি করা নির্বাচনব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস যখন নির্বাচনকেন্দ্রিক সংকটকে গভীর করে, তখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের সহিংসতা তৎকালীন রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। ক্ষমতা হস্তান্তর ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ, রাজপথে সংঘাত এবং নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি হয়, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে পরিচিত। এটি হাসিনার ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার নীলনকশার অংশ। এ পথেই নির্ধারিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেশ দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রবেশ করে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২৯ ডিসেম্বরের ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তবে নির্বাচনটি যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তার পেছনে ছিল জরুরি অবস্থার সময়কার শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং পরিবর্তিত সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা।
আমার মূল্যায়নে ২৮ অক্টোবরের ঘটনা বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থার অবক্ষয়ের ধারাবাহিকতা বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সহিংসতা এবং প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার প্রবণতা গণতান্ত্রিক আস্থাকে দুর্বল করে। যখন রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জনের পরিবর্তে প্রতিপক্ষকে অকার্যকর করে দেওয়ার কৌশলে ঝুঁকে পড়ে, তখন নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা হুমকির মুখে পড়ে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, বিরোধীদলের রাজনৈতিক অধিকার এবং নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে পরবর্তী সময়ে গুরুতর বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিরোধীদলগুলোর অভিযোগ এবং নির্বাচন নিয়ে জনআস্থার সংকট বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— নির্বাচনব্যবস্থাকে কোনো দল বা গোষ্ঠীর ক্ষমতা অর্জনের হাতিয়ারে পরিণত করা যাবে না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা, বিরোধীদলের অবাধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
২৮ অক্টোবরের ঘটনাকে তাই শুধু অতীতের একটি সহিংস রাজনৈতিক অধ্যায় হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর এবং নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার একটি ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট।