ফ্যাসিবাদ কায়েমে আধিপত্যবাদের নগ্ন হস্তক্ষেপে ২৮ অক্টোবর ট্র্যাজেডি


২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৩৪

॥ আবু জায়েদ আনসারী॥
‘২৮ অক্টোবর’ ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ২০০৬ সালের এই দিনে গোটা বিশ্ব মর্মাহত ও বিস্মিত হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পল্টনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ দেখে। এমন বর্বরতা সভ্যতার এ যুগে অতীতে কেউ দেখেনি। সেদিন সাতজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করা ও বিকৃত করার যে উল্লাস, সন্ত্রাসীদের সেই চিত্র সুস্থ ও বিবেকসম্পন্ন কোনো মানুষ সহ্য করতে পারেনি, কাঁদিয়েছে সকলকে।
রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, বিভেদ থাকবে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর হবে— এটি সুস্থধারার রাজনীতির চরিত্র। কিন্তু চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশ করছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী শাখা। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাবেশে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সন্ত্রাসীরা পিস্তল, বন্দুক নিয়ে গুলি চালায়। লগি-বৈঠা দিয়ে জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের কর্মীদের পিটিয়ে হত্যা করে। দেশীয় ও বিদেশি সকল গণমাধ্যমে সেই নারকীয় ঘটনা প্রচারিত হয়।
ঘটনার দৃশ্যপটে স্পষ্ট হয় ওইদিনের হামলার ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। জামায়াতের পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ ছিল বিকেল ৩টায় বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের হায়েনারা বেলা ১১টায় সমাবেশস্থলে মঞ্চ প্রস্তুতের সময়ই হামলা চালিয়ে জামায়াতের ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের আহত করে এবং হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। পোড়ানো হয় রাষ্ট্রীয় সম্পদ। সমাবেশ শুরুর আগেই কেনই বা তারা হামলা চালিয়েছিল? এর সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা কী ছিল— তা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ থেকে জাতি উপলব্ধি করতে পেরেছে ভুক্তভোগী হয়ে।
২৮ অক্টোবরের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে আধিপত্যবাদী শক্তি প্রথম নগ্ন হস্তক্ষেপ শুরু করে। দেশকে করে তোলে অস্থিতিশীল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে, অকার্যকর করে ফেলে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয়। আসন্ন নির্বাচন বানচাল করার পূর্ব অঙ্কিত ছক বাস্তবায়ন করতে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি জনআস্থা নষ্টে এমন অরাজকতা, হত্যা ও রাষ্ট্র এবং জনগণের সম্পদের ক্ষতিসাধন করতে থাকে।
সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে একটু নজর দিলে একটি আশাঙ্কাজনক বার্তাও পাওয়া যায়। সেটি হলো বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিষয়ে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার সাথে বহুবার সংলাপে বসেছেন। কিন্তু তারা ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। ফলে সংকট গভীর হয়। এটিও ছিল ষড়যন্ত্রের অংশ। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার জন্য সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল বিচারপতি কেএম হাসানকে তারা প্রধান উপদেষ্টা বানাবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রধান অভিযোগ ছিল বিচারপতি কেএম হাসান বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন অতীতে। এজন্য তারা তাকে মেনে নিতে চাচ্ছিল না। এই ক্যাচালটি কেন লাগানো হলো? এটি নিছক দলীয় সংকীর্ণতা ছিল না, বরং এর সাথে সম্পৃক্ত ছিল আধিপত্যবাদীদের ষড়যন্ত্র!
একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সার্বিক স্থিতিশীলতার জন্য আইনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত বাহিনী পুলিশের কার্যকার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর পুলিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানে ভূমিকা পালন করেনি। অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি, নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। ফলে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। পরিণতিতে সেদিন পুলিশ সদস্যরাও আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সেদিন অনেক পুলিশ সদস্যের পরনের প্যান্ট পর্যন্ত খুলে নিয়েছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীরা।
সেদিনের দৃশ্যের মূল্যায়নে উঠে এসেছে যে, আধিপত্যবাদী শক্তির প্রচ্ছন্ন প্রভাবে পুলিশ বাহিনীকে অকার্যকর রাখা হয়েছিল সেদিন। হয়তো ভয়ংকর কোনো আগাম বার্তা দেয়া হয়েছিল তাদের। যার কারণে নির্বিকার থেকেছেন তারা। ২৮ অক্টোবর পল্টনে নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত একটি বিবৃতি দিয়েছিল, যা ছিল দায়সারা এবং পরোক্ষভাবে আধিপত্য বিস্তারের বার্তা। কূটনৈতিক বিবৃতিতে ভারত আওয়ামী লীগের হত্যাকাণ্ডকে এড্রেস না করে বক্তব্য দিয়েছিল সেদিন। অর্থাৎ ওই বার্তায় হত্যাকাণ্ডের ন্যূনতম ‘নিন্দা’ শব্দটি উচ্চারণ না করা ছিল রহস্যজনক।
গভীর ছক ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের টার্গেট করে হত্যাযজ্ঞ করে তোলা হয়েছে সেদিন এবং পরবর্তী সাড়ে ১৫ বছর। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) দুজন মন্ত্রী অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে তাদের মন্ত্রণালয় চালিয়ে নজির স্থাপন করেছিল। স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। রাজনৈতিক স্বাভাবিক অবস্থায় দলটির অর্জন আরও বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। এজন্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা হয় এবং সমাবেশে গুলিবর্ষণ করে হত্যাচেষ্টা করা হয়। দ্বিতীয়ত, আধিপত্যবাদী শক্তি জামায়াতের অগ্রযাত্রায় তাদের স্বার্থ হাসিল করতে পারবে না— এ জন্য দলটির বিনাশ কিংবা নেতৃত্ব হত্যা জরুরি মনে করেছিল। এ কারণে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে জামায়াতের শীর্ষনেতাদের হত্যা করে। একইভাবে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর জামায়াতের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ধ্বংস করতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হত্যার বৈধতার সম্মতি উৎপাদন করে এবং শুরু করে ক্রসফায়ার, গুম ও হত্যা।
২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ড ফ্যাসিবাদের ভিত রচিত হয়। হত্যাকাণ্ডকে বিনা বিচারে পার করার যে সংস্কৃতি চালু হয় তা দীর্ঘ সাড়ে ১৭ বছর চলতে থাকে। ওয়ান-ইলেভেনের পর দীর্ঘ দুই বছরের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে ২৮ অক্টোবরের বিচার না হওয়া ফ্যাসিবাদের পথে দেশকে নিয়ে যাওয়ার এবং আধিপত্যবাদী শক্তির প্রচ্ছন্ন মেকানিজম স্পষ্ট হয়। নির্দলীয় সরকার থাকাবস্থায় কেন সেই বিচারিক প্রক্রিয়া এগোয়নি, সেটি স্পষ্ট হয় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় দেশপ্রেমিক ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার মাধ্যমে। ফ্যাসিবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তি কীভাবে একত্রিত হয়েছিল সেসময় সেই বার্তাও পাওয়া যায়।
পল্টন হত্যাকাণ্ডের সময় সন্ত্রাসীরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র কোথা থেকে পেয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর সদ্য বিদায় নেয়া চারদলীয় জোট সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সন্ত্রাসীদের কেন গ্রেফতার করা হয়নি, অবৈধ অস্ত্র কেন উদ্ধার ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি, গোয়েন্দা তথ্য ছিল কি না, যে আওয়ামী ও ১৪ দলসহ বাম দলের সন্ত্রাসীরা জামায়াতের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে এমন তাণ্ডব চালাবে? এসবের পেছনে আধিপত্যবাদী শক্তির প্রচ্ছন্ন মদদ ছিল। যারা দেশকে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দিয়ে নিজের স্বার্থ উদ্ধারে কাজ করেছে।
এখন প্রশ্ন হলো— আধিপত্যবাদী শক্তি সবসময় কি বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করেই যাবে? পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সম্মতি উৎপাদন করে দেশের স্থিতিশীলনতা ধ্বংস করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করতেই থাকবে? না এসবের অবসানের বিকল্প নেই। প্রথমত, নিশ্চিত করতে হবে ২৮ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডটির সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের গ্রেফতার ও ন্যায়বিচার। এই হত্যাকাণ্ডটি নিঃসন্দেহে একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং চরম মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ড, যা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলেছে আধিপত্যবাদী শক্তি।
ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল সাংগঠনিকভাবে ওই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচার হওয়া জরুরি। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়া নিশ্চিতে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ যেসব মামলা প্রত্যাহার করে দায়মুক্তির চেষ্টা করেছে, সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করে বিচার নিশ্চিতে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কোনো রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠার জন্য কোনো নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়ে অস্থিতিশীলতা তৈরির সুযোগ পাবে না।
পল্টনের হত্যাকাণ্ডকে শুধু রাজনৈতিকভাবে বিবেচনার সুযোগ নেই, কারণ এর মাধ্যমে দেশকে গভীর সংকটে ফেলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক পথকে রুদ্ধ করে ফ্যাসিবাদী শাসন জাতির ঘাড়ে চাপানো হয়েছে, হাজার হাজার খুন, গুম, হত্যাকাণ্ড ঘটানো ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিদেশিদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পল্টন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সুষ্ঠু পদক্ষেপ যে দেশে সুস্থধারার রাজনীতির পথরেখা নির্মাণে সহায়ক হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সংবিধানের ৩৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী দেশের যেকোনো নাগরিকের অধিকার রয়েছে যে জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হওয়া এবং জনসভা ও শোভাযাত্রা করার। আওয়ামী লীগের ও ১৪ দলের সন্ত্রাসীরা নাগরিকদের অধিকার হরণ করে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এজন্য বাংলাদেশের বিদ্যমান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী তাদের বিচার গ্রহণযোগ্য। আইনে বলা হয়েছে— রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতনের মতো অপরাধগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ কেউ করলে তার বিচার এই আইনের অধীনে হয়ে থাকে।
এছাড়া রোম স্ট্যাটু (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির আইন): আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বা সিস্টেমেটিক (সুপরিকল্পিত) আক্রমণের অংশ হিসেবে কাউকে হত্যা করা হলে তা সরাসরি ‘ক্রাইমস এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল এবং তাদের নেতাকর্মীরা সেই কাজটি করেছে। সুতরাং আওয়ামী লীগকে পল্টন হত্যাকাণ্ডের বিচার থেকে দায়মুক্তি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই, বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।