তেলাপোকা আতঙ্কে মোদি


২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৭

॥ ওবায়েদ ইবনে গনি ॥
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মসনদ কাঁপছে তেলাপোকা আতঙ্কে। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) হলো ভারতের একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য থেকে অনলাইনে তৈরি হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মঞ্চ। এটি প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো নয়; বরং তরুণদের ক্ষোভ, বেকারত্ব, শিক্ষার্থীদের সমস্যা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির মতো বিষয় তুলে ধরার একটি মঞ্চ। এ দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। দলটি প্রতিষ্ঠা হয়েছে ২০২৬ সালের মে মাসে। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে বেকার তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার পর এ ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলনের সূচনা হয়। এর মূল লক্ষ্য হলো— বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা, ভোটার তালিকার অনিয়ম এবং রাজনৈতিক জবাবদিহি নিয়ে প্রতিবাদ করা।
অনলাইনে প্রথমে এ আন্দোলনের সূচনা করেন অভিজিৎ দীপকে নামে ভারতের একজন তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ। চলতি ২০২৬ সালে ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ হিসেবে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) গড়ে তুলে তিনি আলোচনায় আসেন। বেকারত্ব, পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট এবং তরুণদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের মতো বিষয় তার আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে। ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে ভারতের ঔরঙ্গাবাদ মহারাষ্ট্রে (বর্তমানে ছত্রপতি সম্ভাজিনগর) জন্মগ্রহণ করেন।
অভিজিৎ দীপকে বোস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে আসার আগে প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক প্রচার— দুই ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ২০১৮ সালে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে পুনের দুটি স্টার্টআপে প্রায় চার বছর ব্যাক অ্যান্ড ডেভেলপার হিসেবে চাকরি করেন। ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি আম আদমি পার্র্টির (আপ) সোশ্যাল মিডিয়া কার্যক্রমে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়।
সিজেপি গঠনের পেছনের ঘটনা
চলতি ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। বেকার তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি তেলাপোকার (ঈড়পশৎড়ধপয) সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে এমন মন্তব্য তরুণদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অবজ্ঞা করে।
এর প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ দীপকে ১৬ মে ২০২৬ তারিখে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) চালু করেন। প্রথমে এটি ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক অনলাইন উদ্যোগ। পরে বেকারত্ব, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অসন্তোষের কারণে আন্দোলনটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। তেলাপোকাকে প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার তাৎপর্য— প্রতিকূল পরিবেশেও তেলাপোকা টিকে থাকতে পারে। আন্দোলনটির ব্যঙ্গাত্মক বার্তা হলো— ব্যবস্থা (ঝুংঃবস) অবহেলা করলেও সাধারণ তরুণরা হারিয়ে যাবে না, বরং নিজেদের অস্তিত্ব ও অধিকার নিয়ে কথা বলবে।
আন্দোলনের প্রধান দাবি
সিজেপির আন্দোলনে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে— ১. বেকারত্ব: তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান এবং চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি। ২. শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার: পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ৩. রাজনৈতিক জবাবদিহি: দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ব্যর্থতার জন্য জবাবদিহি দাবি করা। ৪. নির্বাচনী স্বচ্ছতা: ভোটার তালিকা সংশোধন ও ভোটারদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
উল্লেখ্য, চলতি বছর জুন ও জুলাইয়ে শিক্ষা ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে দীর্ঘ ৩৬ দিন গড়ে ওঠা আন্দোলনটি বড় আকার ধারণ করে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই আন্দোলনের চাপ ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে অবদান রেখেছিল। তবে পদত্যাগের একমাত্র কারণ এ আন্দোলন ছিল— এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
সিজেপির ইশতেহার, সংগঠন ও ভবিষ্যৎ
গত ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া প্রতিবেদন ও দলটির প্রকাশিত নথি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এখন আর শুধু একটি ইন্টারনেট মিম বা ব্যঙ্গ নয়; এটি তরুণদের ক্ষোভকে সংগঠিত প্রতিবাদে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে প্রতিবাদী আন্দোলন হিসেবে সাফল্য পাওয়া; আর একটি কার্যকর রাজনৈতিক দল হয়ে ওঠা— দুটি আলাদা পরীক্ষা।
তারা আসলে কী চায়?
প্রাথমিক লক্ষ্য— শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং তরুণদের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেওয়া। গত জুনে সিজেপি পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে একটি শিক্ষা-সংস্কার ইশতেহার প্রকাশ করে। দলটির ওয়েবসাইটে আরো বিস্তারিত রাজনৈতিক প্রস্তাব রয়েছে। তবে এখানে এ দুই ধরনের নথির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি— একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনের দাবি; অন্যটি বৃহত্তর রাজনৈতিক অবস্থান।
ইশতেহারের প্রধান বিষয়
১. শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার : এনইইটিসহ (ঘঊঊঞ) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়মের জন্য দায় নির্ধারণ, শিক্ষার্থীদের ক্ষতির প্রতিকার এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ দাবিগুলোই সিজেপির প্রথম বড় আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল।
২. নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব : দলটির প্রকাশিত ইশতেহারে সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসন সংরক্ষণ এবং মন্ত্রিসভার অর্ধেক পদ নারীদের দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে এটি প্রচলিত ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের প্রস্তাবের চেয়ে বেশি উচ্চাভিলাষী।
৩. ভোটার অধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতা : বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ইশতেহারে বলা হয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্ট প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ইউএপিএ-তে গ্রেপ্তারের প্রস্তাবও আছে। এটি দলের প্রকাশিত রাজনৈতিক অবস্থান; আইনগতভাবে এমন ব্যবস্থা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা আলাদা প্রশ্ন।
৪. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা : আম্বানি ও আদানি-নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল এবং নির্দিষ্ট টেলিভিশন উপস্থাপকদের আর্থিক লেনদেন তদন্তের প্রস্তাব দলটির ইশতেহারে আছে। এর লক্ষ্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলেও, মালিকানার ভিত্তিতে লাইসেন্স বাতিলের প্রস্তাব নিজেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
৫. দলবদল ও রাজনৈতিক জবাবদিহি : কোনো বিধায়ক বা সংসদ সদস্য দল পরিবর্তন করলে তাকে ২০ বছর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সরকারি পদে থাকার অযোগ্য করার প্রস্তাব রয়েছে। এটি দলবদল নিরুৎসাহিত করার কঠোর পদক্ষেপ, তবে এর বাস্তবায়ন সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন তুলতে পারে।
শিক্ষা-সংস্কার ও ভোটার অধিকার বাস্তব জনসমস্যার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু কিছু প্রস্তাব শাস্তিমূলক ও চরম কঠোর। তাই সিজেপির রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করবে— তারা শুধু প্রতিবাদী স্লোগান দেবে, নাকি প্রতিটি প্রস্তাবের সঙ্গে কার্যকর আইন, অর্থায়ন, বাস্তবায়ন-পদ্ধতি ও নাগরিক অধিকার রক্ষার নিশ্চয়তাও দেবে। তবে সরকারি শিক্ষা-সংস্কার কর্মসূচির বিস্তারিত আর দলটির বৃহত্তর ইশতেহার এক জিনিস নয়।
সিজেপি কি সত্যিকারের রাজনৈতিক দল?
বর্তমানে সিজেপিকে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের চেয়ে তরুণদের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবে বোঝা বেশি যথাযথ। গত আগস্টে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানিয়েছিলেন, তাদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য নির্বাচনে অংশ নেওয়া নয়; বরং আন্দোলন ও জনচাপের মাধ্যমে সংস্কার আদায় করা।
সিজেপির শক্তি ও সীমাবদ্ধতা তিন স্তরে দেখা যায়
১. ডিজিটাল নেটওয়ার্ক : মিম, ব্যঙ্গ, ইনস্টাগ্রাম প্রচার এবং অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দ্রুত সমর্থক সংগ্রহ করেছে। তরুণদের কাছে জটিল রাজনৈতিক বিষয় সহজভাবে তুলে ধরাই এর বড় শক্তি। তবে অনলাইন অনুসারীর সংখ্যা সক্রিয় কর্মী বা ভোটারের সংখ্যার সমান নয়।
২. রাস্তার আন্দোলন ও নেতৃত্ব : অভিজিৎ দীপকের পাশাপাশি সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার মতো সংগঠকরাও সামনে এসেছেন। দিল্লির যন্তরমন্তর এবং অন্যান্য শহরে কর্মসূচি সংঘটিত করা প্রমাণ করে— অনলাইন জনপ্রিয়তাকে বাস্তব প্রতিবাদে রূপ দেওয়ার কিছু সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
৩. রাজ্যভিত্তিক সম্প্রসারণ : সিজেপি শিক্ষার্থীদের সমস্যায় আক্রান্ত রাজ্যগুলোয় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য স্থানীয় কমিটি, নিয়মিত সদস্য, অর্থের স্বচ্ছ হিসাব এবং দায়িত্ব বণ্টনের কাঠামো প্রয়োজন। এসবের পরিপক্বতা কতটা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো— সিজেপির নামের মধ্যে ‘পার্টি’ থাকলেও সেটি নিজেকে নির্বাচনী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা করেনি। তাই এর সাংগঠনিক সাফল্য আপাতত নির্বাচনে আসন জয়ের বদলে আন্দোলন গড়ে তোলা ও নীতিগত পরিবর্তন আদায়ের ভিত্তিতে বিচার করা উচিত।
ভারতের রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়েছে?
১. তরুণদের ক্ষোভকে জাতীয় আলোচনায় আনা : বেকারত্ব ও পরীক্ষার অনিয়ম ভারতের বহু তরুণের দীর্ঘদিনের সমস্যা। সিজেপি এ বিষয়গুলোকে ব্যঙ্গাত্মক পরিচিতি ও সংগঠিত প্রতিবাদের মাধ্যমে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীদের ক্ষোভকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দাবিতে রূপ দেওয়া ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২. সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ : ২০২৬ সালের এনইইটি (ঘঊঊঞ) পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করা হয়। তিনি পদত্যাগ করেন; তবে সেই সিদ্ধান্তে আন্দোলনের পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণও ভূমিকা রাখে। তাই পদত্যাগকে শুধু সিজেপির একক কৃতিত্ব বলা অতিসরলীকরণ হবে। চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যে সংগঠনটি নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে অভিযোগের প্রতিবাদেও যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এর কার্যক্রম শিক্ষা-সংক্রান্ত দাবির বাইরে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটাধিকার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
৩. বিরোধী রাজনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনা : সিজেপির প্রতিবাদে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন দেখা গেছে। কংগ্রেসের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু বিরোধীদলের সমর্থন পাওয়া আর কোনো দলের অধীনস্থ হয়ে যাওয়া এক নয়; সিজেপির স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এখনো পর্যবেক্ষণের বিষয়।
ভবিষ্যতে সিজেপি কোন পথে? এখানে তিনটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। এগুলো বিশ্লেষণভিত্তিক সম্ভাবনা, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়—
১. শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলন : সিজেপি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ভোটাধিকার নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন করতে পারে। এতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষকে একই দাবিতে একত্র করা সহজ হতে পারে। তবে আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জিত হলে সমর্থকদের সক্রিয়তা কমেও যেতে পারে।
২. নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ : ভবিষ্যতে যদি সিজেপি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে স্থানীয় প্রার্থী, তহবিল, বুথভিত্তিক সংগঠন এবং বিস্তারিত নীতিগত কর্মসূচি গড়তে হবে। অনলাইন জনপ্রিয়তা তখন কাজে লাগতে পারে, কিন্তু একা তা নির্বাচনী সাফল্য নিশ্চিত করবে না।
৩. বৃহত্তর বিরোধী আন্দোলনের অংশ হওয়া : সিজেপি কংগ্রেস বা অন্যান্য বিরোধীদলের সঙ্গে নির্দিষ্ট ইস্যুতে সমন্বয় করতে পারে। এতে আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তি বাড়তে পারে; তবে দলীয় স্বাতন্ত্র্য, নেতৃত্বের স্বাধীনতা এবং সাধারণ সমর্থকদের আস্থা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
সিজেপি কি ২০২৯ সালে নির্বাচনে লড়বে?
বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, সিজেপির ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা কম। কারণ প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে গত ১৪ অক্টোবর আবারও বলেছেন, সংগঠনটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধিত হবে না; এটি একটি স্বাধীন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবেই কাজ করবে। তবে ২০২৯ সাল এখনো ভবিষ্যতের ঘটনা। আগামী কয়েক বছরে সংগঠনের অবস্থান বদলাতে পারে। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা বিচার করতে হলে দুটি প্রশ্ন আলাদা রাখতে হবে— ১. সিজেপি নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে লড়বে কি না। ২. সিজেপি নির্বাচনে না লড়েও বিরোধী রাজনীতি, তরুণ ভোটার এবং জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারবে কি না। দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই বর্তমানে বেশি বাস্তবসম্মত।
২০২৯ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের তিনটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট
১. নির্বাচনের বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি : সিজেপি স্বাধীন আন্দোলন হিসেবে থেকে শিক্ষা, বেকারত্ব, ভোটাধিকার ও সরকারি জবাবদিহি নিয়ে প্রচার চালাতে পারে। অভিজিৎ দীপকে গত আগস্টে রয়টার্সকে বলেছিলেন, ভবিষ্যতে জনসমর্থন চাইলে নির্বাচনী রাজনীতিতে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা হতে পারে; তবে তখন তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা ছিল না। অক্টোবরে তিনি আরো স্পষ্টভাবে দল হিসেবে নিবন্ধনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন।
২. বিরোধীদলগুলোর সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয় : সিজেপি নিজে প্রার্থী না দিয়েও বিরোধীদলগুলোর কাছে তরুণদের দাবি তুলে ধরতে পারে; প্রার্থীদের কাছ থেকে নীতিগত অঙ্গীকার চাইতে পারে অথবা নির্দিষ্ট আসনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারে। তবে এটি এখনো একটি সম্ভাব্য কৌশল, ঘোষিত নির্বাচনী পরিকল্পনা নয়। দীপকে বলেছেন, ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে কিছু ইস্যুতে অবস্থান মিললেও সিজেপি স্বাধীন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হিসেবেই থাকবে।
৩. নিজস্ব প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে লড়া : এটি সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তন হবে। এর জন্য সিজেপিকে বর্তমান অবস্থান বদলাতে হবে, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং নির্বাচনী সংগঠন গড়তে হবে। গত আগস্টে রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিজিৎ দীপকে ভবিষ্যতে জনসমর্থনের ভিত্তিতে এমন পরিবর্তনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। কিন্তু অক্টোবরের বক্তব্য সেই সম্ভাবনাকে আপাতত আরো দূরে সরিয়ে দিয়েছে।
সিজেপি কি আম আদমি পার্টির মতো হতে পারে?
অনেকে সিজেপির সঙ্গে আম আদমি পার্টির (আপ) তুলনা করতে পারেন। কারণ আপও একটি বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলনের পটভূমি থেকে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল। তবে দুটি পরিস্থিতির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আপ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রার্থী, সংগঠন ও নির্বাচনী প্রচারে বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু সিজেপির কর্ণধার অভিজিৎ দীপকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী রাজনীতির বদলে স্বাধীন জনআন্দোলনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
বিজেপির ভোটব্যাঙ্কে সম্ভাব্য প্রভাব
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে— সিজেপি বিজেপির ভোটব্যাঙ্ককে প্রভাবিত করতে পারে; কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সিজেপির সমর্থকরা সবাই বিজেপির ভোটার। আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে আগে থেকেই বিরোধীদলকে সমর্থন করা মানুষ, দলনিরপেক্ষ শিক্ষার্থী এবং প্রথমবারের ভোটারও থাকতে পারেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে ২৪০টির কম আসন পেয়েছিল— নির্বাচন কমিশনের ফল অনুযায়ী ২৪০টি নয়, ২৩৯টি আসন; সরকার গঠনে এনডিএ-র শরিকদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ফল দেখায়, কিছু আসনে সীমিত ভোটের পরিবর্তনও আসনভিত্তিক প্রতিযোগিতায় তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
ভোটব্যাঙ্কে সম্ভাব্য প্রভাবের ৪ কারণ
১. বেকারত্ব ও পরীক্ষার অনিয়মকে নির্বাচনী ইস্যু করা : সিজেপির আন্দোলন যদি চাকরি, নিয়োগ পরীক্ষা ও শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহিকে ধারাবাহিকভাবে আলোচনায় রাখে, তাহলে বিজেপিকে এসব বিষয়ে নিজেদের নীতি ও ফল ব্যাখ্যা করতে হতে পারে। এর প্রভাব শুধু বিজেপির ওপর নয়, সংশ্লিষ্ট রাজ্যের সরকার ও বিরোধীদলগুলোর ওপরও পড়তে পারে।
২. তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ : সিজেপি যদি তরুণদের ভোটার তালিকা, নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সক্রিয় করে, তাহলে ভোট দেওয়া এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নে তাদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। তবে বেশি তরুণরা ভোট দিতে এলেই বিজেপির ভোট কমবে— এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
৩. বিরোধীদলগুলোর আলোচ্যসূচি বদলে দেওয়া : কংগ্রেস ও অন্যান্য বিরোধীদল সিজেপির উত্থাপিত ইস্যু গ্রহণ করলে চাকরি, পরীক্ষা ও ভোটাধিকার নিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীদলগুলো যদি এসব ইস্যুতে একমত না হয় বা সমন্বয় করতে না পারে, তাহলে আন্দোলনের নির্বাচনী প্রভাব সীমিত থাকতে পারে।
৪. বিজেপির প্রচারকৌশলে পরিবর্তন : বিজেপি চাকরি ও পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রতিশ্রুতি, প্রশাসনিক সংস্কারের ঘোষণা কিংবা তরুণ ভোটারদের লক্ষ করে প্রচার বাড়াতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অমিত আহুজা গণমাধ্যমে বলেছেন, বিজেপি সিজেপির কিছু দাবিকে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করতে পারে। এটি বিশ্লেষকের মূল্যায়ন, বিজেপির ঘোষিত পরিকল্পনা নয়।
সর্বশেষ পরিস্থিতি
গত ১৭ অক্টোবর রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে আন্দোলনের সময় দিল্লিতে অভিজিৎ দীপকেকে আটক করা হয়েছিল। পরে আদালত তাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভের পরিকল্পনার মধ্যে দিল্লিতে ব্যাপক পুলিশি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ওইদিনের অভিযানে ২ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল। সিজেপির নেতাদের মুক্তির পরও দিল্লিতে বিক্ষিপ্ত প্রতিবাদ চলতে থাকে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ পুলিশের আচরণ নিয়ে অভিযোগ তোলে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং বিক্ষোভের অনুমতি নিয়ে বিতর্ক আরো তীব্র হয়। গত ১৯ অক্টোবর সিজেপির অন্য দুই সদস্যের আটক থাকা নিয়ে অভিজিৎ প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানান। এতে বোঝা যায়, আন্দোলনটি এখন শুধু অনলাইন ব্যঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিবাদেও রূপ নিয়েছে।
সিজেপি কতটা সফল?
সিজেপির সাফল্য বিচার করতে তিনটি দিক দেখা যায়— ১. ডিজিটাল প্রচার: ব্যঙ্গ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের মধ্যে দ্রুত পরিচিতি তৈরি করেছেন। ২. জনসমাগম ও আন্দোলন: অনলাইন সমর্থনকে দিল্লির বাস্তব প্রতিবাদে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ৩. দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রভাব: আন্দোলনটি স্থায়ী সংগঠন, সুস্পষ্ট কর্মসূচি এবং কার্যকর নীতিগত পরিবর্তন আনতে পারে কি না, সেটিই হবে বড় পরীক্ষা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া আর নির্বাচনে জয়লাভ করা এক বিষয় নয়। সিজেপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সংগঠন পরিচালনা, স্বচ্ছতা, নেতৃত্বের জবাবদিহি এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে তাদের ধারাবাহিকতার ওপর।
অক্টোবর পর্যন্ত সিজেপি একটি বড় তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক দাবি— শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ অর্জন করেছে। শিক্ষা-সংস্কারে সরকারি উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু সেগুলোকে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন বলা যাবে না। ভোটাধিকার নিয়ে আন্দোলনও চলছে, তবে নির্বাচন কমিশনের কাঠামো বা ভোটার তালিকা নিয়ে সিজেপির প্রধান দাবিগুলো পূরণ হয়েছে— এমন কথা বলার সুযোগ এখনো আসেনি। সব মিলিয়ে সিজেপির বিশেষত্ব হলো— একটি অপমানজনক মন্তব্যকে সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের প্রতীকে পরিণত করেছেন। তার আন্দোলন ভারতের তরুণদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে উঠবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
(তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ইন্ডিয়া টুডেসহ অন্যান্য গণমাধ্যম)।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।