লোমহর্ষক রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ও প্রত্যাশা


২৮ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৫৬

॥ শেখ মনিরুল ইসলাম ॥
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবরে রচিত হয় এক লোমহর্ষক ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। চারদলীয় জোট সরকারের ৫ বছর পূর্তিতে ঐদিন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরীর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররমের উত্তর সড়কে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশে আগত জামায়াত-শিবিরের ৬ জন তরতাজা নেতাকর্মীকে প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে সাপের মতো পিটিয়ে ও মাথায় গুলি করে হত্যা করে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সন্ত্রাসী নেতা-কর্মীরা। শুধু তাই নয়, নিরস্ত্র জামায়াত-শিবিরের নিরীহ নেতাকর্মীদের হত্যার পর মৃত লাশের ওপর নৃত্য করে বর্বর উল্লাসে মেতে ওঠে নির্দয় পাষণ্ড মানবরূপী পশুরা। টেলিভিশনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক সেই বর্বরতার অমানবিক দৃশ্য অবলোকন করে আঁতকে ওঠে।
এ নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পাশবিকতায় ডুকরে কাঁদে গোটা বাংলাদেশ, কাঁদে বিশ্বমানবতা। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিবসহ বিশ্বনেতারা এ নৃশংসতার তীব্র নিন্দা জানান। তাই বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর মানবতাবিরোধী অপরাধের এক কলঙ্কময় দিন।
আওয়ামী তাণ্ডবের প্রেক্ষিত ও সূত্রপাত
২০০৬ সালের অক্টোবর মাস। চলছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিদায় প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে বিএনপি নেতৃত্ব আসন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য সদ্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি কেএম হাসানের নাম ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সাথে বিএনপির চরম মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনা পল্টন ময়দানের মহাসমাবেশে প্রথম লগি-বৈঠা, হকিস্টিক নিয়ে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচিতে অংশ নিতে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য নির্দেশনা দেন।
২৭ অক্টোবর বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনার নির্দেশে সাড়া দিয়ে মুক্তাঙ্গনে আওয়ামী লীগের সভা থেকে লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরা লগি-বৈঠা ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঢাকাসহ সারা দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে। মুক্তাঙ্গন হতে তারা ২৭ অক্টোবর মিছিলে স্লোগান দেয়, ‘একটা দুইটা জামায়াত ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর’; জামায়াত-শিবিরের আস্তানা, বাংলাদেশে রাখব না’— এমন অরাজনৈতিক জঙ্গি স্লোগান ব্যবহার করে। ১৪ দলীয় জোট ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল জলিল, তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক, জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন প্রমুখ উত্তেজনাকর ও উসকানিমূলক বক্তব্যে জামায়াত-শিবিরের ওপর হামলার জন্য তাদের সন্ত্রাসী ক্যাডারদের উৎসাহিত করেন।
দৈনিক নয়া দিগন্তের খবর অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর বেগম জিয়ার ভাষণের পর দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিএনপি নেতা ও গাজীপুরে জামায়াত নেতাসহ মোট ৪ জন নিহত হয়।
দৈনিক প্রথম আলোর খবরে বলা হয়, ঐ দিন ঢাকায় বিএনপি এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদের ডেমরার কার্যালয়ে আগুন দেয়া হয়। ধানমন্ডিতে নাজমুল হুদার বাড়িতে হামলা ও খুলনার এমপি আলী আসগর লবীর বাড়িতে হামলা করা হয়।
কথায় আছে, ‘একে তো নাচুনী বুড়ি, তারপর ঢোলের বাড়ি’। আর যায় কোথায়! পরোয়া কীসে! মূলত শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও জোটের অন্যান্য নেতাদের উসকানিতে উজ্জীবিত হয়ে তাদের অন্ধ অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী সংগঠিত করে ইতিহাসের বর্বরতম নারকীয় নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও সীমাহীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়।
২৮ অক্টোবর নারকীয় তাণ্ডব সংঘটনের উদ্দেশ্য ও শেখ হাসিনার নির্দেশ
শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ নির্দেশে সারা দেশকে অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করে পেছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতা দখলের ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে জামায়াতের মহাসমাবেশে পাশবিক হত্যাকাণ্ড ও শত শত নিরস্ত্র নেতাকর্মীকে আহত করা হয়।
তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার সরকারের ৫ বছর মেয়াদ পূর্তির প্রাক্কালে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে রেডিও ও টেলিভিশনে বিদায়ী ভাষণ দেন। মূলত প্রধানমন্ত্রীর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণের পরপরই আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের সন্ত্রাসীরা গাজীপর, ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ প্রায় সারা দেশে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের বাড়িঘরে যেমন হামলা-ভাঙচুর চালায়, তেমনি ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এবং অনেক নেতাকর্মীর বাড়ি ও দলীয় অফিসে অগ্নিসংযোগ করে সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে।
দিল্লির পুতুল শেখ হাসিনা অবৈধভাবে ক্ষমতায় আরোহণের জন্য এক নোংরা ছক আঁকেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি তার অন্ধ অনুগত সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা নিরীহ নিরস্ত্র প্রতিপক্ষকে হত্যা, মারধর, হামলা, বাড়িঘর ও প্রতিপক্ষের অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ত্রাস, ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চায়। ২৮ অক্টোবরের পাশবিকতা ছিল তার চূড়ান্ত প্রকাশ। তাই সুনিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বাংলাদেশকে আতঙ্কের জনপদ হিসেবে চিহ্নিত করে অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখল করা ছিল ২৮ অক্টোবরের তাণ্ডব সংঘঠনের মূল উদ্দেশ্য।
২৮ অক্টোবরের ভয়ালতম ঘটনাপ্রবাহ
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বিকাল ৩টায় ছিল জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর পূর্ব ঘোষিত সমাবেশ। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেট সড়কে আয়োজিত সমাবেশের মঞ্চ তৈরির কাজ সকাল থেকেই চলছিল। হঠাৎ করেই বেলা ১১টায় পল্টন মোড় থেকে ও বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে এসে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী ও ১৪ দলের লগি-বৈঠাধারী ও শত শত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী জামায়াতের সমাবেশস্থলে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই হামলায় লগি-বৈঠা দিয়ে ক্রমাগত পিটিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয় মিরপুর ১০নং ওয়ার্ড ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম মুজাহিদকে। মুজাহিদ ছিলেন রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবরের প্রথম শহীদ। এছাড়া এ সময় লালবাগের জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দিন (১)কে প্রীতম হোটেলের সামনে একাকী পেয়ে লগি-বৈঠা দিয়ে সন্ত্রাসীরা বেধড়ক মারধর করে। তিনি বারবার উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু হায়েনার দল তাকে লগি-বৈঠা দিয়ে উপর্যুপরি সাপের মতো পিটিয়ে হত্যা করে এবং লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করে মধ্যযুগীয় বর্বর উল্লাস করতে থাকে। বিভিন্ন টেলিভিশ চ্যানেলে এই নারকীয় দৃশ্য দেখে সারা বিশ্ব বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে।
তারা একযোগে বিজয়নগর, তোপখান রোড ও মুক্তাঙ্গন থেকে পল্টন মোড় দিয়ে আক্রমণ চালায়। সেদিন পল্টনজুড়ে ছিল লগি-বৈঠা বাহিনীর তাণ্ডবতা। লগি-বৈঠা আর অস্ত্রধারীদের (পিস্তল ইত্যাদি) হাতে একের পর এক নিহত ও আহত হতে থাকে নিরস্ত্র জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী সন্ত্রাসীদের মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ, বোমা-ককটেল হামলা, ইটপাটকেল নিক্ষেপে ও লগি-বৈঠার আঘাতে আহতদের মিছিল বাড়তে থাকে দ্রুতগতিতে। দুপুর ২টা পর্যন্ত এই নৃশংসতা চলতে থাকে।
বিকেল সাড়ে ৩টায় আনুষ্ঠানিকভাবে বায়তুল মোকাররমের উত্তরের সড়কে জামায়াতের সমাবেশ শুরু হয়। সভাপতিত্ব করছিলেন ঢাকা মহানগরীর তৎকালীন আমীর ও সাবেক শিবির সভাপতি রফিকুল ইসলাম খান। এ সময় বিজয়নগরসহ অন্যান্য এলাকায় লগি-বৈঠা বাহিনী জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের ওপর বিক্ষিপ্তভাবে চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যায়। আহতদের সারি বাড়তে থাকে। তবে সমাবেশ সাভাবিক গতিতে চলতে থাকে।
আসরের বিরতির পর সমাবেশে বক্তব্য রাখেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা আব্দুস সোবহান, সেক্রেটারি জেনারেল ও সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুহাহিদ। এ পর্যায়ে সমাবেশের সভাপতি তার বক্তব্য শেষ করেন। এরপর সমাবেশের প্রধান অতিথি বক্তব্য দিতে দাঁড়ান জামায়াতের তৎকালীন আমীর সরকারের সাবেক কৃষিমন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। মাওলানা নিজামীর ৪/৫ মিনিট বক্তব্যের পরে ৪-৪৩ মিনিটে পল্টন মোড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় র‌্যাগংস টাওয়ারের ছাদ থেকে সমাবেশ লক্ষ করে ১০-১২টি বোমা ছুড়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে এবং একইসাথে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করে ও লগি-বৈঠা দিয়ে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের উপর্যুপরি হত্যা ও আহত করতে থাকে। একদিকে তারা বৃষ্টির মতো বোমা-ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে; অপরদিকে পল্টন মোড় থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সমাবেশের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় জানবাজ জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে জাতীয় নেতাদের রক্ষা করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যায়। এমন সময় আওয়ামী অস্ত্রধারীদের ছোঁড়া গুলি মাথায় বিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন লালবাগের জামায়াত কর্মী হাবিবুর রহমান, জুরাইনের জামায়াত কর্মী জসিম উদ্দীন (২)। লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় শিবিরকর্মী হাফেজ শিপন ও মাসুমকে। এভাবে প্রকাশ্যে রাজপথে ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নির্মমভাবে শহীদ করা হয় জামাত-শিবিরের ৬ নেতাকর্মীকে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সংযোজিত হয় এক কালিমাময় অধ্যায়।
আরও হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ : শেখ হাসিনার নির্দেশে ২৭ অক্টোবর বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার রেডিও-টেলিভিশনের ভাষণের পরপর আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতাকর্মীরা ঢাকা, গাজীপুর, খুলনাসহ সারা দেশে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে, তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে নির্বিচারে। পুরো দেশে চলে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সন্ত্রাসী বাহিনীর অবিরাম তাণ্ডবলীলা।
২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর গাজীপুরে হত্যা করা হয় জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি জামায়াত নেতা মুহাম্মদ রুহুল আমীনকে। এ যাত্রায় তিনিই আওয়ামী হায়েনাদের হাতে ১ম শহীদ (রুহুল আমীন)।
উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে,২০০৬ সালের ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ৩ দিনে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের ৫৪ নেতা-কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাগুরার আরাফাত হোসেন সবুজ, সাতক্ষীরার জবেদ আলী, নিলফামারীর সাবের হোসেন, শাহ আমানত সেতুর টোল আদায়কারী আবুল কালাম, নরসিংদীর হাজীপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম ও তার পুত্র সাইফুল্লাহ মাহমুদ মাসুম (২৮) ঝরে যায়, মেহেরপুরের শাহজাহান আলী, রফিক ও আব্বাসসহ ৫৪ জন নিরীহ নিরস্ত্র নেতাকর্মীর জীবন প্রদীপ অকালে কেড়ে নেয় গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী শেখ হাসিনা, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননদের সন্ত্রাসীদের নৃশংস, উন্মত্ত নিষ্ঠুরতায়।
তাদের পৈচাশিক বর্বরতায় রেহাই পায়নি নারী, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। তাদের সীমাহীন তাণ্ডবে ৩ দিনে মারাত্মক জখম ও আহত হয় ৪ সহস্রাধিক। কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকায় আহতের সংখ্যা ৫ সহস্রাধিকের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লাশ, গুম, দখলের ঘৃণ্য প্রচেষ্টা : ২৮ অক্টোবর আওয়ামী হায়েনারা জামায়াত কর্মী হাবিবকে নৃশংসভাবে হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। লাশটি তারা টেনেহিচড়ে দখলে নিয়ে গুম করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। অতঃপর হাবিবের লাশটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়, তখনো আওয়ামী সন্ত্রাসী হাজী সেলিম বাহিনী লাশ দখলের জন্য হন্যে হয়ে পড়ে। আশ্রয় নেয় চরম প্রতারণার। নকল বাপ-মা বানিয়ে লাশ নিয়ে যেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রতারণা ধরা পড়ায় সটকে পড়ে। এরপরও তারা রণে ভঙ্গ না দিয়ে ভিন্ন কৌশল নেয়। তারা জামায়াতকর্মী হাবিবুর রহমানকে নিজের কর্মী দাবি করে ছবিসহ পোস্টার পর্যন্ত ছাপে। আওয়ামী ধোঁকাবাজির এ এক নিকৃষ্ট নজির।
রহস্যময় ভূমিকায় পুলিশ : ২৮ অক্টোবরের ভয়াবহ ঘটনার শুরু থেকে শেষ অবধি পুলিশের ভূমিকা ছিল রহস্যময়। বিপুলসংখ্যক পুলিশের উপস্থিতিতেই আওয়ামী বাহিনী আগ্নেয়াস্ত্র ও লগি-বৈঠাধারীরা জামায়াতের সমাবেশে হামলা চালিয়ে নিরস্ত্র জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীদের একের পর এক নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং শত শত পিটিয়ে আহত করা হয়। কিন্তু কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা রহস্যজনকভাবে হামলা ঠেকাতে কোনো কার্যকরী ভূমিকা পালন করেননি। এমনকি আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে অবৈধভাবে জড়ো করা লগি-বৈঠা, লাঠি ও অন্যান্য হামলার সরঞ্জামের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও পুলিশ সেগুলো উদ্ধারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
রাজনীতিতে ২৮ অক্টোবর-পরবর্তী প্রভাব : ২৮ অক্টোবরের ভয়াবহ ও মারাত্মক হত্যাযজ্ঞ রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে। এই রাজনৈতিক সংঘাত ও সংকটের জেরে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। উল্লেখ্য, এই নতুন সরকারই সেনা-সমর্থিত ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন শাসিত সরকার নামে পরিচিত।
২৮ অক্টোবর হত্যাকাণ্ডের মামলা ও তার পরিণতি : ২৯ অক্টোবর পল্টন থানা জামায়াতের পক্ষে ১৪ দলের ৪০ নেতাকর্মীকে আসামি করে মামলা করা হয়। ২০০৭ সালের ১১ এপ্রিল শেখ হাসিনাকে পলাতক আসামী দেখিয়ে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের ৪৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০০৭-এর ২২ এপ্রিল তৎকালীন ঢাকা মহানগর হাকিম মীর আলী রেজা চার্জশিট গ্রহণ করেন এবং আদালত হাসিনাকে পলাতক হাসিনাসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। পরদিন ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার নাটকীয়ভাবে আবেদনের কারণে মামলাটি অধিকতর তদন্তের (ঋঁৎঃযবৎ ওহাবংঃরমধঃরড়হ) নির্দেশ দেন একই মহানগর হাকিম।
২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি এক বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে পূর্বের মামলাগুলো প্রত্যাহারের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নেয়। এ প্রেক্ষিতে ২০০৭-এর ৯ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব আবু সাঈদ পল্টন থানার দায়েরকৃত উক্ত হত্যা মামলাটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসককে পত্র দেন। ২০০৭-এর ১৭ আগস্ট বিজ্ঞ আদালত, প্রকাশ্যে দিবালোকে রাজধানীর রাজপথে একটি মহাসমাবেশে নারকীয় হামলা চালিয়ে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে ও আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা গুলি করে নির্মমভাবে ৬ জন তাজাপ্রাণকে হত্যার বিচারের জন্য দায়ের করা উক্ত মামলাটি বাদীপক্ষের বিনা সম্মতিতে সরকারের নির্বাহী আদেশের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ২০০৭-এর ১৭ আগস্ট আদালত কর্তৃক প্রত্যাহার আবেদন মঞ্জুর করা হয়। আদলালতের উক্ত প্রত্যাহার আদেশ ছিল বিচার বিভাগের প্রতি হাসিনা সরকারের চরম কুঠারাঘাত। এভাবে বহুল আলোচিত হত্যা মামলাটি প্রত্যাহার আদেশ ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮-এর বিধানের সম্পূর্ণ লংঘন ও আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা।
স্বজনহারাদের বর্তমান সরকারের প্রতি প্রত্যাশা : স্বজনহারা ভিকটিম পরিবারগুলো এখনো তাদের স্বজনদের নারকীয় হত্যার বিচারের আশায় নিত্যদিন প্রহর গুনছেন। তাদের প্রত্যাশা বর্তমান নির্বাচিত তারেক রহমানের সরকার অনতিবিলম্বে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর বিধি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর বিধানের আওতায় পল্টন থানার উক্ত হত্যা মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে ২৮ অক্টোবরের বর্বরতম হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ নির্দেশদাতা ফ্যাসিস্ট হাসিনা, নির্দেশদাতা হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননসহ ১৪ দলের চার্জশিটভুক্ত ৪৬ আসামির বিচারকার্য সম্পন্ন করবেন।
শেষকথা : অতএব জুলাই বিপ্লবের বাংলাদেশে ১৪০০-এর অধিক শহীদের জীবন উৎসর্গ ও প্রায় ৩০ হাজার অন্ধত্ববরণকারী ও পঙ্গুত্ববরণকারীদের সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার সরকারের পতন ও সরকারের দলবলসহ পলায়ন উত্তর বাংলাদেশে ২৮ অক্টোবর থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী কল্যাণমূলক ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সমাজের ও রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে অবিচার, জুলুম ও নির্যাতনের অবসান ঘটাতে হবে চিরতরে। আর এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আল্লাহর আইন ও সৎ লোকদের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই।
সুতরাং ২৮ অক্টোবরের স্বজন হারা ও ২০২৪-এর জুলাইযোদ্ধা ও দেশবাসীর আজকের প্রত্যাশা সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল পর্যায় থেকে সকল জুলুম, অবিচার ও নেতিবাচক অপশক্তির বিপরীতে কল্যাণমুখী ও ন্যায়বিচারের স্বাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের কর্তব্য হলো, জুলাই শহীদ আবু সাঈদ, মীর মুগ্ধদের এবং অক্টোবরের শহীদ মুজাহিদ, হাবিবদের শহীদি চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধভাবে অটল-অবিচল থেকে সকল প্রকারের অন্যায়-জুলুম রুখে দেয়া।