ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত
২১ অক্টোবর ২০২৬ ২১:০৬
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলন আরও জোরালো হয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার ঝুঁকিতে ফেলার অভিযোগ তুলে রাজধানী নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করছেন বিরোধী রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলনকারীরা। গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ খবরে, আন্দোলনকারীদের ধরপাকড় অব্যাহত রয়েছে। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) দুই নেতার বিচারিক হেফাজতও বাড়ানো হয়েছে। ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন-এসআইআর) কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কারণ এসআইআরের প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) নির্বাচনী সুবিধা দেওয়ার জন্যই করা হয়েছে।
২০ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বশেষ পরিস্থিতি : বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লির যন্তরমন্তরে বিক্ষোভের ঘটনায় গ্রেপ্তার ককরোচ জনতা পার্টির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের বিচারিক হেফাজত আরও বাড়িয়েছেন আদালত। এর আগে গত সপ্তাহে নিষিদ্ধ ঘোষিত বিক্ষোভস্থলে প্রবেশ করে ব্যারিকেড অতিক্রম ও স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তাদেরসহ ১৪ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের পাঁচ দিনের বিচারিক হেফাজতে পাঠানো হয়েছিল। গত ২০ অক্টোবর ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেস দিল্লিতে জ্ঞানেশ কুমারের মুখাবয়বযুক্ত রাবণের কুশপুত্তলিকা দাহ করে। নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম ও ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। এর আগে ১৬ অক্টোবর নয়াদিল্লির ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা কনট প্লেসে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেন। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক অভিজিৎ দীপকেও বিক্ষোভের আগে আটক করা হয়েছিল।
কেন এই আন্দোলন
আন্দোলনের মূল কারণ ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক। ২০২৫ সালে বিহারে শুরু হওয়া এসআইআর কার্যক্রম পরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে সম্প্রসারিত হয়। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য, মৃত ব্যক্তি, একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটার এবং স্থানান্তরিত বা ভোট দেওয়ার যোগ্যতা হারানো ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তালিকা নির্ভুল করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। রয়টার্সের গত ১৩ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশনের হিসাবে তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ১৩ কোটি নামের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ব্যক্তি, ৬ কোটি ৩০ লাখ স্থানান্তরিত ব্যক্তি এবং ৩ কোটি এমন ব্যক্তি রয়েছেন, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদেরও বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র, প্রবীণ, অভিবাসী শ্রমিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং নিজেদের ভোটার হিসেবে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ঘিরে ক্ষোভ
চলতি বছরের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে বিতর্কটি আরও তীব্র হয়েছে। সেখানে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া এবং অনেক ভোটারের নাম যাচাইয়ের আওতায় আসায় উদ্বেগ তৈরি হয়। বিরোধীদের অভিযোগ, এর ফলে বিশেষ করে মুসলিম ভোটারসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বৈধ ভোটাধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিজেপি সুবিধা পেয়েছে। এদিকে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনও আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটার তালিকা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে কমিশনের দুই সদস্য অভ্যন্তরীণভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন। বিরোধীদের দাবি, এসব প্রশ্নের জবাব দিতে হবে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতে হবে।
সামনে কী : কংগ্রেসসহ বিরোধীদলগুলোর পাশাপাশি তরুণদের সংগঠনগুলোও আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর বিরোধীরা ভোটার তালিকা সংশোধন স্থগিতের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। আদালত এর আগে ভোটার তালিকা নির্ভুল রাখার স্বার্থে এসআইআর কার্যক্রম বহাল রাখলেও নির্বাচন কমিশনকে নাগরিকত্ব নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা দেয়নি। গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলমান থাকলেও তিনি পদত্যাগ করেননি। বিক্ষোভকারীদের দাবি প্রধান নির্বাচন কমিশনাদের পদত্যাগেরই তারা ঘরে ফিরবে।