ডেঙ্গু প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিতে হবে


২১ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৫০

॥ ডা. মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসেন ॥
বাংলাদেশে ডেঙ্গু একটি মারাত্মক মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। কথায় আছে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা রোগ নির্মূলে বেশি কার্যকর পন্থা। এক্ষেত্রে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিষয়ে বলা যায়, মশার উৎপাদনক্ষেত্র ধ্বংস করে সহজেই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই এজন্য একটি শক্তিশালী জনসচেতনতামূলক স্লোগান ‘ডেঙ্গুর শুধু চিকিৎসা নয়— ডেঙ্গুর মশা জন্মাতেই দেব না। পানি জমতে দেব না, মশার কামড় থেকে বাঁচব, বিপদের লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে যাব’।
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে এটি বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ থেকে ব্যাপক নগরভিত্তিক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে অবফবং ধবমুঢ়ঃর মশার বিস্তার, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জমে থাকা পানি, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের অনুকূল পরিবেশ ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসা নয়— জনসচেতনতা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং বিপদের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ রোগ প্রতিরোধে স্লোগান হলো, ‘তিন দিনে একবার নয়— প্রতিদিন দেখুন, পানি জমতে দেবেন না।’
সাধারণ মানুষকে জটিল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নয়, সহজ ভাষায় ৫টি বার্তা দিতে হবে।
১. প্রথম বার্তা : ‘জমে থাকা পানি মানেই মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল’
মানুষকে বোঝাতে হবে— এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার জমে থাকা পানিতেও বংশবিস্তার করতে পারে। প্রতিদিন বাড়ি ও আশপাশে দেখুন : ১. ফুলের টব ও টবের নিচের পাত্র,২.বালতি, ড্রাম ও পানির পাত্র, ৩. পরিত্যক্ত বোতল/কৌটা, ৪. নারিকেলের খোসা, ৫. নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি,
ছাদ ও বারান্দার পানি জমার স্থান, পুরোনো টায়ার।
২. দ্বিতীয় বার্তা: ‘নিজের ঘর পরিষ্কার করলেই হবে না’।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ি + কর্মস্থল + স্কুল + রাস্তার আশপাশ— সব জায়গা পরিষ্কার রাখতে হবে।
পরিবারের সবাই মিলে সপ্তাহে অন্তত একদিন ১০ মিনিটের ‘ডেঙ্গু অনুসন্ধান অভিযান’ করতে পারে।
৩. তৃতীয় বার্তা : মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা
এডিস মশা দিনের বেলায়ও কামড়াতে পারে। তাই ফুলহাতা পোশাক পরা, প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ংয়ঁরঃড় জবঢ়বষষবহঃ ব্যবহার, জানালা-দরজায় পর্দা/নেট ব্যবহার, শিশুদের বিশেষভাবে সুরক্ষিত রাখা দিনের বেলায় ঘুমালে মশারি ব্যবহার।
৪. চতুর্থ বার্তা : জ্বর হলেই অবহেলা নয়।
সাধারণ মানুষকে বলতে হবে— ‘হঠাৎ জ্বর+শরীর ব্যথা/মাথাব্যথা/চোখের পেছনে ব্যথা/বমি→ডেঙ্গুর কথা মনে করুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।’ নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য ওষুধ শুরু না করাই ভালো। বিশেষ করে অংঢ়রৎরহ ও ঘঝঅওউ জাতীয় ব্যথানাশক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া না নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইষববফরহম-এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। জ্বর/ব্যথার জন্য সাধারণত চধৎধপবঃধসড়ষ ব্যবহার করা হয়, তবে ডোজ বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
৫. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ : বিপদের লক্ষণ সবাইকে শেখাতে হবে
জ্বর কমে গেলেই রোগী ভালো হয়ে গেছে— এ ধারণা ভুল। ডেঙ্গুর ঈৎরঃরপধষ ঢ়যধংব অনেক সময় জ্বর কমার সময় শুরু হয়। নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে— প্রচণ্ড পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক/মাড়ি দিয়ে রক্ত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অস্বাভাবিক দুর্বলতা/অস্থিরতা, অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব বা অচেতনতা,শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব কমে যাওয়া, ঠাণ্ডা ও স্যাঁতসেঁতে হাত-পা, দ্রুত অবনতি।
জনসচেতনতার জন্য সবচেয়ে কার্যকর ৫টি মাধ্যম : মসজিদে সংক্ষিপ্ত ঘোষণা, স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক ক্লাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ভিডিও/ফটোকার্ড, মহল্লায় বাড়ি-বাড়ি প্রচারণা, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সহজ ভাষায় রোগী শিক্ষা। বিশেষ করে ৩০-৬০ সেকেন্ডের ভিডিও সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। একটি ভিডিওতে শুধু একটি বার্তা রাখুন— যেমন ‘আপনার বাড়ির একটি ছোট পাত্রের জমে থাকা পানিই হতে পারে ডেঙ্গুর মশার জন্মস্থান। আজই বাড়ির চারপাশে ১০ মিনিট খুঁজুন। পানি ফেলুন, পাত্র পরিষ্কার করুন, পরিবারকে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করুন।’
ডেঙ্গুর লক্ষণ: উচ্চজ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, প্রচণ্ড শরীর ও পেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা, বমি/বমিভাব ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এছাড়া ল্যাব পরীক্ষায় রক্তের প্লাটিলেট কমে গেলে বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়া যায়।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা : ডেঙ্গু রোগের কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। লক্ষণ অনুযায়ী বিশ্রাম, প্রচুর তরল খাবার গ্রহণ এবং প্যারাসিটামল খাওয়ার মাধ্যমে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণ করা হয়। জটিল ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়।
করণীয় : ১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম : সম্পূর্ণ বিছানায় বিশ্রাম নিতে হবে। ২. প্রচুর তরল গ্রহণ: ডাবের জল, খাওয়ার স্যালাইন, ফলের রস ও সাধারণ জল প্রচুর পরিমাণে পান করতে হবে (তবে লাল রঙের তরল পরিহার করা ভালো, যাতে বমির সাথে রক্ত মেশার ভুল না হয়)। ৩. জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ: জ্বর বা ব্যথার জন্য শুধু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা যাবে। ৪. চিকিৎসকের পরামর্শ: রক্তে প্লাটিলেট ও অন্যান্য পরীক্ষা করিয়ে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হবে।
বর্জনীয় (যা করা যাবে না) : ১ ব্যথানাশক ওষুধ নিষেধ: অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেন্যাক বা ন্যাপ্রোক্সেনের মতো নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ওষুধ (ঘঝঅওউং) ভুলেও খাওয়া যাবে না, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ২. অ্যান্টিবায়োটিক নয়: এটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।
কখন হাসপাতালে যাবেন : ১. অতিরিক্ত বমি হওয়া বা কিছু খেতে না পারা, ২. পেটে তীব্র ব্যথা বা পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, ৩. অতিরিক্ত দুর্বলতা বা নিস্তেজ হয়ে পড়া, ৪. শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তপাত হওয়া।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাই, ডেঙ্গুসহ সকল ব্যাধি থেকে হেফাজত করুন, আমীন।
লেখক : চিকিৎসক।