বানরের বাঁশের অংকে বন্দি দেশের অর্থনীতি
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৪৮
সুশাসন ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে না
॥ উসমান ফারুক ॥
তেলতেলে বাঁশ বেয়ে প্রথম ১০ মিনিটে দুই ফুট ওপরে উঠলেও পরের ১০ মিনিটে এক ফুট নিচে নেমে যায়। এভাবে বানরের ওঠানামার অঙ্ক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। বাঁশের চূড়ায় উঠতে কত সময় লাগে, সেই অঙ্ক মেলানো গেলেও বাংলাদেশের অর্থনীতি এই পিচ্ছিল বাঁশ বেয়ে কবে ওপরে উঠবে, তার হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লুটপাটে জেরবার হওয়া অর্থনীতিকে খাদ থেকে টেনে তোলা হয় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। এজন্য শত উদ্যোগ নেওয়া হয় সংস্কারের। বিশেষ করে আর্থিক খাতের সংস্কারের ফলে টাকার মান পতনের হাত থেকে রক্ষা পায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল হয়ে বাড়তে থাকে। রেমিট্যন্সপ্রবাহ বেড়ে যায়। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরে অর্থনীতি ওপরের দিকে ওঠার পদক্ষেপ থেমে যায় গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে। সংস্কারের সকল উদ্যোগ বাতিলের পাশাপাশি আইএমএফের শর্তও মেনে চলা বন্ধ করে দেয়। তাতেই ঋণছাড়ও বন্ধ করে আইএমএফ। এখন নতুন করে ঋণ চুক্তি করতে চাচ্ছে সরকার। নতুন করে আরো ৪ থেকে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাচ্ছে। কিন্তু আইএমএফও বলেছে, নতুন প্রস্তাবে ঋণ নিলেও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে ছাড় দেওয়া হবে না বাংলাদেশকে। সংস্থাটি পুরনো সংস্কারের সঙ্গে রাজনৈতিক সরকারের কাছে আরো কঠিন শর্ত দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, সব ধরনের ভর্তুকি তুলে নেওয়া। বিশেষ করে প্রথম পর্যায়ে অভিজাত শ্রেণির ভর্তুকি তুলে নেয়া। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, পেনশন ও সঞ্চয়পত্রে দেওয়া সরকারি প্রণোদনা। আইএমএফ মনে করছে, এসব খাতে সরকার যে ছাড় দেয়, তা ধনিশ্রেণিরা পায়। এখন থেকে সকল রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা কারা পাচ্ছে, তার একটি অনলাইন সার্ভারও করতে বলছে সংস্থাটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের ঋণের সব কিস্তি নিয়ে নতুন ঋণের প্রস্তাব দিলে আইএমএফের সঙ্গে দরকষাকষিতে সুবিধা পেত সরকার। কারণ হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও সংস্কার দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়া আইএমএফের কাছে থেকে সোয়া এক বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে নেওয়া হয়। সেই বর্ধিত ঋণে নতুন করে কোনো শর্ত ছিল না। এখন বিএনপি সরকার আগের ঋণ চুক্তি মানতে চচ্ছে না। এটি একটি রাষ্ট্রের আচরণ ও প্রতিশ্রুতি রক্ষার বিপরীত। এখন আইএমএফ আগের চেয়ে কঠিন শর্ত দেবে ঋণ দেয়ার সময়ে।
এছাড়া সংস্কার বাস্তবায়নে আগে সময়ের ছাড় দিলেও এখন নতুন করে সেই ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা কম। সব সংস্কার একযোগে বাস্তবায়ন করতে গেলে অর্থনীতিতে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ দেখা দেবে। ইতোমধ্যে তেলের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে। টাকার মান আরো কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এতে অর্থনীতিতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হচ্ছে। ঋণ পুনঃতফসিল, বিনিময় হার ও ব্যবসায়ীদের বিশেষ ছাড় দেওয়ার মতো সরকারের অনেক পদক্ষেপ সংস্কারের বিরুদ্ধে চলে গেছে। অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো আইএমএফ ইতিবাচকভাবে না-ও দেখতে পারে।
আর্থিক সংকট সামাল দিতে ২০২২ সাল থেকে কয়েক দফা আলোচনা শেষে পরের বছরের প্রথম দিকে আইএমএফের সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তিতে যায় বাংলাদেশ। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঋণের অঙ্ক বেড়ে হয় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম কিস্তির ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার পায় বাংলাদেশ। এ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পায়। ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের আলোচনা এক বছর আটকে থাকার পর চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠন করলে আইএমএফের ঋণ শর্ত নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করে।
আগের ঋণ থেকে বেরিয়ে নতুন ঋণ নেয়ার জন্য আইএমএফের কাছে প্রস্তাব দেয় সরকার। নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় তিন বছরের জন্য ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ পাওয়া নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যে গত ৩ জুন আইএমএফ আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি দিয়ে বলে, বাংলাদেশ নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আবেদন করেছে। তবে ঋণের অঙ্ক কত, তা নিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি আইএমএফ। সেই ঋণের শর্ত ঠিক করতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্র ও সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে মিশন পাঠায় আইএমএফ।
সেই মিশন সরকারের আগামী পরিকল্পনা জানতে চায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কী কী করতে পারবে সরকার, এজন্য সময় দিয়ে চলে যায়। সেই অগ্রগতি দেখতে চলতি মাসের শেষের দিকে পুনরায় তারা আসবে আলোচনা করতে। তখন ঠিক করবে সরকারের সঙ্গে ঋণ চুক্তিতে থাকবে কি না আইএমএফ।
তাতেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন এক নতুন মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। আইএমএফ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ৩ বছর মেয়াদি নতুন বর্ধিত ঋণ সুবিধা নিয়ে চূড়ান্ত দরকষাকষি করছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সাধারণ সভায় বর্তমানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল রয়েছে। সেখানেও এটি নিয়ে আলোচনা করবে।
নতুন ঋণের আলোচনা এগোলেও আগের কর্মসূচির অসমাপ্ত সংস্কারগুলো আবারও সামনে এনেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি কমিয়ে আনা, সরকারি সকল কাজের ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সময়সীমা ঠিক করতে ছাড় দিবে না আইএমএফ।
সংস্কারের পরিকল্পনা চাচ্ছে আইএমএফ
এবারের আলোচনায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক নীতির কয়েকটি বিষয়েও প্রশ্নের মুখে পড়তে যাচ্ছে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক। উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেও গত ৩০ জুন ঘোষিত মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানো হয়। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অথচ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখার ওপর আইএমএফ আগ থেকেই জোর দিয়ে আসছে। সেই শক্ত অবস্থান ধরে না রেখে শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নীতি সুদহার কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফ প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই অবস্থান সংস্থাটির কাছে তুলে ধরা হবে।
এছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল ও খেলাপিদের বিশেষ ছাড়, আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধানে ৪ শতাংশের সীমা আরোপ, বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক না হওয়া এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর সংস্কার নিয়েও মতপার্থক্যের ঝুঁকি রয়েছে। এসব পদক্ষেপের যৌক্তিকতা ও সংস্কারের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনায় ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে বাংলাদেশকে।
এর আগে নতুন কর্মসূচির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর করে আইএমএফের প্রতিনিধিদল। সফর শেষে সংস্থাটি জানায়, দেশের ব্যাংক খাতে চাপ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মোকাবিলায় রাজস্ব বাড়ানো, ভর্তুকি যৌক্তিকীকরণ, কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে নমনীয়তা এবং ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনার ওপর জোর দেয় তারা। ফলে নতুন কর্মসূচিতে ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি সংস্কারের শর্তও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। শেষ পর্যন্ত কর্মসূচি চূড়ান্ত হওয়া নির্ভর করবে সংস্কার বাস্তবায়নে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি কতটা সুনির্দিষ্ট এবং তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা কতটা বিশ্বাসযোগ্য হবে, তার ওপর। বিশেষ করে এই সরকারের প্রতিশ্রুতি ঠিক থাকবে কি না, তা যাচাই করবে আইএমএফ।
ব্যাংক খাতেই বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে ব্যাংক খাতের সংস্কার অন্যতম অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রকাশ, মূলধন ঘাটতি নিরূপণ এবং পুনর্গঠনের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা চায় আইএমএফ। শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে সংকট সামাল না দিয়ে কোন ব্যাংক কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তারও স্পষ্ট রূপরেখা চাইতে পারে আইএমএফ। এক্ষেত্রে সময়সীমাবদ্ধ পদক্ষেপ নতুন কর্মসূচির শর্তে জায়গা পেতে পারে। সরকার এখন ন্যাশনাল ব্যাংকেও টাকার জোগান দিয়ে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু এখন এই টাকা কীভাবে ন্যাশনাল ব্যাংক শোধ দেবে, তার কোনো উদ্যোগ নেই।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো আইএমএফ ইতিবাচকভাবে না-ও দেখতে পারে। ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমার বদলে কাগজে-কলমে প্রকৃত চিত্র আড়াল হওয়ার ঝুঁঁকি রয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে অঘোষিত নির্দেশনা থাকলেও তা আইএমএফের সংস্কার পরিকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
চলতি বছর ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও এককালীন নিষ্পত্তির সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জুলাইয়ে চালু হওয়া ‘এক্সিট পলিসি’র আওতায় নির্দিষ্ট শর্তে এককালীন অর্থ পরিশোধ করে সুদের অংশে ছাড় পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, এতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে। তবে আইএমএফের উদ্বেগ হলো, দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের প্রমাণ ছাড়া ঋণকে ভালো হিসেবে দেখালে ব্যাংকের প্রকৃত সম্পদের মান আড়াল হতে পারে।
ব্যাংক খাতের বাইরে রাজস্ব সংস্কারও নতুন ঋণ শর্তে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভ্যাটের একক হার ১৫ শতাংশ করা হবে কি না, কোন কোন খাতের কর অব্যাহতি বহাল থাকবে এবং রাজস্ব ব্যবস্থার অটোমেশন কবে শেষ হবে। এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছে আইএমএফ। করের আওতা বাড়ানো ও রাজস্ব আদায়ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। কার হার কমিয়ে আনতে সরকারের পরিকল্পনা চেয়েছে।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি কমিয়ে ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়েও আগের কর্মসূচির অসমাপ্ত কাজ রয়েছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারের সামনে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে রাজস্ব না বাড়লে উন্নয়ন ব্যয় ও সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজন মেটানো কঠিন হবে। তখন সঞ্চয়পত্রের মতো খাতে সরকারের ভর্তুকি কমিয়ে আনতে চাপ দিবে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, আইএমএফ যেসব সংস্কারের তাগাদা দিয়েছে, সেগুলো ব্যাংক খাতের প্রকৃত উন্নয়নের জন্যও প্রয়োজন। নতুন কর্মসূচিতে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে ব্যাংক খাতের সংস্কার।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে দাঁড়িয়ে আছে। এখন ঋণও লাগবে, আবার সংস্কারও করতে হবে। দুটোই দরকার। এর মধ্যে ভারসাম্য আনতে সরকার চেষ্টা করছে।
কেন নতুন চুক্তি চায় সরকার
২০২৩ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সাথে ৪৭ মাসের জন্য ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি ‘এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি’ (ঊঋঋ) চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। কিন্তু বর্তমান সরকার পুরোনো চুক্তির কাঠামো ধরে রাখছে না। আগের চুক্তিতে ব্যাংক খাত সংস্কারে কঠিন শর্ত ছিল। সেটি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে না সরকার। সেই নীতি থেকে সরে এসে আরো উদার হয়ে ঋণ দিচ্ছে এই সরকার। ব্যবসায়ীদের বিষয়ে কঠোর হওয়ার বদলে ঋণ আদায়ে নমনীয় হচ্ছে।
এছাড়া রাজস্ব আদায় বাড়াতে এনবিআরকে ভেঙে দুটি সংস্থায় পরিণত করার পদক্ষেপ থেকেও সরে এসেছে সরকার। নীতিসুদ হার কমিয়ে আনছে, যাতে ঋণ সুদহার কমে যায়। কিন্তু এসবই করা হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। এখানে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেই। তাতেই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ফের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় এ খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। তাই সরকারকে কেবল স্বল্পমেয়াদি ঋণ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য বিশেষ তহবিল প্রয়োজন। পুরোনো চুক্তিতে এই সুবিধাগুলো ছিল না। নতুন ঋণে সেই সুবিধা চেয়ে অঙ্ক বাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে সরকার।
সাধারণ মানুষের জীবন আরো কষ্টময় হবে
সংস্কার থেকে সরে আসায় ইতোমধ্যে জিনিস পত্রের উচ্চ দামের কারণে কষ্টকর জীবন পার করছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আইএমএফ নতুন চুক্তিতে যেসব শর্ত সামনে রেখেছে, তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এই শর্তগুলো মানতে গিয়ে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। কারণ নতুন শর্তে ব্যাংক খাতে সরকারকে আরো টাকা ঢালতে হতে পারে। তাতে বাজেট বাস্তবায়নে করহার বাড়াবে সরকার। সেই কর জোগান দেবে করহার বাড়িয়ে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর কারহার আরো বাড়বে। আইএমএফ চাইছে যে, ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ থেকে দুর্নীতিবাজদের সরানো হোক, খেলাপি ঋণকে বাস্তবসম্মতভাবে চিহ্নিত করা হোক এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পুনঃমূলধন জোগানো হোক। এর অর্থ হলো, সরকারকে ব্যাংকিং খাতের পেছনে বিশাল পরিমাণ টাকা ঢালতে হতে পারে, যা বাজেটে চাপ সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয়ের হার অত্যন্ত নিম্নগামী (প্রায় ৭-৮ শতাংশ)। আইএমএফ চাইছে যে, এই হারকে অন্তত ১০-১২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। এর জন্য করের আওতা বাইরে থাকা ধনী ব্যক্তি, বড় করপোরেট এবং অনানুষ্ঠানিক খাতকে করের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি আমদানি শুল্ক ফাঁকি রোধ এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করতে কাস্টমস ও এনবিআরের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। এতে বাধ সাধবে দুর্নীতিবাজরা। তা সরকারও চ্যালেঞ্জে ফেলবে। আইএমএফের আরেকটি অত্যন্ত জনবিরোধী শর্ত হলো জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়া। বর্তমানে সরকার বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের ওপর ভর্তুকি তুলে নেওয়ায় এসবের দাম বেড়েছে। সরকার এখন শুধু বিদ্যুতে ভুর্তকি দিচ্ছে। এছাড়া আইএমএফ চাইছে যে, বিনিময় হারকে সম্পূর্ণ বাজারভিত্তিক করা হোক। এতে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়বে, কিন্তু রপ্তানি খাত প্রতিযোগিতামূলক হবে। পাশাপাশি শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনার জন্য নতুন নীতিমালা তৈরি করতে হবে। তাতে ডলারের দাম দিন দিন বাড়বে। আইএমএফের শর্তানুযায়ী করের আওতা বাড়ানোর ফলে আগামী ১-২ বছরে নিত্যপণ্য, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল বাড়বে। মূল্যস্ফীতি সহসা কমার সম্ভাবনা নেই।
সরকারের সামনে বিকল্প কী আছে
দুর্নীতিবাজদের শাস্তি, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল আইএমএফের এই ঋণ বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনীতির পথে নিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় ঋণের বোঝা বাড়বে, কিন্তু অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হবে না। অর্থনৈতিক সংস্কার কোনো একক সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। এর জন্য সরকার, প্রধান বিরোধীদল (বিএনপি), সুশীল সমাজ এবং ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করতে হবে। সরকার নিজেদের বিলাসবহুল খরচ, অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প এবং আমলাতান্ত্রিক অপচয় কমিয়ে রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে হবে।
আইএমএফের কঠোর শর্তগুলো সাধারণ মানুষের ওপর স্বল্পমেয়াদে চাপ সৃষ্টি করবে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে অর্থনীতি স্থিতিশীল হবে না। এটি করতে পারলে আইএমএফের ঋণ চুক্তিতে সংস্কারের চাপ কমিয়ে আনতে পারবে সরকার। কয়েক বছরের বদলে দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে যেতে পারে। তাতে অর্থনীতি খাপ খাইয়ে চলতে পারবে।
সরকারকেও নিশ্চিত করতে হবে যে, এই সংস্কারের বোঝা যেন শুধু সাধারণ মানুষের কাঁধেই না চাপে। বরং যারা এই অর্থনৈতিক দুর্নীতির মূল হোতা, তাদের সম্পদ যেন রাষ্ট্রের কোষাগারে ফিরিয়ে আনা হয়। কারণ প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি কেবল আইএমএফের ঋণে নয়, বরং সুশাসন ও ন্যায়বিচারের ওপরই নির্ভর করে হয়।