কবি ফররুখ আহমদের অভিমান
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২:১৭
॥ অধ্যাপক আশরাফ জামান ॥
॥ এক ॥
মাইকেল-রবীন্দ্র-নজরুল-পরবর্তী অন্যতম কবি ফররুখ আহমদ মাত্র ছাপ্পান্ন বছর বয়সে ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর আমাদের কাছ থেকে অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলেন। যিনি তার কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও নাটকে তুলে ধরেছেন শ্রমিক-মজুর আর মেহনতি মানুষের দুঃখ-বেদনার কথা। তাদের ওপর ওপরতলার মানুষের নির্যাতনের কথা। সাম্রাজ্যবাদের শোষণ-বঞ্চনা আর জুলুমের কথা।
ফররুখ আহমদ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভদ্র পরিবারে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও কবির জীবনের শেষ সময়গুলো কেটেছে দুর্বিষহ অসচ্ছলতা ও অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে। তার চিকিৎসক বলেছেন, ‘ফররুখ আহমদ ঠিকমতো ওষুধ ও সেবা পেলে আরো কিছুদিন জীবিত থাকতেন।’
পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা যায়, যুগে যুগে অনেক দেশেই সে দেশের কবি, দার্শনিক, সাহিত্যিকগণ শাসক বা প্রভাবশালীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অনাদর, অবহেলা আর হয়েছেন নিগৃহীত। তারা অত্যাচার-নিপীড়নের হলাহল পান করে নীলকণ্ঠ হয়েছেন আর সে দেশের মানুষের জন্য সৃষ্টি করে গেছেন অমৃত। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস, পারস্যের কবি ফেরদৌসী বাংলা সাহিত্যের কবি গোবিন্দ দাস, কাজী নজরুল ইসলাম, কবি ফররুখ আহমদসহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তিত্ব এরূপ।
কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর পৈতৃক অর্থ-সম্পদ থেকে বঞ্চিত হন। যার ফলে তার জীবনে নেমে আসে চরম অভাব-দৈন্যতা। তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসার ও ব্যক্তিগত চাহিদা পূরণ হয়নি। যে মানুষটি একসময় অহঙ্কার করে বন্ধুদের বলতেন, মধুসূদন কাউকে গুনে পয়সা দেয় না। বলতেন, চল্লিশ হাজার টাকার কমে ভদ্রভাবে বছর যাপন করা যায় না। সে মানুষটি সামান্য একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ে ওষুধ-পথ্যহীন অবস্থায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন।
ত্রিশোত্তর কথাসাহিত্যের বিখ্যাত লেখক মানিক বন্দোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী দুঃখ করে বলেছিলেন, ঘরে তিনআনা পয়সা ছিল না, যা দিয়ে ট্রাকে করে স্বামীর বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি যাবেন খবরটা জানাতে। যদিও লেখকের মরদেহ প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজন সোনার পালঙ্কে করে চিতায় নিয়ে যায়।
অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বলেছেন, ফররুখ আহমদ সম্পর্কে আমরা বলতে চাই যে, তার ভাবাদর্শ যাই থাক না কেন, তিনি কখনো কারো কাছ থেকে কোনো অনুগ্রহ গ্রহণ করেননি। এমনকি রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহও তিনি গ্রহণ করেননি। এমনকি পাকিস্তান আমলে সরকার তাকে যে সকল সম্মাননা প্রদান করেছেন, তিনি নিজে তা গ্রহণ করেননি। তার বাড়িতে এসে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন সচিব সে সম্মাননা তাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি কখনো আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের সফরসঙ্গী হননি। তিনি বারবার আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও দেশের বাইরে; এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান সফরেও যাননি। কারো কোনোরূপ অনুগ্রহ বা পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করেননি। এই দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ সমাজে অতিশয় বিরল।
আত্মবিশ্বাসী কবি ফররুখ আহমদ তার সৃষ্টিকর্মে ছিলেন নিষ্ঠাবান। সাহিত্য সাধনার ক্ষেত্রে একাগ্রতা নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। কিন্তু প্রচার ও প্রকাশের ক্ষেত্রে কারো সহযোগিতা বা সাহায্য প্রাপ্তির ধার তিনি ধারতেন না। তাই দেখা যায়, তিনি জীবিতকালে অর্ধশতাধিক বিভিন্ন ধরনের গ্রন্থ রচনা করলেও প্রকাশ পেয়েছে মাত্র ১৪টি। অন্যদিকে তার মৃত্যুর পর বিয়াল্লিশটির অধিক গ্রন্থ প্রকাশিত ও পুনঃপ্রকাশিত হয়েছে।
॥ দুই ॥
কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন একজন আদর্শবাদী লেখক। এ ব্যাপারে কারো সঙ্গে কোনো আপস করেননি। এজন্যই তিনি আপামর পাঠকমহলে এত প্রিয় ছিলেন। তবে এ দেশের কিছুসংখ্যক লেখক, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীর কাছে তিনি অপ্রিয় ছিলেন। কারণ সেসব লেখক তার অসাধারণ প্রতিভার কাছে ছিলেন ম্লান ও নিষ্প্রভ। নিছক ঈর্ষাবশত সুযোগ পেলেই তারা কবির ওপর ব্যক্তিগত আক্রোশ চরিতার্থ করার চেষ্টা করতেন। কবি পাকিস্তানের শেষের দিকে দুঃখ করে বলতেন, আমার লেখা ঢাকার পত্রিকার সম্পাদক সাহেবরা প্রকাশ করেন না। প্রকাশ করেন পশ্চিমবঙ্গের পত্রিকার সম্পাদকরা।
ফররুখ আহমদের কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে ফররুখ গবেষক অধ্যাপক মুহাম্মদ মতিউর রহমান বলেছেন, ফররুখ আহমদের বিভিন্ন কাব্য কবিতায় এ সর্বজনীনতা ও চিরন্তনত্বের অবিনাশী সুর প্রতিধ্বনিত। এ সুর মানবতার, এ সুর অধ্যাত্মিকতার, দেশাত্মবোধে পূর্ণ। এসব নবজাগরণ ও নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, ভাগ্যাহত মানুষের মুক্তির সংরাগে পূর্ণ। ফররুখ প্রতিভা তাই যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি কালজয়ী।
ফররুখ গবেষক ড. সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায় বলেন, “আত্মপ্রতিষ্ঠার কামনায় উদ্বেগ ত্রিশোত্তর কালের নবজাগ্রত মুসলমানদের জন্য অতীত জীবন সমুদ্রে মুসলমানদের জন্য অতীত জীবন সমুদ্রের মহাকল্লোল ধ্বনি বহন করে যেদিন ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্য আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেদিনটি বাংলা কাব্যের ইতিহাসে বড় তাৎপর্যপূর্ণ।” ‘এমন বলিষ্ঠ কণ্ঠেও প্রত্যয়দীপ্ত সুরে আর কোনো কবি কোনোদিন বাঙালি মুসলমানদের আহ্বান করেননি জীবনের সমুদ্র বেলায়। ইতোপূর্বে নজরুলের জাগরণী গানে মুসলমানদের জড়তা কেটে এসেছিল ফররুখ এবার তাদের উদ্বুদ্ধ করলেন কর্মের পথে, সাধনার পথে বলিষ্ঠ পদক্ষেপে অগ্রসর হতে।’
ফররুখ আহমদ রোমান্টিক রূপ তার লেখায় ফুটে উঠেছে প্রকৃতির রূপ, সৌন্দর্য, আকাশ-নক্ষত্রমণ্ডল, বন-বনানী, নদী, সমুদ্র, ঝড়-ঝঞ্ঝা, ফুল, পাখি, দিগন্ত, ধুধু মরুভূমি, জীবন্ত জানোয়ারের কথা। কবি কল্পনায় ফুটে উঠেছে রূপক ও প্রতীক উপমা রূপকল্পের। আর লেখার মূল বিষয়বস্তু ছিল মানুষের কথা।
রোমান্টিক কবিরা হলেন স্বপ্নচারী। কবি ফররুখ আহমদ স্বপ্ন দেখেছিলেন মানুষের মুক্তির শোষিত-নিপীড়িত মানুষের স্বাধিকার পরাধীনতার। মধ্যযুগের কবি চণ্ডীদাস যে স্বপ্ন দেখেছিলেন—
শুনহ মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়—
কপট রাত্রিচ্ছায়ে
হেনেছে নিঃস্বহায়ে।
আমি যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের
বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে অপরাধে।
ফররুখ আহমদের কলমে ফুটে উঠলো সেই মুক্তির কথা—
তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপিণ্ডে পদাঘাত হানি
নিয়ে যাব জাহান্নাম দ্বারপ্রান্তে টানি,
আজ এই উৎপিড়ীত মৃত্য দীর্ণ নিখিলের
ধ্বংস হও অভিশাপ বস্তু
তুমি ধ্বংস হও।’ (লাশ)
॥ তিন ॥
ফররুখ আহমদ ছিলেন মুসলিম পুনর্জাগরণের কবি। ক্ষুধার্ত মানুষের কবি। তার লেখায় শুধুমাত্র মুসলিম জনতার কথা নয়, সকল জাতি ও গণমানুষের কথা ফুটে উঠেছে। তিনি গান লিখেছেন—
মাটির মানুষ মাঠের মানুষ
ঘরের মানুষ আর
এই দুনিয়ায় সবার সাথে সমান অধিকার।
আরো লিখেছেন—
গরিবের তাজা বুকের লহুতে।
কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, ইংরেজি রোমান্টিক কবিকুল তার মন হরণ করেছিলেন। তার কণ্ঠে যখন-তখন ধ্বনিত হলো শেলি, কীটসের অবিনাশী পঙক্তিমালা। যখন তিনি আবৃত্তি করতেন তার দীর্ঘ এলোমেলো চুল নেমে আসত কপালে। ধারালো উজ্জ্বল চোখ হয়ে উঠত উজ্জ্বলতর। তার আরেকটি প্রিয় প্রসাদ ছিল মধুসূদন দত্তের কবিতা। মধুসূদনের কথা বলতে গেলেই তার কণ্ঠে বেজে উঠতো অন্যরকম সুর। মধুসূদনের কবিতা অনর্গল মুখস্থ বলে যেতে পারতেন তিনি।
ফররুখ আহমদ পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিপ্লবী কর্মী ছিলেন। ১৯৪৩-৪৬ সালের দিকের কথা— তখন কলকাতা ঢাকা ও অন্যান্য শহরে বের হতো পাকিস্তান আন্দোলনকারী নেতাকর্মীদের জঙ্গি মিছিল। মিছিলকারীদের মুখে একটি জনপ্রিয় স্লোগান ছিল লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান, দীনকে লেঙ্গে পাকিস্তান। ঐ স্লোগানটি নিয়ে কবি একটি গান লিখে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশের জন্য দিলেন। কবি তখন আজাদ ও মোহাম্মদী পত্রিকা দুটিতে চাকরি করতেন। মাওলানা আকরম খাঁ কবিতাটি নিজের নাম দিয়ে আজাদে প্রকাশ করলেন। ব্যাপারটি নিয়ে কবি খুব অসন্তুষ্ট হলেন।
সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘১৩৫০ সালের অগ্রহায়ণ মাসে হঠাৎ একজন যুবক অতি উত্তেজিত অবস্থায় সওগাত অফিসে এসে হাজির হন এবং জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে উদ্দেশ করে গালিবর্ষণ করতে থাকেন। তার চোখ দুটি জবাফুলের মতো লাল। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। এদিক-ওদিক ঝাঁকিয়ে পায়চারি করছেন আর যা মনে আসছে, বলে যাচ্ছেন। ইতোপূর্বে তাকে কোনোদিন দেখিনি। তাই তার পরিচয় জানতে চাইলাম এবং উত্তেজিত অবস্থায় আমার অফিসে ঢুকে এভাবে অন্য একজনকে গালাগালি করার কারণ জিজ্ঞাসা করলাম। তাকে শান্ত হতে বললাম। কিন্তু তিনি থামলেন না। বললেন, বেটাকে আমি দেখে নেব, আমি তাকে জেলে দেব।’
ফখরুখ আহমদ সম্পর্কে লেখা প্রবন্ধে সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন আরেক জায়গায় লিখেছেন, ‘বিগত ২২ জুন (১৯৭৪) নজরুল জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সওগাত মজলিসের অনুষ্ঠানে বহু কবি-সাহিত্যিকের সমাগম হয়েছিল। কিন্তু এ অনুষ্ঠানে ফররুখ আহমদকে পাইনি। একজন প্রখ্যাত কবিকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা ফররুখ আহমদ এলেন না কেন? তিনি বললেন, কবি আজকাল ঘর থেকে বড় বেশি বের হন না। তিনি নাকি ইসলামী তমুদ্দুনের কবি তাই অপরাধী। জানি না, কবে পর্যন্ত তার অপরাধের সমাপ্তি হবে এবং তিনি আমাদের সাথে আবার মিলিত হবেন।’
অকস্মাৎ খবরের কাগজে ফররুখ আহমদের মৃত্যুর খবর বেরোল। তিনি মৃত্যুবরণ করলেন নীরবে, কিন্তু তার ধারণা ও বিশ্বাসে অটল রইলেন। টললেন না নিজের ও পরিবারের জীবন রক্ষার তাগিদেও না।
ফররুখ আহমদের স্ত্রী সৈয়দা তৈয়বা খাতুন স্বামী সম্পর্কে বলেন, ‘তার রোজগার খুব বেশি ছিল না কখনোই। কিন্তু সুখ ছিল। অভাব-অনটনের সংসারে প্রশান্তি ছিল।’
এ প্রসঙ্গে কবিকন্যা সাইয়েদা ইয়াসমিন বানু বলেন, ‘সোনার চামচ মুখে নিয়েই আব্বার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু দুঃসহ দারিদ্র্যের মধ্যে তাকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে হয়েছে। দারিদ্র্য তার মাথানত করাতে পারেনি। এই মর্দে মুমিন জীবনে আল্লাহ ছাড়া কারো সামনে মাথানত করেননি। শির উঁচু রেখে সম্মানের সঙ্গে এই জরাগ্রস্ত পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।’
কবি ও প্রবন্ধকার আহমদ ছফা ‘ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ শিরোনামে লিখেছেন, ‘ফররুখ আহমদের অপরাধ শেষ পর্যন্ত এই দাঁড়ায় যে, তিনি অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকদের মতো স্লোগান বদল করতে পারেননি। … অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক, যাদের কোনোরকমের আদর্শবোধ নেই, চরিত্র নেই, সুবিধাবাদিতাই নীতি, আমরা জানি তারা আজ ফররুখ আহমদের নামে দুটি সমবেদনার কথা কইতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন। তারপরও আমরা মনে করি, ফররুখ আহমদ একজন বীর চরিত্রের পুরুষ। একজন শক্তিমান কবি। আমাদের সাহিত্য থেকে তার নাম কেউ মুছে ফেলতে পারবেন না। (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১ আগস্ট, ১৯৮০)।
॥ চার ॥
ফররুখ আহমদ ছিলেন গ্রীক সাহিত্যের প্রমিথিয়স, তানতালাস, ইত্তিপাস। জীবনে তিনি আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথানত করেননি। সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ জীবিতকালেও বেশকিছু জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন তার যোগ্যতার জন্য, মৌলিক প্রতিভার জন্য। আজকাল দেখা যায়, এ জাতীয় পুরস্কারের জন্য কোনো কোনো লোককে সরকারি বা প্রভাবশালীদের লবিং করতে হয়। সেখানে ফররুখ আহমদ এ জাতীয় কাজকে ঘৃণার চোখে দেখতেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের লেখায় যেসব পুরস্কারের চরিত্র পাওয়া যায় কবি ছিলেন সেই পুরস্কারের প্রতীক।
॥ পাঁচ ॥
ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ আমার আদর্শিক গুরু। তবে তা পরোক্ষভাবে। কারণ তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ লাভের সৌভাগ্য হয়নি। স্কুল জীবন থেকে যখন ছড়া-কবিতা লেখার চেষ্টা করি, তখন এই প্রতিভাবান কবির লেখাকে অনুকরণ ও অনুসরণ করতাম। পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে ঢাকায় প্রকাশিত দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলোয় শিশু-কিশোরদের আসর; যেমন কুলের মাহফিল, নও নেহালের আসর, শাহীন শিবির, শাহীনের মাহফিলে ছাড়া ও কবিতা পাঠাতাম এবং তা প্রকাশ পেতো। এ সময় আমার লেখা ছোটদের প্রিয় কবি ফররুখ আহমদ নামক একটি ছোট্ট প্রবন্ধ একটি দৈনিক পত্রিকায় ছোটদের আসরে প্রকাশ পায়।
১৯৭৩ সালে আমি কলেজে পড়ি— তখন দু-তিনটি দীর্ঘ পত্র কবি ফররুখ আহমদকে লিখে ডাকে তার বাসার ঠিকানায় পাঠাই। পত্রে কবির প্রতি আমার অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাস রয়েছে, সে কথা লিখি। আশা করেছিলাম, দু’লাইন হলেও তার উত্তর পাবো। সঙ্গে এজন্য খামও দিয়েছিলাম। প্রসঙ্গত, আমার তখন মনে হয়েছিল কবি নজরুলের কাছে পত্র লিখে অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁ যেমন তার উত্তর পেয়েছিলেন, তেমনি আমিও পাবো। যদিও ইবরাহীম খাঁর তুলনায় আমি ছিলাম একজন সামান্য বালক। যখন পরপর চিঠিগুলোর কোনো উত্তর পেলাম না, তখন অভিমান করে রইলাম। মফস্বল শহরে নিজের বাড়িতে থাকি। তবে বছরে দু’চারবার ঢাকায় গেলেও কবির সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম।
অবশ্য কিছুদিন পর কবির দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে মৃত্যু এবং পূর্ববর্তী তিন বছরের জীবন সম্পর্কে জানতে পেরে নিজের প্রতিই একটা অপরাধবোধের অনুশোচনা ও নিজের প্রতি অনুশোচনা সৃষ্টি হলো। আজও আফসোস ভুলতে পারি না।
কবির মৃত্যুর দু’বছর পর কবির ইস্কাটনের বাসায় গিয়েছিলাম আমার এক ভাই আলিমুর রহমানকে নিয়ে। দেখা হয়েছিল কবির ছেলে আখতার সাহেবের সঙ্গে। তিনি স্মৃতিচারণ করলেন। আমার চিঠি পড়ে কবি যেসব মন্তব্য করেছিলেন, সেসব কথা বললেন। কবি তখন ছিলেন শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে খুব অসুস্থ। বলতে গেলে কলম হাতে নেয়া ছেড়ে দিয়েছেন।
আখতার বললেন, আপনার কথা আব্বা বাসায় আম্মাসহ আমাদের সকলের কাছে বলেছেন। অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চিঠি ও প্রবন্ধটি পড়েছেন। আমরা শুনেছি। কবে কবির লেখা একটি অপ্রকাশিত কবিতা রমজানের ওপরে লেখা আমাকে দিলেন। আমি টাঙ্গাইল থেকে রমজান ও ঈদের ওপর আমার সম্পাদিত সংকলনে সেটা প্রকাশ করেছিলাম।
আমি কিছুটা অনুভব করলাম, কবির বাসার অবস্থা দেখে। এত বড় একজন কবির বাসায় তেমন কোনো আসবাবপত্র নেই। একটা হাতলভাঙা কাঠের চেয়ার, পাশে বই রাখার টেবিল। একটা বই রাখার আলমারি ও চৌকি এই ছিল ড্রয়িংরুমের আসবাবপত্র।
কবিকন্যা সাইয়েদা ইয়াসমিন বানু তাই লিখেছেন, ‘আব্বার ইন্তেকালের পরের ঘটনা বড়ই মর্মন্তুদ। কপর্দকহীন হয়ে আব্বা ইন্তেকাল করেছেন। বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স এবং বিষয়-সম্পত্তি বলতে কিছু রেখে যাননি। মুসাফির খালি হাতে আসে আর খালি হাতে ফিরে যায়। আব্বাও ছিলেন এমনি এক মুসাফির।’
মহান আল্লাহপাক তাকে বেহেশতের উচ্চতম স্থান দান করুন। আমিন।