কবি ফররুখ আহমদের ‘পাঞ্জেরী’, ‘সাত সাগরের মাঝি’ ও ‘সিন্দবাদ’: নতুন দিগন্তের সন্ধান
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১২:১৬
॥ মুহাম্মদ আবুল হুসাইন ॥
চল্লিশের দশকের বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান ও ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর কবি ফররুখ আহমদ। প্রগতিবাদ ও আধুনিকতার দ্বন্দ্বে ক্ষুব্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, ঔপনিবেশিক শোষণ আর লুণ্ঠনে জর্জরিত তৎকালীন সমাজ যখন এক চরম হতাশা ও নৈতিক অবক্ষয়ের আবর্তে নিমজ্জিত, ঠিক তখনই তার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল এক নতুন আশাবাদ ও মুক্তির আহ্বান। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত তার যুগান্তকারী কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’ বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। এই কাব্যের মূল সুর হলো— তন্দ্রাচ্ছন্ন ও ঐতিহ্যবিস্মৃত একটি জাতিকে রূপক ও প্রতীকের আশ্রয়ে জাগিয়ে তোলা। এই জাগরণী মন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী তিনটি স্তম্ভ হলো ‘পাঞ্জেরী’, ‘সাত সাগরের মাঝি’ এবং ‘সিন্দবাদ’। এই তিনটি কবিতাই মূলত মুসলিম জাগরণ, নবজাগৃতি এবং সংগ্রামশীল চেতনার প্রতীক। এগুলোয় কবি অতীত ঐতিহ্য ও রূপকথার অনুষঙ্গ ব্যবহার করে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছেন। আমরা এখন এই তিন কবিতার অন্তর্গূঢ় দর্শন, শব্দশৈলী, রূপক-প্রতীকের ব্যবহার এবং মানবমুক্তির প্রেক্ষাপটে সেই নতুন দিগন্ত সন্ধানের চেষ্টা করব।
১. ‘পাঞ্জেরী’: তিমির হননের আকুতি ও দিকনির্দেশনার মহাকাব্যিক হাহাকার
ক. উৎস, পটভূমি ও নামকরণের তাৎপর্য
‘পাঞ্জেরী’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো জাহাজের মাস্তুলে বসে যে দূরদর্শী নাবিক বা অগ্রবর্তী প্রহরী সামনের পথ, দিক, ঝড় কিংবা তীরের সন্ধান করে। তৎকালীন পরাধীন ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা যখন চরম অন্ধকার, কুসংস্কার এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ, তখন কবি এক কাল্পনিক জাহাজের দাঁড়টানা মাল্লা হিসেবে নিজেকে এবং তার সমাজকে আবিষ্কার করেন। এই ঘন কুয়াশাচ্ছন্ন সাগরে তরীকে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য একজন যোগ্য নেতার বা ‘পাঞ্জেরী’র প্রয়োজন। এই গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা থেকেই কবিতাটির সৃষ্টি।
খ. কবিতার ভেতরের রূপক ও আধ্যাত্মিক পর্যায়সমূহ
কবিতাটির শুরুই হয় এক চরম ব্যাকুলতা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার আর্তি দিয়ে—
‘রাত পোহাবার কত দেরি পাঞ্জেরী?’
‘এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?’
‘সেতারা, হেলাল এখনো ওঠেনি জেগে?’
এখানে ‘রাত’ কেবল চব্বিশ ঘণ্টার একটি স্বাভাবিক অন্ধকারের সময় নয়; এই রাত হলো পরাধীনতা, মন্বন্তরের হাহাকার, নৈতিক বিপর্যয় এবং লক্ষ্যহীনতার এক প্রতীকী মহাকাল। ‘সেতারা’ (তারা) এবং ‘হেলাল’ (বাঁকা চাঁদ) হলো আশার আলো ও ঐতিহ্যের প্রতীক, যা এখনো মেঘের আড়ালে ঢাকা।
কবি নিজেকে একজন সাধারণ দাঁড়টানা মাল্লার জায়গায় দাঁড় করিয়েছেন, ‘তুমি মাস্তলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে;/অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।’ কবি এখানে স্বীকার করছেন যে, সাধারণ মানুষ বা কর্মীরা দিকভ্রান্ত হয়ে অন্ধের মতো খাটুনি খাটছে, কিন্তু মূল কাণ্ডারি বা পাঞ্জেরীর নির্লিপ্ততা বা অবর্তমানতায় পুরো সমাজ এক গভীর শূন্যতায় নিমজ্জিত।
গ. মন্বন্তর ও মজলুমের অধিকারের সমাজতাত্ত্বিক রূপ
কবিতাটি কেবল রোমান্টিক রূপকের গণ্ডিতে আটকে থাকে না, বরং তা তৎকালীন বাস্তবতার এক নির্মম ও নগ্ন দলিল হয়ে ওঠে যখন কবি চারপাশের আর্তনাদকে সরাসরি শব্দে রূপ দেন—
‘ওকি বাতাসের হাহাকার, ও কি/রোনাজারি ক্ষুধিতের!
ওকি দরিয়ার গর্জন, ও কি বেদনা মজলুমের!
ওকি ক্ষুধাতুর পাঁজরায় বাজে মৃত্যুর জয়ভেরী। পাঞ্জেরী!’
এখানে চল্লিশের দশকের দুর্ভিক্ষ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিপীড়ন এবং ভুখা-নাঙ্গা মানুষের ‘ক্ষুধাতুর পাঁজরা’ বা কঙ্কালসার দেহের চিত্র ফুটে উঠেছে। সাগরের গর্জনকে কবি মিলিয়ে দিয়েছেন শোষিত বা ‘মজলুম’ মানুষের বুকফাটা কান্নার সাথে।
ঘ. শেষভাগের বৈপ্লবিক জাগরণ ও বর্তমান প্রাসঙ্গিকতা
কবিতার সমাপ্তি ঘটে এক তীব্র তিরস্কার এবং চূড়ান্ত জাগরণের আহ্বানের মধ্য দিয়ে—
‘পাঞ্জেরী!’
‘জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি,
জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি!
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!!’
‘কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি’ এবং ‘ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি’র মাধ্যমে কবি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নেতৃত্ব যদি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে শোষিত জনতা একদিন তার হিসাব চাবে। বর্তমান যুগেও যখন সমাজে নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনার তীব্র সংকট দেখা দেয়, সাধারণ মানুষ যখন আদর্শহীনতার কুয়াশায় পথ হারায়, তখন ‘পাঞ্জেরী’র এই আহ্বান এক নতুন সমাজ বিনির্মাণের অবিনাশী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
২. ‘সাত সাগরের মাঝি’: ঐতিহ্যচেতনা ও তন্দ্রাচ্ছন্ন মানবতার পুনর্জাগরণ
ক. রূপক কাঠামোর গভীরতা
‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতাটি শুধু এই কাব্যের নামাঙ্কিত কবিতাই নয়, এটি ফররুখ আহমদের সামগ্রিক জীবনদর্শন ও কাব্যভাবনার মূল নির্যাস। এখানে ‘মাঝি’ বলতে কবি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে বোঝাননি; এই মাঝি হলো মানবসভ্যতার সেই চালিকাশক্তি, যা একসময় বীরত্ব, নৈতিকতা এবং সাহসের সাথে বিশ্বজয় করেছিল, কিন্তু আজ সে নিজের গৌরবময় অতীত ভুলে মরণঘুমে আচ্ছন্ন।
খ. অতীত গৌরব বনাম বর্তমান স্থবিরতার দ্বন্দ্ব
কবিতার প্রারম্ভেই কবি প্রকৃতির এক অপূর্ব রূপাবয়ব তৈরি করেন, যেখানে চারদিকে ভোরের আলো ফুটলেও মাঝির ঘুম ভাঙে না—
‘কত যে আঁধার পর্দা পারায়ে ভোর হল জানি না তা।
নারঙ্গী বনে কাঁপছে সবুজ পাতা।
দুয়ারে তোমার সাত-সাগরের জোয়ার এনেছে ফেনা।
তবু জাগলে না? তবু, তুমি জাগলে না?’
‘নারঙ্গী বনের সবুজ পাতা’ এবং ‘সাত-সাগরের জোয়ার’ হলো জীবনের গতিময়তা ও সম্ভাবনার প্রতীক। অথচ যিনি এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবেন, সেই মাঝি আজ ‘অচল ছবি’ বা তসবিরের মতো নিশ্চল। তার জাহাজের ‘হালে পানি নাই, পাল তার ওড়ে নাকো’। এই নিষ্ক্রিয়তা কবিকে চরমভাবে ব্যথিত করে। কবি মাঝিকে মনে করিয়ে দেন যে, অতীতে সে লবঙ্গ ফুল, এলাচ, দারুচিনির মতো সমৃদ্ধ সওদা নিয়ে সাত সাগর চষে বেড়িয়েছিল; তার চোখে ছিল ‘জমরুদ-তোলা স্বপ্ন’। অথচ আজ—
‘কবে যে তোমার পাল ফেটে গেছে উচ্ছৃঙ্খল ঝড়ে,
তোমার স্বপ্নে আজ অজগর দুঃস্বপ্নেরা ফেরে।
তারা ফণা তোলে জীর্ণ তোমার মৃত্যুর বন্দরে,
তারা বিষাক্ত করেছে তোমার নুয়ে পড়া আকাশেরে।’
এখানে ‘অজগর দুঃস্বপ্ন’ হলো দাসত্ব, কুসংস্কার এবং হীনম্মন্যতা, যা একটি জাতির জীবনীশক্তিকে বিষাক্ত করে ফেলে।
গ. আদর্শিক দিশা ও ‘হেরার তোরণ’
মানুষ যখন তার সঠিক পথ ও আদর্শ হারিয়ে ফেলে, তখন সে নানারকম সাময়িক মোহের পেছনে ছোটে। কবি একে ‘আলেয়ার পিছু নেওয়া’ হিসেবে অভিহিত করেছেন— ‘তুমি দেখছ না, এরা চলে কোন আলেয়ার পিছে পিছে?/চলে ক্রমাগত পথ ছেড়ে আরও নিচে।’
এই চরম নৈতিক পতন থেকে মানবজাতিকে টেনে তোলার জন্য ফররুখ আহমদ তার কবিতায় এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক ও আদর্শিক আশ্রয়ভূমির সন্ধান দেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘হেরার রাজ-তোরণ’। ইসলামী ঐতিহ্যের আলোয় উদ্ভাসিত এই ‘হেরা’ মূলত সত্য, ন্যায়, সাম্য এবং পরম মানবতার প্রতীক। কবি মাঝিকে অভয় দিয়ে বলেন, পথ যতই কণ্টকাকীর্ণ ও মরুভূমি সদৃশ হোক না কেন, সেখানে পৌঁছাতে পারলে জীবনের ‘মিঠে পানি’ আর ‘ছায়াতরু’ মিলবেই—
‘সে পথে যদিও পার হতে হবে মরু
সে পথে যদিও দরিয়ার নোনা পানি,
তবুও সেপথে আছে মঞ্জিল, জানি আছে ছায়াতরু’
পথে আছে মিঠে পানি।
তবে পাল খোল, তবে নোঙ্গর তোলো;
ঘ. আধুনিক যুগের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকতা
আজকের বিশ্ব যখন চরম বস্তুবাদ, ভোগবাদ, হিংসা, এবং যুদ্ধোন্মাদনায় মেতে উঠেছে, মানুষ যখন তার ভেতরের আত্মিক ও মানবিক সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে এক অন্ধ ‘আলেয়া’র পেছনে ছুটছে, তখন ‘সাত সাগরের মাঝি’র এই তন্দ্রা ভাঙার গান মানুষকে পুনরায় তার আপন শিকড় ও মহৎ আদর্শের দিকে ফিরে আসার তাগিদ দেয়।
৩. ‘সিন্দবাদ’: স্থবিরতার বিরুদ্ধে অনন্ত যৌবনের ও দ্রোহের জয়গান
ক. ‘সিন্দবাদ’ রূপকের অভিনবত্ব
আরব্য রজনীর (আলিফ লায়লা) সিন্দবাদ এক রোমাঞ্চপ্রিয় চরিত্র, যে আরাম-আয়েশের জীবন ছেড়ে বারবার অনিশ্চিত সাগরে যাত্রা করে এবং বিভিন্ন দ্বীপে বিপদের মুখে পড়েও নিজের বুদ্ধি ও সাহসে বেঁচে ফেরে। ফররুখ আহমদ এই চরিত্রটিকে বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রায় রূপায়িত করেছেন। তার সিন্দবাদ কেবল একজন নাবিক বা সওদাগর নয়; সে হলো মানুষের ভেতরের সেই চিরন্তন বিপ্লবী সত্তা, যা কোনো খাঁচায় বা আরামের শৃঙ্খলে বন্দি থাকতে চায় না।
খ. আয়েশ বনাম সংগ্রামের দ্বান্দ্বিক রূপরেখা
কবিতার শুরুতেই এক তীব্র বৈপরীত্যের আবহ তৈরি করা হয়েছে। একপাশে রয়েছে ‘রঙিন মখমল দিন’ অর্থাৎ বিলাসী, নিশ্চিন্ত এবং স্থবির জীবন; অন্যদিকে রয়েছে ‘নোনা দরিয়ার ডাক’ অর্থাৎ অজানা, ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু প্রাণবন্ত কর্মময় জীবন—
‘কেটেছে রঙিন মখমল দিন নতুন সফর আজ,
শুনছি আবার নোনা দরিয়ার ডাক,
ভাসে জোরওয়ার মউজের শিরে সফেদ চাঁদির তাজ,
পাহাড়-বুলন্দ ঢেউ বয়ে আনে নোনা দরিয়ার ডাক।’
কবি অত্যন্ত চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন যে, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তায় মানুষের কর্মক্ষমতায় জং ধরে যায়, ‘কেটেছে পল্কা নরম আয়েশ আশরতে বহুদিন,/মর্চে ধরেছে কবজায়; ম্লান তাজ।’ এই জং বা জড়তাকে দূর করতে হলে ‘মাল্লার নীল সাজ’ অর্থাৎ সংগ্রামের পোশাক পরিধান করে ঝড়ের মুখে কিসতি ভাসাতে হবে।
গ. অন্যায়ের বিরুদ্ধে দ্রোহ ও নির্ভীক মানসিকতা
সিন্দবাদের এই যাত্রা কেবল ঘুরে বেড়ানোর জন্য নয়, এর একটি গভীর সামাজিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হলো জগতের সমস্ত অন্যায়-পাপকে গুঁড়িয়ে দেওয়া—
‘পাকে পাকে ঘুরে তীরবেগে ছুটে আবর্তে দিশাহারা,
ক্ষুধার ধমকে ঘাস ছিঁড়ে খেয়ে আকাশে জাগায়ে সাড়া,
জালিমের চোখ আগুনে পোড়ায়ে গুঁড়ায়ে পাপের মাথা;
দেখেছি সবুজ দরিয়া জাজিমে স্বপ্ন রয়েছে পাতা।’
‘জালিমের চোখ আগুনে পোড়ানো’ এবং ‘পাপের মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়া’র এই সংকল্প ফররুখ আহমদের মানবতাবাদী ও দ্রোহী কবিসত্তার পরিচয় বহন করে। তিনি এমন এক সমাজ চান যেখানে অত্যাচারীর কোনো স্থান থাকবে না। সিন্দবাদ জানে এই পথে জাহাজ বানচাল হতে পারে, তক্তায় ভেসে জীবন বিপন্ন হতে পারে, কিন্তু সে পিছু হটতে রাজি নয়, কারণ: ‘আমরা পেয়েছি নিত্যনতুন জীবনের তাজা ঘ্রাণ।’
ঘ. আধুনিক সমাজ ও সিন্দবাদ দর্শনের প্রয়োজনীয়তা
বর্তমান সময়ে মানুষ যখন সামান্য সুখ আর আয়েশের জন্য নিজের বিবেক ও স্বাধীনতাকে বিকিয়ে দিচ্ছে, যখন চারপাশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে, তখন সিন্দবাদের এই আহ্বান এক পরম সঞ্জীবনী মন্ত্র—
‘ভেঙে ফেলে আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ,
দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ,
ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল-অবসাদ,
নতুল পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দবাদ!’
এখানে ‘খাকের মমতা’ বা মাটির প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি হলো সংকীর্ণ পার্থিব মোহ। এই মোহ ভেঙে একবিংশ শতাব্দীর তরুণ সমাজকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং নতুন পৃথিবী গড়ার সাহসী প্রেরণা দেয় এইনতুন দিগন্তের সন্ধান ‘সিন্দবাদ’।
৪. তিন কবিতার তুলনামূলক ও সমন্বিত সাহিত্যিক মূল্যায়ন
ফররুখ আহমদের এই তিনটি প্রধান কবিতা— ‘পাঞ্জেরী’, ‘সাত সাগরের মাঝি’ এবং ‘সিন্দবাদ’-কে যদি আমরা একটি সুতোয় গাঁথি, তবে দেখব এরা আসলে একটি একক জীবনদর্শনেরই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়।
কবিতার নাম
মূল প্রতীক/চরিত্র
মূল সংকট
কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য
সুর ও চেতনা
পাঞ্জেরী
দূরদর্শী পথপ্রদর্শক/নেতা
দিকভ্রান্তি
দিকভ্রান্তি, নিশ্চিদ্র অন্ধকার, শোষিত ও ক্ষুধিতের হাহাকার
নতুন সকাল/মুক্তি ও স্বাধীনতা
সাত সাগরের মাঝি
ঐতিহ্যবিস্মৃত জাতি/মানবতা
মরণঘুম, হীনম্মন্যতা, আলেয়ার পিছু নেওয়া, জীর্ণ বন্দর
হেরার তোরণ’ বা পরম আদর্শ ও সত্যের পুনপ্রতিষ্ঠা
ঐতিহ্যচেতনা ও আধ্যাত্মিক জাগরণ
সিন্দবাদ
চির-যৌবনা কর্মবীর/বিপ্লবী
আয়েশ ও জড়তা, জং ধরা কব্জি, জালিমের অত্যাচার
নতুন পানিতে সফর/অন্যায়ের বিনাশ ও নতুন সকাল
দ্রোহ, গতিশীলতা ও অনন্ত যৌবনের জয়গান
ক. শব্দশৈলী ও আঙ্গিক বিচার
এই তিনটি কবিতাতেই ফররুখ আহমদের শব্দচয়ন অসাধারণ। তিনি বাংলা ভাষার অন্তরে আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দকে এমনভাবে আত্মীকরণ করিয়েছেন, যা কবিতার কাব্যিক সুষমাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘জুলমাত’, ‘মর্সিয়া’, ‘সিন্দবাদ’, ‘আফতাব’, ‘মাহতাব’, ‘কিংখাব’, ‘পোখরাজ’, ‘মারজান’— এই শব্দগুলো কেবল ধ্বনিমাধুর্যই তৈরি করে না, বরং পাঠককে এক লহমায় এক শাশ্বত, রোমান্টিক ও বীরত্বপূর্ণ আবহে নিয়ে যায়। তার ছন্দোময় চাল (বিশেষ করে মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্তের মিশ্রণ) এবং উপমার ব্যবহার কবিতাগুলোকে এক অনন্য গতিশীলতা দান করেছে।
খ. মানবতার প্রতি ভালোবাসা ও সাম্যের বাণী
অনেকে ফররুখ আহমদকে কেবল একটি নির্দিষ্ট আদর্শ বা গণ্ডির কবি হিসেবে মূল্যায়ন করার ভুল করে থাকেন। কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে এই তিনটি কবিতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার মূল লক্ষ্য ছিল সমগ্র ‘মানবতার মুক্তি’। ‘পাঞ্জেরী’র ক্ষুধিত মুখ, ‘সাত সাগরের মাঝি’র আর্তমানবতা এবং ‘সিন্দবাদ’ কর্তৃক জালিমের চোখ উপড়ে ফেলার সংকল্প— এ সবই প্রমাণ করে যে কবি শ্রেণিহীন, শোষণমুক্ত এবং সাম্যবাদী এক মানবিক সমাজ চেয়েছিলেন। তাঁর আদর্শিক দিকটি ছিল মানুষের নৈতিক আত্মশুদ্ধির পথ, যা মানুষকে পশুর স্তর থেকে উন্নীত করে প্রকৃত মানুষে রূপান্তরিত করে।
উপসংহার : সামগ্রিক মূল্যায়নে বলা যায়, ‘পাঞ্জেরী’, ‘সাত সাগরের মাঝি’ এবং ‘সিন্দবাদ’ কোনো সাময়িক ঘটনা বা নির্দিষ্ট দশকের ফ্রেমে বন্দি কবিতা নয়। এগুলো হলো চিরন্তন মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার দলিল। ফররুখ আহমদ রূপকের মায়াবী নেপথ্যে সমকালীন বাস্তবতার যে কঠিন ও নির্মম সত্যকে উন্মোচন করেছেন এবং তা থেকে উত্তরণের যে পথ দেখিয়েছেন, তা আজও একবিংশ শতাব্দীর সংকটাপন্ন বিশ্বের জন্য সমানভাবে সত্য এবং দিকনির্দেশক। যতদিন মানবসমাজে অন্ধকার থাকবে, মানুষ আয়েশের মোহে নিজের বিবেক হারাবে এবং শোষিতের হাহাকারে বাতাস ভারী হবে— ততদিন ফররুখ আহমদের এই কবিতাগুলো মুক্তির মশাল হয়ে মানবতাকে পথ দেখিয়ে যাবে।
লেখক : সাংবাদিক, সাহিত্য সমালোচক।