ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন

আসন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে বিএনপি আশাবাদী জামায়াতের দেলাওয়ার


৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৫৯

রাফিক সরকার, ঠাকুরগাঁও : চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হয় বিএনপি। মাত্র সাত মাস পরই ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচন হচ্ছে। সরকারের এ স্বল্প মেয়াদে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের নানা অনিয়ম, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজিএবং অপকর্মে লিপ্ত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে একের পর এক উঠে আসতে থাকে। সরকার এসব সামাল দিতে চাপে পড়ে অনেককে বহিষ্কার করে এবং চরম ইমেজ সংকটে পড়ে। এর মধ্যে আসন্ন উপনির্বাচনে আশার আলো দেখছে বিরোধীদল জামায়াত। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি আসন ধরে রাখা ও ইমেজ উদ্ধারে মরিয়া।
দলীয়ভাবে বিএনপির ইমেজ সংকটের মধ্যে আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন। এ নির্বাচন ঘিরে বেশ সরগরম হয়ে উঠছে ঠাকুরগাঁওয়ের পথ প্রান্তর। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তুতি চলছে জোরে সোরে। ভোটাররা যেমন অপেক্ষায় আছে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। তেমনিভাবে প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জয় করতে ছুটে যাচ্ছেন দ্বারে দ্বারে। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি, দেখাচ্ছেন নতুন ঠাকুরগাঁওয়ের স্বপ্ন।
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচনী এ দৌড়ে রয়েছেন বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ কংগ্রেসসহ পাঁচটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। শেষ পর্যন্ত সকল প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মাঝে। ঠাকুরগাঁও সদর, ভূল্লি ও রুহিয়া উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসন। এ আসনে মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন।
জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন
ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী নানা সমালোচনা ও আন্তর্জাতিক মহলের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়ার পর এ উপনির্বাচন কতটা ফেয়ার ও সুষ্ঠু হবে তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। কারণ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিরোধীদল জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন মাঠে রয়েছেন। প্রথমবার নির্বাচনে আসা জামায়াতের তরুণ এ প্রার্থী যেন রীতিমতো বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সলকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এবং ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন। শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। টানা ৫৭ দিন রিমান্ডে রেখে তার ওপর চালানো অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে, যা দেশবাসীর হৃদয়ে নাড়া দেয় সেসময়। তখন থেকেই জীবন্ত শহীদখ্যাত দেলাওয়ার একজন মজলুম নেতা হিসেবে সারা দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন।
আসন্ন নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের সমর্থন নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দেলাওয়ার হোসেন। এতে ভোটের সমীকরণ পাল্টে যেতে থাকে। কারণ দলীয় ইমেজ সংকটের কারণে খোদ বিনপির সাধারণ ভোটাররা চাপা ক্ষোভ নিয়ে আছে। প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও তাদের সিল যে অন্য কোনো প্রতীকে যাবে, তা মাঠের চিত্র বলে দিচ্ছে। প্রথমবারের মতো এ আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে একাট্টা হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন জামায়াতের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। যেকোনো মূল্যে দেলাওয়ার হোসেনকে বিজয়ী করতে তারা বদ্ধপরিকর। বিএনপির দলীয় কর্মীদের অপকর্মের ফলে সৃষ্ট ইমেজ সংকট জামায়াতের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। জনগণের এ সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে কাছে টানছেন জামায়াতের নেতাকর্মীরা। তাদের নিয়ে মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, পথসভা আর গণসংযোগে দিনরাত একাকার করছেন তারা। শহর গ্রাম, হাট-বাজার মাঠে-ঘাটে নিরলস প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে। পরিশ্রমের ফল হিসেবে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন তারা। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভোটের ফলাফল অনুকূলে আসবে বলেও দৃঢ় বিশ্বাস জামায়াতের নেতাকর্মীদের। বিশেষ করে তরুণ, সংখ্যালঘু এবং নারী ভোটাররা যেভাবে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে, তাতে পাল্টে যেতে পারে অতীতের ভোটের হিসাব-নিকাশ।
জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন এ প্রতিবেদককে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা আমার মূল লক্ষ্য। যেখানে সৃষ্টি করা হবে কর্মসংস্থান। থাকবে না সন্ত্রাস, মাদক, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবজি, দখলদারিত্ব। এমনকি থাকবে না কোনো ধর্মীয় বিভেদ। সকল নাগরিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে। সকল ধর্মের মানুষ মিলেমিশে সমাজে একসাথে বসবাস করবে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সম্মানিত ভোটারগণ আমাকে আগামী নির্বাচনে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে, আমি আমার উক্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন। যিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সাবেক মেয়র। ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে তিনি আওয়ামী লীগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতেন। যার কারণে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে মামলা ও জেলজুলুম হলেও মির্জা ফয়সল আমীন ছিলেন নিরাপদ; এমনকি তার বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্টের ১৭ বছরে কোনো মামলা হয়নি।
বড় ভাই মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রণ এখন তার হাতেই। নির্বাচনে দলের একক সমর্থন পাওয়ায় এবং কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। পিতা ও বড় ভাইয়ের পরিচিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কাজে লাগিয়ে আসন্ন উপনির্বাচনে জয়ের মুকুট পরতে চান বিএনপির এ প্রার্থী। তবে বর্তমান সরকারের আমলে সরকারের নীতি ও দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা নানা অপরাধের মধ্যে সহজ হবে কি না, তা দেখতে নির্বাচনের ফলাফল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তবে তিনি জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে বলেন, আমাদের দল ক্ষমতায় রয়েছে, আমার বড় ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে সকল উন্নয়ন কাজ শুরু করেছেন, তা আমি সম্পন্ন করতে চাই। সব বিবেচনা করে ভোটাররা আমাকে নির্বাচত করবে বলে বিশ্বাস করি।
এদিকে বিএনপি-জামায়াত ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মো. খাদেমুল ইসলাম, খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক নির্বাচনে লড়ছেন। বিএনপির অপর প্রার্থী ওবায়দুল্লাহ মাসুদ মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন বলে জানা গেছে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়ন জমাদানের শেষ দিন ছিল ২৭ সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টা। ২৯ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ৭ অক্টোবর এবং প্রতীক বরাদ্দ ৮ অক্টোবর।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।