কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটিতে রূপান্তর আটকে আছে চিঠি চালাচালিতে


৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৫৩

আল আমিন, কক্সবাজার : বাংলাদেশের পর্যটন শহর হিসেবে পরিচিত কক্সবাজার। পৌর শহরটিতে দেশ বিদেশের লাখ লাখ পর্যটক প্রতিনিয়ন আগমন ঘটে। তবে নাগরিক সেবা ও নিরাপত্তা সংকটসহ আছে নানা সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনা। ক্রমবর্ধমান চাহিদার আলোকে সরকার নাগরিক সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রাচীন এ পৌরসভাটিকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়। শুরু হয় চিঠি চালাচালি। কিন্তু দীর্ঘসময়ে আলোর মুখ দেখেনি এ উদ্যোগ। স্থানীয়দের প্রত্যাশা দ্রুত এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ শহরে বাড়বে ব্যবসা ও নানা সুবিধা। এর মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে আরও বেশি অবদান রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রশাসনিক ক্রমবিকাশ
কক্সবাজার জেলায় বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস। ১৮৫৪ সালে চট্টগ্রামের অধীনে কক্সবাজার থানা গঠিত হয়। একই বছর কক্সবাজার, চকরিয়া, মহেশখালী ও টেকনাফ থানার সমন্বয়ে কক্সবাজার মহকুমা গঠন করা হয়। পরবর্তীতে টেকনাফ থেকে উখিয়া, মহেশখালী থেকে কুতুবদিয়া কক্সবাজার থেকে রামুকে পৃথক করে নতুন তিনটি থানা গঠন করে মোট সাতটি থানা নিয়ে ১৯৫৯ সালে কক্সবাজার টাউন কমিটিতে রূপান্তর করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে টাউন কমিটি বিলুপ্ত করে কক্সবাজারকে পৌরসভায় রুপান্তর করা হয়।
বর্তমানে কক্সবাজার জেলায় দশটি উপজেলা পাঁচটি পৌরসভা ৭৪টি ইউনিয়ন এবং চারটি সংসদীয় আসন রয়েছে। পৌরসভার মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভা সবচেয়ে প্রাচীন এবং প্রশাসনিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে পরিচিত। পর্যটন, পর্যটন স্থাপনা ও প্রশাসনিক সকল ইউনিট কক্সবাজার পৌরসভায় অবস্থিত। ৩২.৯০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত বর্তমান কক্সবাজার পৌরসভাটি কক্সবাজার সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত। এর পূর্বে বাঁকখালী নদী পশ্চিম বঙ্গোপসাগর এবং উত্তরে খুরুস্কুল ইউনিয়ন অবস্থিত। পর্যটন রাজধানী হিসেবে কক্সবাজারের অবস্থান মূলত পৌর এলাকাকে আবর্তিত। শীত মৌসুমে প্রতিদিন লক্ষাধিক পর্যটকের আগমন ঘটে কক্সবাজার পৌরসভায়। পৌরবাসী তাদের সাদরে গ্রহণ করে আতিথিয়তা এবং নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে রাখে।
পর্যটকদের ভ্রমণ আরামদায়ক, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সড়ক ও আকাশ পথের পাশাপাশি রয়েছে কক্সবাজার পৌরসভার সাথে রেলপথ সংযোগ। কক্সবাজার পৌরসভায় অবস্থিত বিমান অবতরণ কেন্দ্রকে আন্তর্জাতিক অবতরণ কেন্দ্রে পরিণত করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে।
সর্বশেষ তথ্যমতে, অক্টোবর ২০২৬ থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ওঠানামা করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১২টি প্রশাসনিক ওয়ার্ড এবং প্রায় দুই লাখ মানুষের বসবাসরত বর্তমান কক্সবাজার পৌরসভা ভৌগোলিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও আর্থসামাজিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বর্তমান সরকার কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ১৫৭ বছরের পুরোনো কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করতে চলতি বছরের জুলাই মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং ভৌগোলিক অবস্থান নিরূপণের লক্ষ্যে চিঠি দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে কক্সবাজার পৌরসভা প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সহযোগিতায় প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের ভৌগোলিক সীমানা, জনসংখ্যা ও আয়তন নির্ণয় করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠিয়েছেন।
প্রস্তাবিত সম্প্রসারিত এলাকার তথ্য
চলতি বছরের ২২ জুলাই কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসক মো. শামীম আল ইমরান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. আদনান চৌধুরী এবং সহকারী প্রকৌশলী রুমেল বড়ুয়ার যৌথ স্বাক্ষরিত তথ্য পত্রমতে, বর্তমান পৌর এলাকার সাথে সদর উপজেলার ঝিলংজা ও পিএমখালী ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অংশ এবং রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন সম্পূর্ণ ও খুনিয়া পালং ইউনিয়নের আংশিক অংশকে প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারিত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে প্রস্তাবপত্র তৈরি করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়েছেন। সম্প্রসারিত এলাকা বর্তমান পৌরসভার সাথে যুক্ত হলে প্রস্তাবিত কক্সবাজার সিটি করপোরেশনের আয়তন হবে ১৬৯.৬৪ বর্গকিলোমিটার জনসংখ্যা হবে প্রায় দশ লাখ আশি হাজার, মৌজার সংখ্যা হবে ১২টি।
প্রস্তাবিত সিটি করপোরেশনের সীমানা নির্ধারণ করার পর কক্সবাজার সদর উপজেলার অন্তর্গত দুটি ইউনিয়ন যথাক্রমে ভারুয়াখালী ও চৌফলদন্ডী ইউনিয়নের অধিবাসীরা সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য মানববন্ধন, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের দাবি-দাওয়া পেশ করেছেন। তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ভারুয়াখালী ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কক্সবাজার জেলা প্রশাসক স্বাক্ষরিত একটি পত্র সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গত ২৭ সেপ্টেম্বর পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে।
নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা
কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করার বিষয়ে নাগরিক সমাজের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ বলেছেন দীর্ঘসূত্রতা, কেউ বলেছেন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কক্সবাজার জেলা পিপি এডভোকেট মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, কক্সবাজারকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। নাগরিক সেবা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। নচেৎ পৌরবাসী সেবা পেতে ভোগান্তির শিকার হবেন।
কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, নাগরিক সেবা বৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে সময়ের সাথে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর জরুরি। রূপান্তর প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা হলে জনদুর্ভোগ বাড়বে। যার কিছু প্রভাব ইতোমধ্যে পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমি আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সিটি করপোরেশন রূপান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী শহীদুল আলম বাহাদুর বলেন, কক্সবাজারবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি কক্সবাজার পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে রূপান্তর। আমি সরকারের এই প্রক্রিয়াকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। তবে পৌরসভা হিসেবে পর্যাপ্ত নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, যানজট, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, হকার সমস্যা ও অবকাঠামোগত সমস্যা বিদ্যমান। আমি আশা করি, কক্সবাজার পৌরসভা সিটি করপোরেশনে রূপান্তর হলে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।