ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সমুদ্রের মাছ ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধান


৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৩৪

॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥
বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ নীল জলরাশি আজ আর কেবল ঐতিহ্যবাহী মৎস্যজীবীদের স্থান নয়। ড্রোন, স্যাটেলাইট, আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির স্পর্শে সমুদ্রভিত্তিক অর্থব্যবস্থা বা ‘ব্লু ইকোনমি’তে সূচিত হচ্ছে এক বিপ্লব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিভিত্তিক এই সমুদ্র অনুসন্ধান কতটা বাস্তবসম্মত এবং কতটা পরিবেশবান্ধব আজকের এই ফিচারে আমরা জানার চেষ্টা করবো?
এক. বিশ্বের মহাসাগরগুলোর বিপুল অংশ আজও মানুষের কাছে অদেখা ও অনিশ্চিত রয়ে গেছে। শত শত বছর ধরে সমুদ্রের মাছ ধরা কিংবা তলদেশের সম্পদ অনুসন্ধানে মানবজাতি নির্ভর করেছে অনুমান, অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে চালানো দীর্ঘযাত্রা এবং সীমিত পরিসরের যন্ত্রপাতির ওপর। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে এই সনাতন দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজকের উন্নত সমুদ্র অনুসন্ধানে চালকহীন আকাশযান বা ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট সেন্সিং, মাল্টিবিম একোসাউন্ডার বিশিষ্ট সোনার, স্বায়ত্তশাসিত পানির নিচের যান এবং স্বায়ত্তশাসিত পৃষ্ঠ যান সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। প্রচলিত পদ্ধতিতে একটি অনুসন্ধানকারী জাহাজকে সমুদ্রে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়, যা অত্যন্ত ধীরগতির, অপচয়মূলক এবং প্রচুর জ্বালানিভিত্তিক। পক্ষান্তরে উপগ্রহের ছবি ও ড্রোনের মাধ্যমে ওপর থেকে দেখা, এআই বিশ্লেষণ এবং পানির নিচে সংবেদনশীল সেন্সর ও এইউভি চালনার মাধ্যমে খুব দ্রুত নির্দিষ্ট অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট উপাত্ত সংগ্রহ করা সম্ভব। ফলে সময় বাঁচে, খরচ বহুগুণ কমে আসে এবং তথ্যের নিখুঁততা বৃদ্ধি পায়।
দুই. সমুদ্রের বিশাল জলরাশিতে কোথায় মাছের ঝাঁক ভেসে বেড়াচ্ছে, তা দূর থেকে শনাক্ত করা এখন আর রূপকথা নয়। ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে সমুদ্রের উপরিভাগ পর্যবেক্ষণ করে মাছের অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছে। ড্রোনে ব্যবহৃত সাধারণ দৃশ্যমান লাইট ক্যামেরার পাশাপাশি ব্যবহৃত হচ্ছে মাল্টিস্পেকট্রাল ও হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং সিস্টেম। এই বিশেষ ক্যামেরাগুলো সমুদ্রের পানির রঙের সূক্ষ্ম পরিবর্তন, ক্লোরোফিলের ঘনত্ব, তরঙ্গের বৈশিষ্ট্য এবং পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করতে পারে। পানির নিচে থাকা অ্যালজি বা প্ল্যাঙ্কটনের উপস্থিতি নির্ধারণ করে ড্রোনের ক্যামেরা, যা মাছের প্রধান খাদ্য এবং মাছের অবস্থানের অন্যতম বড় নির্দেশক। এরপর এআই চালিত কম্পিউটার ভিশন অ্যালগরিদম এই ভিজ্যুয়াল ও বর্ণালি উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কেবল মাছের সন্ধানই দেয় না, বরং মাছের প্রজাতি, দৈর্ঘ্য, আনুমানিক সংখ্যা এবং চলাচলের দিক পূর্বাভাস করতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় বিজ্ঞান সংস্থা এবং টেকনোলজি এনভায়রনমেন্টাল এজেন্সিগুলো উপগ্রহ ও ড্রোন উপাত্তের সঙ্গে এআই মডেল যুক্ত করে সামুদ্রিক জীবের ট্র্যাকিং এবং টুনাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাছের ঝাঁক অনুসন্ধানে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করছে। মার্কিন ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ‘Saildrone’-এর মতো স্বায়ত্তশাসিত ভাসমান ড্রোন ও এরিয়াল ড্রোন ব্যবহার করে আলাস্কা ও প্রশান্ত মহাসাগরে পাল্যাঙ্কটন ও মাছের অবস্থান জরিপ করছে, যা জাহাজের জ্বালানি খরচ প্রায় ৮০% হ্রাস করেছে। ইউরোপীয় গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং স্পেনের মৎস্য খাত আধুনিক স্মার্ট বয়া ও সেন্সর ড্রোন ব্যবহার করে টুনা মৎস্য আহরণে এআই অ্যালগরিদম সফলভাবে প্রয়োগ করেছে।
স্মার্ট ফিশিং’ বা ‘প্রিসিশন ফিশিং’ বলতে বোঝায় আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট স্থানে, সঠিক পরিমাণে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে মাছ আহরণ করা। একটি এআই মডেল একইসঙ্গে বায়ুমণ্ডলীয় আবহাওয়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা, সমুদ্রস্রোতের গতিবিধি, লবণাক্ততা, ক্লোরোফিলের ঘনত্ব, সামুদ্রিক উচ্চতার তারতম্য এবং অতীত ইতিহাস সংকলিত করে মাছের সম্ভাব্য উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে। বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা হলো— এআই-এর তৈরি করা পূর্বাভাস শতভাগ নিশ্চিত মাছের অবস্থান নির্দেশ করে না। এটি জটিল গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে সামুদ্রিক পরিবেশের আনুকূল্য বিবেচনা করে মাছের অবস্থানের একটি ‘উচ্চ সম্ভাবনাময় অঞ্চল’ তৈরি করে দেয়।
তিন. বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মূল ভূখণ্ডের প্রায় সমপরিমাণ। এই বিশাল সমুদ্র এলাকায় ৪৭৫টিরও বেশি প্রজাতির মাছ এবং ৫০টিরও বেশি প্রজাতির চিংড়ি রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্য খাতের বড় অংশই এখনো উপকূলীয় ও অগভীর সমুদ্রে (২০০ মিটারের কম গভীরতা) সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশের বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো হলো— প্রযুক্তির অভাব; অধিকাংশ ঐতিহ্যবাহী কাঠের ট্রলার ও নৌকায় আধুনিক জিপিএস, একোসাউন্ডার বা স্যাটেলাইট রিসিভার নেই। জ্বালানি অপচয়; নির্দিষ্ট মৎস্যক্ষেত্রের তথ্য না থাকায় জেলেদের আন্দাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সমুদ্রে ট্রলার চালাতে হয়, যা জ্বালানি খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গভীর সমুদ্রের অবহেলা; ইলিশ, রূপচাঁদা, লটিয়া ও চিংড়ি উপকূল থেকে ধরা হলেও সমুদ্রের টুনা বা স্কুইড আহরণে স্থানীয় জেলেদের আধুনিক ট্রলার ও ড্রোন টেকনোলজির সুবিধা নেই। যেখানে প্রযুক্তি পরিবর্তন আনতে পারে বিরাট। বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং মৎস্য অধিদপ্তর যদি স্যাটেলাইট ও ড্রোন ভিত্তিক সার্ভিল্যান্স চালু করে, তবে অবৈধ, অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা বন্ধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট যৌথভাবে এআই চালিত প্রটেনশিয়াল ফিশিং জোন সেবা চালু করলে জেলেরা কম সময়ে বেশি মাছ পেতে পারেন।
এখানে একটি গভীর নৈতিক ও পরিবেশগত প্রশ্ন দেখা দেয়; প্রযুক্তি কি সমুদ্রের মাছ বাড়াবে, নাকি অতি-আহরণের পথ ত্বরান্বিত করবে? যদি প্রযুক্তির অপব্যবহার ঘটে এবং জেলেরা এআই-এর সাহায্যে প্রতিটি মৎস্য-ঝাঁককে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে নিধন করতে শুরু করে, তবে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধসে পড়তে পারে। তবে প্রযুক্তির ইতিবাচক ও টেকসই প্রয়োগও সম্ভব। কোটা নির্ধারণ করে এআই মডেলের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে ঠিক কতটুকু মাছ ধরা নিরাপদ তা নির্ধারণ করা যায়। প্রজনন মৌসুম পর্যবেক্ষণ করে নিষিদ্ধ সময়ে বা সামুদ্রিক সুরক্ষিত এলাকায় ট্রলার ঢুকছে কিনা তা দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে দিনরাত নজরদারি করা যায়। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রজাতি রক্ষার ক্ষেত্রে সোনার ও এআই ইমেজিংয়ের মাধ্যমে ছোট মাছ বা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী যেমন ডলফিন ও কচ্ছপের উপস্থিতি টের পেয়ে আগেই জাল তোলা নিশ্চিত করা যায়।
চার. ড্রোন ও রোবোটিক্সে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানসমুদ্রের তলদেশে হাইড্রোকার্বন (তেল ও গ্যাস) অনুসন্ধান একটি অতি জটিল ও ব্যয়বহুল ভূ-বিজ্ঞানের বিষয়। সিজমিক সার্ভে ও এআই-এর ভূমিকা অনেক। সমুদ্রের ভূগর্ভস্থ গঠন বোঝার প্রাথমিক উপায় হলো সিজমিক সার্ভে। এতে জাহাজের পেছন থেকে কৃত্রিম শব্দতরঙ্গ পাঠোনো হয়, যা সমুদ্রের তলদেশের বিভিন্ন শিলাস্তরে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এআই ও মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম এই কোটি কোটি সিজমিক উপাত্তকে অতি দ্রুত প্রসেস করে ভূগর্ভস্থ ত্রিমাত্রিক মডেল তৈরি করতে পারে, যেখানে তেল বা গ্যাস থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। অফশোর প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করা। বায়ুমণ্ডলীয় ড্রোন সরাসরি সমুদ্রের গভীরে শিলাস্তরের নিচে অনুসন্ধান চালায় না; ড্রোনের কাজ আকাশে বা পানির উপরিভাগে সীমাবদ্ধ। সমুদ্রের উপরিভাগে চালিত এরিয়াল ড্রোন অফশোর রিগ ও পাইপলাইনের মিথেন গ্যাস লিক এবং ক্ষয়প্রাপ্ত অংশ সেন্সর ও থার্মাল ইমেজিংয়ের মাধ্যমে নিরীক্ষা করে। আর সমুদ্রের গভীরে গভীর-পানির পাইপলাইন ও অবকাঠামো পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হয় রোবোটিক অটঠ বা মেকানাইজড আর ও ভি।
পাঁচ. মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে বিরাট এক ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য পায়। বাংলাদেশের গভীর ও অগভীর সমুদ্রে মোট ২৬টি অফশোর ব্লক রয়েছে (১৫টি গভীর সমুদ্রে, ১১টি অগভীর সমুদ্রে)। মিয়ানমার ও ভারতের বঙ্গোপসাগর অংশে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও, বাংলাদেশের অফশোর ব্লকে অনুসন্ধান দীর্ঘকাল ধীরগতিতে চলেছে। সম্প্রতি পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর জন্য অফশোর বিডিং রাউন্ড ঘোষণা করেছে এবং বহুমাত্রিক সিজমিক জরিপ সম্পন্ন করেছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে গ্যাস সম্ভাবনার বড় ইঙ্গিত থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি নিশ্চিতকরণ ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো ব্লকে কত ট্রিলিয়ন কিউবিক ফিট গ্যাস সংরক্ষিত আছে, তা সুনির্দিষ্ট বলা সম্ভব নয়। তবে এআই সিজমিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করলে নতুন কূপ খননের ঝুঁকি ও ড্রিলিং ব্যর্থতার হার নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। তেল ও গ্যাসের বাইরেও মহাসাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ খনিজসম্পদ রয়েছে। পলিম্যাটালিক নোডিউলস; আলু আকারের এই পিণ্ডগুলোয় মাঙ্গানিজ, নিকেল, কোবাল্ট ও তামার সমৃদ্ধ মিশ্রণ থাকে। রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট; আধুনিক ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ও ইভি ব্যাটারির জন্য প্রয়োজনীয় দুর্লভ মৌল। উপকূলীয় খনিজ বালি; ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন ও গার্নেট। বাংলাদেশের অবস্থান হলো; কক্সবাজার ও ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার উপকূলীয় বালুতে ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল ও গার্নেট এর উপস্থিতি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এ নিয়ে গবেষণা করেছে। বঙ্গোপসাগরের গভীরে পলিগঠিত সুগভীর অংশে নোডিউলস বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট থাকার সম্ভাবনা নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণা থাকলেও, গভীর সমুদ্রে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের মতো খনিজ নিশ্চিত করতে বিস্তৃত এইউভি জরিপ ও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এখনো প্রয়োজন।
ছয়. এআই চালিত সিবেড ম্যাপিং করা। সমুদ্রের তলদেশের সঠিক মানচিত্র ছাড়া কোনো প্রযুক্তিই কার্যকর হতে পারে না। আন্তর্জাতিক প্রকল্প ‘Seabed 2030’-এর উদ্দেশ্য বিশ্ব মহাসাগরের পুরো তলদেশের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা। মাল্টিবিম একোসাউন্ডার ব্যবহার করে বিশিষ্ট সোনার সমুদ্রের নিচে একাধিক তরঙ্গ পাঠিয়ে ডেটা সংগ্রহ করে। স্যাটেলাইট অল্টিমেট্রি ও সমুদ্রের ঢেউয়ের উচ্চতা থেকে পানির নিচের ভূখণ্ডের আনুমানিক উচ্চতা বোঝা যায়। এআই এই অসম এবং অসম্পূর্ণ ডেটা সমন্বয় করে নিরবচ্ছিন্ন ত্রিমাত্রিক সিবেড ম্যাপ তৈরি করে। প্রযুক্তির জয়গান গাওয়ার পাশাপাশি এর বড় চ্যালেঞ্জগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। উচ্চ প্রযুক্তিগত ব্যয়; উচ্চমানের এইউভি, হাইপারস্পেকট্রাল ড্রোন ও স্যাটেলাইট ডেটা প্রসেসিং সিস্টেম অত্যন্ত ব্যয়বহুল। দক্ষ জনবলের ঘাটতি; বাংলাদেশে ওশেনোগ্রাফিক ডেটা সায়েন্স ও মেরিন রোবোটিক্সে দক্ষ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা এখনো সীমিত। ক্ষুদ্র জেলেদের বৈষম্য; কেবল বড় শিল্পগোষ্ঠী বা ধনী ট্রলার মালিকরা যদি এই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পায়, তবে প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা জীবিকা হারাবেন। পরিবেশগত ঝুঁকি; সমুদ্রের গভীরে রোবোটিক খনিজ খনন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র, প্রবালপ্রাচীর ও পানির নিচের শব্দদূষণের চরম বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
সাত. এখানেই উত্থাপিত হয় মূল প্রশ্ন? আমরা কি কেবল দ্রুত সম্পদ আহরণের পেছনে ছুটব, নাকি দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করব? ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতি কেবল সম্পদ শোষণ নয়; এটি মূলত সম্পদ রক্ষা ও ব্যবহারের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। পরিবেশগত ভারসাম্য না রেখে এআই দিয়ে সমস্ত মাছ ধরে ফেললে বা অনিয়ন্ত্রিত খনন চালালে সমুদ্রের জীবনচক্র ভেঙে পড়বে। তাই বাংলাদেশকে সামুদ্রিক স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে— যেখানে কোন এলাকা মৎস্যক্ষেত্র, কোন এলাকা সংরক্ষিত এবং কোথায় কূপ খনন করা যাবে তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা থাকবে। আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও দৃষ্টান্ত হলো: নরওয়ে তাদের অফশোর তেল-গ্যাস এবং আধুনিক অ্যাকুয়াকালচারে ব্যাপকভাবে এআই এবং স্বায়ত্তশাসিত আন্ডারওয়াটার ভেহিকল ব্যবহার করে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করেছে। সিবেড ম্যাপিং এবং স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত প্রিসিশন ফিশিংয়ের মাধ্যমে জাপান তাদের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাছের অপচয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। ভারতের ‘Deep Ocean Mission’-এর অধীনে তারা নিজস্ব রোবোটিক ও এইউভি উন্নত করছে এবং ‘INCOIS’ সংস্থার মাধ্যমে এআই পূর্বাভাস সেবা নিয়মিত জেলেদের প্রদান করছে। বাংলাদেশ এসব দেশের কাছ থেকে প্রযুক্তি স্থানান্তর (Technology Transfer) ও যৌথ গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষা নিতে পারে।
পরিশেষে; ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বঙ্গোপসাগরের মাছ, তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদ অনুসন্ধানে এক নতুন যুগের দ্বারে বাংলাদেশকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল কল্পনা নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রমাণিত একটি সম্ভাবনা। তবে প্রযুক্তি কোনো জাদুদণ্ড নয়। ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে, নাকি নীতিমালার অভাবে তা সামুদ্রিক জীবনের ওপর নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়াবে? উত্তরটি নির্ভর করছে আমাদের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর। প্রযুক্তিকে কেবল শোষণ বা দ্রুত মুনাফার হাতিয়ার না বানিয়ে যদি সঠিক তথ্য সংগ্রহ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং প্রান্তিক জেলেদের ক্ষমতায়নের কাজে লাগানো যায়, তবেই প্রযুক্তিভিত্তিক ‘টেকসই নীল অর্থনীতি’ বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে। তথ্যসূত্র: FAO; SOFIA; NOAA Report.