অংকশাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান


৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৩০

॥ মনসুর আহমদ ॥
জ্ঞানবিজ্ঞানের আবিষ্কার ও তার উন্নতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন জাতির মনীষী ও বিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। কারো অবদান ছোট করে দেখার নেই। মানবজাতির ইতিহাসে মুসলমানদের আবির্ভাবের পূর্বে বহু জাতির উত্থান হয়েছে। তাদের জ্ঞানবিজ্ঞানে প্রচুর অবদান রয়েছে। শাস্ত্র হিসাবে অংক বিজ্ঞানের অতি পুরাতন শাখা। এ শাখার পাটিগণিত, বীজগণিত, (ব্যক্ত ও অব্যক্ত গণিত) জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি ইত্যাদি বিভিন্নকালে বিভিন্ন জাতির বিজ্ঞানীদের দ্বারা আবিষ্কৃত ও উন্নতি লাভ করেছে। যেমন পাটিগণিত সম্পূর্ণ রূপে হিন্দুদের বিজ্ঞান। অন্য কোনো জাতির দ্বারা কোনোরকম প্রভাবিত না হয়ে স¤পূর্ণ স্বাধীনভাবে হিন্দুরা অন্যসব জাতির চেয়ে পাটিগণিতে অত্যধিক ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিল। পাটিগণিতে হিন্দুদের সবচেয়ে বড় অবদান ও কৃতিত্ব ১ থেকে ৯ পর্যস্ত্র সংখ্যা ও ‘০’ শূন্যের আবিষ্কার। ১ থেকে ৯ এবং ‘০’ ধরে অর্থাৎ দশ ধরে গণনা পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলেই হিন্দুরা গ্রীকদের চেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করেছিল। কোলব্রুক বলেন, আরবরা এই সংখ্যা গণনা পদ্ধতি হিন্দুদের কাছ থেকে শিক্ষা করেছিল। পরবর্তীতে এই সংখ্যা গণনা পদ্ধতি ইউরোপ আরবদের কাছ থেকে শিক্ষা করে। অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে ভারতীয়রা পাটিগণিত ও বীজগণিতে আরবদের শিক্ষা দাতা হয়েছিল এবং তাদের মারফতে পাশ্চাত্য জাতিসমূহের।
এটাই সত্য যে হিন্দুরা পাটিগণিতে সমস্ত জাতির চেয়ে উন্নত ছিল। তবে বীজগণিতে মুসলমানদের অবদান ছিল সব জাতির চেয়ে বেশি। বীজগণিতের ইংরেজী নাম অ্যালজেবরা (অষমবনৎধ)। আরবদের মধ্যে বীজগণিতের প্রথম লেখক মুহাম্মদ মুসা আল খোয়ারেজমী (৮২৫ খ্রি.) কৃত ‘আলজেব-ওয়াল মোকাবেলা’ নামক বীজগণিতের গ্রন্থের নাম থেকে ঐ শব্দ নেয়া হয়েছে। বাগদাদে গণিত বিশারদ মুহাম্মদ বিন-মুসা আল খুরেজমী (ইউরোপীয় : আল গোরিতমি) বাস করতেন। তিনি বর্তমানে ‘খানাতে খিবা’ অর্থাৎ খুরেজমে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং ৮৪৭ খ্রি. মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছিলেন। তিনি বীজগণিত এবং অংকশাস্ত্রের গ্রন্থাকার ছিলেন এবং রেনেসাঁর যুগ পর্যস্ত্র ইউরোপে এ বিষয়ে শ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ রূপে বিবেচিত হয়ে এসেছেন। ‘লগারিদম’ শব্দটি তাঁর নামের অপভ্রংশ থেকে নেয়া হয়েছে। প্রাচীন জ্যোতিষ শাস্ত্রীয় সারনি প্রস্তুত ছাড়াও তিনি প্রাচীন অংক এবং বীজগণিতের সুত্রগুলোকে সুসমন্নিত করেন। তার রচিত ‘হিসাব-উল-জাবর-ওয়াল মুকাবালা’ আরবী ভাষায় লিখিত বীজগণিতের ওপর প্রামান্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ইহা ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ষষ্ঠদশ শতাব্দী পর্যন্ত্র ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে সমাদৃত হয়েছে।
গণিতশাস্ত্রে মুসলমানদের অবদান স¤পর্কে আলোচনা করতে গেলে আলোচনায় আসেন হিন্দু গণিতজ্ঞ ভাস্করাচার্য। তিনি ৩৬ বছর বয়সে ১১৫০ খ্রিষ্টাব্দে তার সুপ্রসিদ্ধ ‘সিদ্ধাস্ত্র শিরোমনি’ রচনা করেন। ‘সিদ্ধাস্ত্র’ গ্রন্থটি অনুবাদের ফলে মুসলমানগণ হিন্দু অংকশাস্ত্র, ভারতীয় সংখ্যারীতি এবং শূন্য সম্বন্ধে সম্যক ধারণা লাভ করেন। আল ফারাজী এই গ্রন্থ অনুবাদ করেন। আল ফারাজী একাদশ শতাব্দীতে তার ‘আল-কাফি-ফিল-হিসাব’ গ্রন্থে ভারতীয় সংখ্যা চিহ্নগুলোকে শব্দের মাধ্যমে লিপিবদ্ধ করেন।
ত্রিকোণমিতি প্রসঙ্গে প্রথমে যে বিজ্ঞানীর নাম করতে হয় তিনি আল বাত্তানী (ইউরোপীয়ঃ আল বাতেগ নিয়াস)। আবু আবদুল¬াহ আল বাত্তানী (৮৫৮-৯২৯ খ্রি.) ফোরাত উপকূলস্থ রাক্কায় কাজ করতেন এবং ৯২৯ খিষ্টাব্দে মারা যান। তিনি ছিলেন অংকশাস্ত্রবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী। ত্রিকোণমিতি প্রয়োগ স¤পর্কীয় প্রাথমিক জ্ঞান ইউরোপ তার নিকট থেকেই পেয়েছিল। গ্রীস ও পাক ভারত বাংলাদেশ এই উভয় দেশেই ত্রিকোণমিতি কেবলমাত্র জ্যোর্তিবিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে আলোচিত হয়েছিল। মাত্র ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এটা প্রাচ্য দেশগুলোয় এটা পৃথক শাস্ত্র হিসেবে বিবেচিত হতে আরম্ভ করেছিল। বাত্তানী অংকশাস্ত্রের ত্রিকোণমিতি শাখাকে স্বয়ং স্বাধীন বিজ্ঞান হিসেবে আবিষ্কার করেন। তাঁর অসাধারণ প্রতিভাবলে নির্জীব ত্রিকোণমিতি সজীব হয়ে ওঠে। সাইন, কোসাইনের সাথে ট্যানজেন্টের স¤পর্ক আল বাত্তানীই প্রথম আবিষ্কার করেন। ত্রিভূজের বাহুর সাথে কোণের ত্রিকোণমিতি স¤পর্ক তারই আবিষ্কার। তিনি গোলাকার ত্রিকোণমিতির কিছু কিছু সমস্যার অত্যস্ত্র বিস্ময়কর সমাধান দিয়েছেন। তঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান, ত্রিকোণমিতি ও অংকশাস্ত্রের বহু মূল্যবান গ্রন্থ ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
ত্রিকোণমিতির আলোচনায় যার নাম অত্যন্ত স¤পৃক্ত তিনি আল বেরুনী। সুলতান মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি জ্যোতিষশাস্ত্রের সমসাময়িক তত্ত্বাবলীর সমন্বয়ে ‘আল কানুন-উল-মাসুদী-ফিল হাইওয়ান নজুম’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রসূত গ্রন্থ ১০৩০খ্রিষ্টাব্দে প্রণয়ন করেন। এ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে ত্রিকোণমিতি বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সূক্ষ ও শুদ্ধ গণনায় আল বেরুনী একটি বিস্ময়কর পন্থা আবিষ্কার করেন যার বর্তমান নাম ঞযব ঋড়ৎসঁষধ ড়ভ ওহঃবৎঢ়ড়ষধঃরড়হ পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ এটিকে নিউটনের আবিষ্কার বলে প্রচার করার চেষ্টা চালাচেছন। অথচ নিউটনের জন্মের ৫৯২ বছর পূর্বেই আল বেরুনী এটি আবিষ্কার করেন এবং একে ব্যবহার করে বিশুদ্ধ সাইন তালিকা প্রস্তুত করেন।
বিশ্বমানবতার গৌরব ইবনে সিনা চিকিৎসা জগতে বিখ্যাত হলেও অংকশাস্ত্রে তার অবদান উল্লেখযোগ্য। ১৯ বছর বয়সে চিকিৎসা শাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি গণিত ও জ্যামিতি শাস্ত্রে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হন। তিনি এ বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে শতাধিক কিতাব রচনা করেন। সময় ও গতির সাথে বিদ্যমান স¤পর্কের কথা তিনিই আবিষ্কার করেন।
কবি ওমর খৈয়াম ছিলেন একজন অংকশাস্ত্রবিদ। তিনি ‘আত তারিখ-উজ-জালালী’ নামে পরিচিত পঞ্জিকা উদ্ভাবন করেন। তাঁর এ পঞ্জিকা গ্রেগোরিয়ান পঞ্জিকা হতেও নির্ভূল। আল খাওয়ারিজমীর প্রভাবে তিনি পাটিগণিত, বীজগণিত ও জ্যোর্তিবিজ্ঞানের ওপর বহু গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তিনি সর্বপ্রথম কণিকের ছেদ দ্বারা উহার দ্বিঘাত, ত্রিঘাত ও ঘন সমীকরণগুলোর সমাধান করেন। ঐতিহাসিক হিট্রি বলেছেন, ত্রিকোণমিতির বিজ্ঞান যেমন-বীজগণিত এবং বিশে¬ষণমূলক জ্যামিতি প্রধানত আরবদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। টলেমী ও ইউক্লিডের অনুকরণে প্রথম অবস্থায় গণিত শাস্ত্রের চর্চা শুরু হলেও খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দী থেকে মুসলমানদের মৌলিক গবেষণা বিশ্ব জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছিল। এ যুগেই বীজগণিত ও সমতল এবং বৃত্তাকার সমীকরণ সমাদৃত হয়। দার্শনিক আল কারাবী জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ওপর তথ্যমূলক পুস্তক রচনা করেন।
দশম শতাব্দীর মুসলিম বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে আবু ওয়াকার নাম বিশেষভাবে উলে¬খযোগ্য। তিনি খাওয়াবিজলী ও ইউক্লিডের জ্যামিতির সমালোচনা করেন এবং ত্রিকোণমিতির তালিকা প্রণয়ন করেন। তিনি সর্বপ্রথম সাইন উপপাদ্যের সাথে গোলাকার ত্রিভূজের সাধারণত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। জাবির ইবনে আখলাহ তার ‘কিতাব আল হায়াত’ এ গোলাকার এবং সাধারণ ত্রিকোণমিতির ওপর একটি জ্ঞানগর্ভ পরিচ্ছেদ সংযোজিত করেন। ১২৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরুদ্দীন তুর্কী তাঁর কিতাব ‘চোক লোল কাত্তা’ গ্রন্থে ত্রিকোণমিতি বিশদভাবে আলোচনা করেন। এভাবে মুসলমানদের মৌলিক গবেষণার ফলে গ্রীক জ্যামিতির জটিল সমস্যাগুলির সমাধান, ভারতীয় ‘শূন্যের’ ইউরোপে বহুল প্রচার, দশমিক প্রথা, বীজগণিত, গোলাকার ও ত্রিকোণমিতির প্রবর্তন করে মুসলমানগন কৃতিত্ব অর্জন করেন।
আরবরা গণিতশাস্ত্র থেকে গ্রীক পরিভাষার শব্দগুলো উঠিয়ে দিয়ে তদস্থলে একই অর্থবোধক নিজস্ব ভাষার শব্দ ব্যবহার করেছিলেন।
আব্বাসীয় খলিফাদের রাজত্বকালের দুই সময় আরবরা বিদেশিদের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করে : (১) মনসুরের রাজত্বকালে (খ্রিষ্টাব্দ ৭৫৩-৭৭৪) প্রধানত জ্যোতির্বিদ্যা (২) হারুনের রাজত্বকালে বারযাক নামক মন্ত্রী পরিবারের প্রভাবে (যারা ৮০৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মুসলমান জগতের ওপর প্রভুত্ব করেছিলেন)।
বিদেশিদের কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন ও নিজেদের মৌলিক গবেষনা মুসলমানদের মর্যাদার শীর্ষে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছিল, মুসলমানরা হয়েছিল পাশ্চাত্য জগতের শিক্ষাগুরু।