বিএনপি নেতাকর্মীরা বেপরোয়া, মানছে না হাইকমান্ডের নির্দেশনা


৭ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৮

স্টাফ রিপোর্টার : রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশ দখল, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্র থেকে বারবার সতর্কবার্তা, বহিষ্কার ও কমিটি বিলুপ্তির মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সর্বশেষ রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় বিএনপির স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নাম আসায় দলটির সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ওই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দলটির একজন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগও করতে হয়েছে।
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও জমি দখলের অভিযোগ। গত ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১ নম্বরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের পর সেটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ও কয়েকজন নেতার নাম উঠে আসে। অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে রাড্ডা ঘটনার সঙ্গে কমিটি বিলুপ্তির সরাসরি যোগসূত্র আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ঘটনার পর বিএনপির ভেতরে বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি আরও বাড়ে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে ছাড় দেওয়া হবে না, এমন অবস্থানের কথাও জানানো হয়েছে সরকারি সূত্রগুলো থেকে।
এর মধ্যেই গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। একই সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল এবং ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। পাশাপাশি বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংগঠনবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গের কথা বলা হয়েছে।
এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপির পল্লবী থানা এলাকার ৯১ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মফিজুর রহমান মামুনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অনৈতিক ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়। স্থানীয়ভাবে তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছে।
শুধু ঢাকায় নয়, দেশের অন্যান্য এলাকায়ও একই ধরনের অভিযোগে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গাজীপুরে শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজিসহ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিএনপির চার নেতাকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলটির স্থানীয় নেতারা বলেন, বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কোনো সুযোগ নেই।
দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে। বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ দখলদারি, চাঁদাবাজি, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাম্প্রতিক সময়ে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কার, পদ স্থগিত, কারণ দর্শানোর নোটিশসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।
এত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কেন অপরাধ থামছে না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে দুর্বলতা, স্থানীয় আধিপত্যের দ্বন্দ্ব এবং ক্ষমতার নতুন সমীকরণে ব্যক্তিস্বার্থের সংঘাত এর অন্যতম কারণ হতে পারে।
বিএনপি এখন একদিকে সরকার পরিচালনা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে; অন্যদিকে দলীয় ভাবমর্যাদা রক্ষায় তৃণমূলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চ্যালেঞ্জে পড়েছে। ফলে দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগে একের পর এক বহিষ্কার ও কমিটি বিলুপ্তির পদক্ষেপ শুধু শাস্তি নয়, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের জন্য কেন্দ্রের একটি কঠোর বার্তা বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।