নব্য চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজরা বিএনপিকে দিকহারা করছে


২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২৭

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
দেশের ১৮ কোটি মানুষ কি শুধুই দিয়ে যাবে, পাওয়ার খাতায় শূন্য? ৫৫ বছরে প্রায় সবাই ক্ষমতায় ছিল। চারদলীয় জোট সরকারের সময় জামায়াতের ২ জন মন্ত্রী সাবেক আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ৫ বছরে ৩টি মন্ত্রণালয় সততার সাথে দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় চালিয়ে গেছেন। তারপরও স্বৈরাচার হাসিনা তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছে যা দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য জঘন্য পাপ হিসেবে গণ্য হবে, ইনশাআল্লাহ।
সর্বশেষ প্রতারণা করে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রকাশ্যে হাজারো লোকের উপস্থিতিতে জুলাই সনদ ও গণভোটের ব্যবস্থা করা হয় এবং সবাই মিলে প্রায় ৩১টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করে। সদ্য সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণা যে প্রতারণার দলিল, তা সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান রাজসাক্ষী হিসেবে প্রকাশ্য দিবালোকে জানান যে, আমরা মৌলবাদীদের ক্ষমতায় আসতে দিইনি। ফল যা হওয়ার, তাই হলো। বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে গত ৭ মাসে কোনো ভালো পারফরমেন্স দেখাতে পারেনি। একমাত্র শিলং সালাহউদ্দিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও তিনি সব মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তার নিজস্ব মন্ত্রণালয়ের দশা করুণ। খুন, হত্যা, ধর্ষণ, আত্মহত্যা লেগেই আছে। মাদক দেশটাকে ছেয়ে ফেলেছে। সবচেয়ে বেশি মাদক আসছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা দিয়ে। মাদক ব্যবসায়ীদের সবাই চেনে। কিন্তু কে কাকে ধরে। কারণ সবারই ভাগ আছে নিচ থেকে ওপরওয়ালা পর্যন্ত।
দেশ এভাবে চলতে পারে না। আমাদের ছাত্র-জনতা ৩৬ জুলাই যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, তারা এখনো বেঁচে আছে আর যারা শহীদ-আহত হয়েছেন, তাদের কোনো ত্যাগ বৃথা যাবে না। শুধু ডাকের অপেক্ষা। আবার দেশ গর্জে উঠবে। এবার কারো ছাড় হবে না। যারা জুলাই বিপ্লবের ভূমিকার ফলে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আপনারা গুলির সম্মুখীন হননি, মিছিলে ছিলেন না। বর্তমানের ডিজিটাল মিডিয়ার ফলে আন্দোলনে কারা নেতৃত্ব দিয়েছে, কারা রিস্ক নিয়েছে, কারা মিছিল-মিটিং করেছে, সবারই বাস্তব ছবি আছে। তাই লাফালাফি না করে অনতিবিলম্বে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় মেনে নিন। দেশকে আর বিপদে ফেলবেন না। জনগণ ক্ষেপলে আম-ছালা সবই হারাবেন। জামায়াত জোটের দুই লংমার্চে প্রমাণ হয়েছে— জনগণ যেমন ভোট দিয়েছে আবার তারা সচেতন যেকোনো ডাকে সাড়া দিতে প্রস্তুত।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যাপারে আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় বলে আমাদের দেশে জ্বালানি ও গ্যাসের অভাব নেই। গত সরকারগুলো দেশের সম্পদ আহরণের বাস্তব সম্ভব পদক্ষেপ নেয়নি। বাপেক্সকে দায়িত্ব দেন ৭ দিনের মধ্যে সারা দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর অবস্থা কী? কোন গ্যাসক্ষেত্র উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। শহীদ জিয়াউর রহমান নাটোরে চলনবিলের পাশে বিশাল গ্যাসক্ষেত্র উদ্বোধনের আগে হঠাৎ বাতিল করা হয়। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্যাস মজদু রয়েছে। বাপেক্সে দায়িত্ব দিয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে কোন এলাকার গ্যাসক্ষেত্র কার্যকর করা সম্ভব তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনে প্রণোদনা দিয়ে গ্যাসকেন্দ্র চালু করতে হবে। শুধু স্থলেই যত গ্যাসক্ষেত্র আছে, তাই আগে চালু করা হোক। পরে সমুদ্রে অভিযান চালানো যাবে। আমার জানা মতে, দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো সঠিকভাবে চালু করতে পারলে গ্যাস রফতানি করা সম্ভব হবে। প্রয়োজন ড্রাস্টি একশন। অতিসত্বর সব রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হবে। সাথে সাথে দেশের চালু সোলার ব্যবহার গতি বাড়াতে হবে ১০০%। যারা সোলার ব্যবহার বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, তাদের প্রণোদনা দিয়ে কুইক রেন্টালের বিকল্প হিসেবে সামনে আনতে হবে। আমাদের দেশের চরাঞ্চলগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আনতে হবে। আমার জানা মতে, বেক্সিমকোসহ বেশ কয়েকটি কোম্পানি সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে সরকারের কাছে বিক্রয় করছে। তাদেরও লাভ হচ্ছে। আমরা চাই আর দেশের সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার করা যাবে না। আমাদের ন্যায্য অধিকার বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে চাঁদাবাজি বড় বাধা। উৎপাদকদের থেকে শহরে আসতে জায়গায় জায়গায় চাঁদা দিতে দিতে সব জিনিসের দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমরা যদি শহর-বন্দরে সরকারি দল ও বিরোধীদল মিলে প্রশাসনকে জড়িত করে কমিটি করতে পারি, তবে এক সপ্তাহে চাঁদাবাজদের কব্জা করা সম্ভব হবে। আমার এলাকা ও শহরের অবস্থা বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকেই এ প্রস্তাব দিলাম।
জোট সরকারের আমলে ক্লিনহার্ট অপারেশন হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে, সরকারি দলের লোকেরাই বেশিরভাগ ধরা খেয়েছে চাঁদাবাজ-দখলবাজ দুর্নীতিতে ভরা। জানি না, এ সরকার এমন সাহসী ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা? শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়া কিন্তু জনগণের রাজনীতি করতেন। যার ফলে আপনারা দেখেছেন তাদের জানাজায় লাখ লাখ লোক একত্রিত হয়েছিল। ভালোবাসায় সিদ্ধহস্ত আমরাও দল-মত নির্বিশেষে জানাজায় উপস্থিত ছিলাম।
আমার প্রস্তাব কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ এবং সোলার সিস্টেম চালু ত্বরিত করতে হবে। সময় একটুও অপচয় করা যাবে না। সময়ের কাজ সময়মতোই করতে হবে। ইতোমধ্যে আমার বেশ কয়েকজন সোলার ব্যবসায়ীর সাথে কথা হয়েছে। তারা আত্মবিশ্বাসের সাথে আমাকে বলেছে, সরকারি সহযোগিতা পেলে তারা কুইক রেন্টালের বিকল্প বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারবে এবং সুলভমূল্যে সরবরাহ করতে পারবে।
আমাদের দেশের আবহাওয়া এবং চরাঞ্চলগুলোয় সোলার প্যানেল স্থাপন করতে পারলে সহজেই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সাথে সাথে বন্ধ করে রাখা গ্যাস কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করার বড় উদ্যোগ নিতে হবে। এতেও কোনো ছাড় দেয়া যাবে না। অতিদ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাপেক্সকে স্বাধীনতা দিতে হবে— যাতে তাদের কাজে কোনো বাধা না হয়ে আসে। আমরা যেমন জুলাই সনদ স্বাক্ষর করতে পেরেছি সেই উদ্দীপনায় কাজ করলে বিদ্যুৎ-গ্যাস আমাদের ব্যবহার করেও রফতানি করতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
অন্যদিকে দেশ এগিয়ে নিতে হলে জনগণের মতকে উপেক্ষা করা যাবে না। কোনো টালবাহনা বা ধোঁকাবাজি বা প্রতারণার মাধ্যমে জনগণের রায় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। আর কালবিলম্ব না করে অতিসত্বর জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় কার্যকর করতে হবে। জনগণকে আর পরীক্ষায় ফেলবেন না। জনগণের ৭০% রায়ের ওপর কোনো কথা নেই। এক গণভোট কেবল আর এক গণভোট দিয়েই পাল্টানো সম্ভব।
গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ রায়। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই যারা জুলাইয়ের সুবিধাভোগী, তাদের ভুলে গেলে চলবে না— বিপ্লবের ফসল হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, এমপি হবেন আর জুলাই সনদ কার্যকর করবেন না; প্রতারণা করবেন জনগণের সাথে, তা হবে না। জুলাই সনদ আর গণভোটের রায় কার্যকর না করলে সরকারি দলকে চরম মূল্য দিতে হবে; এমনকি সরকারের পতনও অস্বাভাবিক নয়। বিএনপির মধ্যেও বেশিরভাগ লোক শহীদ জিয়া ও বেগম জিয়ার অনুসারী। নব্য চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজরা বিএনপিকে দিকহারা করার চেষ্টা করছে। বিএনপির ভালো লোকদেরও রুখে দাঁড়াতে হবে জনগণের রায় বাস্তবায়নের জন্য।
শহীদ জিয়ার উত্তরসূরী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন। এটা বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গৌরবের বিষয়। আমরা দেশের জনগণ স্বাগত জানাই। দেশে ও বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হোক, আমরা চাই। সচেতন নাগরিক দল-মত নির্বিশেষে সবাই চাই। দেশ বাঁচলে আমরা সবাই বাঁচবো। গৌরবের সাথে মাথাউঁচু করে চলবো। কারো দাদাগিরি আমাদের ওপর চলবে না। স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে সবার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখবো, কারো সাথে শত্রুতা নয়।
আমার দেশের সড়ক, আকাশ ও জলপথে কোনো দেশের জন্য একক সুবিধা দেয়া যাবে না। নেপাল ও ভুটানের সাথে আমাদের স্থলপথের উন্নয়ন করতে হবে। সকল প্রতিবেশীর সাথে আমরা ভালো সম্পর্ক চাই। সবার উৎপাদিত দ্রব্য আমরা আমদানি-রফতানির মাধ্যমে সহজলভ্য করতে চাই।
দেশের আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন কোনোভাবেই বাধার সৃষ্টি করা যাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আপনার পুলিশ বাহিনীকে আওয়ামীমুক্ত করুন। প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করুন। যারা মনেপ্রাণে আওয়ামী, তাদের বাদ দিয়ে নতুন রিক্রুট করুন। দেশের অধিকাংশ মানুষ দেশদরদি। স্বৈরাচার যারা দলবলে পালায়, তারা কোনোদিন আর দেশে ফিরে আসতে পারে না। যেসব জায়গায় আগুনসন্ত্রাস করছে, তাদের কঠোরহস্তে দমন করুন। জনগণের সহযোগিতা নিন। হঠাৎ করে বাসে আগুন দেয়া কোনো দেশদরদির কাজ হতে পারে না। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ করি। কঠোরহস্তে দমন করার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে সক্রিয় করুন। আমরা উদ্যোগ নিলে কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না। হাসিনাকে ও তার দোসরদের ফিরিয়ে এনে তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনি সহায়তা নিতে হবে। কোনো দুষ্কৃতকারীর ঠাঁই নেই বাংলাদেশে। আমরা সচেতন হলে কোনো ষড়যন্ত্রই পাত্তা পাবে না। আসুন, আমরা ১৮ কোটি মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com