মাতৃভাষা, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও রাষ্ট্রভাষা


২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪১

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
ভাষা চিন্তা ও ভাবনা প্রকাশ করার বাহন। ভাষা মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে। সহজ কথায়, মানুষ তার মনের ভাব, চিন্তা ও অনুভূতি অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য যে মাধ্যম ব্যবহার করে, তাকে ভাষা বলে। এ ভাষা স্থান কাল পাত্র ভেদে বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। একই অঞ্চলে যেমন বিভিন্ন রকমের ভাষা উপভাষা থাকে, তেমনিভাবে একই রাষ্ট্রেও ভিন্ন ভিন্ন ভাষা রয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োজনে বিশ্বে যেমন নতুন ভাষার বিকাশ ঘটেছে, তেমনিভাবে অনেক ভাষা ও উপভাষা কালের গর্ভে হারিয়েও গেছে এবং যাচ্ছে।
বিশ্বে বর্তমানে প্রচলিত বা সচল ভাষার সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার ১০০টির মতো। ভাষা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এথনোলগ’ (Ethnologue)-এর তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৭১০০ থেকে ৭ হাজার ১৭০টি জীবিত ভাষা রয়েছে। তবে এই সংখ্যাটি নির্দিষ্ট নয়, কারণ নতুন ভাষা আবিষ্কার ও পুরোনো ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সবসময় চলতে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৪২ থেকে ৪৪% ভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। পৃথিবীর জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষ মাত্র ২০ থেকে ২৩টি প্রধান ভাষায় কথা বলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইংরেজি, ম্যান্ডারিন চাইনিজ, স্প্যানিশ, ফরাসি, বাংলা, হিন্দি, আরবি, পর্তুগিজ, ফরাসি রুশ ও উর্দু ইত্যাদি। এসব ভাষার অবস্থানগত মর্যাদারও পার্থক্য রয়েছে যেমন কোনোটি শুধুই মাতৃভাষা, আবার কোনোটি লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও কোনো ভাষা একসাথে মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষা। এ নিবন্ধে মাতৃভাষা, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা হচ্ছে।
মাতৃভাষা
মানুষ জন্মের পর সাধারণত প্রথমে তার মায়ের মুখে যে ভাষা শোনে এবং মায়ের কোল থেকে যে ভাষা শেখে, তাকে মাতৃভাষা বলে। সহজ কথায়, কোনো শিশু জন্মের পর তার পরিবার ও পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে যে প্রথম ভাষাটি আয়ত্ত করে, সেটিই তার মাতৃভাষা বা প্রথম ভাষা (First Language)।
ভাষা বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে : স্বাভাবিক শিক্ষা: শিশু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই অবচেতনভাবে পরিবার ও চারপাশের মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে এই ভাষা শেখে।
পারিবারিক শিক্ষা : সাধারণত মায়ের মুখের ভাষা বা পারিবারিক ভাষা হিসেবে এটি শিশুর ভাব প্রকাশের প্রথম মাধ্যম হয়ে ওঠে। মাতৃভাষার সাথে মানুষের গভীর মানসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন থাকে, যা তার চিন্তাভাবনা ও ব্যক্তিত্ব গঠনে সাহায্য করে।
রাষ্ট্রভাষা
যে ভাষা দেশের অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা এবং যা সংবিধান বা আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রের সব দাপ্তরিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত হয়, তাকে রাষ্ট্রভাষা বলে।
রাষ্ট্রভাষার প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হচ্ছে তার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার ও জাতীয় ঐক্যের মেলবন্ধন। এটি দেশের সাধারণ মানুষের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার : আইন ও সংবিধান অনুযায়ী সরকারের অফিস, আদালত, শিক্ষা ও নথিপত্রে এই ভাষা ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়।
জাতীয় ঐক্য : রাষ্ট্রভাষা বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন ও সংহতি তৈরি করে।
লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা
লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (Lingua franca) হলো এমন একটি সাধারণ বা সংযোগকারী ভাষা, যা ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ বা পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। যখন দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাতৃভাষা আলাদা হয় এবং তারা একে অপরের ভাষা বোঝে না, তখন তারা যোগাযোগের জন্য তৃতীয় একটি ভাষাকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নেয়। এই মাধ্যম বা সেতু হিসেবে কাজ করা ভাষাটিকেই ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বা যোগাযোগের ভাষা বলা হয়।
‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ একটি ইতালীয় শব্দ, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘ফ্রাঙ্কীয় ভাষা’ বা ‘ফ্রাঙ্কদের ভাষা’। মধ্যযুগে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য বন্দরে বিভিন্ন দেশের নাবিক ও ব্যবসায়ীদের; যেমন— ইতালীয়, ফরাসি, স্প্যানিশ, আরবি ও গ্রীকদের মধ্যে যোগাযোগের সুবিধার জন্য একটি মিশ্র ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল, যা মূলত সাবির (Sabir) নামে পরিচিত ছিল। সেখান থেকেই পরবর্তী সময়ে সাধারণ যোগাযোগকারী ভাষাকে বোঝাতে এই টার্মটি বিশ্বজুড়ে ব্যবহার করা শুরু হয়।
বর্তমান বিশ্বে ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু ও সোয়াহিলি হচ্ছে সবার্ধিক ব্যবহৃত লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। আধুনিক বিশ্বে ইংরেজি হলো সবচেয়ে বড় এবং প্রধান লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। আন্তর্জাতিক ব্যবসা, বিজ্ঞান, বিমান চালনা, প্রযুক্তি এবং কূটনীতির ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মানুষ প্রধানত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই যোগাযোগ করে থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম উর্দু ও হিন্দি। পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোয় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের মধ্যে কথা বলার জন্য সোয়াহিলি ভাষা ব্যবহার করে।
সহজ কথায়, নিজের মাতৃভাষা বাদ দিয়ে ভিন্ন ভাষার মানুষের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা বা আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য আমরা যে সাধারণ ভাষাটি ব্যবহার করি, তা-ই হলো লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা।
মাতৃভাষা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও রাষ্ট্রভাষার পার্থক্য
মাতৃভাষা ও রাষ্ট্রভাষার মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো তাদের উৎস, উদ্দেশ্য এবং ব্যবহারিক ক্ষেত্রে। মানুষ জন্মের পর স্বাভাবিকভাবে তার মায়ের মুখ থেকে যে ভাষা শেখে তা হলো মাতৃভাষা। অন্যদিকে একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও সরকারি কাজের জন্য সংবিধানে স্বীকৃত ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বলা হয়।
মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা এবং লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (Lingua Franca)— এই তিনটি ধারণাই ভাষার ব্যবহার ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর ভিত্তি করে আলাদা করা হয়।
মানুষ জন্ম থেকে মায়ের মুখে বা পরিবারে যে ভাষা শুনে বড় হয় এবং স্বাভাবিকভাবে প্রথম যে ভাষাটি শেখে, তাকে মাতৃভাষা বলে। এটি মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের সাথে গভীরভাবে জড়িত। যেমন— বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী একজন বাঙালির মাতৃভাষা বাংলা।
কোনো দেশের সংবিধান বা আইন দ্বারা রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম, শাসনকার্য, আইন আদালত ও দাপ্তরিক যোগাযোগের জন্য যে ভাষাকে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তাকে রাষ্ট্রভাষা বলে। একটি দেশে একাধিক রাষ্ট্রভাষা থাকতে পারে; যেমন— কানাডায় ইংরেজি ও ফরাসি। আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।
যখন ভিন্ন ভিন্ন ভাষাভাষী দুটি জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সাধারণ বা অভিন্ন একটি ভাষা ব্যবহার করে, তখন তাকে ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ বা ‘সংযোগকারী ভাষা’ বলা হয়। এটি কোনো জনগোষ্ঠীর নিজস্ব মাতৃভাষা নাও হতে পারে, কিন্তু যোগাযোগের প্রয়োজনে সবাই তা শেখে। যেমন আন্তর্জাতিকভাবে ইংরেজি ভাষা হচ্ছে একটি লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। আবার ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মানুষের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে হিন্দি ভাষা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে কাজ করে।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের প্রতিটি দেশের জনগণেরই যেমন মাতৃভাষা আছে তেমনিভাবে রাষ্ট্রভাষা ও লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা রয়েছে। ভারতে অসংখ্য মাতৃভাষা রয়েছে; যেমন— পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা, আসামের অসমিয়া, উড়িষ্যার উড়িয়া, গুজরাটের গুজরাটি, তামিলনাড়ুর তামিল কেরালার মালায়ালাম ভাষা, অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেগু, কর্নাটকের কন্নড় ও মহারাষ্ট্রের মারাঠি ইত্যাদি। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে হিন্দি। তেমনিভাবে পাকিস্তানেরও বেশ কয়েকটি মাতৃভাষা রয়েছে; যেমন— পাঞ্জাবীদের পাঞ্জাবী ভাষা, বেলুচিস্তানের বেলুচ ভাষা, সিন্ধিদের সিন্ধি ভাষা, পাখতুনখাওয়াদের পশতু ভাষা। কিন্তু পুরো পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কিন্তু পাঞ্জাবী বা বেলুচ নয়, রাষ্ট্রভাষা হচ্ছে উর্দু।
বর্তমানে রাশিয়ায় ১০০টিরও বেশি সংখ্যালঘু মাতৃভাষা সচল রয়েছে। রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের ভাষাতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, দেশটিতে মোট ১৫৫টি জীবন্ত দেশীয় বা মাতৃভাষা (Living Native Languages) রয়েছে। তবে উপভাষা বা আঞ্চলিক রূপভেদ (Dialects) হিসাব করলে এই সংখ্যা ২৭০টিরও বেশি পৌঁছায়। সমগ্র রাশিয়ার একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা হলো রুশ ভাষা (Russian)। দেশের প্রায় ৮১% মানুষের প্রথম বা প্রধান মাতৃভাষা এটি।
এভাবে বিশ্বের অনেক দেশেই বিভিন্ন রাজ্য ও প্রদেশের জনগণের আলাদা আলাদা মাতৃভাষা থাকার পরও একটি রাষ্ট্রভাষা রয়েছে। তবে মাতৃভাষা, লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ও রাষ্ট্রভাষার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে সব মাতৃভাষাই লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা বা রাষ্ট্রভাষা হয় না। আবার রাষ্ট্রভাষাও কোনো দেশের মাতৃভাষা নাও হতে পারে। যেমন উর্দু পাকিস্তানের কোনো প্রদেশরই জনগণের মাতৃভাষা নয়, কিন্তু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। রাষ্ট্র দেশ ও জাতির বিশেষ প্রয়োজনেই এ রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ করে থাকে। যেমন ভারত ব্রিটিশ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর তার অধিকাংশ রাজ্যের আলাদা আলাদা মাতৃভাষা থাকার পরও সংখ্যালঘু একটি ভাষা হিন্দিকে তার রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করে। হিন্দি তার রাষ্ট্রভাষা কিন্তু কোনো রাজ্য থেকেই এ হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন সংগ্রাম হয়নি। বরং পুরো ভারতের জনগণ হিন্দি ভাষাকেই তাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছে। হিন্দি যেমন ভারতের রাষ্ট্রভাষা, তেমনিভাবে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কাও বটে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার পাঁচ প্রদেশের জন্য এমন একটি ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করতে চেয়েছিল যেটি কোনো প্রদেশেরই একক ভাষা না। অবশ্য সেটি ছিল মুসলিমদের জাতীয় ভাষা উর্দু। আবার এটি পাকিস্তানের পাঁচ প্রদেশেরই মানুষ কিছুটা বুঝে যা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে যোগাযোগের একটি সহজ মাধ্যম হতে পারতো। কিন্তু যেই প্রতিবেশী দেশটি পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মই মেনে নিতে পারেনি, তারা এ ভাষাকে কেন্দ্র করে শুরু করে ষড়যন্ত্র। আর ষড়যন্ত্রের সাথে তৎকালীন কমিউনিস্ট ও বামধারার রাজনৈতিক নেতারা তাল মিলিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে। বিগত শতকের পঞ্চাশ দশকের দিকে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধে যে আন্দোলন হয়, তার নেপথ্য ইতিহাস জানার পর মুসলমানদের টনক নড়ে অনেক পড়ে। উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে ইসলাম বিরোধী শক্তি কমিউনিস্ট ও বামধারার আন্দোলনের নেপথ্য ইতিহাস নিয়ে বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তাবিদ ডা. ফাহমিদুর রহমান ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ নামে একটি বই লিখেছেন। ২০২৩ সালে প্রকাশিত বইটির ফ্লাপে লিখিত কয়েকটি বাক্য এখানে পাঠকদের জন্য তুলে ধরতে চাই। প্রচ্ছদের প্রথম ফ্লাপে লেখা হয়েছে, ‘রাজনীতির পিছনে আরেকটি রাজনীতি থাকে। সে রাজনীতিই দৃশ্যমান রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। একুশের রাজনীতির পেছনে আরেকটি রাজনীতি ছিল। সে রাজনীতিটি সবার কাছে অধরা রয়ে গেছে। এ অধরা রাজনীতিটিই বাঙালি মুসলিমের পরবর্তীকালের রাজনীতির ধারাবাহিকতাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। দৃশ্যমান একুশকে দেখে তাই পেছনের একুশকে বোঝা যাবে না। একুশ এ দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনীতির গতিপথকে বদলে ফেলেছে এবং বাঙালি মুসলিমের আটশ’ বছরের ইতিহাসের ধারাবাহিকতাকে উল্টে দিয়েছে। সে উল্টে যাওয়া ইতিহাসের বিবৃতি এ- বই।’
ডা. ফাহমিদুর রহমান ‘আ মরি বাংলা ভাষা’ গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায়ের ৮৭-৮৮ পৃষ্ঠায় কয়েকটি প্যারায় লিখেছেন, ‘আগেই বলেছি, উর্দু ছিল ভারতীয় মুসলিমদের জাতীয় ভাষা। এখনো ভারতের ছয়টি রাজ্যের অফিসিয়াল ভাষা উর্দু। মুসলিম লীগ চাচ্ছিল পাকিস্তানের পাঁচটি রাজ্যের প্রধান ভাষার পাশাপাশি উর্দুকে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। যেহেতু উর্দু পাকিস্তানের কোনো রাজ্যেরই প্রধান ভাষা ছিল না, সেহেতু এটাকে আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগের ভাষা করা হলে কারো প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করা যাবে না। কিন্তু তমুদ্দুন মজলিস সেই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ করেছিল এবং সেই অভিযোগকে রীতিমতো রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিণত করেছিল।… তমুদ্দুনের এসব যুক্তি আপাত নির্দোষ হলেও এর পিছনে ছিল সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতলব। ভাষার মত নির্দোষ একটি বিষয়কে সামনে এনে জনগণকে খেপিয়ে তুলে তারা মুসলিম জাতীয়তাবাদের গোড়ায় আঘাত হানতে চেয়েছিল।
একটি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নির্ভর করে অনেক ঐতিহাসিক বাস্তবতার ওপর, শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নয়। আবার পাকিস্তান হয়েছিল ভারতীয় মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য, শুধু বাংলাভাষীদের নৃতাত্তিক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য নয়। তমুদ্দুন সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে মুসলিম জাতীয়তাবাদকে রক্তাক্ত করে দেয় এবং সেই রক্তাক্ত জমিনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নিশান উড়ায়।’
বাংলা অঞ্চলের মুসলিম আলেম-ওলামা ভারতব্যাপী মুসলিম জাতীয়তার প্রশ্নে কওমি জবান বা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে উর্দুর গুরুত্বকেও যথেষ্ট মূল্য দিতেন। ১৩২৫ বঙ্গাব্দে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মিলনে সভাপতির ভাষণে দৈনিক আজাদ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক মাওলানা আকরম খাঁ বলেছিলেন, ‘উর্দু আমাদের মাতৃভাষা নহে, জাতীয় ভাষাও নহে, কিন্তু ভারতবর্ষের মোসলেম জাতীয়তা রক্ষা ও পুষ্টির জন্য আমাদের উর্দুর দরকার’। মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী লিখেছিলেন, ‘বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। এই ভাষা ত্যাগ করিবার কোনো উপায় নাই। তবে উর্দুটা অতিরিক্ত ভাষারূপে শিক্ষা করা প্রয়োজনীয়, ইহাই আমাদের বক্তব্য।’
১৯৩৮ সালে ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একে ফজলুল হক সভাপতির ভাষণে হিন্দির পরিবর্তে উর্দুকে ভারতের সাধারণ ভাষা তথা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেছিলেন। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণে এবং তৎকালীন ভারতীয় রাজনীতির পেক্ষাপটে বাঙালি মুসলিম রাজনীতিবিদরা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে উর্দুর পক্ষে ছিলেন। তৎকালীন বাঙালি মুসলিমদের নেতা হিসেবে হুগলির দেলওয়ার হোসেন আহমদ, কুমিল্লার সিরাজুল ইসলাম ও সৈয়দ শামসুল হুদা, সিলেটের আবদুল করিম, মেদিনিপুরের স্যার আবদুর রহীম, ওবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী, আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী, বর্ধমানের খান আবদুল জব্বার প্রমুখ সবাই কওমি জবান তথা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে উর্দুর পক্ষপাতী ছিলেন।
বাঙালিদের দাবির প্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষে প্রস্তাব পাস করে। তারপর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে ২১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে বাংলা ও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার পরও বামপন্থি ও কমিউনিস্ট দল ও নেতারা ভাষা ইস্যুটাকে জিইয়ে রাখে এবং এটাকে কেন্দ্র করে একটার পর একটা রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে পাকিস্তানের মুসলিমদের মধ্যে অনৈক্য ও বিরোধ তৈরি করে। বিশেষ করে উর্দু ভাষার বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলিমদের ক্ষেপিয়ে তুলে। উর্দুর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলার অন্যতম কারণ ছিল উর্দু সাহিত্য ছিল ইসলাম, ইসলামী আদর্শ ও মুসলমানদের নৈতিক বিকাশ ও উন্নয়নের পক্ষের সাহিত্য। উর্দুতে ইসলামী আদর্শ ও মুসলিম জাগরণের প্রচুর গ্রন্থ ছিল যেগুলো পড়লে বাঙালি মুসলিমরা জেগে উঠবে। এটা বাংলা অঞ্চলের কমিউনিস্ট ও নাস্তিক্যবাদীরা ভালো করেই জানত। তাই তারা বাঙালি মুসলিমদের জাগরণ ঠেকাতেই বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার আন্দোলনের নামে উর্দুর বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে। এটাকে রাজনৈতিক ও চেতনার আন্দোলনে প্রবাহিত করে। এককথায় তাদের এ আন্দোলন ছিল বাংলার মুসলিমদের চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস ও আদর্শ ইসলামের বিরুদ্ধে এ গভীর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com