গুম-খুন আইন : বিচারের বাণী কি নীরবে-নিভৃতেই কাঁদবে?
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:২০
॥ জামশেদ মেহদী ॥
শেখ হাসিনার ১৫ বছর ৭ মাসের রাজত্বে যত রকমের অপরাধ, দুর্বৃত্তায়ন, অর্থ পাচার, লুণ্ঠন, খুন, হত্যা, গণহত্যা প্রভৃতি যেসব দানবীয় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো গুম ও খুন, অর্থাৎ এনফোর্সড ডিজ-অ্যাপিয়ারেন্স এবং ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূত হত্যা। এর মধ্যে বর্বরতম অপরাধ হলো একাধিক আয়নাঘরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক কারণে বছরের পর বছর বন্দী রাখা এবং নির্যাতন করা। এছাড়া কয়েকদিন আগে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন যে, শেখ হাসিনার আমলে ৪ হাজারেরও বেশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে ক্রসফায়ার বা বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এই গুম ও খুনের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশে প্রথম ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় কমরেড সিরাজ শিকদারকে। তার অপরাধ ছিলো, তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ভারতীয় প্রভুত্বকে মেনে নিতে পারেননি। তার আরো অপরাধ ছিলো, শেখ মুজিবের দুর্নীতি, অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও রক্ষীবাহিনীর হাজার হাজার আওয়ামীবিরোধীকে হত্যার নৃশংসতা তিনি মেনে নিতে পারেননি।
শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা এই সমস্ত মানুষ হত্যার ক্ষেত্রে তার পিতাকে কয়েক ডিগ্রি ছাড়িয়ে যান। তার আমলে হাজার হাজার মানুষকে এভাবে গুম ও খুন করার বিচার মানুষ পায়নি। তাই জুলাই বিপ্লবের পর ড. ইউনূসের সরকার এদিকে নজর দেয়। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ইউনূস সরকার ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ-২০২৫’ জারি করে। এটি ছিলো ড. ইউনূস সরকারের ৭৩ নম্বর অধ্যাদেশ। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি অপর একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ১ ডিসেম্বরের অধ্যাদেশটির সংশোধনী আনা হয়।
ড. ইউনূস সরকারের আমলে প্রণীত ও জারি করা এই অধ্যাদেশ তথা আইনটি ব্যাপকভাবে জনসমাদৃত হয়। কারণ শেখ মুজিবের পর ৩৪ বছর পর্যন্ত এই ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। কিন্তু শেখ হাসিনা এসে শুধুমাত্র ক্রসফায়ারই পাইকারিভাবে চালু করেননি, বরং ইতিহাসের নিকৃষ্ট ডিক্টেটর হিটলারের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের আদলে একাধিক আয়নাঘর স্থাপন করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে মুক্তিবাহিনীর প্যারালাল মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে বিরোধীদল নিধনের জন্য প্রধানত মুজিব বাহিনী থেকে রিক্রুট করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয় কুখ্যাত রক্ষীবাহিনী। শেখ হাসিনা তার আমলে র্যাবকে ব্যবহার করেন হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর মতো। আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে শেখ হাসিনার আমলে র্যাবকে ব্যবহার করা হয় হিটলারের ব্রাউন শার্ট বাহিনীর মতো। যদিও র্যাব ছাড়াও পুলিশও বিপুলসংখ্যক মানুষকে গুম ও খুন করে।
নির্বাচনের পর জনগণ আশা করেছিলেন যে, ড. ইউনূস যে গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ জারি করেছিলেন, তারেক রহমানের নির্বাচিত বিএনপি সরকার ঐ অধ্যাদেশটিতে আরো কঠোর অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত করে হাসিনার আমলের গুম ও খুনের বিচার করবেন। কিন্তু চরম দুঃখের বিষয় হলো এই যে, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগণ এবং গুম-খুনের ভুক্তভোগীরা আশা করেছিলেন যে, বিএনপি ঐ অধ্যাদেশটি আরো কঠোর বিধি সংযুক্ত করে ড. ইউনূসের অধ্যাদেশ র্যাটিফাই করবেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বিএনপি এ সম্পর্কে যে আইন পাস করে, তা সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং গুম-খুনের ভুক্তভোগীদের চরম হতাশ করেছে। এই হতাশার অনেক কারণ রয়েছে। তার মধ্যে প্রধান কারণ হলো, গুম-খুনের অভিযোগে যাদের বিচার করা হবে, তাদের ওপরেই ঐসব অপরাধের তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে। বিএনপি সরকারের গুম প্রতিরোধ আইনের মাজেজা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ প্রখ্যাত পল্লীগীতির গায়ক আব্দুল আলীমের সেই বিখ্যাত গানের নিম্নোক্ত কয়েকটি চরণ স্মরণ করছেন। চরণ কটি হলো—
হাকিম হইয়া হুকুম করো
পুলিশ হইয়া ধরো।
সর্প হইয়া দংশন করো
ওঝা হইয়া ঝাড়ো।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুম-খুনের তদন্তকারী সংস্থা করা হয়েছিলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে (NHRC). এর পাশাপাশি পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও অভিযোগ দাখিল করা যেত। কিন্তু বিএনপি সরকারের আইনে পুলিশকেই গুম-খুন অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু বিএনপির আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের তদন্তের ক্ষমতা সম্পূর্ণ বিলোপ করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুমকে পৃথক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে এবং সেই অপরাধের বিচারের ক্ষমতা বা এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটিকে। কিন্তু বিএনপির আইনে বিশেষ গুম ট্রাইব্যুনাল নয়, সাধারণ বিচারব্যবস্থার কাঠামোর মধ্যে বিচারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে গুম ও খুনকে ব্যাপক ও পরিকল্পিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সেজন্য আইসিটিতে এই অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে বিচার করার ব্যবস্থা ছিলো। কিন্তু বিএনপির আইনে এটিকে পরিকল্পিত অপরাধ না বলে পদ্ধতিগত অপরাধ বলা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের ২৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছিলো যে, যদি গুম বা খুন ব্যাপক এবং পরিকল্পিত হয় এবং যদি সেটি মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়, তাহলে সেটা ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারের আইনগুলো প্রযোজ্য হবে।
ওপরে যেসব পার্থক্য তুলে ধরা হলো সেগুলো প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গুরুতর। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই ১৫ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিচার শুরু হয়। তখন আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর ছিলেন তাজুল ইসলাম। এই বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনায় গুরুতর বৈষম্য দেখা দেয়। এই ১৫ জন কর্মকর্তা হলেন— (১) মেজর জেনারেল শেখ মো. সারওয়ার হোসেন, (২) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, (৩) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারওয়ার, (৪) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. কামরুল হাসান, (৫) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, (৬) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান, (৭) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকী, (৮) কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, (৯) কর্নেল এ কে এম আজাদ, (১০) কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, (১১) কর্নেল মো. সারওয়ার বিন কাশেম, (১২) কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল, (১৩) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. সাইফুল ইসলাম সুমন, (১৪) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ রেদওয়ানুল ইসলাম ও (১৫) মেজর রাফাত বিন আলম মুন।
অভিযুক্তদের মধ্যে আরেকজন ছিলেন মেজর জেনারেল কবির আহমেদ। তিনি এ্যাকটিভ সার্ভিসে ছিলেন। যেদিন এসব সেনা অফিসারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়, সেদিনই তিনি ভারতে পালিয়ে যান। তার ভারতে পলায়ন নিয়ে অনেক কথা রয়েছে।
এই ১৫ জন সেনা অফিসারের বিচার গত বছরের অক্টোবর মাসে শুরু হয়। আর ৫ দিন পর আবার অক্টোবর আসবে। অর্থাৎ প্রায় ১ বছর হলো এই সব অফিসারের বিচার থমকে দাঁড়িয়ে গেছে।
এসব অফিসারকে গুরুতর মামলার আসামি হিসেবে কারাগারে রাখার কথা। কিন্তু ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের একটি বা একাধিক রুমকে কারাগার হিসেবে বিবেচনা করে তাদেরকে রাখা হচ্ছে। তাদের থাকার ঘর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে করে কোর্টে আসা-যাওয়া করেন। তারপরও তাদের বিচার মাঝ পথে থমকে দাঁড়িয়েছে।
পক্ষান্তরে শেখ হাসিনার আমলে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুর রহিমের মৃত্যুদণ্ড হয়। পরে তারা হাইকোর্টের রায়ে খালাস পান। মেজর জেনারেল সাদিক হাসান রুমি এই মামলায় সাক্ষী ছিলেন। সেনাবাহিনীর এসব মেজর জেনারেল এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল র্যাংকের অফিসারদের হাসিনার আমলে সাধারণ প্রিজন ভ্যানে কোর্টে আনা-নেওয়া করা হতো। এছাড়া তারা ক্যান্টনমেন্টে নয়, দেশের কারাগারে বন্দী ছিলেন।
এখন ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রণীত বিএনপির গুমবিরোধী আইনে ওপরে উল্লেখিত সেনা অফিসারদের বিচার হবে কিনা, সেটি আইনবিদ এবং রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে।
বিএনপি সরকারের সাথে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের বিরোধের অন্যতম প্রধান জায়গা হলো শেখ হাসিনার আমলে কৃত অপরাধসমূহের বিচার। এর মধ্যে গুম ও খুনের মামলাও রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায় যে, আইসিটির কাছে এখন ১০টি মামলা বিচারাধীন। এছাড়া অপর একটি তথ্য মোতাবেক ২৫০টি গুমের ঘটনা নিয়ে তদন্ত চলছে।
উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জুলাই বিপ্লবের পর ২ বছর ১ মাস বা ২৫ মাস অতিক্রান্ত হলো। এই ২৫ মাসে একটি গুম ও খুনের মামলারও বিচার সম্পন্ন হয়নি। আর ২৫০টি অভিযোগের কথা বলাই বাহুল্য। ভুক্তভোগীরা মনে করেন যে, ৯ মন তেলও জুটবে না আর রাধাও নাচবে না। অথচ এই গুম ও খুন তথা এনফোর্সড ডিজ-অ্যাপিয়ারেন্স ও ক্রসফায়ার তথা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে অতীতে অসংখ্য ঘটনা নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। লে. জেনারেল (অব.) আমান আযমী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, ব্যারিস্টার আরমান এমপি প্রমুখ সারা দেশে পরিচিত হয়েছেন শেখ হাসিনার আয়নাঘরের জন্য। সেই আয়নাঘরের একটি বিচারেরও রায় আজ পর্যন্ত বের হয়নি।
এসব দেখেশুনে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্ন করছেন, বিচারের বাণী কি এভাবেই নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে?
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com