অনিশ্চয়তায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন


২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১০

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এই সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করেন। ওইদিন তার ঘোষণা অনুযায়ী, সাত ধাপে স্থানীয় সরকার; বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা আসে ১২ নভেম্বর থেকে। পরবর্তী ধাপগুলোর সম্ভাব্য তারিখ ছিল ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েও তাদের পরিকল্পনায় অটল থাকতে পারেনি। সরকারের চাপের কাছে তারা বশ্যতা স্বীকার করেছে। বাধ্য হয়েছে সম্ভাব্য ঘোষিত তারিখ থেকে সরে আসতে। নির্বাচন কমিশন বহুকাঙ্ক্ষিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য শিডিউল ঘোষণার পরপরই সরকার কেন বেঁকে বসলো— এই প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। ‘সরকার কি জনরায়কে ভয় পায়, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে না— এমন আন্দাজ থেকে ভোট পেছাতে চায় নাকি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সাবির্ক পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে নেই ভেবে এখনই ভোটে যেতে চাচ্ছে না’— এমন বহু প্রশ্ন মানুষের মনে।
ইসি কর্তৃক ১৪ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ঘোষণার পরদিনই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলে বসলেন, সরকার ওই তারিখ সম্পর্কে কিছুই জানে না। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও বললেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ইসির ‘একক কোনো এখতিয়ার নেই’; সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বললেন, ইসির ঘোষিত সময়সূচি চূড়ান্ত নয়। সরকারের এই প্রভাবশালী তিন কর্মকর্তা একইদিন এসব কথা বলেন। এরপর ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পর নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ নিজেই জানান, নভেম্বরেই ভোট শুরু হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়। বৈঠক থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে। অর্থাৎ ১৪ সেপ্টেম্বর যে সাত ধাপের সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশ্যে এসেছিল, সেটি কার্যত পুনর্বিবেচনায় চলে যায়।
এ ঘটনা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সমন্বয়ের প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে সামনে এসেছে আরও বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা। তা হচ্ছে— দেশের বহু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে নেই; প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতারা প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিতরাই দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সেই প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়িয়ে দলীয় নেতাদের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকট
বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা এবং দলটির অন্যতম অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ দুটি কারণে বিএনপির এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে চায়। একটি কারণ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। সরকার মনে করে, এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শতভাগ সরকারের অনুকূলে নেই। বাহিনীর মধ্যে এখনো অনেকেই সরকারের বিপক্ষের লোক। কয়েকদিন আগে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। কারণ সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ভয়ঙ্কর অডিও ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনে আওয়ামী লীগের লোক এখনো অনেক আছে, এদের নিয়ে সরকার বিব্রত ও অস্বস্তিতে রয়েছে। তাছাড়া বিএনপির তৃণমূলে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ঘোষণার পর বিরোধ চরমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তখন প্রশাসনে থাকা আওয়ামী লীগের অনুসারীদের ভূমিকা নিয়ে সরকারের টেনশন রয়েছে। ফলে ভোটকেন্দ্রিক ক্ষমতাসীনদের বিরোধীদের সুযোগ কেউ কেউ ষড়যন্ত্র উসকে দেয় কিনা, তা নিয়েও চিন্তা রয়েছে সরকারের। অন্যদিকে দেশের দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে। এই মধ্যে দফায় দফায় মূল্য বেড়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য এক মাসে (এপ্রিল) সরকার বাড়িয়েছে দুই দফায় ৫৯৯ টাকা পর্যন্ত, যা অতীতে সব রেকর্ড ভেঙেছে। লোডশেডিংয়ের মধ্যেই সরকার বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়েছে। এখন দ্বিতীয় ধাপে (২১ সেপ্টেম্বর) সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানোয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। এই অবস্থায় ভোটের মাঠে বিএনপির বিপক্ষে শক্তিশালী প্রার্থী থাকলে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থিত প্রার্থীর বিজয় অনেকটাই অনিশ্চিত। ফলে পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে সরকার সময়ক্ষেপণ করতে চায়।
প্রশাসকের চেয়ার বনাম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে বিএনপি নেতাদের প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ ছয়টি সিটি করপোরেশনে নতুন প্রশাসক হিসেবে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের সবাই বিএনপির নেতা। খুলনা সিটি করপোরেশনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের প্রশাসক করা হয়েছে বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান শামীমকে। তিনি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-৬ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীও ছিলেন।
শুধু সিটি বা জেলা পরিষদ নয়, কিছু ইউনিয়ন পরিষদেও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের প্রশাসক ও সদস্য হিসেবে নিয়োগের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে দেশের একটি প্রভাবশলী দৈনিকের প্রতিবেদনে। তাতে অন্তত ৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে কোথাও সরকারি কর্মকর্তা, কোথাও বিএনপি নেতাদের প্রশাসক করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপির নেতা মো. নূরনবী ভুঁইয়াকে প্রশাসক করার পাশাপাশি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের ১২ নেতা-নেত্রীকে পরিষদের সদস্য করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজনের সঙ্গে প্রশাসক নিয়োগের একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। নির্বাচন হলে এসব পদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা আসবেন। ফলে বর্তমানে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশকে নির্বাচনের মাঠে যেতে হলে প্রশাসনিক পদ ছাড়তে হতে পারে। আবার যারা নির্বাচনে প্রার্থী হবেন না, তাদেরও বর্তমান প্রশাসনিক প্রভাবের জায়গাটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তাছাড়া ভোট হলে বিরোধীদলের নেতা বা সমর্থকদের মধ্য থেকে অনেকেই নির্বাচিত হয়ে যাবেন। ফলে এখন দেশজুড়ে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিএনপির একক আধিপত্য থাকলেও নির্বাচন দেওয়ার পর সেই আধিপত্য থাকবে না। ফলে বিএনপি চাইছে কোনো না কোনো অজুহাতে ভোট পিছিয়ে দিতে। বিশেষ করে সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। বর্তমানে মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসকই কার্যত করপোরেশনের শীর্ষ নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন। সিটি করপোরেশনগুলোর প্রশাসক নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, প্রশাসক মেয়রের ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন এবং বিধি অনুযায়ী ভাতা পাবেন।
কাউন্সিলর নেই, প্রশাসকের হাতে একক ক্ষমতা
সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের বিষয়টি তাই শুধু একজন মেয়র নির্বাচনের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কাউন্সিলর নির্বাচনও। বর্তমানে প্রশাসককেন্দ্রিক ব্যবস্থায় সেই নির্বাচিত কাউন্সিলর কাঠামো নেই। ফলে নগর সরকারের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের জায়গাটি অনেকটাই প্রশাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত। নির্বাচন হলে মেয়রের পাশাপাশি সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন। তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় একক প্রশাসকের পরিবর্তে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ থাকবে। এই বাস্তবতায় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের অবস্থানও পরিবর্তিত হবে। তাদের কেউ মেয়র পদে, কেউ কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হতে পারেন। আবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে প্রশাসক হিসেবে যে সরাসরি ক্ষমতা রয়েছে, সেটিও থাকবে না। বিএনপির পক্ষ থেকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। দলটির ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেছেন, সিটি মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার পদে স্থানীয়ভাবে সমন্বয় করে একজন করে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।
তৃণমূলে একাধিক প্রার্থী, কোন্দলের আশঙ্কা
স্থানীয় সরকার নির্বাচন জাতীয় নির্বাচনের মতো নয়। এখানে একটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড বা পৌর এলাকায় একই দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হতে পারেন এবং ব্যক্তিগত পরিচিতি, স্থানীয় প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক অবস্থান বড় ভূমিকা রাখে। বিএনপির ক্ষেত্রে এই সমীকরণটি এখন থেকেই দৃশ্যমান। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রায় সব ইউনিয়ন পরিষদেই একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্দেশনার বাইরে গিয়ে প্রার্থী হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির তৃণমূলে একাধিক প্রার্থী নিয়ে আলোচনা রয়েছে। দলীয়ভাবে একক প্রার্থী নির্ধারণের চেষ্টা, স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় এবং বিভিন্ন বলয়ের মধ্যে প্রার্থী ঠিক করার বিষয়টি তখন থেকেই আলোচনায় ছিল, এখনো আছে।
বশ্লেষকরা মনে করেন, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিএনপির তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচনের মতো দলীয় প্রতীকের ওপর নির্ভর করে ভোট নিয়ন্ত্রণের সুযোগও থাকবে না। কেননা এবার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা সুযোগ নেই। সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ কোথায়ও এবার দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে দলীয় প্রতীক নয়, ব্যক্তিগত ও স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভর করেই ভোট করতে হবে। একই দলের একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোট ভাগ হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে। এটি কোথায় কী ফল তৈরি করবে, তা আগাম নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে দলীয় কেন্দালের কারণে বিএনপি নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। যতটা সম্ভব কোন্দ মেটানোর পরই ভোটে যেতে চায় ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
‘ইসির একক এখতিয়ার নেই’, স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ভোটের সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণার পর যখন সরকারের চাপের মুখে ইসিকে থেমে যেতে হয়েছে, তখন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কতটুকু— এমন প্রশ্ন কিন্তু চাপিয়ে রাখা যাবে না। ইউনিয়ন পরিষদ আইনে নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা এবং ভোটের তারিখ, সময় ও স্থান নির্ধারণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের ওপর রয়েছে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে জাতীয় নির্বাচন বা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মতো ইসির একক এখতিয়ারের বিষয় নয়; সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার আইন অনুযায়ী সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করেই এ নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। এই দুই অবস্থানের মধ্যেই সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনার সানাউল্লাহ সম্ভাব্য সাত ধাপের সময়সূচি প্রকাশ করেন। কিন্তু ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, সরকার ওই সময়সূচি সম্পর্কে কিছু জানে না। একই দিনে তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে, সে বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয় করে এগোতে হবে। ১৭ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার পর ইসিও আগের অবস্থান থেকে ভাষা পরিবর্তন করে। কমিশনার সানাউল্লাহ বলেন, নভেম্বরেই নির্বাচন শুরু হবে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব নয়; সভা থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন কমিশন ২২ সেপ্টেম্বর দুপুরে এক রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত ইসির পক্ষ থেকে নতুন কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
প্রতিশ্রুতি রাখেনি বিএনপি, ইসির টার্গেট ৬ জুন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনও আগস্টে জানিয়েছিলেন, কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময়সূচি সেপ্টেম্বরের মধ্যে ঘোষণা করতে চায় এবং বছরের শেষ নাগাদ প্রথম ধাপের ভোট শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে গত ১৭ সেপ্টেম্বরের আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর ইসি জানিয়েছে, আগামী বছরের ৬ জুনের মধ্যে ইউপি নির্বাচন শেষ করতে হবে। পরীক্ষার সময়সূচি, রোজা, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক বাস্তবতার কারণে ভোটের সময় নির্ধারণে জায়গা খুব সীমিত বলেও জানিয়েছে কমিশন।
বাস্তবতা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই জামায়াতে ইসলামী এবং তরুণদের নতুন দল এনসিপিসহ বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন চেয়েছিল, তখন বিএনপির এই দাবির তীব্র বিরোধিতা করায় সরকার থেমে যায়, বিএনপিও তখন বলেছিল জাতীয় নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে যাবে তারা। কিন্তু এখন সেই প্রতিশ্রুতি থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে দলটি। নানা অজুহাতে ভোট পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে এখন প্রশাসক রয়েছেন; এরা ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা। সিটি করপোরেশনগুলোয় নির্বাচিত মেয়র-কাউন্সিলর না থাকায় প্রশাসকদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এতে সাধাণ মানুষ সেবা বঞ্চিত হচ্ছে এবং দুর্নীতিরও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।