ডেঙ্গু ও হামের ছোবলে বিপন্ন জনজীবন
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫২
# একদিনে প্রাণ গেল ১২ জনের, হাসপাতালে ছুটছে হাজারো মানুষ
স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কয়েকজন শিশুর অস্বাভাভিক মৃত্যুর পর স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে এ নিয়ে খুবই সরব দেখা গেছে। তিনি হাসপাতালটির লাইসেন্সও স্থাগিত করেন। রোগীর জন্য তিনি হৃদয়বান স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু এখন প্রতিদিনই হাম ও ডেঙ্গুতে মানুষ মারা যাচ্ছে। এই মৃত্যু কী হাসপাতালের সঠিক চিকিৎসার অভাবে, নাকি সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটাতে গাফিলতি করার কারণে ডেঙ্গু হচ্ছে, তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। যেন এসব মৃত্যু তার কোনো গায়েই লাগছে না। তিনি আর আলোচনায় নেই, অনেকটা নীরবেই থাকছেন। একদিকে দেশজুড়ে ডেঙ্গুর ভয়ংকর বিস্তার; অন্যদিকে হামের উপসর্গে একের পর এক শিশুর মৃত্যু— দুই সংক্রামক রোগের দ্বিমুখী আঘাতে উদ্বেগ বাড়ছে সারা দেশে। হাসপাতালের বিছানায় অসুস্থ মানুষের ভিড়, স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর একের পর এক মৃত্যুর খবর দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (২০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯০ জনে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট ৬৩ হাজার ৬২৭ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৫৯ হাজার ৩৮ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ছয়জনই রাজশাহী বিভাগের সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরের বাসিন্দা। অর্থাৎ ডেঙ্গুর ঝুঁকি শুধু রাজধানী বা বড় নগরকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগটির বিস্তার নিয়ে নতুন করে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৩ জনে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০১ জনের এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯৬২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় (২০ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ২১ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন করে ১ হাজার ৩০৫ জনের শরীরে হাম বা হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে ঢাকা ও সিলেট বিভাগে দুজন করে এবং চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ১৫ মার্চ থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৮১ হাজার ৩৫ জনের মধ্যে সন্দেহজনক হাম বা হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২০ হাজার ৬৪৬ জনের। হাসপাতালগুলোয় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৮০৪ জন, যাদের মধ্যে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৪৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু মশা মারলেই হবে না
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিন ধরে মশকনিধন, ফগিং ও পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এসব কার্যক্রমকে আরও সমন্বিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তবতা বিবেচনায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
প্রথমত, হটস্পটভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ। কোন ওয়ার্ড, উপজেলা বা ইউনিয়নে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেটি প্রতিদিনের তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করে সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লার্ভা ধ্বংস, প্রজননস্থল পরিষ্কার এবং প্রয়োজনীয় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা দরকার।
দ্বিতীয়ত, শুধু ফগিং নয়, লার্ভা নিয়ন্ত্রণে জোর দিতে হবে। জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত ভবন, ছাদ, ড্রেন, ডাবের খোসা, টায়ার ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননস্থল হতে পারে। তাই সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে।
তৃতীয়ত, হাসপাতাল পর্যায়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। ডেঙ্গুতে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে। তাই জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং সতর্ক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা জরুরি।
হামের ক্ষেত্রে টিকাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ
হামের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভিন্ন। এটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও টিকাদানের মাধ্যমে এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। ফলে হাম মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম, সেসব এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ ক্যাচআপ ক্যাম্পেইন চালানো প্রয়োজন। স্কুল, মাদরাসা, কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে বাদ পড়া শিশুদের টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত চর, পাহাড়ি এলাকা, বস্তি এবং দুর্গম গ্রামেও টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে একটি এলাকার টিকাবঞ্চিত শিশু শুধু নিজের জন্য নয়, পুরো সম্প্রদায়ের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
দরকার ‘একসঙ্গে কাজ করার’ সংস্কৃতি
ডেঙ্গু ও হাম— দুই রোগের প্রকৃতি আলাদা হলেও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি জায়গায় বড় মিল রয়েছে। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একার পক্ষে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ওয়াসা, গণপূর্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে হামের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবার পরিকল্পনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় রোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। কোথায় রোগ বাড়ছে, কোন বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কোথায় টিকাদানের ঘাটতি রয়েছে কিংবা কোথায় হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে— এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো সম্ভব।
মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো অভিযান সফল হবে না
সরকারি উদ্যোগ যতই থাকুক, নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পানির পাত্র কিংবা আশপাশের জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন হচ্ছে কি না— প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত তা দেখতে হবে।
একইভাবে শিশুর জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা হামের মতো উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
এখনই সমন্বিত প্রস্তুতির সময়
ডেঙ্গুতে চলতি বছরে ইতোমধ্যে ১৯০ জনের মৃত্যু এবং একদিনে ১ হাজার ৬৫৫ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সতর্কবার্তা। একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে ১ হাজার ৬৩ জনের মৃত্যু, যার বড় অংশই শিশু— এটিও আমাদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা। রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি রোগ যাতে মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেই প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। ডেঙ্গুর মশা নিয়ন্ত্রণ এবং হামের টিকাদান— দুই ক্ষেত্রেই স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি, নিয়মিত তথ্য প্রকাশ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।